|
দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রতিরোধ ও প্রস্তুতিই হোক অগ্রাধিকার
লায়ন মোঃ গনি মিয়া বাবুল:
|
দুর্যোগ প্রকৃতির নিয়মে আসতে পারে, কিন্তু দুর্যোগে প্রাণহানি ও সম্পদের বিপুল ক্ষয়ক্ষতি সব সময় অনিবার্য নয়। যথাযথ পরিকল্পনা, আগাম সতর্কতা, নিরাপদ অবকাঠামো, জনসচেতনতা এবং কার্যকর ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে দুর্যোগের ক্ষতি অনেকাংশে কমানো সম্ভব। তাই দুর্যোগের পর উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রমের পাশাপাশি দুর্যোগের আগেই ঝুঁকি শনাক্ত করা এবং ক্ষয়ক্ষতি প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি। ১৩ অক্টোবর আন্তর্জাতিক দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস দিবস আমাদের সেই দায়িত্বের কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়।জাতিসংঘের উদ্যোগে প্রতিবছর ১৩ অক্টোবর বিশ্বব্যাপী আন্তর্জাতিক দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস দিবস পালিত হয়। দিবসটির মূল লক্ষ্য হলো দুর্যোগের ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি, প্রাণহানি ও অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতি কমানো এবং দুর্যোগ মোকাবিলায় ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রের সক্ষমতা বাড়ানো। বাংলাদেশে দিবসটির গুরুত্ব বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। ভৌগোলিক অবস্থান, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, জনসংখ্যার ঘনত্ব এবং অপরিকল্পিত নগরায়ণের কারণে বাংলাদেশ বিভিন্ন ধরনের প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট দুর্যোগের ঝুঁকিতে রয়েছে। বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, নদীভাঙন, বজ্রপাত, ভূমিধস ও ভূমিকম্পের ঝুঁকির পাশাপাশি অগ্নিকাণ্ড, ভবনধস, শিল্পকারখানার দুর্ঘটনা এবং পরিবেশদূষণও জনজীবনের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ। এসব দুর্যোগ মানুষের জীবন ও জীবিকার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। ক্ষতিগ্রস্ত হয় কৃষি, শিল্প, ব্যবসা-বাণিজ্য, যোগাযোগব্যবস্থা ও শিক্ষা কার্যক্রম। সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়ে দরিদ্র জনগোষ্ঠী, শিশু, নারী, প্রবীণ ব্যক্তি এবং প্রতিবন্ধী মানুষ। ফলে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনাকে শুধু জরুরি ত্রাণ কার্যক্রম হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি জাতীয় উন্নয়ন, জননিরাপত্তা ও মানবিক মর্যাদা রক্ষার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। বাংলাদেশ দুর্যোগ মোকাবিলায় উল্লেখযোগ্য অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে। ঘূর্ণিঝড়ের পূর্বাভাস প্রচার, আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ, স্বেচ্ছাসেবক তৈরি এবং উদ্ধার কার্যক্রমে বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা প্রশংসনীয়। অতীতের তুলনায় অনেক ক্ষেত্রে আগাম সতর্কতা ও আশ্রয়ব্যবস্থা উন্নত হয়েছে। তবে এসব অগ্রগতির পাশাপাশি নতুন ঝুঁকিও তৈরি হচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা, নদীভাঙন ও জলোচ্ছ্বাসের চাপ বাড়ছে। অতিবৃষ্টি ও জলাবদ্ধতায় নগরজীবন ব্যাহত হচ্ছে। অন্যদিকে, অপরিকল্পিত ভবন নির্মাণ, অগ্নিনিরাপত্তার ঘাটতি, ঝুঁকিপূর্ণ শিল্পকারখানা এবং দুর্বল জরুরি প্রস্তুতি মানবসৃষ্ট দুর্যোগের আশঙ্কা বাড়িয়ে তুলছে। এই বাস্তবতায় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় প্রতিক্রিয়াভিত্তিক পদ্ধতির পরিবর্তে ঝুঁকি হ্রাসকেন্দ্রিক পরিকল্পনাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। কোনো এলাকায় বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, ভূমিধস বা ভূমিকম্পের ঝুঁকি কতটা, কোন জনগোষ্ঠী সবচেয়ে বেশি বিপন্ন এবং কোন অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, তা বৈজ্ঞানিক তথ্যের ভিত্তিতে চিহ্নিত করা প্রয়োজন। ঝুঁকির মানচিত্র তৈরি, নিয়মিত হালনাগাদ তথ্য সংরক্ষণ এবং স্থানীয় পর্যায়ে দুর্যোগ প্রস্তুতি পরিকল্পনা বাস্তবায়নের মাধ্যমে সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি অনেকাংশে কমানো সম্ভব। আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা কার্যকর করাও অত্যন্ত জরুরি। শুধু আবহাওয়ার পূর্বাভাস প্রচার করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। সতর্কবার্তা মানুষের কাছে সময়মতো পৌঁছাতে হবে এবং সেই বার্তার ভিত্তিতে কী করণীয়, তা স্পষ্টভাবে জানাতে হবে। প্রত্যন্ত অঞ্চল, চরাঞ্চল, উপকূলীয় এলাকা ও দুর্গম জনপদের মানুষ যেন সহজে সতর্কবার্তা পায়, তা নিশ্চিত করতে হবে। স্থানীয় ভাষা ও সহজবোধ্য বার্তার পাশাপাশি মোবাইল ফোন, গণমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, মসজিদ-মন্দির এবং স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবক নেটওয়ার্ককে কাজে লাগানো যেতে পারে। সতর্কবার্তা পাওয়ার পর নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা না থাকলে কিংবা উদ্ধার কার্যক্রমে সমন্বয় না থাকলে আগাম সতর্কতার সুফল সীমিত হয়ে পড়ে। দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি কমাতে নিরাপদ অবকাঠামো নির্মাণ ও বিদ্যমান স্থাপনাগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অপরিহার্য। ভবন নির্মাণে অনুমোদিত নকশা ও নির্মাণবিধি মানা, অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা কার্যকর রাখা, জরুরি বহির্গমনপথ উন্মুক্ত রাখা এবং নিয়মিত পরিদর্শন নিশ্চিত করতে হবে। হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বাজার, শিল্পকারখানা ও গণপরিবহনকেন্দ্রের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোকে দুর্যোগ সহনশীল করে গড়ে তোলা প্রয়োজন। একই সঙ্গে নদী, খাল, জলাশয় ও প্রাকৃতিক নিষ্কাশনব্যবস্থা রক্ষা করতে হবে। অপরিকল্পিত স্থাপনা নির্মাণ ও জলাধার ভরাটের কারণে সৃষ্ট জলাবদ্ধতা অনেক সময় অতিবৃষ্টির ক্ষয়ক্ষতিকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। বাংলাদেশের নগর এলাকাগুলোতে ভূমিকম্পের ঝুঁকি মোকাবিলায় বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। জনবহুল শহরে বিপুলসংখ্যক ভবন, সংকীর্ণ সড়ক এবং অপর্যাপ্ত উন্মুক্ত স্থান জরুরি উদ্ধার কার্যক্রমকে কঠিন করে তুলতে পারে। তাই ঝুঁকিপূর্ণ ভবন চিহ্নিতকরণ, প্রয়োজনীয় কাঠামোগত সংস্কার, নির্মাণবিধি বাস্তবায়ন এবং উদ্ধারকারী সংস্থার সক্ষমতা বৃদ্ধিতে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। ভূমিকম্পের সময় কীভাবে নিরাপদ থাকতে হবে, কোথায় আশ্রয় নিতে হবে এবং দুর্যোগের পর কীভাবে ঝুঁকিপূর্ণ স্থান এড়িয়ে চলতে হবে, তা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কর্মক্ষেত্রে নিয়মিত মহড়ার মাধ্যমে শেখানো উচিত। সরকারের পাশাপাশি স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম, বেসরকারি খাত এবং সাধারণ মানুষের সক্রিয় অংশগ্রহণ অপরিহার্য। দুর্যোগ মোকাবিলা শুধু সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরের একক দায়িত্ব নয়। স্থানীয় পর্যায়ে স্বেচ্ছাসেবক দল গঠন, প্রাথমিক চিকিৎসা ও উদ্ধার প্রশিক্ষণ, জরুরি সরঞ্জাম সংরক্ষণ এবং দুর্যোগকালীন যোগাযোগব্যবস্থা সচল রাখার প্রস্তুতি থাকতে হবে। বিশেষ করে শিশু, নারী, প্রবীণ ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের প্রয়োজন বিবেচনায় রেখে আশ্রয়কেন্দ্র ও উদ্ধার পরিকল্পনা তৈরি করা প্রয়োজন। দুর্যোগের সময় তাঁদের নিরাপত্তা, চিকিৎসা, খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি ও স্যানিটেশনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা মানবিক দায়িত্ব। গণমাধ্যমের ভূমিকাও এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দুর্যোগের সময় নির্ভরযোগ্য তথ্য প্রচার, গুজব প্রতিরোধ, সতর্কবার্তা ছড়িয়ে দেওয়া এবং মানুষের করণীয় তুলে ধরার মাধ্যমে গণমাধ্যম জীবন রক্ষায় কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। তবে দুর্যোগের সময়ই শুধু নয়, সারা বছর সচেতনতামূলক প্রচার চালাতে হবে। বিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমে দুর্যোগ প্রস্তুতি ও নিরাপত্তাবিষয়ক শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করা এবং নিয়মিত মহড়ার ব্যবস্থা করা গেলে নতুন প্রজন্মের মধ্যে দায়িত্বশীল আচরণ গড়ে উঠবে। দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাসে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও বৈজ্ঞানিক গবেষণার বিকল্প নেই। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা, প্রযুক্তিনির্ভর পূর্বাভাস, দুর্যোগ-সহনশীল অবকাঠামো নির্মাণ এবং ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর পুনর্বাসনে প্রয়োজনীয় অর্থায়ন নিশ্চিত করতে হবে। জাতিসংঘের দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাসবিষয়ক সেন্দাই ফ্রেমওয়ার্ক এবং টেকসই উন্নয়ন অভীষ্টের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বাংলাদেশের পরিকল্পনা ও কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন। উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণের আগে সম্ভাব্য দুর্যোগঝুঁকি মূল্যায়ন করতে হবে, যাতে উন্নয়নের নামে নতুন ঝুঁকি সৃষ্টি না হয়। সরকারের দায়িত্ব হলো দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার মধ্যে কার্যকর সমন্বয় নিশ্চিত করা, আইন ও নীতিমালার বাস্তবায়ন তদারক করা এবং বরাদ্দকৃত অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা। দুর্যোগের পর ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পুনর্বাসনেও স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি থাকতে হবে। ত্রাণ বিতরণে বৈষম্য, অনিয়ম কিংবা দীর্ঘসূত্রতা যেন অসহায় মানুষের দুর্ভোগ বাড়িয়ে না দেয়, সে বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। একই সঙ্গে স্থানীয় পর্যায়ে দুর্যোগ মোকাবিলার সক্ষমতা বাড়াতে পর্যাপ্ত জনবল, প্রশিক্ষণ ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সরবরাহ করতে হবে। দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি কমানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো ঝুঁকি সম্পর্কে জানা, আগাম প্রস্তুতি নেওয়া এবং সময়মতো সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা। দুর্যোগের পর উদ্ধার ও ত্রাণ অবশ্যই প্রয়োজন, কিন্তু তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো দুর্যোগের আগেই মানুষের জীবন রক্ষার ব্যবস্থা করা। এ জন্য পরিকল্পনা, বিনিয়োগ, জবাবদিহি এবং জনসম্পৃক্ততার সমন্বয় ঘটাতে হবে। আন্তর্জাতিক দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস দিবসে আমাদের অঙ্গীকার হোক, দুর্যোগকে শুধু প্রাকৃতিক বিপর্যয় হিসেবে বিবেচনা না করে এর ঝুঁকি ও ক্ষয়ক্ষতি কমানোর জন্য কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা। সরকারকে দুর্যোগ সহনশীল বাংলাদেশ গড়তে সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে। পাশাপাশি প্রত্যেক নাগরিককে সচেতন, দায়িত্বশীল ও প্রস্তুত থাকতে হবে। দুর্যোগ পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব না হলেও পরিকল্পিত উদ্যোগ, বিজ্ঞানভিত্তিক ব্যবস্থাপনা এবং সম্মিলিত প্রচেষ্টায় প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব। দুর্যোগের পর প্রতিক্রিয়া নয়, দুর্যোগের আগেই প্রতিরোধ ও প্রস্তুতিই হোক জাতীয় অগ্রাধিকার। লায়ন মোঃ গনি মিয়া বাবুল: শিক্ষক, কবি, কলাম লেখক, সমাজসেবক ও সংগঠক |