|
নদী কি লাশের বাহক: সুশাসনের মুখে বড় প্রশ্নচিহ্ন
মীর আব্দুল আলীম:
|
নদীতে মানুষ ভাসে না, ভাসে মানুষের লাশ। সড়কের পাশে পড়ে থাকে মরদেহ, রেললাইনের ধারে পড়ে থাকে মরদেহ, ঝোপঝাড়ে, নির্জন স্থানে, কখনো বস্তাবন্দি অবস্থায়, কখনো বা হাত পা বাঁধা অবস্থায়। কেউ জানে না তিনি কে, কেউ জানে না কোথা থেকে এসেছিলেন, এমনকি অনেক সময় জানা যায় না কীভাবে তার মৃত্যু হলো। সবচেয়ে নির্মম ও নিষ্ঠুর সত্য হলো, কোথাও কোথাও মৃত্যুর পরও মানুষটির পরিচয় আর কোনোদিনই ফিরে আসে না। একটি জ্যান্ত মানুষ পৃথিবী থেকে চিরতরে চলে গেলেন, অথচ তার নামটিও যেন হারিয়ে গেল এক অন্ধকারের অতল গহ্বরে। প্রশ্ন হলো, আমরা আজ কোথায় এসে দাঁড়িয়েছি? আমাদের নদীগুলো কি মানুষের লাশ বহন করার জন্য? একটি সভ্য ও আধুনিক সমাজে একজন মানুষের মৃত্যুর পরও কি তার পরিচয় চিরকালের জন্য অজানা ও অচেনা থেকে যেতে পারে?দেশের শীর্ষ জাতীয় দৈনিকে ১ অক্টোবর ২০২৬ প্রকাশিত একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৩ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত তিন বছর আট মাসে দেশে মোট ১ হাজার ৯৭৮টি অজ্ঞাতপরিচয় মরদেহ উদ্ধারের তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ২০২৩ সালে ৩৬২টি, ২০২৪ সালে ৫১০টি, ২০২৫ সালে ৬৪১টি এবং ২০২৬ সালের প্রথম আট মাসেই ৪৬৫টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। সবচেয়ে উদ্বেগের ও আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, ২০২৩ সালে ৩৬২টি থেকে ২০২৫ সালে এই সংখ্যা একলাফে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬৪১টিতে। অর্থাৎ মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে অজ্ঞাতপরিচয় মরদেহ উদ্ধারের হার বেড়েছে প্রায় ৭৭ শতাংশ। আর ২০২৬ সালের প্রথম আট মাসেই আরও ৪৬৫টি অজ্ঞাতপরিচয় মরদেহ উদ্ধারের তথ্য আমাদের জাতীয় নিরাপত্তার সামনে ভয়ংকর এক নতুন প্রশ্ন তুলে ধরছে। ৭৭ শতাংশ বৃদ্ধি, এটি কি কেবলই একটি গাণিতিক সংখ্যা? একটি পরিসংখ্যান বলে কি এটিকে খুব সহজে পাশ কাটিয়ে যাওয়া সম্ভব? না, একেবারেই যায় না। কারণ এই সংখ্যার প্রতিটি অঙ্কের পেছনে লুকিয়ে রয়েছে একজন আস্ত মানুষ। একজন বাবা, একজন সন্তান, একজন স্বামী, একজন স্ত্রী, একজন ভাই কিংবা একজন বোন। এর পেছনে জড়িয়ে রয়েছে একটি করে পুরো পরিবার, যারা হয়তো বছরের পর বছর ধরে নিখোঁজ প্রিয় মানুষটির পথচেয়ে বসে রয়েছে এবং এখনো বিশ্বাস করে যে তাদের প্রিয়জন একদিন না একদিন ঘরে ফিরে আসবে। কোনো মা হয়তো প্রতিদিন দরজার কড়া নাড়ার শব্দ শোনার আশায় জেগে থাকেন, কোনো স্ত্রী হয়তো এখনো বুক ভরা আশা নিয়ে বিশ্বাস করেন তার স্বামী পৃথিবীর কোথাও না কোথাও বেঁচে আছেন, আর কোনো সন্তান হয়তো বাবার পুরোনো ফোন নম্বরটি বুকের মধ্যে আঁকড়ে ধরে দিন গুজরান করছে। অথচ সেই মানুষটি হয়তো কোনো নদীর পাড়ে, কোনো হাসপাতালের মর্গে কিংবা কোনো অচেনা নির্জন স্থানে পরিচয়হীন মরদেহ হয়ে পড়ে আছেন। একটি অজ্ঞাত মরদেহ আসলে কখনো অজ্ঞাত কোনো মানুষ নয়; অজ্ঞাত কেবল আমাদের কাছে তার নামটি, তার পরিচয়টি। আমরা প্রায়শই সংখ্যার মারপ্যাঁচে পড়ে মানুষের জীবনের প্রকৃত গল্প ও আবেগগুলোকে হারিয়ে ফেলি। কতজন মারা গেল, কতজন আহত হলো, কতজন নিখোঁজ রয়েছে, কতটি মামলা দায়ের হলো কিংবা কতটি গুম বা মরদেহ উদ্ধার করা সম্ভব হলো, এসব শুষ্ক পরিসংখ্যান পড়তে পড়তে একসময় আমাদের মানবিক অনুভূতিগুলো একদম অসাড় হয়ে যায়। অথচ পরিসংখ্যানের প্রতিটি সংখ্যার পেছনে তো একজন রক্তমাংসের মানুষ ছিলেন, তারও একটি সুন্দর জীবন ছিল, আকাশছোঁয়া স্বপ্ন ছিল, ভালোবাসার প্রিয় মানুষ ছিল এবং প্রতিদিন কাজ শেষে ঘরে ফেরার অপেক্ষায় থাকা স্বজনেরা ছিল। আকস্মিক মৃত্যুর পর তার পরিবার অন্তত একটি প্রশ্নের উত্তর জানতে চায়, মানুষটি কোথায়, কীভাবে এবং কোন পরিস্থিতিতে মারা গেলেন এবং তার এই অকাল মৃত্যুর জন্য কেউ দায়ী কি না। সেই ন্যূনতম সত্য ও উত্তরটুকুও যদি একটি পরিবার না পায়, তবে তাদের আজীবন বয়ে বেড়ানো করুণ কষ্টের শেষ সীমান্ত কোথায়? সবচেয়ে বড় এবং মৌলিক প্রশ্ন তাই এটাই, নদীতে মানুষের লাশ ভেসে ওঠে কেন? সড়কের পাশে, রেললাইনের ধারে কিংবা লোকচক্ষুর অন্তরালে নির্জন স্থানে এত অজ্ঞাত মরদেহ বারবার পাওয়া যাবে কেন? প্রতিটি মরদেহ যে কেবলই নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার, এমন চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে নিশ্চিতভাবে আসা হয়তো সম্ভব নয়। দুর্ঘটনা, আত্মহত্যা, স্বাভাবিক মৃত্যু কিংবা নানা অনাকাঙ্ক্ষিত শারীরিক বা মানসিক সংকটের কারণেও একজন মানুষের পরিচয় তাৎক্ষণিকভাবে শনাক্ত না ও হতে পারে। তবে যখন অজ্ঞাতপরিচয় মরদেহের সংখ্যা মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে এত বিপুল পরিমাণে বেড়ে যায়, তখন সমাজ ও রাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে বাধ্য। এই অভাবনীয় বৃদ্ধির মূল কারণ কী? সমাজে কি হঠাৎ করেই মানুষ বেশি নিখোঁজ হতে শুরু করেছে? অপরাধীদের অপরাধ সংঘটন ও অপরাধ আড়াল করার ধরন কি বিপজ্জনকভাবে বদলে গেছে? প্রযুক্তি থাকার পরও অপরাধী ও পরিচয় শনাক্ত করার আইনি ব্যবস্থা কি যথেষ্ট কার্যকর নয়? নাকি আইনি তদন্ত ও অনুসন্ধানের কোনো প্রাথমিক পর্যায়ে বড় ধরনের কোনো অবহেলা ও দুর্বলতা রয়ে যাচ্ছে? কোনো একজন মানুষ হঠাৎ নিখোঁজ হওয়ার পর তার স্বজনেরা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে যান, থানায় সাধারণ ডায়েরি করেন, নিখোঁজ ব্যক্তির ছবি দেন, দৈহিক পরিচয় দেন এবং ব্যাকুল হয়ে খোঁজ করতে থাকেন। অন্যদিকে, দেশের কোনো না কোনো নদীর চরে বা রাস্তার পাশে একটি অজ্ঞাত মরদেহ উদ্ধার হয়। এই দুটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য কেন দ্রুত একটি একক কেন্দ্রীয় ডিজিটাল নেটওয়ার্কে এসে মিলিত হয় না? নিখোঁজ ব্যক্তির বিস্তারিত তথ্যের সাথে উদ্ধার হওয়া অজ্ঞাত মরদেহের তথ্যের কি নিয়মিত ও বাধ্যতামূলক ডিজিটাল যাচাই বাছাই করা হয়? পুলিশ প্রশাসন, হাসপাতাল, মর্গ, কেন্দ্রীয় ডিএনএ ল্যাবরেটরি এবং সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মাঝে সমন্বয়ের এত বড় অভাব থাকবে কেন? প্রযুক্তির আধুনিকায়নে যখন কয়েক সেকেন্ডে মানুষের পরিচয় শনাক্তের অবিশ্বাস্য সব সুযোগ তৈরি হয়েছে, তখন কেন একটি মরদেহের পরিচয় দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, এমনকি বছরের পর বছর ধরে সম্পূর্ণ অজানা ও রহস্যময় থাকবে? বর্তমান যুগে বায়োমেট্রিক আঙুলের ছাপ, ডিএনএ প্রোফাইলিং ও ম্যাচিং, ফেসিয়াল রিকগনিশন বা মুখমণ্ডল শনাক্তকরণ সফটওয়্যার এবং জাতীয় পরিচয়পত্রের (এনআইডি) বিশাল ডাটাবেজ ব্যবহার করে অতি দ্রুত যেকোনো মানুষের পরিচয় নিশ্চিত করা পুরোপুরি সম্ভব। ফলে নদী থেকে বা সড়ক থেকে একটি মরদেহ উদ্ধার করেই আইনি দায়িত্ব শেষ হয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। মরদেহটির সুনির্দিষ্ট পরিচয় শনাক্ত করতে হবে, তার সুনির্দিষ্ট মৃত্যুর কারণ বৈজ্ঞানিকভাবে বের করতে হবে, এটি যদি কোনো পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড হয় তবে দ্রুত হত্যাকারীকে খুঁজে বের করতে হবে এবং ভুক্তভোগী পরিবারকে প্রকৃত সত্য জানাতে হবে। যদি কোনো মামলার তদন্ত মাঝপথে থেমে যায়, তবে কেন থেমে গেল এবং কার গাফিলতিতে থামল, সেটিরও প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। কারণ একজন অজ্ঞাত মৃত মানুষও শেষ পর্যন্ত এই রাষ্ট্রের একজন বৈধ নাগরিক; তার মৃত্যুরও নাগরিক মর্যাদা পাওয়ার অধিকার রয়েছে এবং তার পরিবারের সত্য জানার আইনি ও মানবিক অধিকার রয়েছে। আরও অনেক বড় উদ্বেগের জায়গা হলো, অপরাধীরা যদি মনে করে কোনো মানুষকে নির্বিঘ্নে হত্যা করে তার মরদেহ নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া সম্ভব, তার পরিচয় চিরতরে মুছে ফেলা সম্ভব এবং শেষ পর্যন্ত হত্যাকাণ্ডের সমস্ত আলামত ও তদন্ত দীর্ঘসূত্রতায় আটকে শেষ করে দেওয়া সম্ভব, তবে তা কেবল একটি ভুক্তভোগী পরিবারের জন্য চরম দুর্ভাগ্যই বয়ে আনে না, বরং পেশাদার অপরাধীদের জন্য নতুন অপরাধ করার বিশাল সুযোগ তৈরি করে দেয়। অপরাধী যদি বুঝতে পারে যে মানুষকে হত্যা করে লাশ গুম করা ও আইনকে ফাঁকি দেওয়া এ দেশে অত্যন্ত সহজ কাজ, তবে অপরাধের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের যে মূল প্রতিরোধ ক্ষমতা তা সরাসরি প্রশ্নের মুখে পড়বে। তাই অজ্ঞাত মরদেহ শনাক্তের বিষয়টি কেবল একটি আবেগীয় বা মানবিক দায়িত্ব নয়; এটি অপরাধ দমন, অপরাধীদের মনে আইনি ভয় সৃষ্টি করা এবং সার্বিক আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখার একটি অত্যন্ত মৌলিক ও কৌশলগত অংশ। একজন মানুষ নিখোঁজ হওয়ার পর তার পরিবার যে মানসিক যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে দিন অতিবাহিত করে, তার কোনো সঠিক পরিমাপ নেই। স্বাভাবিক মৃত্যুর একটি নিশ্চিত পরিণতি ও ইতি থাকে, স্বজনেরা মনকে সান্ত্বনা দিতে পারে। কিন্তু নিখোঁজের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে এক সীমাহীন ও করুণ অনিশ্চয়তা। মানুষটি কি আদৌ বেঁচে আছেন? নাকি তিনি কোথাও বন্দি আছেন? তিনি কি খেয়েছেন নাকি না খেয়ে আছেন? তিনি কি আর কখনো কোনোদিন ঘরে ফিরবেন? এই উত্তরহীন প্রশ্নগুলো একটি পরিবারকে প্রতিদিন তিল তিল করে শেষ করে দেয়। আর যদি সেই নিখোঁজ মানুষটির মরদেহ কোনো নির্জন স্থানে বা নদীর পাড়ে পরিচিয়হীন অবস্থায় পচে গলে নষ্ট হতে থাকে এবং পরিবার সে কথা কখনোই জানতে না পারে, তবে সেই যন্ত্রণার তীব্রতা প্রকাশ করার মতো ভাষা কোনো ভাষারীতিতে নেই। তাই প্রতিটি অজ্ঞাতপরিচয় মরদেহের সুনির্দিষ্ট শনাক্তকরণকে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া এখন সময়ের দাবি। এই ভয়াবহ সংকট সমাধানের জন্য নিখোঁজ ব্যক্তি এবং উদ্ধার হওয়া অজ্ঞাত মরদেহের সব তথ্য নিয়ে একটি অত্যন্ত শক্তিশালী ও স্বয়ংক্রিয় জাতীয় ডাটাবেজ গড়ে তোলা জরুরি। প্রতিটি অজ্ঞাত মরদেহ উদ্ধার হওয়া মাত্রই তার ছবি, হাতের আঙুলের ছাপ, ডিএনএ (DNA) নমুনা, ব্যবহৃত পোশাক, আনুমানিক বয়স, শারীরিক বিশেষ কোনো চিহ্ন বা ট্যাটু এবং উদ্ধার সংক্রান্ত সব তথ্য ডিজিটাল ডাটাবেজে সংরক্ষণ করতে হবে। ঠিক একইভাবে দেশের যেকোনো প্রান্তে কোনো নিখোঁজ ডায়েরি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই নিখোঁজ ব্যক্তির বায়োমেট্রিক তথ্যও সেই ডাটাবেজে আপলোড হতে হবে। একটি আধুনিক অ্যালগরিদম নিয়মিতভাবে এই দুই ধরনের তথ্যের মধ্যে মেলবন্ধন বা ম্যাচিং পরীক্ষা করবে, যা অত্যন্ত অল্প সময়ে শত শত পরিবারকে তাদের প্রিয়জনের শেষ পরিণতি সম্পর্কে নিশ্চিত বার্তা দিতে পারবে। পাশাপাশি দেশের ময়নাতদন্ত ও ফরেনসিক ব্যবস্থাকে আরও আধুনিক, বিজ্ঞানসম্মত ও জবাবদিহিমূলক করতে হবে; কেবল নথিপত্রে অজ্ঞাত লিখে কোনো একটি লাশকে মর্গের হিমাগারে ফেলে রাখা বা আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের হাতে তুলে দিয়ে একটি ফাইলের নম্বরে রূপান্তর করার মানসিকতা বন্ধ করতে হবে। এখানে আমাদের গণমাধ্যমের সামাজিক ও পেশাগত দায়িত্বও কোনো অংশে কম নয়। নদী থেকে বা সড়কের পাশ থেকে একটি অজ্ঞাত মরদেহ উদ্ধারের প্রথম দিনের রোমাঞ্চকর খবরটুকু প্রকাশ করেই একজন সাংবাদিক বা সংবাদমাধ্যমের দায়িত্ব শেষ হতে পারে না। সেই উদ্ধার হওয়া মরদেহের পরবর্তী সময়ে পরিচয় শনাক্ত হলো কি না, ময়নাতদন্তের রিপোর্টে মৃত্যুর আসল কারণ কী জানা গেল, ঘটনাটি হত্যাকাণ্ড হলে মূল অপরাধী শনাক্ত ও গ্রেফতার হলো কি না এবং মামলার তদন্তের অগ্রগতি কোন পর্যায়ে আছে, এসব বিষয় ধারাবাহিকভাবে ফলোআপ বা অনুসরণ করা সংবাদমাধ্যমের নৈতিক কর্তব্য। কারণ একটি খবরের স্থায়িত্ব হয়তো পত্রিকার পাতায় বা টেলিভিশনের পর্দায় কেবল এক দিনের, কিন্তু একটি মানুষের করুণ মৃত্যু এবং একটি স্বজনহারা পরিবারের অনন্ত অপেক্ষার প্রহর এক দিনের নয়; গণমাধ্যমকে সেই বিচারহীনতা ও দীর্ঘ অপেক্ষার নির্ভীক সাক্ষী ও প্রতিবাদী কণ্ঠ হতে হবে। তবে দিনশেষে আসল প্রশ্নটি আমাদের সবার সামাজিক বিবেকের কাছে। আমরা আজ সভ্যতার কোন পর্যায়ে অবস্থান করছি? আমরা কি এমন একটি অনিশ্চিত ও আশঙ্কাজনক সমাজ ব্যবস্থা চেয়েছিলাম, যেখানে পরিবারের কোনো সদস্য সকালে কর্মক্ষেত্র বা শিক্ষার উদ্দেশে ঘর থেকে বের হলে দিনশেষে তার নিরাপদে ফিরে আসার কোনো গ্যারান্টি থাকবে না? আমরা কি এমন একটি ভয়ংকর বাস্তবতাকে মুখ বুজে মেনে নেব, যেখানে দেশের নদীগুলোতে প্রতিদিন ভেসে উঠবে আমাদেরই কোনো না কোনো নাগরিকের লাশ, অথচ রাষ্ট্র ও সমাজ কেউ জানবে না যে সেই লাশটি কার? নিরাপদে বেঁচে থাকার আকুতি কিংবা নাগরিক অধিকার কোনো বিশেষ দয়া বা দান নয়; এটি আমাদের সংবিধান প্রদত্ত পরম মৌলিক অধিকার। একজন নাগরিক সকালে কাজের উদ্দেশ্যে বের হবেন, রাস্তায় চলবেন, নদীপথে বা রেলে যাত্রা করবেন এবং সব কাজ শেষে নিরাপদে হাসিমুখে নিজ ঘরে ফিরে আসবেন, এটাই একটি আধুনিক সভ্য দেশের স্বাভাবিক চিত্র হওয়ার কথা। যখন একটি লাশ নদীপথে বা সমুদ্র সৈকতে ভেসে ওঠে, তখন কেবল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নয়, বরং পুরো সামাজিক ব্যবস্থার ও আমাদের সার্বিক বিবেকের জেগে ওঠা উচিত। কারণ আজ যে মরদেহটি পরিচয়হীন ও বেওয়ারিশ হিসেবে মর্গে পড়ে রয়েছে, সেটি হয়তো অন্য কারো স্বজন; কিন্তু কাল যে এই একই নির্মম পরিণতি আমাদের কিংবা আমাদের নিজেদের পরিবারের কারো ওপর নেমে আসবে না, তার নিশ্চয়তা কোথায়? ২০২৩ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে অজ্ঞাতপরিচয় মরদেহ উদ্ধারের সংখ্যা প্রায় ৭৭ শতাংশ বেড়ে যাওয়া এবং ২০২৬ সালের প্রথম আট মাসে আরও ৪৬৫টি মরদেহ উদ্ধারের ঘটনা কেবল কিছু নিছক পরিসংখ্যান নয়; এটি আমাদের ভঙ্গুর আইনশৃঙ্খলা ও সামাজিক নিরাপত্তার সামনে এক ভয়ংকর আয়না তুলে ধরেছে। যে আয়নায় আমরা আমাদের সমাজের আসল চেহারাটি দেখতে পাচ্ছি। এখন সিদ্ধান্ত আমাদের, আমরা কি এই সমস্যার সত্যকে মেনে নিয়ে কার্যকর সমাধানের পথে হাঁটব, নাকি বরাবরের মতো নীরব থেকে নিজেদের জীবনকে আরও বড় ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেব? মানুষের জীবনের নিরাপত্তার পাশাপাশি মৃত্যুর পরও যেন প্রতিটি নাগরিক তার প্রাপ্য নাম, পরিচয় ও যথাযথ সামাজিক মর্যাদাটুকু ফিরে পায়, রাষ্ট্রের কাছে আজ সেটাই আমাদের একমাত্র মৌলিক দাবি। মীর আব্দুল আলীমঃ সাংবাদিক, কলামিস্ট। |