|
পর্যটন দিবস ২৭ সেপ্টেম্বরঃ পর্যটনেই খুলতে পারে বাংলাদেশের নতুন অর্থনীতির দুয়ার
মীর আব্দুর আলীম:
|
সমুদ্রের ঢেউ, পাহাড়ের সবুজ, নদীর কলতান, সুন্দরবনের গভীরতা, হাওরের বিস্তীর্ণ জলরাশি, গ্রামবাংলার মাটির গন্ধ, প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন আর মানুষের হাজার বছরের সংস্কৃতি মিলিয়ে বাংলাদেশ প্রকৃতিগতভাবেই একটি অসাধারণ পর্যটনভূমি। অথচ পর্যটনের যে বিপুল সম্ভাবনা আমাদের সামনে পড়ে আছে, তার সামান্য অংশই আমরা কাজে লাগাতে পেরেছি। বিশ্বের বহু দেশ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে পরিকল্পিত পর্যটন শিল্পে রূপান্তর করে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা আয় করছে, লাখ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করছে এবং নিজেদের আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডে পরিণত করছে। আমাদেরও সেই পথে হাঁটার সময় এসেছে। পর্যটনকে শুধু অবকাশযাপনের বিষয় হিসেবে দেখলে চলবে না, এটিকে জাতীয় অর্থনীতির একটি শক্তিশালী খাত হিসেবে দেখতে হবে। বিশ্ব পর্যটন দিবসে তাই নতুন করে ভাবার সময় এসেছে, বাংলাদেশের পর্যটন শিল্প কি সত্যিই তার সম্ভাবনার সমান জায়গায় পৌঁছেছে?বাংলাদেশের পর্যটন সম্পদের বৈচিত্র্য বিস্ময়কর। কক্সবাজারের দীর্ঘ সমুদ্রসৈকত, সেন্ট মার্টিনের নীল জল, কুয়াকাটার সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত, বান্দরবানের পাহাড়, রাঙামাটির কাপ্তাই হ্রদ, সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ বন, সিলেটের চা-বাগান, রাতারগুলের জলাবন, হাওর অঞ্চলের বর্ষার সৌন্দর্য, চট্টগ্রামের পাহাড় ও সমুদ্র, নদীভিত্তিক জীবন, গ্রামীণ জনপদ, মসজিদ, মন্দির, বৌদ্ধবিহার ও ঐতিহাসিক স্থাপনা আমাদের পর্যটনকে বহুমাত্রিক করেছে। পৃথিবীর অনেক দেশে পর্যটক আকর্ষণের জন্য একটি বা দুটি প্রধান সম্পদকে কেন্দ্র করে পর্যটন শিল্প গড়ে উঠেছে। আমাদের রয়েছে একসঙ্গে প্রকৃতি, ইতিহাস, সংস্কৃতি, নদী, পাহাড় ও সমুদ্র। এই বৈচিত্র্যকে একটি সমন্বিত পর্যটন ব্র্যান্ডে পরিণত করতে পারলে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক পর্যটন মানচিত্রে আরও দৃশ্যমান হতে পারে। তবে শুধু সৌন্দর্য থাকলেই পর্যটক আসে না। পর্যটনের সঙ্গে যুক্ত থাকে নিরাপত্তা, পরিচ্ছন্নতা, যোগাযোগ, আবাসন, খাবার, বিনোদন, তথ্য, স্বাস্থ্যসেবা, ডিজিটাল সুবিধা এবং সর্বোপরি ব্যবস্থাপনা। একজন বিদেশি পর্যটক কোনো দেশে এসে শুধু একটি সুন্দর জায়গা দেখতে চান না। তিনি চান নিরাপদ যাতায়াত, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ, সহজ বুকিং ব্যবস্থা, নির্ভরযোগ্য পরিবহন, প্রশিক্ষিত গাইড, বহুভাষিক তথ্য, মানসম্মত খাবার, সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতা এবং নির্বিঘ্ন ভ্রমণ। এই পুরো ব্যবস্থাকে একসঙ্গে উন্নত করতে না পারলে শুধু প্রকৃতির সৌন্দর্য দিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যটন শিল্প গড়ে তোলা কঠিন। কক্সবাজার এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সম্ভাবনার একটি উদাহরণ। পৃথিবীর দীর্ঘতম প্রাকৃতিক সমুদ্রসৈকতগুলোর একটি আমাদের দেশে রয়েছে। আমি নিজেও বিভিন্ন দেশের সমুদ্রসৈকত দেখেছি। অনেক জায়গায় কক্সবাজারের মতো প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য নেই, অথচ পরিকল্পনা, পরিচ্ছন্নতা, নিরাপত্তা, শৃঙ্খলা ও ব্যবস্থাপনার কারণে সেসব স্থান আন্তর্জাতিক পর্যটকের কাছে অত্যন্ত আকর্ষণীয়। কক্সবাজারকে তাই শুধু স্থানীয় পর্যটকের ছুটির গন্তব্য হিসেবে নয়, আন্তর্জাতিক পর্যটনের একটি বড় কেন্দ্র হিসেবে ভাবতে হবে। বিমান যোগাযোগ, আন্তর্জাতিক ফ্লাইট, উন্নত হোটেল, নিরাপদ বিচ জোন, ওয়াটার স্পোর্টস, মেরিন ড্রাইভ, সি-ফুড, স্থানীয় হস্তশিল্প, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং পর্যটনকেন্দ্রিক বিনোদনের সমন্বিত ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারলে কক্সবাজার বাংলাদেশের পর্যটন অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হতে পারে। কক্সবাজার বিমানবন্দরকে আন্তর্জাতিক পর্যটনের প্রবেশদ্বার হিসেবে গড়ে তোলার যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ঘোষণা করলেই আন্তর্জাতিক পর্যটন নিশ্চিত হয় না। প্রয়োজন নিয়মিত আন্তর্জাতিক ফ্লাইট, প্রতিযোগিতামূলক বিমানভাড়া, সহজ ভিসা ব্যবস্থা, দ্রুত ইমিগ্রেশন, আন্তর্জাতিক মানের টার্মিনাল, নিরাপদ পরিবহন এবং বিমানবন্দর থেকে পর্যটনকেন্দ্র পর্যন্ত নিরবচ্ছিন্ন সেবা। বিদেশি পর্যটক যেন ঢাকায় নেমে আলাদা কোনো অনিশ্চয়তায় না পড়েন, আবার কক্সবাজারে পৌঁছেও যেন ব্যবস্থাপনার দুর্বলতায় হতাশ না হন। পুরো ভ্রমণব্যবস্থাকে পর্যটকবান্ধব করতে হবে। কক্সবাজারে একটি বা একাধিক আন্তর্জাতিক মানের বিশেষ পর্যটন জোনের কথাও ভাবা যেতে পারে। পুরো সমুদ্রসৈকত সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত থাকবে। বাংলাদেশের মানুষ বিনা মূল্যে সমুদ্র উপভোগ করবে, পরিবার নিয়ে যাবে, শিশুরা খেলবে, তরুণরা আনন্দ করবে। এটি তাদের অধিকার। পাশাপাশি নির্দিষ্ট এলাকায় অর্থের বিনিময়ে উন্নত সেবা গ্রহণের সুযোগ তৈরি করা যেতে পারে। সেখানে থাকতে পারে নিরাপদ সাঁতার এলাকা, লাইফগার্ড, আধুনিক ওয়াশরুম, লকার, পরিবর্তনকক্ষ, বিচ চেয়ার, সানশেড, মানসম্মত খাবার, ওয়াটার স্পোর্টস, শিশুদের বিনোদন, চিকিৎসা ও জরুরি উদ্ধারব্যবস্থা। দেশি ও বিদেশি পর্যটকের জন্য আলাদা প্যাকেজ থাকতে পারে। বিষয়টি হতে হবে গবেষণা, পরিবেশগত সমীক্ষা, জনমত ও স্বচ্ছ নীতিমালার ভিত্তিতে। উদ্দেশ্য কোনোভাবেই বৈষম্য তৈরি করা নয়, বরং একই সম্পদকে বিভিন্ন স্তরের সেবার মাধ্যমে অর্থনৈতিকভাবে কার্যকর করা। বাংলাদেশের পর্যটন উন্নয়নের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ভুল হবে শুধু কয়েকটি পর্যটনকেন্দ্র সাজিয়ে থেমে যাওয়া। আমাদের প্রয়োজন একটি জাতীয় পর্যটন নেটওয়ার্ক। একজন বিদেশি পর্যটক কক্সবাজারে এলেন, সেখান থেকে তিনি বান্দরবান গেলেন, তারপর চট্টগ্রাম, সিলেট কিংবা সুন্দরবনে গেলেন। এমন সমন্বিত প্যাকেজ তৈরি করতে হবে। তিন দিনের প্যাকেজ, পাঁচ দিনের প্যাকেজ, সাত দিনের বাংলাদেশ ট্যুর, সমুদ্র ও পাহাড়ভিত্তিক প্যাকেজ, ইকো-ট্যুরিজম, অ্যাডভেঞ্চার ট্যুরিজম, নদীভ্রমণ, সাংস্কৃতিক পর্যটন, ঐতিহাসিক পর্যটন, ওয়েলনেস ট্যুরিজম, কনভেনশন ও কনফারেন্স ট্যুরিজমসহ বিভিন্ন ধরনের প্যাকেজ তৈরি করা যায়। পর্যটককে এক জায়গায় এনে দ্রুত বিদায় না দিয়ে কয়েক দিন বাংলাদেশে রাখাই হবে মূল লক্ষ্য। পর্যটনের সঙ্গে বৈদেশিক মুদ্রার সম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একজন বিদেশি পর্যটক যখন বাংলাদেশে আসেন, তখন তিনি শুধু হোটেলে অর্থ ব্যয় করেন না। বিমানভাড়া, পরিবহন, খাবার, গাইড, বিনোদন, স্থানীয় পণ্য, পোশাক, হস্তশিল্প, ছবি, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানসহ নানা খাতে তার অর্থ ব্যয় হয়। অর্থাৎ একজন পর্যটক একটি পূর্ণাঙ্গ অর্থনৈতিক চেইন তৈরি করেন। সেই অর্থের একটি অংশ হোটেল মালিকের আয়, একটি অংশ পরিবহনকর্মীর আয়, একটি অংশ রেস্টুরেন্টের আয়, একটি অংশ স্থানীয় কারিগরের আয় এবং একটি অংশ স্থানীয় ব্যবসায়ীর আয় হয়ে অর্থনীতিতে ছড়িয়ে পড়ে। পর্যটন তাই শুধু বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের খাত নয়, এটি স্থানীয় অর্থনীতিরও শক্তিশালী ইঞ্জিন হতে পারে। এখানে স্থানীয় মানুষকে পর্যটনের কেন্দ্রীয় অংশীদার করতে হবে। কক্সবাজারের মানুষ শুধু পর্যটকের কাছে দোকানদার বা পরিবহনকর্মী হয়ে থাকবেন কেন? তাদের প্রশিক্ষণ দিয়ে ট্যুর গাইড, লাইফগার্ড, শেফ, হোটেলকর্মী, ট্রাভেল অপারেটর, নৌযান পরিচালনাকারী, হস্তশিল্প উদ্যোক্তা ও পর্যটন ব্যবস্থাপনার অংশীদার করা যায়। একইভাবে পাহাড়ি অঞ্চলের জনগোষ্ঠী, সুন্দরবনসংলগ্ন মানুষ, হাওর এলাকার বাসিন্দা কিংবা গ্রামীণ উদ্যোক্তাদের পর্যটন অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত করা সম্ভব। এতে পর্যটনের সুফল রাজধানী বা বড় শহরে সীমাবদ্ধ না থেকে প্রত্যন্ত অঞ্চলেও পৌঁছাবে। বাংলাদেশের পর্যটন শিল্পের আরেকটি বড় সম্ভাবনা হলো গ্রামীণ ও সাংস্কৃতিক পর্যটন। বিদেশি পর্যটকের কাছে আমাদের গ্রামের জীবন, নদী, নৌকা, হাট, কৃষি, লোকসংগীত, পিঠা, তাঁত, মৃৎশিল্প, বাউল সংস্কৃতি, পালাগান কিংবা স্থানীয় উৎসবও আকর্ষণের বিষয় হতে পারে। পর্যটন মানেই পাঁচ তারকা হোটেল নয়। কখনো একটি গ্রামের মানুষের জীবনযাপনও বিদেশি পর্যটকের কাছে অসাধারণ অভিজ্ঞতা হয়ে উঠতে পারে। পরিকল্পিত হোমস্টে, গ্রামীণ খাবার, স্থানীয় সংস্কৃতি ও প্রকৃতিনির্ভর ভ্রমণ গড়ে তুললে বাংলাদেশের পর্যটনের নতুন বাজার তৈরি হতে পারে। তবে পর্যটন উন্নয়নের সঙ্গে পরিবেশের প্রশ্নটি অবশ্যই গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে। সমুদ্রসৈকত, পাহাড়, বন, নদী কিংবা হাওর ধ্বংস করে পর্যটন শিল্প গড়ে তোলা যাবে না। আবার পরিবেশ রক্ষার নামে সব উন্নয়নকেও থামিয়ে রাখা সমাধান নয়। আমাদের প্রয়োজন পরিবেশবান্ধব পর্যটন। কোথায় নির্মাণ করা যাবে, কোথায় যাবে না, কত পর্যটক একসঙ্গে প্রবেশ করতে পারবেন, কোথায় বালিয়াড়ি রক্ষা করতে হবে, কোথায় জলাভূমি অক্ষত রাখতে হবে, কোথায় গাছ লাগাতে হবে, কোথায় বর্জ্য ব্যবস্থাপনা করতে হবে, এসব বৈজ্ঞানিক সমীক্ষার ভিত্তিতে নির্ধারণ করতে হবে। প্রকৃতি রক্ষা করেই পর্যটন অর্থনীতি গড়ে তুলতে হবে। পরিবেশবিদদের মতামত এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু পরিবেশ ও অর্থনীতিকে পরস্পরের শত্রু হিসেবে দেখার প্রয়োজন নেই। পরিবেশবান্ধব পর্যটনই হতে পারে ভবিষ্যতের পথ। একটি প্রকল্পে পরিবেশগত ঝুঁকি থাকলে নকশা পরিবর্তন করা যেতে পারে, নির্মাণের ধরন বদলানো যেতে পারে, পর্যটকের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করা যেতে পারে, নির্দিষ্ট সময় প্রবেশ সীমিত করা যেতে পারে কিংবা বিকল্প ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। অর্থাৎ প্রশ্ন হওয়া উচিত কীভাবে পরিবেশ রক্ষা করে উন্নয়ন করা যায়। উন্নয়ন বনাম পরিবেশ নয়, আমাদের লক্ষ্য হতে হবে পরিবেশসহ উন্নয়ন। নিরাপত্তার বিষয়টিও পর্যটন শিল্পের প্রাণ। একটি পর্যটনকেন্দ্র যত সুন্দরই হোক, সেখানে নিরাপত্তার অভাব থাকলে পর্যটক বারবার যেতে চাইবেন না। পর্যটন পুলিশ, প্রশিক্ষিত লাইফগার্ড, সিসিটিভি, জরুরি চিকিৎসাকেন্দ্র, উদ্ধারকারী দল, নারী ও শিশু সহায়তা, স্পষ্ট বিপদসংকেত, পরিচ্ছন্ন স্যানিটেশন এবং ২৪ ঘণ্টার জরুরি যোগাযোগব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। পর্যটকের নিরাপত্তার পাশাপাশি স্থানীয় জনগণ ও ব্যবসায়ীদের নিরাপত্তাও নিশ্চিত করতে হবে। আমাদের পর্যটন ব্যবস্থাপনায় ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে। একটি পর্যটক যেন মোবাইল ফোনে বাংলাদেশের পর্যটনকেন্দ্র সম্পর্কে তথ্য পান, অনলাইনে হোটেল বুক করতে পারেন, পরিবহন নিতে পারেন, ট্যুর গাইড নির্বাচন করতে পারেন, টিকিট কিনতে পারেন এবং জরুরি প্রয়োজনে সহায়তা পেতে পারেন। গুরুত্বপূর্ণ পর্যটনকেন্দ্রে বহুভাষিক সাইনবোর্ড, ডিজিটাল তথ্যকেন্দ্র এবং প্রশিক্ষিত পর্যটনকর্মী থাকা প্রয়োজন। বিদেশি পর্যটকের কাছে একটি দেশের প্রথম পরিচয় তৈরি হয় তার ব্যবস্থাপনা দিয়ে। তাই পর্যটন সেবার প্রতিটি স্তরকে আন্তর্জাতিক মানে নিতে হবে। বাংলাদেশকে পর্যটনের আন্তর্জাতিক বাজারে ব্র্যান্ডিংও করতে হবে। শুধু দেশের মানুষকে জানালে হবে না, পৃথিবীর মানুষকে জানাতে হবে বাংলাদেশ কী। আন্তর্জাতিক পর্যটন মেলা, ডিজিটাল প্রচারণা, বিদেশি পর্যটন সাংবাদিকদের আমন্ত্রণ, আন্তর্জাতিক ট্রাভেল এজেন্সির সঙ্গে অংশীদারত্ব এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিকল্পিত প্রচারণার মাধ্যমে বাংলাদেশের পর্যটনকে বিশ্ববাজারে তুলে ধরতে হবে। আমাদের বার্তা হতে পারে, বাংলাদেশ একটি ছোট ভূখণ্ডে প্রকৃতি, সংস্কৃতি, নদী, পাহাড়, সমুদ্র ও মানুষের বৈচিত্র্যের অনন্য সমন্বয়। রাষ্ট্রকে পর্যটনকে শুধু একটি মন্ত্রণালয়ের বিষয় হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি অর্থনীতি, বিমান চলাচল, যোগাযোগ, স্থানীয় সরকার, পরিবেশ, স্বরাষ্ট্র, সংস্কৃতি, বাণিজ্য এবং বেসরকারি খাতের সম্মিলিত উদ্যোগের বিষয়। একটি জাতীয় পর্যটন মহাপরিকল্পনা দরকার, যেখানে আগামী ১০, ২০ ও ৩০ বছরের লক্ষ্য নির্ধারণ থাকবে। কোন এলাকায় কী ধরনের পর্যটন হবে, কোথায় কত বিনিয়োগ হবে, কীভাবে পরিবেশ রক্ষা হবে, স্থানীয় মানুষ কীভাবে লাভবান হবে, কত পর্যটক নেওয়া যাবে এবং কীভাবে আন্তর্জাতিক পর্যটক বাড়ানো হবে, সবকিছু সেই পরিকল্পনায় থাকতে হবে। সরকারি বিনিয়োগের পাশাপাশি স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপের সুযোগ তৈরি করা যেতে পারে। বেসরকারি বিনিয়োগ আসবে, নতুন হোটেল ও রেস্টুরেন্ট হবে, বিনোদনকেন্দ্র হবে, পর্যটনসেবা বাড়বে, কর্মসংস্থান তৈরি হবে। কিন্তু সৈকত, বন, পাহাড়, নদী, বালিয়াড়ি ও জনসম্পদের ওপর জনস্বার্থের সুরক্ষা অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে। পর্যটনের নামে দখল, অপরিকল্পিত নির্মাণ ও পরিবেশ ধ্বংসের সুযোগ দেওয়া যাবে না। বাংলাদেশের পর্যটন শিল্পকে এগিয়ে নিতে হলে আমাদের মানসিকতাও বদলাতে হবে। পর্যটন মানে শুধু ঈদের ছুটিতে লাখো মানুষের কক্সবাজার যাওয়া নয়। পর্যটন মানে সারা বছর পর্যটক, সারা বছর কর্মসংস্থান, সারা বছর ব্যবসা এবং বিদেশি পর্যটকের মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা আয়। পর্যটন মানে স্থানীয় মানুষের আয় বাড়ানো। পর্যটন মানে দেশের ভাবমূর্তি উন্নত করা। পর্যটন মানে নতুন উদ্যোক্তা তৈরি করা। পর্যটন মানে তরুণদের জন্য নতুন কর্মক্ষেত্র সৃষ্টি করা। সবচেয়ে বড় কথা, পর্যটন হতে পারে অর্থনীতিকে বহুমুখী করার একটি শক্তিশালী মাধ্যম। বাংলাদেশের সামনে এখন নতুন অর্থনৈতিক বাস্তবতা। শুধু প্রচলিত কয়েকটি খাতের ওপর নির্ভর না করে আমাদের নতুন নতুন সম্ভাবনাময় খাত গড়ে তুলতে হবে। পর্যটন সেই সম্ভাবনাময় খাতগুলোর একটি। আমাদের প্রাকৃতিক সম্পদ আছে, মানবসম্পদ আছে, সংস্কৃতি আছে, ইতিহাস আছে। এখন দরকার সঠিক পরিকল্পনা, বিনিয়োগ, ব্যবস্থাপনা ও রাজনৈতিক সদিচ্ছা। পৃথিবীর পর্যটন বাজারে বাংলাদেশকে আরও দৃশ্যমান করতে হলে পর্যটনকে জাতীয় অগ্রাধিকারের একটি খাত হিসেবে বিবেচনা করা জরুরি। বিশ্ব পর্যটন দিবসে তাই আমাদের নতুন করে প্রশ্ন করতে হবে, আমরা কি শুধু নিজেদের সৌন্দর্য নিজেরাই দেখব, নাকি সেই সৌন্দর্যকে বিশ্বের মানুষের সামনে তুলে ধরে অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত করব? কক্সবাজারের ঢেউ, সুন্দরবনের বন, বান্দরবানের পাহাড়, সিলেটের চা-বাগান, কুয়াকাটার সূর্যোদয়, হাওরের জলরাশি কিংবা বাংলার গ্রামীণ জীবন কোনো সাধারণ সম্পদ নয়। এগুলো বাংলাদেশের প্রাকৃতিক ও সাংস্কৃতিক পুঁজি। এই পুঁজিকে ধ্বংস না করে, দায়িত্বশীলভাবে কাজে লাগিয়ে একটি শক্তিশালী পর্যটন অর্থনীতি গড়ে তোলা সম্ভব। কক্সবাজার হতে পারে সেই যাত্রার অন্যতম প্রধান দরজা, কিন্তু গন্তব্য হতে হবে পুরো বাংলাদেশ। সমুদ্র থেকে পাহাড়, পাহাড় থেকে বন, বন থেকে নদী, নদী থেকে গ্রাম, গ্রাম থেকে ইতিহাস ও সংস্কৃতি, সবকিছুকে এক সুতোয় গেঁথে বাংলাদেশকে একটি পূর্ণাঙ্গ পর্যটন গন্তব্য হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। পর্যটন শিল্পের বিকাশ ঘটলে শুধু বিদেশি পর্যটক আসবেন না, তৈরি হবে নতুন উদ্যোক্তা, নতুন কর্মসংস্থান, নতুন ব্যবসা এবং নতুন বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ। প্রকৃতি আমাদের অনেক কিছু দিয়েছে। এখন আমাদের দায়িত্ব সেই সম্পদকে জ্ঞান, পরিকল্পনা ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে কাজে লাগানো। বাংলাদেশের পর্যটন শিল্প যদি আন্তর্জাতিক মানে পৌঁছাতে পারে, তাহলে এটি শুধু বেড়ানোর আনন্দ দেবে না, দেশের অর্থনীতিতেও নতুন গতি আনবে। কক্সবাজারের ঢেউ থেকে সুন্দরবনের নিস্তব্ধতা, পাহাড়ের সবুজ থেকে হাওরের জলরাশি, বাংলার সংস্কৃতি থেকে মানুষের আতিথেয়তা, সব মিলিয়ে বাংলাদেশ হতে পারে বিশ্বের কাছে এক অনন্য পর্যটন অভিজ্ঞতার নাম। পর্যটনকে নতুনভাবে দেখার সময় এখনই। কারণ পর্যটনের হাত ধরেই খুলে যেতে পারে বাংলাদেশের নতুন অর্থনীতি, নতুন কর্মসংস্থান এবং বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের নতুন দুয়ার। |