|
দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে মুমিনের করণীয়
নতুন বার্তা, ঢাকা:
|
বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক সংকট, যুদ্ধ-বিগ্রহ ও নানা প্রতিকূলতার প্রভাবে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি এখন এক নিত্যদিনের বাস্তবতা। দিন দিন পাগলা ঘোড়ার মতো লাফিয়ে লাফিয়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম বাড়লেও মানুষের আয়-রোজগার সে হারে বাড়ে না।ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে দেখা দেয় অস্থিরতা, উদ্বেগ ও ক্ষোভ। অথচ ইতিহাস সাক্ষী দেয়, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি নতুন কোনো ঘটনা নয়, এটি পৃথিবীর আদি নিয়মের অংশ। স্বয়ং মহানবী (সা.)-এর যুগেও একসময় জিনিসপত্রের দাম বেড়ে গিয়েছিল। তখন সাহাবায়ে কেরাম তাঁর কাছে সমাধান চাইলে তিনি বিষয়টিকে নিছক বাজার অর্থনীতির প্রশ্ন হিসেবে না দেখে এর আধ্যাত্মিক তাৎপর্যের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। এখান থেকে শিক্ষা নিলে আজকের সংকটেও অনেকখানি প্রশান্তি ও দিকনির্দেশনা পাওয়া সম্ভব। হাদিস শরিফে ইরশাদ হয়েছে, আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, লোকেরা বলল, হে আল্লাহর রাসুল (সা.)! জিনিসপত্রের দাম বেড়ে গেছে। আপনি আমাদের জন্য দ্রব্যমূল্য নির্ধারণ করে দিন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, আল্লাহই মূল্যের গতি নির্ধারণকারী, তিনিই তা কমান ও বৃদ্ধি করেন এবং একমাত্র তিনিই রিজিকদাতা। আমি এই আশা করি যে আমি আল্লাহর সঙ্গে এমন অবস্থায় সাক্ষাৎ করব, যেন আমার ওপর কারো জীবন বা সম্পদের ওপর জুলুম করার কোনোরূপ অভিযোগ না থাকে। (আবু দাউদ, হাদিস : ৩৪৫১) এ হাদিস থেকে বোঝা যায়, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি পেলে সবার আগে মুমিনের উচিত এই বিশ্বাস দৃঢ় করা যে এটি নিছক অর্থনৈতিক ঘটনা নয়, বরং আল্লাহর ইচ্ছার প্রকাশ ও পরীক্ষারও একটি অংশ। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘আর আমি অবশ্যই তোমাদের পরীক্ষা করব কিছু ভয়, ক্ষুধা এবং জান-মাল ও ফল-ফলাদির স্বল্পতার মাধ্যমে। আর তুমি ধৈর্যশীলদের সুসংবাদ দাও।’ (সুরা : বাকারাহ, আয়াত : ১৫৫) এই আয়াত আমাদের শেখায়, অভাব-অনটন এলে হতাশ না হয়ে ধৈর্যের সঙ্গে তা মোকাবেলা করতে হবে। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিও অভাব-অনটন সৃষ্টির পেছনে শক্তিশালী একটি কারণ। তাই ধৈর্য সহকারে আল্লাহর নির্দেশিত পদ্ধতিতে তা মোকাবেলা করা মুমিনের করণীয়। নিম্নে এ রকম পরিস্থিতিতে করণীয় কয়েকটি বিষয় তুলে ধরা হলো— আল্লাহর ওপর ভরসা রাখা ও তাকওয়া অবলম্বন করা : পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘আর যে আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তার জন্য উত্তরণের পথ বের করে দেন এবং তাকে এমন উৎস থেকে রিজিক দেবেন, যা সে কল্পনাও করতে পারবে না।’ (সুরা : তালাক, আয়াত : ২-৩) তাই হতাশ না হয়ে বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ নেওয়াই কর্তব্য। অপচয়-অপব্যয় রোধ করা : ইসলাম প্রতিটি ক্ষেত্রে মধ্যপন্থা অবলম্বনের শিক্ষা দেয়। খরচের ক্ষেত্রেও ইসলামের এই নীতি অবলম্বন করলে বিপদ অনেকাংশে কমে যায়, বিশেষ করে আপৎকালে এমনভাবে চলা উচিত যাতে নিজের পাশাপাশি আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীদেরও ক্ষুধার কষ্টে পড়তে না হয়। জাবালা (রা.) বর্ণনা করেন, দুর্ভিক্ষের সময় ইবনে উমর (রা.) তাদের সতর্ক করে বলতেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) কাউকে তার ভাইয়ের অনুমতি ছাড়া একসঙ্গে দুটি করে খেজুর খেতে নিষেধ করেছেন। (বুখারি : ২৪৫৫) অর্থাৎ সংকটকালে প্রতিটি সম্পদ যত্নসহকারে ব্যবহার করাই ঈমানের দাবি। গুনাহ থেকে বিরত থাকা : হাদিসের ভাষ্যমতে, সমাজে প্রচলিত সুদ, ব্যভিচার, প্রতারণা ইত্যাদির মতো পাপাচারের কারণেই অনেক সময় খাদ্যসংকট ও দুর্ভিক্ষ নেমে আসে। তাই মুমিনের উচিত পাপাচার ত্যাগ করে নেক আমলে মনোযোগী হওয়া। মহানবী (সা.) বলেন, ‘সৎকর্ম ছাড়া অন্য কিছু আয়ুষ্কাল বাড়াতে পারে না এবং দোয়া ছাড়া অন্য কিছুতে ভাগ্য পরিবর্তন হয় না। মানুষ তার পাপের কারণে প্রাপ্য রিজিক থেকে বঞ্চিত হয়।’ (ইবনে মাজাহ : ৪০২২) লক্ষণীয় বিষয় হলো দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও দুর্ভিক্ষের পেছনে অনেক সময় প্রাকৃতিক কারণের চেয়ে মানুষের নিজের কারসাজিই বেশি দায়ী। ব্যবসায়ীদের অতিরিক্ত মুনাফার লোভ, মজুদদারি, নীতিনির্ধারকদের দুর্নীতি বা উদাসীনতা এবং সব মহলে একে অপরকে ঠকিয়ে এগিয়ে যাওয়ার অসুস্থ প্রতিযোগিতা—এসবই বাজারে অস্থিরতা ও সংকট তৈরি করে। তাই সংকট মোকাবেলার প্রথম ও সবচেয়ে জরুরি শর্ত হলো ব্যবসায়ী, নীতিনির্ধারক ও সাধারণ জনগণ—সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষ নিজ নিজ অবস্থানে আল্লাহকে ভয় করা এবং সততা বজায় রাখা। কেউ যদি অন্যায় মুনাফা, প্রতারণা বা অসততা থেকে বিরত থাকে, তাহলে আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে অভাবনীয় সাহায্য ও কল্যাণ নেমে আসার প্রতিশ্রুতি স্বয়ং কোরআনেই দেওয়া হয়েছে। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘আর যদি জনপদসমূহের অধিবাসীরা ঈমান আনত এবং তাকওয়া অবলম্বন করত তাহলে আমি অবশ্যই আসমান ও জমিন থেকে বরকতসমূহ তাদের ওপর খুলে দিতাম; কিন্তু তারা অস্বীকার করল। অতঃপর তারা যা অর্জন করত তার কারণে আমি তাদেরকে পাকড়াও করলাম।’ (সুরা : আরাফ, আয়াত : ৯৬) এই আয়াতে স্পষ্ট প্রমাণ হয় যে সমাজের সর্বস্তরের মানুষ সৎ ও আল্লাহভীরু হয়ে গেলে আসমান থেকেই বরকত ও সাহায্য নেমে আসে; পক্ষান্তরে অসততা ও পাপাচারই বয়ে আনে সংকট ও কষ্ট। সুতরাং ব্যবসায়ীদের উচিত ন্যায্য মুনাফায় সন্তুষ্ট থাকা ও মজুদদারি পরিহার করা, নীতিনির্ধারকদের উচিত নিরপেক্ষ ও কার্যকর বাজার-ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা, আর সাধারণ মানুষেরও উচিত পারস্পরিক সম্পর্ক ও লেনদেনে সততা বজায় রাখা, ইনশাআল্লাহ এর বরকতে সমাজে প্রকৃত প্রশান্তি ফিরে আসবে। অসহায়দের পাশে দাঁড়ানো : মানুষ অনেক সময় অভাবের তাড়নায় নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। তাই আপৎকালে সমাজের অসচ্ছল শ্রেণির পাশে দাঁড়ানো সবার দায়িত্ব। কোরবানির গোশত বণ্টন প্রসঙ্গে হাদিসে এসেছে, আবদুল্লাহ ইবনে ওয়াকিদ (রা.) বলেন, তিন দিনের বেশি কোরবানির গোশত খেতে রাসুল (সা.) নিষেধ করেছেন। আবদুল্লাহ ইবনে আবু বকর (রহ.) বলেন, আমি বিষয়টি আমরাহ (রা.)-এর কাছে উল্লেখ করলে তিনি বলেন, ‘ইবনে ওয়াকিদ সত্যই বলেছেন। আমি আয়েশা (রা.)-কে বলতে শুনেছি যে রাসুল (সা.)-এর যুগে ঈদুল আজহার সময় বেদুইনদের কিছু পরিবার শহরে আসে, তখন তিনি বলেন, তোমরা তিন দিনের পরিমাণ জমা রেখে বাকি গোশতগুলো সদকা করে দাও। পরবর্তী সময়ে লোকেরা বলল, হে আল্লাহর রাসুল (সা.), মানুষ তো কোরবানির পশুর চামড়া দিয়ে পাত্র প্রস্তুত করছে এবং তার মধ্যে চর্বি গলাচ্ছে। রাসুল (সা.) বলেন, তাতে কী হয়েছে? তারা বলল, আপনিই তো তিন দিনের বেশি কোরবানির গোশত খাওয়া থেকে বারণ করেছেন। তিনি বলেন, আমি তো বেদুইনদের কারণে এ কথা বলেছিলাম। এরপর এখন তোমরা খেতে পারো, জমা করে রাখতে পারো এবং সদকা করতে পারো।’ (মুসলিম : ৪৯৯৭) অর্থাৎ সামর্থ্যবানদের উচিত ভাগাভাগি করে খাওয়া এবং দান-সদকায় এগিয়ে আসা, যেন কোনো অভাবী মানুষ ক্ষুধার কষ্ট না পায়। দোয়ার মাধ্যমে আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনা করা : দোয়ার মাধ্যমে বহু সমস্যার সমাধান হয়ে যায়। আনাস (রা.) বর্ণিত একটি হাদিসে এসেছে, দুর্ভিক্ষের সময় মহানবী (সা.)-এর দোয়ার ফলে বৃষ্টি বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটেছিল। (মুসলিম : ১৯৬৪) তাই মুমিনের উচিত সংকটকালে বেশি বেশি দোয়া-ইস্তিগফারের মাধ্যমে মহান আল্লাহর সাহায্য কামনা করা। আমরা যে যাই করি না কেন, মহান আল্লাহর সাহায্য ছাড়া কোনো সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। আর আমরা যদি যার যার অবস্থান থেকে পাপমুক্ত না হই, তাহলে তাওবা ছাড়া তার প্রভাবে সৃষ্ট সংকটও মোকাবেলা সম্ভব নয়। তাই আমাদের উচিত আল্লাহকে ভয় করা, তাঁর ফয়সালায় সন্তুষ্ট থাকা, মিতব্যয়ী হওয়া, গুনাহ পরিহার করা, ব্যবসায়ী-নীতিনির্ধারক-জনগণ সবাই নিজ নিজ জায়গায় সততা বজায় রাখা, অসহায়দের পাশে দাঁড়ানো, আল্লাহর ওপর ভরসা রাখা, দোয়া করা এবং পরিশ্রমে আত্মনিয়োগ করা। মহান আল্লাহ সবাইকে তাওফিক দান করুন। আমিন। |