|
কেমন হবে ইমাম ও মুসল্লির সম্পর্ক
নতুন বার্তা, ঢাকা:
|
ইসলামী সমাজব্যবস্থায় মসজিদের ভূমিকা কেন্দ্রীয়। মসজিদকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয় ইসলামী সমাজের যাবতীয় কার্যক্রম।তাই ইমামের সঙ্গে মুসল্লিদের সম্পর্ক শিকড়ের সঙ্গে শাখা-প্রশাখা ও পত্র-পল্লবের সম্পর্কের মতো। মুসলিম সমাজে একজন আদর্শ ইমাম শিকড় হয়ে মুসল্লিদের ঈমান ও ইসলাম দিয়ে সজীব রাখেন এবং মুসল্লিরাও ইমামকে সম্মান দেন, মূল্যায়ন করেন। পারস্পরিক এই সম্পর্ক ও সংযোগে গড়ে ওঠে আদর্শ মুসলিম সমাজ। মুসল্লিদের প্রতি ইমামের আচরণ মসজিদের মুসল্লিদের প্রতি ইমামের আচরণ হবে নিম্নরূপ— ১. মুসল্লিদের সম্পর্কে সচেতন হওয়া : একজন ইমামের প্রথম দায়িত্ব হলো তাঁর মুসল্লিদের সম্পর্কে সচেতন হওয়া; বিশেষত তাঁদের দ্বিনদারির অবস্থা সম্পর্কে জানা এবং সে অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর একটি হাদিস থেকে সচেতনতার এই ধারণা পাওয়া যায়। তিনি বলেন, ‘আমি নামাজে দাঁড়িয়ে তা দীর্ঘায়িত করব বলে ইচ্ছা করি, অতঃপর শিশুর কান্না শুনতে পেয়ে আমি নামাজ সংক্ষিপ্ত করি এই আশঙ্কায় যে তার মা কষ্ট পাবে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৭০৭) ইমাম নববী (রহ.) বলেন, ‘আলেমরা বলেন, অবস্থার ভিন্নতার কারণে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর নামাজ দীর্ঘ বা সংক্ষিপ্ত হতো। যখন মুসল্লিরা দীর্ঘ নামাজকে প্রাধান্য দিত এবং নবীজি (সা.) ও সাহাবিদের কোনো ব্যস্ততা থাকত না, তখন তিনি নামাজ দীর্ঘ করতেন। আর যখন এমনটি না হতো তখন তিনি নামাজ সংক্ষিপ্ত করতেন।’ (শরহু মুসলিম : ৩/১৪৫) ২. শিক্ষক হওয়া : বাংলাদেশের মতো দেশগুলোতে, যেখানে দ্বিনি শেখার সুযোগ সীমিত এবং প্রয়োজনীয় ধর্মীয় জ্ঞান রাখে এমন মানুষের সংখ্যা কম, সেখানে একজন ইমাম শিক্ষকের ভূমিকা পালন করবেন। তিনি চেষ্টা করবেন মানুষ যেন অন্তত ফরজ পরিমাণ জ্ঞান অর্জন করতে পারে। কেননা একদিকে আল্লাহ মানুষের ওপর ধর্মীয় জ্ঞান অর্জন করাকে ফরজ করেছেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘ইলম (ধর্মীয় জ্ঞান) অর্জন করা প্রত্যেক মুসলমানের ওপর ফরজ।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস : ২২৪) অন্যদিকে তিনি বলেছেন, নিশ্চয়ই আল্লাহ আমাকে শিক্ষক ও সহজকারী হিসেবে প্রেরণ করেছেন। (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ১৪৭৮) সুতরাং নবীর উত্তরসূরি হিসেবে একজন ইমাম হবেন সমাজের শিক্ষক। ৩. সহনশীল ও কোমল হওয়া : নবী (সা.)-এর উত্তরসূরি, সমাজের শিক্ষক ও নেতা হিসেবে ইমাম মুসল্লিদের প্রতি সহনশীল হবেন। তিনি তাঁদের প্রতি ধৈর্য ও সংযম প্রদর্শন করবেন। কেননা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর উদ্দেশ্যে আল্লাহ বলেছেন, ‘আল্লাহর দয়ায় তুমি তাদের প্রতি কোমল হৃদয় হয়েছিলে; যদি তুমি রূঢ় ও কঠোরচিত্ত হতে, তবে তারা তোমার আশপাশ থেকে সরে পড়ত। সুতরাং তুমি তাদের ক্ষমা কোরো এবং তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা কোরো। আর কাজে-কর্মে তাদের সঙ্গে পরামর্শ কোরো, অতঃপর তুমি কোনো সংকল্প করলে আল্লাহর ওপর নির্ভর করবে; যারা নির্ভর করে আল্লাহ তাদের ভালোবাসেন।’ (সুরা : আলে ইমরান, আয়াত : ১৫৯) ৪. নিজে আদর্শ হওয়া : অনেক সাধারণ মানুষ ইমাম ও তাঁর কর্মকাণ্ডকে শরিয়তের প্রমাণ ও মানদণ্ড মনে করে। তাই একজন ইমামের দায়িত্ব হলো মুসল্লিদের সামনে নিজেকে আদর্শ ব্যক্তিত্ব হিসেবে পেশ করা। ঠিক যেমন রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ব্যাপারে আম্মাজান আয়েশা (রা.) সাক্ষ্য দিয়েছিলেন—তাঁর চরিত্র হলো কোরআন। ইমাম কখনো এমন হবেন না যে মানুষকে নেক কাজের উপদেশ দেয়, কিন্তু নিজে তার ওপর আমল করে না। আল্লাহ বলেন, ‘হে মুমিনরা! তোমরা যা করো না তা তোমরা কেন বলো? তোমরা যা করো না তোমাদের তা বলা আল্লাহর দৃষ্টিতে অতিশয় অসন্তোষজনক।’ (সুরা—সাফ, আয়াত : ২-৩) ৫. শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে ভূমিকা রাখা : ইমাম মুসলিম সমাজের অভিভাবক ও নেতা। আর একজন অভিভাবক ও নেতার দায়িত্ব হলো সমাজে শান্তি ও শৃঙ্খলা বজায় রাখতে ভূমিকা রাখা। যেমন—অসহায় ও বিপদগ্রস্তকে সাহায্য করা, সমাজে বিবাদ-সংঘাত হলে আইনের সীমার মধ্যে থেকে মীমাংসা করা ইত্যাদি। একদিন রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, আমি কি তোমাদের রোজা, নামাজ ও সদকার চেয়েও মর্যাদাপূর্ণ কাজের কথা বলব না? সাহাবিরা বললেন, হ্যাঁ, অবশ্যই হে আল্লাহর রাসুল! তিনি বললেন, পরস্পরের মধ্যে মীমাংসা করা। কেননা পরস্পরের মধ্যে ঝগড়া বাধানো ধ্বংসের কারণ।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস : ৪৯১৯) ইমামের প্রতি মুসল্লিদের আচরণ মসজিদের ইমামের প্রতি মুসল্লিদের আচরণ হবে নিম্নরূপ— ১. সম্মান ও মান্য করা : একজন ইমাম আলেম ও ধর্মীয় নেতা হিসেবে সমাজের সাধারণ মানুষের সম্মান ও মান্যতার অধিকারী। তাঁকে সম্মান করা ও দ্বিনের ব্যাপারে তাঁর পরামর্শ ও নির্দেশনা মান্য করে চলা তাঁদের দায়িত্ব। স্বয়ং আল্লাহ আলেমদের এই মর্যাদার স্বীকৃতি দিয়েছেন। ইরশাদ হয়েছে, ‘তোমাদের মধ্যে যারা ঈমান এনেছে এবং যাদেরকে জ্ঞান দান করা হয়েছে আল্লাহ তাদেরকে মর্যাদায় উন্নত করবেন। তোমরা যা করো আল্লাহ সে সম্পর্কে সবিশেষ অবহিত।’ (সুরা : মুজাদালা, আয়াত : ১১) মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘সাধারণ ইবাদতকারীর ওপর আলেমদের মর্যাদা তোমাদের ওপর আমার মর্যাদার অনুরূপ।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস : ২৬৮৫) ২. ভালো ধারণা পোষণ করা : ইমামরা সমাজের জন্য শিক্ষকস্বরূপ। আর শিক্ষকের জ্ঞান ও মনোযোগ দ্বারা উপকৃত হওয়ার প্রথম শর্ত হলো তাদের প্রতি সুধারণা পোষণ করা। ইমামদের প্রতি মন্দ ধারণা পোষণ করে তাদের থেকে উপকৃত হওয়া সম্ভব নয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, তিন ধরনের মানুষকে মোনাফিক ছাড়া আর কেউ অবজ্ঞা করতে পারে না : এক. বৃদ্ধ মুসলমান, দুই. আলেমে দ্বিন, তিন. ন্যায়পরায়ণ শাসক। (মুজামুল কাবির লিত-তাবারানি, হাদিস : ২০২) ৩. দ্বিনি কল্যাণের মাধ্যম বানানো : সাধারণ মুসল্লিরা ইমামকে দ্বিনি কল্যাণ লাভের মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করবেন, তাঁরা কখনো জাগতিক স্বার্থ উপলক্ষ করবেন না। বিশেষত প্রাজ্ঞ ইমামের মাধ্যমে তাঁরা নিজেদের ধর্মীয় জ্ঞানে সমৃদ্ধ করবে, নিজেদের দৈনন্দিন জীবনের দ্বিনি সমস্যার সমাধানগুলো জেনে নেবেন। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘তোমরা যদি না জানো, তবে জ্ঞানীদের জিজ্ঞাসা কোরো।’ (সুরা : নাহল, আয়াত : ৪৩) ৪. কল্যাণের কাজে সহযোগিতা করা : ইমাম মুসলিম সমাজের নেতা। মুসলমানের ভালো-মন্দ লক্ষ রাখা তাদের ঈমানি দায়িত্ব। তাই ইমাম দ্বিনি কোনো কাজে অথবা সমাজের কল্যাণমূলক কোনো কাজে আহবান জানালে মুসলমানদের উচিত তাঁর আহ্বানে সাড়া দেওয়া। মহান আল্লাহ বলেন, ‘সৎকাজ ও তাকওয়ায় তোমরা পরস্পরকে সাহায্য করবে এবং পাপ ও সীমালঙ্ঘন করবে না। আল্লাহকে ভয় করবে। নিশ্চয়ই আল্লাহ শাস্তিদানে কঠোর।’ (সুরা : মায়িদা, আয়াত : ২) ৫. ভালো-মন্দের খবর রাখা : বাংলাদেশে ইমামদের সাধারণত বেতন-ভাতা যা হয়ে থাকে তাতে বর্তমান বাজারে সংসারের মৌলিক প্রয়োজন পূরণ করাই কঠিন। বিশেষত গ্রামাঞ্চলের ইমামদের আর্থিক অবস্থা খুবই শোচনীয়। তাই তাদের ভালো-মন্দের খবর রাখা মুসল্লিদের দায়িত্ব। ইমামদের ভেতর অনেকে এমন যাঁরা নিজেরা প্রচণ্ড অভাবে থাকলেও ব্যক্তিত্বের কারণে তা প্রকাশ করেন না, এমন ইমামদের খোঁজখবর রাখা বেশি জরুরি। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘এটা প্রাপ্য অভাবগ্রস্ত লোকদের; যারা আল্লাহর পথে এমনভাবে ব্যাপৃত যে দেশময় ঘোরাফিরা করতে পারে না; যাঞ্চা না করার কারণে অজ্ঞ লোকেরা তাদেরকে অভাবমুক্ত বলে মনে করে; তুমি তাদের লক্ষণ দেখে চিনতে পারবে। তারা মানুষের কাছে নাছোড় হয়ে যাঞ্চা করে না। যে ধনসম্পদ তোমরা ব্যয় করো আল্লাহ তা সবিশেষ অবহিত।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ২৭৩) আল্লাহ সবাইকে দ্বিনের সঠিক জ্ঞান দান করুন। আমিন। |