|
অর্থ আইন ২০২৬: করমুক্ত সীমা বাড়ল, কর ব্যবস্থায় এলো দীর্ঘমেয়াদি ভাবনার প্রতিফলন
সৈয়দ জাফর সাদেক:
|
প্রতিবছরের মতো এবারও ৩০ জুন জাতীয় সংসদে পাস হয়েছে অর্থ আইন, ২০২৬। আইনটি পর্যালোচনা করলে স্পষ্ট হয়, এবারের পরিবর্তন শুধু করহার সমন্বয়ে সীমাবদ্ধ নয়; বরং কর প্রশাসনকে আরও আধুনিক, পূর্বানুমানযোগ্য এবং করদাতাবান্ধব করার একটি সুস্পষ্ট প্রচেষ্টা এতে প্রতিফলিত হয়েছে।সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে আয়কর রিটার্ন দাখিলের পদ্ধতিতে। এতদিন নির্ধারিত সময়সীমার শেষ দিকে রিটার্ন দাখিলের প্রবণতা ছিল বেশি। ফলে করদাতা ও কর প্রশাসন উভয়কেই শেষ মুহূর্তের অতিরিক্ত চাপ সামলাতে হতো। অর্থ আইন, ২০২৬-এ সেই কাঠামোতে পরিবর্তন এনে সময়মতো রিটার্ন দাখিলে আর্থিক প্রণোদনা যুক্ত করা হয়েছে। ১ জুলাই থেকে ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে রিটার্ন দাখিল করলে প্রদেয় করের ওপর ৫ শতাংশ কর রেয়াত (সর্বোচ্চ ২৫ হাজার টাকা) পাওয়া যাবে। অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত কোনো রেয়াত বা অতিরিক্ত কর প্রযোজ্য হবে না। তবে পরবর্তী সময়ে রিটার্ন দাখিল করলে ধাপে ধাপে অতিরিক্ত কর আরোপের বিধান রাখা হয়েছে। এই পরিবর্তন করদাতাকে শাস্তি দেওয়ার পরিবর্তে সময়মতো কর পরিপালনে উৎসাহিত করার একটি ইতিবাচক নীতির প্রতিফলন। পেশাজীবীদের জন্যও অর্থ আইনটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন নিয়ে এসেছে। এতদিন ব্যয় বিয়োজন সংক্রান্ত বিভিন্ন বিধানে শুধু "ব্যবসা" শব্দটি ব্যবহৃত হওয়ায় স্বাধীন পেশাজীবীদের ক্ষেত্রে ব্যাখ্যাগত অস্পষ্টতা দেখা দিত। এবার প্রাসঙ্গিক ধারায় "ব্যবসা বা পেশা" শব্দবন্ধ যুক্ত হওয়ায় চিকিৎসক, আইনজীবী, প্রকৌশলী, স্থপতি, চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট, কর পরামর্শকসহ বিভিন্ন পেশাজীবীর ক্ষেত্রে আইনের প্রয়োগ আরও স্পষ্ট হয়েছে। রাজস্ব আহরণের ক্ষেত্রেও নতুন কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। মোটরগাড়ির ইঞ্জিনের ধারণক্ষমতা অনুযায়ী অগ্রিম আয়করের হার বৃদ্ধি করা হয়েছে। একই সঙ্গে খুচরা বিক্রেতার কাছে পণ্য সরবরাহ এবং ক্লাবের সদস্যপদের ওপর নতুন উৎসে কর আরোপ করা হয়েছে। এতে বোঝা যায়, অর্থনৈতিক লেনদেনের বিভিন্ন পর্যায়ে উৎসে কর সংগ্রহের পরিধি আরও বিস্তৃত করার নীতি অনুসরণ করা হয়েছে। এবারের অর্থ আইনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো করমুক্ত আয়ের সীমা নির্ধারণে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ। সাধারণ করদাতার ক্ষেত্রে ২০২৬-২৭ ও ২০২৭-২৮ করবর্ষে করমুক্ত আয়ের সীমা ৪ লাখ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। ২০২৮-২৯ ও ২০২৯-৩০ করবর্ষে তা বেড়ে হবে ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা এবং ২০৩০-৩১ করবর্ষে ৫ লাখ টাকা। একই সঙ্গে করমুক্ত সীমার পর প্রথম করহার ১০ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে; পূর্বের ৫ শতাংশের স্তরটি আর থাকছে না। মহিলা, জ্যেষ্ঠ নাগরিক, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, তৃতীয় লিঙ্গের ব্যক্তি এবং মুক্তিযোদ্ধাদের ক্ষেত্রেও ধাপে ধাপে করমুক্ত সীমা বৃদ্ধির ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। এই পূর্বনির্ধারিত রোডম্যাপ কর ব্যবস্থায় একটি নতুন দৃষ্টিভঙ্গির সূচনা করেছে। করদাতা, বিনিয়োগকারী ও উদ্যোক্তারা এখন ভবিষ্যৎ কর কাঠামো সম্পর্কে আগাম ধারণা পাবেন, যা দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক পরিকল্পনা গ্রহণে সহায়ক হবে। যদিও এটি মূল্যস্ফীতির সঙ্গে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সমন্বিত কোনো ব্যবস্থা নয়, তবুও আগাম নির্ধারিত করমুক্ত সীমা কর ব্যবস্থাকে আরও স্থিতিশীল ও পূর্বানুমানযোগ্য করে তুলবে। সারচার্জ ব্যবস্থাতেও নতুন সংযোজন হয়েছে। নিট সম্পদের ভিত্তিতে বিদ্যমান সারচার্জ কাঠামো বহাল থাকলেও একাধিক মোটরগাড়ির মালিকদের জন্য পরিবেশ সারচার্জ চালু করা হয়েছে। প্রথম গাড়ির বাইরে প্রতিটি অতিরিক্ত গাড়ির জন্য ইঞ্জিনের ধারণক্ষমতা অনুযায়ী নির্ধারিত হারে পরিবেশ সারচার্জ দিতে হবে, যা কোনো অবস্থাতেই সমন্বয়যোগ্য বা ফেরতযোগ্য নয়। একই সঙ্গে অন্তর্ভুক্তিমূলক কর্মসংস্থান উৎসাহিত করতে একটি প্রশংসনীয় উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। যেসব প্রতিষ্ঠান তাদের মোট জনবলের অন্তত ১০ শতাংশ অথবা ন্যূনতম ২৫ জন প্রতিবন্ধী ব্যক্তি বা তৃতীয় লিঙ্গের ব্যক্তিকে নিয়োগ দেবে, তারা নির্ধারিত শর্তসাপেক্ষে কর রেয়াতের সুবিধা পাবে। সামাজিক অন্তর্ভুক্তিকে উৎসাহিত করার ক্ষেত্রে এই উদ্যোগ নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। সব মিলিয়ে অর্থ আইন, ২০২৬ তাৎক্ষণিক করহার পরিবর্তনের চেয়ে দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত সংস্কারের বার্তাই বেশি বহন করে। সময়মতো রিটার্ন দাখিলে প্রণোদনা, করমুক্ত সীমার পূর্বঘোষিত রোডম্যাপ, পেশাজীবীদের আইনি স্বীকৃতি এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক কর্মসংস্থানে কর প্রণোদনা এসব পরিবর্তন বাংলাদেশের কর ব্যবস্থাকে আরও আধুনিক, পরিকল্পিত ও পূর্বানুমানযোগ্য করে তুলতে পারে। এখন মূল চ্যালেঞ্জ হবে এসব বিধানের কার্যকর বাস্তবায়ন। কারণ একটি ভালো আইন তখনই সফল হয়, যখন তার সুফল করদাতা বাস্তবে অনুভব করতে পারেন। সৈয়দ জাফর সাদেক: আয়কর আইনজীবী |