|
পানিসংকট মোকাবিলায় ‘গ্লেসিয়ার গ্রাফটিং’, শতাব্দীপ্রাচীন কৌশল কেন এখন গুরুত্ব পাচ্ছে
নতুন বার্তা, ঢাকা:
|
পাকিস্তানের উচ্চভূমি হিমালয়াঞ্চলে পানিসংকট মোকাবিলায় শতাব্দীপ্রাচীন কৌশল নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে। ‘গ্লেসিয়ার গ্রাফটিং’ নামের এই পদ্ধতি স্থানীয় ভাষায় ‘গ্লেসিয়ার ম্যারেজ’ নামেও পরিচিত। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে দ্রুত হিমবাহ গলে যাওয়ার বাস্তবতায় এই ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতি আবারও আশার আলো দেখাচ্ছে।পাকিস্তানে কমপক্ষে ১৩ হাজার হিমবাহ রয়েছে। তবে দেশটি ক্ষতিকর কার্বন নিঃসরণ বা গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণে বিশ্বে এক শতাংশেরও কম অবদান রাখলেও জলবায়ু ঝুঁকিতে শীর্ষ ১০ দেশের একটি। ন্যাশনাল ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট অথরিটি বা এনডিএমএ গত বছর সতর্ক করে বলেছে, তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে হিমবাহ গলার প্রভাব উল্লেখযোগ্য হতে পারে। খবর আল জাজিরার। গ্লেসিয়ার গ্রাফটিং: গ্লেসিয়ার গ্রাফটিং হলো উচ্চভূমির নির্দিষ্ট স্থানে বরফ স্থাপন করে কৃত্রিম হিমবাহ তৈরি করার প্রক্রিয়া। গবেষকদের মতে, এর সূচনা ১৪শ শতকে। বালতিস্তান বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জাকির হুসেইন জাকির জানান, সুফি সাধক মির সাইয়্যেদ আলী হামাদানি একসময় গিয়ারি গ্রামে এই পদ্ধতি প্রয়োগ করেছিলেন। পদ্ধতিতে দুটি ভিন্ন উৎস থেকে তথাকথিত ‘পুরুষ’ ও ‘নারী’ বরফ সংগ্রহ করা হয়। প্রায় ২০০ কেজি করে বরফ পাহাড়ি উপত্যকা থেকে এনে নির্দিষ্ট স্থানে মিশিয়ে স্তর তৈরি করা হয়। স্থানীয়দের বিশ্বাস, কালচে বরফ ‘পুরুষ” এবং হালকা বরফ ‘নারী’-দুটির সমন্বয়ে উর্বর পানির উৎস গড়ে ওঠে। এই প্রক্রিয়া শুধু প্রযুক্তিগত নয়; এটি আধ্যাত্মিক ও সাংস্কৃতিক অনুশীলনও। বরফ সংগ্রহের আগে পবিত্র কুরআন তেলাওয়াত, দোয়া ও বিশেষ আচার-রীতি পালিত হয়। প্লাস্টিক ব্যবহার, অশালীন আচরণ বা পরিবেশের ক্ষতি কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। সংগৃহীত বরফ মাটি স্পর্শ করতে দেয়া হয় না। নির্দিষ্ট স্থানে খাদ খুঁড়ে লবণ, কয়লা ও ঘাসের সঙ্গে বরফ স্তরে স্তরে বসানো হয়। সাতটি ভিন্ন ঝরনার পানি ফোঁটা ফোঁটা করে ঢেলে স্তরগুলোকে সংযুক্ত করা হয়। উপযুক্ত স্থানে-উত্তরমুখী ঢাল, কম সূর্যালোক, তীব্র বাতাস ও তুষারপাতের সুবিধাযুক্ত এলাকায়-এই বরফ কয়েক মাসে জমাট বেঁধে বৃহত্তর বরফস্তূপে পরিণত হয়। টিকে থাকলে কয়েক বছরে তা স্থায়ী জলস্রোতে রূপ নেয়। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৫০-এর দশক থেকে পাকিস্তানে গড় তাপমাত্রা ১ দশমিক ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়েছে-যা বৈশ্বিক গড়ের দ্বিগুণ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গ্লেসিয়ার গ্রাফটিং একক সমাধান নয়; তবে এটি স্থানীয় পর্যায়ের জ্ঞান ও সমষ্টিগত উদ্যোগের শক্তিশালী উদাহরণ। স্থানীয়দের আশঙ্কা, তরুণ প্রজন্ম শহরমুখী হওয়ায় এই ঐতিহ্য হারিয়ে যেতে পারে। তবু পানিসংকট ও অনিয়মিত তুষারপাতের সময়ে গ্লেসিয়ার গ্রাফটিং তাদের কাছে এখনও টিকে থাকার লড়াইয়ের গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার। |