|
সাইবার আক্রমণ এখন নতুন মহামারি
জুবায়ের আহমেদ:
|
ইন্টারনেট সেবা সহজলভ্য হওয়ার পর থেকেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে মানুষের সরব উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। প্রযুক্তির অভাবনীয় অগ্রগতির যুগে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানুষের জীবনকে যেমন সহজ করেছে, তেমনি এর অপব্যবহার ডেকে আনছে চরম বিপর্যয়। বর্তমানে মানুষ কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিপক্ষকে ফাঁসাতে বা সামাজিকভাবে হেয় করতে এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে মিথ্যা, ভিত্তিহীন, কুরুচিপূর্ণ ও অশ্লীল ছবি ও ভিডিও তৈরি করছে। ব্যক্তিগত ক্ষোভ বা শত্রুতা মেটাতে এই ধরণের কুরুচিপূর্ণ ও অপপ্রচারমূলক কনটেন্ট তৈরি করে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে সোশ্যাল মিডিয়ায়। দেশের প্রতিটি এলাকাতেই এখন এই জঘন্য প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, যা মানুষের সামাজিক মর্যাদা ও মানসিক শান্তিকে এক নিমেষে ধ্বংস করে দিচ্ছে।এই ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সবচেয়ে বিষাক্ত প্রভাব দেখা যাচ্ছে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে। বিশেষ করে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী সরকারের পতনের পর রাজনৈতিক অঙ্গনে পক্ষ-বিপক্ষের তীব্র বাকযুদ্ধ ও মেরুকরণ তৈরি হয়েছে। এই সুযোগে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে বা হাসি-ঠাট্টার পাত্র বানাতে পরস্পরের বিরুদ্ধে এআই দিয়ে বিকৃত ভিডিও ও ছবি তৈরি করা হচ্ছে। শত্রুকে বিপদে ফেলতে তার নামে ভুয়া বক্তব্য তৈরি করে এবং দেশের মূলধারার প্রতিষ্ঠিত গণমাধ্যমের লোগো ব্যবহার করে বানানো হচ্ছে ভুয়া ফটোকার্ড। সাধারণ মানুষ এসব ফটোকার্ড ও এআই নির্মিত ডিজিটাল কনটেন্টকে সত্য মনে করে বিভ্রান্ত হচ্ছে এবং অন্ধের মতো বিশ্বাস করে তা ছড়িয়ে দিচ্ছে। অপরদিকে নিজেরা অপকর্ম করে এআইকে এর উপর দায় চাপিয়ে দেওয়ার মতো ঘটনাও ঘটছে। ডিজিটাল দুনিয়ায় এই মিথ্যাচার ছড়িয়ে দেওয়া কেবল সামাজিক বা আইনি অপরাধই নয়, তা একটি চরম নৈতিক ও ধর্মীয় অপরাধ। আমাদের ইসলাম ধর্মসহ প্রতিটি ধর্মেই মিথ্যা তথ্য প্রচার, চরিত্রহনন এবং অপপ্রচার ভুল কাজ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। মিথ্যাচারকে ধর্মে পাপ এবং সমাজের শান্তি বিনষ্টকারী ব্যাধি হিসেবে গণ্য করা হয়। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, ধর্মীয় বিধি-বিধান ও নৈতিক শিক্ষার তোয়াক্কা না করে মানুষ প্রতিদিন আরও বেশি করে এই গর্হিত কাজে লিপ্ত হচ্ছে। সত্য-মিথ্যার তোয়াক্কা না করে অন্ধ আক্রোশে মেতে ওঠার এই সংস্কৃতি আমাদের বিবেক ও মানবিক মূল্যবোধকে পুরোপুরি ধ্বংশ করে দিচ্ছে। ইন্টারনেট এবং ডিজিটাল মাধ্যমগুলোর সহজলভ্যতার ফলে ব্যক্তিগত স্বার্থ উদ্ধারের জন্য মানুষের এই গর্হিত কাজ দিন দিন বাড়ছে। ইউটিউব এবং ফেইসবুক থেকে ইনকাম করার সুযোগ থাকার কারনে ভালো-মন্দ সবকিছুই হয়ে যাচ্ছে এখন কনটেন্ট। সত্যি মিথ্যা যাই হোক, প্রচার করে ভিউ আনতে পারলেই ডলার মিলছে। ডলারের এই নেশায় এমন কোন কাজ নেই, যা হচ্ছে না এখন। কিচু মানুষ মিথ্যাচার করছে স্বার্থ উদ্ধারের জন্য, অপরাপর কিছু মানুষ না জেনে বা জেনেশুনেও সেই মিথ্যাচার প্রচার করছে ভিউ কামানোর জন্য। এআই প্রযুক্তি এবং সংবাদ ফটোকার্ডের এই অপব্যবহার এবং ডিজিটাল অপপ্রচার রূপ নিয়েছে এক ভয়াবহ আধুনিক মহামারিতে। এই সাইবার মহামারির হাত থেকে বাঁচতে হলে কেবল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কঠোর পদক্ষেপই যথেষ্ট নয়; বরং দরকার সর্বস্তরের মানুষের সচেতনতা ও দায়িত্বশীল আচরণ। সোশ্যাল মিডিয়ায় ভেসে আসা যেকোনো ফটোকার্ড বা খবর অন্ধভাবে বিশ্বাস ও শেয়ার না করে তথ্য যাচাই করার মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে। পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় স্থানগুলো থেকে মিথ্যাচারের কুফল সম্পর্কে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা জরুরি। প্রযুক্তির অশুভ ব্যবহার রোধ করে সত্য ও ন্যায়ের চর্চা না করলে এই সাইবার মহামারি পুরো সমাজের মৌলিক ভিত্তি ও পারস্পরিক বিশ্বাসকে চিরতরে ধসিয়ে দেবে। জুবায়ের আহমেদঃ সাবেক শিক্ষার্থী, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব জার্নালিজম অ্যান্ড ইলেকট্রনিক মিডিয়া (বিজেম) |