|
কোরবানির ঈদ সামনে রেখে চাঙা কোমলপানীয়ের বাজার
নতুন বার্তা, ঢাকা:
|
কোরবানির ঈদ সামনে রেখে চাঙা হয়ে উঠেছে দেশের কোমলপানীয়ের বাজার। দোকানিরা মজুত বাড়াচ্ছেন। সরবরাহ বাড়িয়েছে কোম্পানিগুলো। সারাবছর যে পরিমাণ কোমলপানীয় বিক্রি হয়, শুধু কোরবানিতেই বিক্রি হয় তার ১৫-২০ শতাংশ। এ বছরও তার ব্যতিক্রম হবে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।দেশে ক্রমে বড় হয়ে ওঠা কোমলপানীয়ের বাজারের প্রবৃদ্ধি হচ্ছে প্রতিবছর ১০ শতাংশ হারে। বর্তমানে এ বাজার ১২ হাজার কোটি টাকারও বেশি, যা জমে ওঠে ঈদ বা এমন কোনো বড় উৎসব কেন্দ্র করে। সংশ্লিষ্টরা জানান, প্রতিবছর কোরবানির ঈদ সামনে রেখে কার্বোনেটেড সফট ড্রিংকসের চাহিদা বেশি বাড়ে। এবছরও বাজারে বিক্রি এরই মধ্যে বেড়েছে। বিশেষ করে ৫০০ মিলি লিটার কিংবা তার চেয়ে বড় বোতলজাত সফট ড্রিংকসের প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ বিক্রি হয় কোরবানির ঈদে। এবার ঈদ পড়েছে পুরো গরমের মধ্যে। গরমে কোমলপানীয়ের চাহিদা এমনিতেই বেশি থাকে। একই সঙ্গে অতিথি আপ্যায়নের অনুষঙ্গ হয়ে ওঠায় কোরবানি ঈদ কেন্দ্র করে বাজারে কোমলপানীয়ের চাহিদা তুঙ্গে। ১২ হাজার কোটি টাকার বাজার কোম্পানিগুলোর তথ্যমতে, দেশে কোমলপানীয়ের বাজার ১০ থেকে ১২ হাজার কোটি টাকারও বেশি। এর মধ্যে কার্বোনেটেড সফট ড্রিংকসের (সিএসডি) বাজার প্রায় ছয় হাজার কোটি টাকার। প্রতিবছর প্রায় তিন হাজার কোটি টাকার এনার্জি ড্রিংকস, ৫শ কোটি টাকার জুস, ৬শ কোটি টাকার ফ্লেভার ড্রিংকস ও ৫শ কোটি টাকার মিল্ক অ্যাডেড ড্রিংকস বিক্রি হয়। কোমলপানীয় দোকানে সাজানো কোমলপানীয় এছাড়া বোতলজাত পানির বাজারও প্রায় ১৫শ কোটি টাকার। আর দেশে প্রতিবছর অন্তত ১০ শতাংশ হারে বড় হচ্ছে কোমলপানীয়ের বাজার। দেশে প্রধানত কোমলপানীয় উৎপাদন ও বিপণন করে প্রাণ বেভারেজ লিমিটেড, আকিজ ভেঞ্চারের আকিজ ফুড অ্যান্ড বেভারেজ লিমিটেড, মেঘনা বেভারেজ লিমিটেড, পারটেক্স বেভারেজ, গ্লোব বেভারেজ, কোলা-কোলা বাংলাদেশ ও পেপসিকো বাংলাদেশ। প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান প্রাণ বেভারেজ লিমিটেডের হেড অব মার্কেটিং মো. নুরুল হক পরশ বলেন, ‘দেশে বেভারেজ বাজারের আকার গত বছর প্রায় ১২ হাজার ১৯১ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। প্রতিবছর গড়ে ১০ শতাংশ হারে এ বাজারের প্রবৃদ্ধি হচ্ছে।’ তবে কোকা-কোলা বাংলাদেশ বেভারেজ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাদাব আহমেদ খান বলেন, ‘সবশেষ তথ্য অনুযায়ী এ বাজার অন্তত ১০ হাজার কোটি টাকারও বেশি।’ কোরবানিতে বিক্রি ১৫-২০ শতাংশ কোমলপানীয় দেশে সারাবছর যে পরিমাণ কোমলপানীয় বিক্রি হয়, তার ১৫ থেকে ২০ শতাংশই বিক্রি হয় কোরবানির ঈদে। আর দুই ঈদে বিক্রি হয় মোট বিক্রির ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ। কোরবানির ঈদে বেশি বিক্রি হয় বড় আকারের বোতলজাত কোমলপানীয়। ৫০০ মিলিলিটার কিংবা তার চেয়ে বড় বোতলগুলোর ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ বিক্রি হয় শুধু কোরবানির ঈদেই। আর ২৫০ মিলিলিটার বোতলের বিক্রি তো আছেই। বৈশ্বিক বাজার এখনো ছোট, রয়েছে সুযোগ বাংলাদেশের কোমলপানীয়ের বাজার এখনো ছোট। তবে এখানে ব্যবসার সুযোগ রয়েছে বলে মনে করেন কোকা-কোলা বাংলাদেশ বেভারেজ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাদাব আহমেদ খান। তিনি বলেন, ‘বৈশ্বিকভাবে কোমলপানীয়ের বাজার বাংলাদেশে এখনো ছোট। এখানে ব্যবসা করার অনেক সুযোগ রয়েছে। আমরা সবাই এখন এটি নিয়ে কাজ করছি।’ শাদাব আহমেদ খান বলেন, ‘দুই ঈদেই দেশে কোমলপানীয়ের বিক্রি বাড়ে। তবে কোরবানির ঈদে বিক্রি তুলনামূলক বেশি হয়। কারণ মাংসের সঙ্গে অনেকেই কোমলপানীয় পান করতে পছন্দ করেন।’ বাজারে কোকা-কোলার অবস্থান প্রসঙ্গে শাদাব আহমেদ খান বলেন, ‘বাংলাদেশের বাজারে এখনো স্থানীয় ব্র্যান্ডগুলো শক্ত অবস্থানে রয়েছে। কোকা-কোলা এখন মার্কেট লিডার নয়।’ জানতে চাইলে প্রাণ বেভারেজ লিমিটেডের হেড অব মার্কেটিং মো. নুরুল হক পরশ বলেন, ‘প্রতিবছরই কোরবানির ঈদ সামনে রেখে কোমলপানীয়ের বিক্রি বাড়ে। সারাবছর যে পরিমাণ বিক্রি হয়, তার ৩০ শতাংশ বিক্রি হয় কোরবানির ঈদেই। সারাবছর যে পরিমাণ কার্বোনেটেড সফট ড্রিংকস বিক্রি হয় তার ১৫ থেকে ২০ শতাংশ বিক্রি হয় কোরবানির ঈদে।’ তিনি জানান, জুস, ফ্লেভার্ড ড্রিংকস ও মিল্ক অ্যাডেড ড্রিংকস ক্যাটাগরিতেও ঈদ কেন্দ্র করে চাহিদা বাড়ে। বিশেষ করে পরিবারভিত্তিক আয়োজন, অতিথি আপ্যায়ন ও গরম আবহাওয়ার কারণে এসব পানীয়ের বিক্রি কয়েকগুণ বেড়ে যায়। প্রাণ আরএফএল গ্রুপের এই কর্মকর্তা বলেন, ‘কোরবানির ঈদে সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয় বড় আকারের, অর্থাৎ ৫০০ মিলি, ১ লিটার ও ২ লিটারের বোতলগুলো। সারা বছরে আমরা যে পরিমাণ বিক্রি করি, তার প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশই হয় এই ঈদ মৌসুমে। শুধু আমাদের প্রতিষ্ঠান নয়, পুরো ক্যাটাগরিতেই কোরবানির ঈদ কেন্দ্র করে বড় সাইজের সফট ড্রিংকসের বিক্রি ব্যাপক বেড়ে যায়। মোট বিক্রির প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ এই সময়েই হয়।’ নাম প্রকাশ না করার শর্তে দেশের একটি শীর্ষ বেভারেজ কোম্পানির এক কর্মকর্তা বলেন, ‘দুই ঈদের সময় অন্তত ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত বেভারেজের ভোগ বেড়ে যায়। এটা পুরো ইন্ডাস্ট্রিরই একটা ট্রেন্ড। বিশেষ করে কোরবানির ঈদে ভারী খাবার বেশি খাওয়া হয় বলে মানুষ কার্বোনেটেড বেভারেজ বেশি গ্রহণ করে।’ তিনি বলেন, ‘আমাদের সংস্কৃতিতে একটা ধারণা আছে যে, ভারী খাবারের পর সফট ড্রিংকস হজমে সহায়তা করে। তবে এখন বিষয়টা শুধু হজমের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, কার্বোনেটেড বেভারেজ এখন লাইফস্টাইলের অংশ হয়ে গেছে।’ ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘দেশের সংস্কৃতিতে এখন অতিথি আপ্যায়নের সঙ্গে সফট ড্রিংকস ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে গেছে। ঈদে বাসায় অতিথি এলে খাবারের সঙ্গে বেভারেজ পরিবেশন করা এখন সাধারণ চিত্র। ফলে ঈদ এলেই কোমলপানীয়ের চাহিদা স্বাভাবিকভাবেই বেড়ে যায়।’ ঈদে ছোট দোকানেও বিক্রি হয় লাখ টাকার বেশি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গরম আবহাওয়া, মাংসভিত্তিক খাবার ও পারিবারিক আয়োজনের কারণে প্রতিবছরই কোরবানির ঈদ ঘিরে কোমলপানীয়ের বাজারে বাড়তি গতি তৈরি হয়। দোকানিরাও একই কথা বলছেন। এসময় ছোট দোকানিদের অনেকে লাখ টাকার কোমলপানীয় বিক্রি করেন। মিরপুরের শেওড়াপাড়ায় কথা হলে খুচরা দোকানি জসিম উদ্দিন বলেন, ‘দুই ঈদে কোমলপানীয়ের চাহিদা বাড়ে। এসময় আমার মতো ছোট দোকানেও লাখ টাকার সফট ড্রিংকস বিক্রি হয়। এরই মধ্যে ৬০ হাজার টাকার সফট ড্রিংকস কিনেছি। হয়তো ঈদের আগের দিনেই অর্ধেক বিক্রি হয়ে যাবে।’ ময়মনসিংহের গফরগাঁও উপজেলার মাইজবাড়ী বাজারের পাভেল স্টোরের মালিক পাভেল মিয়া বলেন, ‘ঈদের সময় গ্রামে কোমলপানীয় অনেক বেশি চলে। কোরবানির ঈদে প্রায় সব পরিবারই কেনে। আবার শহর থেকে যারা গ্রামে আসেন, আড্ডার সময়ও তারা কোমলপানীয় খান।’ এবার ঈদে তিন লাখ টাকার সফট ড্রিংকস উঠিয়েছেন জানিয়ে বলেন, ‘ঈদের পরে তিন-চারদিনের মধ্যে এসব পানীয় বিক্রি হয়ে যাবে।’ |