|
রক্তের জন্য হাহাকার
নতুন বার্তা, ঢাকা:
|
আড়াই বছরের নাজনীন রাইসা দুরারোগ্য ব্যাধি থ্যালাসেমিয়ায় ভুগছে। থ্যালাসেমিয়া সোসাইটি হাসপাতালের বিছানায় বাবার কোলে ঘুমাচ্ছে সে। রাইসার বাবা আহমদ আলী বলেন, ‘মেয়ের রক্ত সংগ্রহের জন্য বাগেরহাট থেকে প্রতি মাসে এ হাসপাতালে আসি। অন্য সময় রক্ত মিললেও রমজান মাসে রক্ত সংগ্রহ করা একটু কঠিন হয়ে পড়ে।রমজানে রক্ত সংগ্রহ কমে আসায় বিপাকে পড়েছেন থ্যালাসেমিয়াসহ দুরোরোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত সংকটাপন্ন রোগীরা। রক্তের সংকটে বিপন্ন হয়ে পড়েছে জীবন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধের কারণে কমেছে স্বেচ্ছায় রক্তদান। থ্যালাসেমিয়া রোগীদের পাশাপাশি অগ্নিদগ্ধ, কিডনিসহ জরুরি অপারেশনে রক্ত পেতেও ভোগান্তিতে পড়ছেন রোগীর স্বজন ও চিকিৎসকরা। বাংলাদেশ থ্যালাসেমিয়া সোসাইটি হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, দেশে প্রতি বছর ১৩-১৪ হাজার শিশু থ্যালাসেমিয়া নিয়ে জন্মগ্রহণ করে। দেশের জনসংখ্যার ১১ দশমিক ৪৫ শতাংশ মানুষ থ্যালাসেমিয়ার বাহক। অর্থাৎ দেশের জনসংখ্যা ১৮ কোটি হলে থ্যালাসেমিয়ার বাহক রয়েছে প্রায় ২ কোটি। নিয়মিত রক্ত পরিসঞ্চালন আর ওষুধই একজন থ্যালাসেমিয়া রোগীকে বাঁচিয়ে রাখে। থ্যালাসেমিয়া এক ধরনের রক্তরোগ; যা বংশগতভাবে প্রবাহিত হয়। থ্যালাসেমিয়া রোগীকে সারাজীবন অন্যের রক্ত নিতে হয়। একজন থ্যালাসেমিয়া রোগীর জীবন বাঁচাতে মাসে ১ থেকে ৩ ব্যাগ রক্তের প্রয়োজন হয়। দেশে এখন থ্যালাসেমিয়া রোগী ৮০ হাজারের বেশি। বাংলাদেশ থ্যালাসেমিয়া সোসাইটি হাসপাতালের নির্বাহী পরিচালক ডা. এ কে এম একরামুল হোসেন বলেন, ‘থ্যালাসেমিয়া রোগীদের বেঁচে থাকার প্রধান অবলম্বন নিরাপদ রক্ত। প্রতিদিন আমাদের থ্যালাসেমিয়া হাসপাতালে রোগীদের জন্য ৩০ থেকে ৫০ ব্যাগ রক্ত প্রয়োজন হয়। এ রক্তের ৪০ ভাগ জোগান দেন স্বেচ্ছাসেবক তরুণরা।’ তিনি আরও বলেন, ‘রমজান মাসে রক্ত সংগ্রহ অনেক কমে যায়। কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ থাকায় স্বেচ্ছায় রক্তদান কমে আসে। রোগীরা অনেক সময় স্বজনদের নিয়ে আসেন রক্ত দেওয়ার জন্য। এ ছাড়া রেড ক্রিসেন্ট, কোয়ান্টাম, পুলিশ ব্লাডব্যাংকের মতো নির্দিষ্ট কিছু ব্লাডব্যাংক থেকে রক্ত নেওয়া হয়। রোগীর বয়স এবং ওজনভেদে রক্তের প্রয়োজন হয়।’ থ্যালাসেমিয়া রোগীদের রক্ত ছাড়াও ওষুধ প্রয়োজন। এ ব্যয়বহুল চিকিৎসায় হৃদয়বান মানুষ ও প্রতিষ্ঠান অনেক সময় সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয়। রোটারি ক্লাব অব ঢাকা কারওয়ান বাজারের প্রেসিডেন্ট মাহবুবা আক্তার সংগঠনের পক্ষ থেকে হাসপাতালে রোগীদের চিকিৎসায় আর্থিক সহযোগিতা করেন। কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ট্রান্সফিউশন মেডিসিন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. আশরাফুল হক বলেন, ‘রমজান মাসে অনেকের ধারণা থাকে এ সময় রক্তের প্রয়োজন কমে যায়। কিন্তু বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। নিয়মিত অপারেশন ছাড়াও দুর্ঘটনা, প্রসূতি জটিলতা, ক্যানসার চিকিৎসা কিংবা বিভিন্ন জরুরি অবস্থায় প্রতিদিনই বহু রোগীর রক্তের প্রয়োজন হয়।’ তিনি আরও বলেন, ‘বাংলাদেশের বাস্তবতায় একটি বড় সীমাবদ্ধতা রয়েছে। দেশের অধিকাংশ হাসপাতালের নিজস্ব কোনো রক্তদাতা গ্রুপ নেই। অর্থাৎ কোনো রোগীর রক্তের প্রয়োজন হলে সেই রক্ত সংগ্রহের দায়িত্ব পুরোপুরি রোগীর স্বজনদের ওপরই বর্তায়। ফলে রমজান মাসে এ দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে তারা প্রায়ই কঠিন দুর্ভোগের মুখে পড়েন। দিনের বড় অংশ রোজা থাকায় অনেক স্বেচ্ছায় রক্তদাতা ইফতারের পর রক্ত দান করতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। কিন্তু ঠিক সেই সময়ই বড় শহরগুলোতে যানজট চরমে পৌঁছে যায়। ফলে অনেকেই রক্ত দিতে ইচ্ছুক থাকলেও সময়মতো পৌঁছাতে পারেন না। রাষ্ট্রীয়ভাবে কোনো সমন্বিত ও নির্ভরযোগ্য রক্তদাতার তালিকা নেই। ফলে যখন রোগীর স্বজনরা রক্তের সন্ধানে নামেন, তখন অনেক সময়ই তারা বিভিন্ন ধরনের হয়রানির শিকার হন।’ থ্যালাসেমিয়া রোগীদের পাশাপাশি কিডনি ডায়ালাইসিস, বিভিন্ন ধরনের অপারেশন, অগ্নিদগ্ধ মানুষের চিকিৎসায় রক্তের প্রয়োজন পড়ে। স্বেচ্ছায় রক্তদাতারা মানুষের জীবন বাঁচানোর আন্দোলনের দূত। প্রতি বছর বাংলাদেশে ৮-১০ লাখ ব্যাগ রক্তের চাহিদা রয়েছে। এর মধ্যে ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ আসে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন থেকে। বাকিটা আত্মীয়স্বজন ও পেশাদার রক্তদাতাদের মধ্য থেকে। স্বেচ্ছাসেবীদের মধ্যে একটা বড় অংশ পূরণ করে কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশন, সন্ধানী, রেড ক্রিসেন্ট, পুলিশ ব্লাডব্যাংকসহ বেসরকারি সংস্থা। রমজান মাসে বন্ধ রয়েছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। স্বেচ্ছায় রক্তদাতাদের বড় অংশ বিভিন্ন কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। এর মধ্যে রক্ত সংগ্রহে ক্যাম্পও পরিচালনা করতে পারছে না হাসপাতাল বা সংগঠনগুলো। ফলে কমে এসেছে রক্ত সংগ্রহের পরিমাণ। এর মধ্যে হাসপাতালে আহত রোগীদের জরুরি অপারেশনেও রক্ত জোগাড় করতে হচ্ছে। |