|
‘সিলেকশন’ নয়, ছাত্রদলে নতুন নেতৃত্ব পেতে ‘ইলেকশনে’ জোর
নতুন বার্তা, ঢাকা:
|
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সংসদ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) শাখায় নতুন নেতৃত্ব গঠন ঘিরে সংগঠনটির ভেতরে আলোচনা তীব্র হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে ‘সিলেকশন’ পদ্ধতিতে কমিটি গঠনের প্রচলন থাকলেও এবার কাউন্সিলের মাধ্যমে নেতৃত্ব নির্বাচনের দাবি জোরালো হয়ে উঠেছে।গত ১ মার্চ কেন্দ্রীয় কমিটির দুই বছরের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর থেকে সংগঠনের ভেতরে-বাইরে নতুন নেতৃত্ব গঠনের প্রস্তুতির বিষয়টি দৃশ্যমান হয়েছে। ১৯৭৯ সালের ১ জানুয়ারি তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ও বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান ছাত্রদল প্রতিষ্ঠা করেন। প্রতিষ্ঠার পর থেকে বিভিন্ন গণতান্ত্রিক আন্দোলনে সংগঠনটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। বিশেষত, নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে ছাত্রদলের ভূমিকা রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপকভাবে স্বীকৃত। বর্তমানে রাকিবুল ইসলাম রাকিব ও নাছির উদ্দীন নাছিরের নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় কমিটির মেয়াদ শেষ হয়েছে। একইভাবে ২০২৪ সালের ১ মার্চ গঠিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সাত সদস্যের কমিটির মেয়াদও প্রায় এক বছর আগে শেষ হয়েছে। ওই কমিটির নেতৃত্বে ছিলেন গণেশ চন্দ্র রায় সাহস ও নাহিদুজ্জামান শিপন। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি তেজগাঁও কার্যালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান রাজনৈতিক উপদেষ্টাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। সেখানে উপদেষ্টারা দলের সাংগঠনিক শক্তি বাড়াতে অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলোর পুনর্গঠন কার্যক্রম দ্রুত শুরু করার পরামর্শ দেন। দলীয় সূত্রে জানা গেছে, বৈঠকে দ্রুত পুনর্গঠন প্রক্রিয়া শুরু করার পরামর্শ দেওয়া হয়। এরপর থেকেই সম্ভাব্য পদপ্রত্যাশী নেতাদের তৎপরতা বেড়ে গেছে। ইফতার মাহফিল, শোডাউন ও বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে নিজেদের অবস্থান জানান দিচ্ছেন তারা। সংগঠনের তৃণমূল পর্যায়ের অনেক নেতাকর্মী সরাসরি ভোটের মাধ্যমে নেতৃত্ব নির্বাচনের দাবি তুলেছেন। তারা মনে করছেন, কাউন্সিলের মাধ্যমে নেতৃত্ব নির্বাচন হলে সংগঠনে গণতান্ত্রিক চর্চা বাড়বে এবং পক্ষপাতিত্বের সুযোগ কমবে। এরই মধ্যে কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে কাউন্সিলের মাধ্যমে ছাত্রদলের নেতৃত্ব নির্বাচনের নজির তৈরি হয়েছে। গত বছরের ৬ ডিসেম্বর বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং এর আগে উত্তরা বিশ্ববিদ্যালয়, শান্ত-মারিয়াম, কানাডিয়ান ও সোনারগাঁও ইউনিভার্সিটিতে কাউন্সিলের মাধ্যমে কমিটি গঠন করা হয়। দলীয় সূত্র বলছে, আসন্ন কেন্দ্রীয় কমিটিতে ২০০৯-১০ থেকে ২০১১-১২ সেশনের নেতাদের প্রাধান্য পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সভাপতি পদে ২০০৯-১০ সেশনের কয়েকজন নেতা আলোচনায়ও রয়েছেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন—কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মমিনুল ইসলাম জিসান, সাংগঠনিক সম্পাদক আমানউল্লাহ আমান, সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এস এম মাহমুদুল হাসান রনি, ফারুক হোসেন ও মোস্তাফিজুর রহমান। ২০১০–১১ সেশনের মধ্যে আলোচনায় আছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সহসভাপতি আনিসুর রহমান খন্দকার অনিক। ঢাবি শাখার সভাপতি গণেশ চন্দ্র রায় সাহসও আলোচনায় থাকলেও অতীতের কিছু বিতর্কের কারণে তিনি কিছুটা পিছিয়ে আছেন বলে জানা গেছে। অন্যদিকে, সাধারণ সম্পাদক পদে ২০১১–১২ সেশনের কয়েকজন নেতার নাম শোনা যাচ্ছে। তাদের মধ্যে রয়েছেন—মিনহাজ আহমেদ প্রিন্স, নাসির উদ্দিন শাওন, রাজু আহমেদ, গাজী সাদ্দাম হোসেন, মাহমুদ ইসলাম কাজল, তারেক হাসান মামুন ও আব্দুর রহমান রনি। তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার বর্তমান সাধারণ সম্পাদক নাহিদুজ্জামান শিপনের নতুন কমিটিতে শীর্ষ পদে আসার সম্ভাবনা কম বলে একাধিক সূত্র জানিয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ঢাবি ছাত্রদলের একজন নেতা বলেন, ‘বর্তমান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক পরবর্তী কেন্দ্রীয় কমিটিতে স্থান পাবেন কি না, তা মূলত তাদের দায়িত্বকালীন সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদলের কার্যক্রম কতটা সফল বা ব্যর্থ হয়েছে তার ওপর নির্ভর করবে। সুতরাং, এ বিষয়টি থেকেই তাদের ভবিষ্যৎ বিবেচনার মাত্রা অনেকটা অনুমান করা যায়।’ ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখাকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইউনিট হিসেবে বিবেচনা করা হয়। দলীয় সূত্র বলছে, আন্দোলন–সংগ্রামে সক্রিয় এবং বুদ্ধিবৃত্তিক রাজনীতিতে পারদর্শী নেতাদের অগ্রাধিকার দেওয়া হতে পারে। সম্ভাব্য তালিকায় ২০১৪–১৫ ও ২০১৫–১৬ সেশনের কয়েকজন নেতাও আলোচনায় রয়েছেন। ২০১৪–১৫ সেশন থেকে বিএম কাউসার ও সাইফ খানের নাম শোনা যাচ্ছে। আর ২০১৫–১৬ সেশন থেকে রয়েছেন ডাকসু নির্বাচনে ছাত্রদলের ভিপি প্রার্থী আবিদুল ইসলাম খান, মল্লিক ওয়াসি উদ্দিন তামী ও আবু হায়াত মো. জুলফিকার জিসান। ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সংসদের তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক মাহমুদ ইসলাম কাজল বলেন, ‘ফ্যাসিস্ট আমলে যারা পরীক্ষিত এবং সাংগঠনিক দক্ষতায় এগিয়ে, তাদের দিয়েই নতুন কমিটি হওয়া উচিত।’ এদিকে, বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি জানিয়েছেন, ছাত্রদলের নতুন কমিটির বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন তারেক রহমান। কেন্দ্রীয় সংসদে কী ধরনের নেতৃত্ব চায় ছাত্রদল একাধিক ছাত্রদল নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ‘হাইপ’ নয়, বরং রাজপথের আন্দোলন–সংগ্রামে পরীক্ষিত ও দীর্ঘদিন সক্রিয় থাকা কর্মীদের মধ্য থেকেই নেতৃত্ব আসা উচিত বলে মনে করছেন সংগঠনটির নেতাকর্মীরা। তাদের মতে, নতুন নেতৃত্ব নির্বাচনের ক্ষেত্রে দলের প্রতি কমিটমেন্ট, ত্যাগের মানসিকতা, মেধা, রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা এবং শিক্ষার্থীবান্ধব মনোভাবকে গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। পাশাপাশি নেতৃত্বকে ক্ষমতার কেন্দ্র হিসেবে নয়, বরং আদর্শ ও দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্র হিসেবে দেখার মানসিকতাও থাকা জরুরি বলে মনে করছেন তারা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের আপ্যায়নবিষয়ক সম্পাদক আরিফুল ইসলাম বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তৈরি হওয়া হাইপ নয়, আমরা নেতৃত্ব চাই রাজপথ থেকে ওঠে আসা কর্মীদের মধ্য থেকে। যারা দীর্ঘদিন আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় ছিল। বিশেষত (২০২৩ সালের) ২৮ অক্টোবর পরবর্তী হরতাল-অবরোধ কর্মসূচি এবং জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে সামনের সারিতে ভূমিকা রেখেছে। ‘পাশাপাশি যারা যুগোপযোগী রাজনীতির সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিয়েছে, মেধাবী, দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার অধিকারী এবং ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়েও যাদের চারিত্রিক ও নৈতিক অবক্ষয় ঘটেনি—এমন নেতাকেই আমরা ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে দেখতে চাই’—বলেন তিনি। জানতে চাইলে বিজয় একাত্তর হল ছাত্রদলের সদস্যসচিব সাকিব বিশ্বাস বলেন, ছাত্র রাজনীতিতে নতুন নেতৃত্ব বাছাইয়ের ক্ষেত্রে দলের প্রতি কমিটমেন্ট, ত্যাগের মানসিকতা ও নেতৃত্বগুণকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। যারা শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সম্পৃক্ত, শিক্ষার্থীবান্ধব এবং অতীতে শিক্ষার্থীদের নৈতিক ও গঠনমূলক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় ছিলেন, তারাই নেতৃত্বের যোগ্য। ‘নেতৃত্বকে ক্ষমতার কেন্দ্র নয়, বরং দায়িত্ব ও আদর্শচর্চার ক্ষেত্র হিসেবে দেখতে হবে। পাশাপাশি দলীয় নেতাকর্মী ও অন্যান্য প্রগতিশীল ছাত্রসংগঠনের সঙ্গে সৌহার্দ্যপূর্ণ ও সহনশীল সম্পর্ক বজায় রাখার মানসিকতা থাকাও জরুরি’—যোগ করেন এই ছাত্রদল নেতা। জানতে চাইলে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দীন নাছির বলেছেন, ‘নতুন কমিটির বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানানো হয়নি। আমাদের সাংগঠনিক অভিভাবক দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান যখন সিদ্ধান্ত দেবেন, তখনই নতুন নেতৃত্ব ঘোষণা করা হবে।’ |