|
রোজা যেভাবে ইসলামের পাঁচ ফরজের একটি হয়ে উঠল
নতুন বার্তা, ঢাকা:
|
ইসলাম ধর্মের পাঁচটি স্তম্ভের একটি হলো রোজা। ঈমান, নামাজ, যাকাত ও হজের পাশাপাশি রমজানের রোজা মুসলমানদের জন্য ফরজ ইবাদত। তবে শুরু থেকেই রমজানের ৩০ দিনের রোজা বাধ্যতামূলক ছিল না। ইতিহাস বলছে, ধাপে ধাপেই ইসলামে রোজা ফরজ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।মক্কা-মদিনায় আগের রোজার চর্চা রোজা ফরজ হওয়ার আগে আরব সমাজে বিভিন্নভাবে রোজার প্রচলন ছিল। কেউ আশুরার দিনে রোজা রাখতেন, কেউ আবার চান্দ্র মাসের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখে, যা ‘আইয়ামুল বিজ’ নামে পরিচিত। কুরআনের যে আয়াত দিয়ে রোজা ফরজ করা হয়েছে সেখানে উল্লেখ আছে পূর্ববর্তী জাতিসমূহের ওপরও রোজা ফরজ ছিল। অর্থাৎ বিভিন্ন জাতির মধ্যে আগে থেকেই রোজার বিধান প্রচলিত ছিল, যদিও তার ধরন ভিন্ন ছিল। পূর্ববর্তী নবীদের ওপর রোজা ফরজ থাকলেও তা একমাসব্যাপী ছিল না। হযরত মুহাম্মদ (সা.) মক্কায় অবস্থানকালে প্রতি চান্দ্র মাসে তিন দিন করে সিয়াম সাধনা করতেন যা বছরে মোট ৩৬ দিন হয়। ইতিহাসে উল্লেখ আছে, নবী আদম (আ.)-এর সময় মাসে তিন দিন রোজা রাখা হতো। নবী দাউদ (আ.) একদিন পরপর রোজা রাখতেন। নবী মুসা (আ.) তুর পাহাড়ে প্রথমে ৩০ দিন, পরে আরো ১০ দিন মিলিয়ে মোট ৪০ দিন রোজা রেখেছিলেন। আশুরা থেকে রমজান মদিনায় হিজরতের পর নবী মুহাম্মদ (সা.) দেখেন, ইহুদি সম্প্রদায় আশুরার দিনে রোজা রাখছে। জানতে চাইলে তারা বলেন, এই দিনে আল্লাহ মুসা (আ.)-কে ফেরাউনের কবল থেকে মুক্তি দিয়েছিলেন। তখন নবী (সা.) বলেন, মুসার বিষয়ে তোমাদের চেয়ে আমরা অধিক হকদার। এরপর তিনি নিজেও আশুরার রোজা রাখেন এবং সাহাবীদের রাখতে বলেন। তবে তখনও রমজানের একমাস রোজা ফরজ হয়নি। নবী (সা.) নিজে নফল হিসেবে আইয়ামুল বিজ—চান্দ্র মাসের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখে রোজা রাখতেন। হিজরি দ্বিতীয় বর্ষে রোজা ফরজ হিজরি দ্বিতীয় বর্ষে রমজান মাসে কুরআনের আয়াত নাজিলের মাধ্যমে মুসলমানদের জন্য রোজা বাধ্যতামূলক করা হয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি কোনও নির্দিষ্ট ঘটনার কারণে নয়; বরং ইসলামের শরিয়াহভিত্তিক বিধানসমূহের অংশ হিসেবেই রোজা ফরজ করা হয়। মক্কায় নাজিল হওয়া আয়াতগুলোতে আকিদা ও তাওহিদের ওপর গুরুত্ব দেয়া হয়েছিল। আর মদিনায় নাজিল হওয়া আয়াতগুলোতে সামাজিক ও ধর্মীয় বিধিবিধান নির্ধারণ করা হয়। রোজা সেই মদিনাকালীন বিধানের অন্যতম। রোজার বিধানে ধাপে ধাপে পরিবর্তন শুরুতে রোজার বিধান ছিল তুলনামূলক সহজ। কেউ অসুবিধা বোধ করলে ফিদইয়া (প্রতিটি রোজার বিনিময়ে গরিবকে খাদ্য বা তার মূল্য প্রদান) দিয়ে অব্যাহতি নিতে পারতেন। পরে তা রহিত করে সক্ষম সকলের জন্য রোজা বাধ্যতামূলক করা হয়। প্রথমদিকে নিয়ম ছিল— সন্ধ্যা থেকে এশার আজান পর্যন্ত খাওয়া-দাওয়া করা যাবে। এশার পর থেকে পরদিন সন্ধ্যা পর্যন্ত আর কিছু খাওয়া যেত না। এতে অনেক সাহাবীর কষ্ট হচ্ছিল। পরে আয়াত নাজিল হয়ে সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত রোজার সময় নির্ধারণ করা হয়। এই বিধানই চূড়ান্ত রূপ পায়। সেহরি-ইফতারের খাবার ইতিহাসবিদদের মতে, সে সময় আরব অঞ্চলে সেহরি ও ইফতারে সাধারণত খেজুর, পানি, উট বা দুম্বার দুধ এবং মাংস খাওয়া হতো। সহজ ও স্বল্প উপকরণের মধ্য দিয়েই রোজার পালন শুরু হয়েছিল। পাঁচ স্তম্ভের একটি আজ রমজানের রোজা ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের একটি। ঈমান, নামাজ, যাকাত ও হজের সঙ্গে রোজা মুসলমানদের জন্য ফরজ ইবাদত হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে হিজরি দ্বিতীয় বর্ষ থেকে। তারপর থেকে প্রায় দেড় হাজার বছর ধরে বিশ্বজুড়ে একই বিধান অনুসরণ করে রোজা পালন করছেন মুসলমানরা। ধাপে ধাপে বিধান প্রণয়ন এবং চূড়ান্ত রূপ লাভের মধ্য দিয়ে রোজা ইসলামের অবিচ্ছেদ্য অনুষঙ্গ হয়ে উঠেছে। |