|
তদারকিতে গিয়ে একই সড়ক দুইবার উদ্বোধন চাঁপাইনবাবগঞ্জের দুই সাংসদের, এলাকাবাসীর ক্ষোভ
চাঁপাইনবাবগঞ্জ প্রতিনিধি ঃ
|
সীমান্তবর্তী একটি সড়ক একই দিনে দুইবার উদ্বোধনের ঘটনা ঘটেছে চাঁপাইনবাবগঞ্জে। সড়কটির নির্মাণ কাজ সকালে উদ্বোধন করেছেন চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ সদর আসনের বর্তমান এমপি মো. নূরুল ইসলাম বুলবুল এবং বিকেলে পুনরায় তা উদ্বোধন করেছেন একই আসনের সাবেক এমপি ও জেলা পরিষদের প্রশাসক মো. হারুনুর রশিদ। এ নিয়ে শুরু হয়েছে তীব্র সমালোচনা। রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের জের ধরেই এমন পাল্টাপাল্টি উদ্বোধনের ঘটনা ঘটেছে বলে জানান স্থানীয়রা। তবে এলজিইডি বলছে, কোনটিই আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন নয়। তারা উভয়েই পৃথক সময়ে ওই স্থানে তদারকিতে গিয়েছিলেন।জানা যায়, চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার চরবাগডাঙ্গা ইউনিয়নের বাখের আলী বিওপি ক্যাম্প থেকে ফরিদপুর বিওপি ক্যাম্প পর্যন্ত সড়ক নির্মাণের কাজ শুরু করেছে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর-এলজিইডি। ৩ কিলোমিটার ৫ শত ৫০ মিটার সড়ক নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে ৩ কোটি ৯৪ লক্ষ ৪০ হাজার ৫ শত ৩১ টাকা। এই সড়ক নির্মাণ হলে সীমান্তবর্তী এলাকায় বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ-বিজিবির টহল ও সীমান্তে নজরদারিতে সুবিধার পাশাপাশি পদ্মা নদী তীরবর্তী সীমান্তবর্তী এলাকার মানুষের যাতায়াত আরো সহজ ও সুন্দর হবে। এদিকে, সড়ক নির্মানের এই কাজ কয়েকদিন আগে থেকে শুরু হলেও রোববার (১ নভেম্বর) সকালে সড়কটি তদারকিতে গিয়ে নির্মাণ কাজের উদ্বোধন করেন, চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ সদর আসনের বর্তমান সংসদ সদস্য ও ঢাকা দক্ষিণ মহানগর জামায়াতের আমীর নুরুল ইসলাম বুলবুল। তবে একই দিন বিকেলে একই সড়কটির তদারকিতে গিয়েে এর নির্মাণ কাজের উদ্বোধন করেন, একই আসনে বিএনপির সাবেক এমপি, বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা ও জেলা পরিষদের প্রশাসক মো. হারুনুর রশীদ। সকাল ও বিকেলে উদ্বোধনের সময় অনুষ্ঠিত পৃথক আলোচনা সভায় এনিয়ে পাল্টাপাল্টি একে-অপরের প্রতি সমালোচনা করতে দেখা যায়, বর্তমান ও সাবেক এমপিকে। তবে বর্তমান বা সাবেক এমপি উদ্বোধন করলেও কোনটিই আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন নয় বলছেন এলজিইডির কর্মকর্তারা। এমনকি সাবেক ও বর্তমান এমপি উদ্বোধন দাবি করলেও সড়কটির নির্মাণকাজ প্রায় দুই সপ্তাহ আগেই শুরু হয়েছে বলে জানা গেছে। সকালে বর্তমান এমপি বুলবুল কোদাল দিয়ে মাটি খননের মাধ্যমে এই সড়কের কাজের উদ্বোধনের সময় স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের নামসহ ব্যানার থাকলেও বিকেলে সাবেক এমপি ও বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা হারুনুর রশীদ উদ্বোধন করার সময় কোন ব্যানার ছিল না এবং তিনি ফিতা কেটে উদ্বোধন করেন এই কাজের। তবে এলজিইডির কর্মকর্তা ও ঠিকাদাররা উভয় সময়েই উপস্থিত ছিলেন। এ নিয়ে উদ্বোধন শেষে মতবিনিময় সভায় চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য ও ঢাকা দক্ষিণ মহানগর জামায়াতের আমীর নুরুল ইসলাম বুলবুল বলেন, ‘চাঁপাইনবাবগঞ্জের সকল ভালো কাজের উদ্বোধনে আপনি (হারুনুর রশীদ) যদি আমার সাথে থাকতে চান, ওয়েলকাম, আপনি থাকবেন আমার সাথে। কারণ আমি সহযোগিতা ও সহমর্মিতার সাথে সকলকে সাথে নিয়ে জেলাকে এগিয়ে নিতে চাই। সুতরাং, আমি যেই কাজ উদ্বোধন করব, আপনি আমার সাথে থাকেন কোনো অসুবিধা নাই। আপনি জেলা পরিষদের প্রশাসক, সেই বরাদ্দ নিয়ে থাকেন। আপনার যে বরাদ্দ আসবে, কী বাজেট আসছে আপনি কোন খাতে খরচ করছেন এবং করবেন, সেটিও জেলা পরিষদের উপদেষ্টা হিসেবে খোঁজ-খবর নেয়ার দায়িত্ব একজন এমপির আছে। এটি শুধু আমার একার নয়, সারা বাংলাদেশের সকল এমপির আছে। সুতরাং আপনার তদারকি করা আমার দায়িত্ব। কিন্তু আমার কোনো কাজের তদারকি আপনার দায়িত্বের মধ্যে পড়েনা।’ তিনি আরও বলেন, ‘আগামী ৫ বছরে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর আসনে যা কাজ হবে, তার সব কাজের দায়িত্ব হচ্ছে এমপির। যেটা এমপির কাজ, এমপিকে করতে দিবেন। ৬২ হাজার ৬১৯ ভোট বেশি পেয়ে আমি নির্বাচিত হয়েছি, এতগুলো মানুষ আমাকে আপনার থেকে বেশি সমর্থন দিয়েছে। আপনার ভোট আপনি কিভাবে পেয়েছেন, সেটি জনগণ জানে। জনগণের কোনো অধিকার নিয়ে আপনি (সাবেক এমপি ও বিএনপি নেতা হারুনুর রশীদ) হউন আর যেই হউন ছিনিমিনি খেললে জনগণকে সাথে নিয়ে তা প্রতিহত করব। এখানে এলজিইডির কাজ হবে, আর আপনি উদ্বোধন করবেন। আমার কাজ, আর আপনি উদ্বোধন করবেন। এই এখতিয়ার আপনাকে কে দিয়েছে, জনগণ দেয়নি।’ একই সড়ক বারবার উদ্বোধনের কারন জানতে চাইলে মুঠোফোনে চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ সদর আসনের সাবেক এমপি ও বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা এবং জেলা পরিষদের প্রশাসক হারুনুর রশিদ বলেন, ‘এনিয়ে এমপি বুলবুলকে প্রশ্ন করুন। তিনিই বলতে পারবেন। আমি নিজে এসব রাস্তা-ঘাটের বরাদ্দ নিয়ে আসছি, আর তিনি (এমপি বুলবুল) গিয়ে উদ্বোধন করছেন। বরাদ্দ-প্রকল্প আমি নিয়ে আসছি, আর ব্যানার টাঙ্গিয়ে উদ্বোধন বললেই হলো? এত ছ্যাচড়ামি করার কোন দরকার নাই। একজন এমপির প্রটোকল তাকে বুঝতে হবে। বরাদ্দ নিয়ে আসার সুবাদে আমি সাবেক এমপি ও জেলা পরিষদের প্রশাসক হিসেবে পরিদর্শন বা উদ্বোধন করতেই পারি।’ এদিকে, উদ্বোধন পরবর্তী আলোচনা সভায় সাবেক এমপি ও বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা হারুনুর রশীদ বলেন, ‘আমাদের নতুন এমপিকে (নুরুল ইসলাম বুলবুল) বলব, বহু কাঁচা রাস্তা আছে ভাই, তুমি টাকা বরাদ্দ নিয়ে এসে কাজ করো, তোমার বরাদ্দ আনার ক্ষমতা আমরা দেখতে চাই। মানুষ চাই, এখানে আরও কাজ হোক, উন্নয়ন হোক, কোন অসুবিধা নাই। কথাবার্তা বলার সময় খুব সাবধানে বলবা, উল্টাপাল্টা কথা বললে, জনগণ কিন্তু সে ব্যাপারেও ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। এরকম ছ্যাঁচড়া এমপি আমি দেখিনি। এত ছ্যাঁচড়া এমপি বাংলাদেশে আর কোথাও আছে কি না আমার জানা নেই। সড়কটি আমার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির অংশ ছিল, বাস্তবায়নেও আমার অনেক সহযোগিতা ছিল।’ সড়ক নির্মাণের ঠিকাদার মো. সেলিম রেজা বলেন, ‘বর্তমান ও সাবেক এমপি উদ্বোধনের দুই সময়ই আমি উপস্থিত ছিলাম। এনিয়ে আমাদের তেমন কোন কার্যক্রম নেই। উদ্বোধন ছাড়াও সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের প্রতিনিধি পরিদর্শনে আসলে, আমাদেরকে থাকতেই হয়। সেই সুবাদেই আমার থাকা।’ এনিয়ে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করলেও ফোন রিসিভ করেননি স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর-এলজিইডি চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. হারুন অর রশীদ। তবে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলা এলজিইডির প্রকৌশলী মো. আজহারুল ইসলাম জানান, এলজিইডির পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হয়নি। এটি হলে আমরা ফলক বসাতাম। কিন্তু তা করা হয়নি। বর্তমান ও সাবেক এমপি দুজনই তদারকির কাজে গিয়েছিলেন। সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের প্রতিনিধিরা পরিদর্শন বা তদারকিতে গেলে আমাদের সেখানে উপস্থিত থাকতেই হয়। চলতি বছরের ডিসেম্বরই প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হবে বলেও জানান তিনি। |