|
স্বাস্থ্যসেবার বৈষম্য: ভিআইপি সংস্কৃতি ও সাধারণ মানুষের অধিকার
কাজী মোহাম্মদ হাসিবুল হক:
|
একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মূল ভিত্তি হলো সমতা, ন্যায়বিচার এবং প্রতিটি নাগরিকের মৌলিক অধিকারের সমান সুরক্ষা। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় হলো, বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের দীর্ঘদিনের কাঠামোগত অসংগতি এবং বৈষম্যমূলক চর্চা আজ এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে সংবিধানের মূল স্পিরিট চরমভাবে লঙ্ঘিত হচ্ছে। “রোগ সবার জন্যই সমান”-এই সর্বজনীন সত্যটিকে পাশ কাটিয়ে স্বাস্থ্যসেবায় যে ‘ভিআইপি সংস্কৃতি’ শিকড় গেড়েছে, তা সাধারণ মানুষের মৌলিক অধিকারের পরিপন্থীই এবং মানবমর্যাদার ওপর এক নির্মম আঘাত।আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এবং টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDG-3)-এর মূল বার্তা হলো সার্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা (Universal Health Coverage - UHC), যেখানে আর্থিক বা সামাজিক অবস্থান নির্বিশেষে প্রতিটি মানুষ তার প্রয়োজনীয় মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার অধিকার রাখে। উন্নত বিশ্ব কিংবা অনেক উন্নয়নশীল দেশেও স্বাস্থ্যসেবাকে জরুরি মানবিক প্রয়োজন হিসেবে দেখা হয়, যেখানে ট্রায়াজ সিস্টেম (Emergency Triage System)-এর মাধ্যমে রোগীর শারীরিক ঝুঁকির তীব্রতাকেই অগ্রাধিকার দেওয়া হয়, কোনো সামাজিক বা রাজনৈতিক পদমর্যাদাকে নয়। অথচ আমাদের দেশে এর চিত্র সম্পূর্ণ উল্টো। বাংলাদেশে সাধারণ মানুষ যখন সরকারি হাসপাতালের বারান্দায়, মেঝেতে কিংবা জরুরি বিভাগে জীবন বাঁচাতে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে হাহাকার করে, তখন প্রভাবশালী বা ভিআইপি ব্যক্তিদের সামান্য অসুস্থতার জন্য বিশেষ মেডিকেল বোর্ড গঠন এবং শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কেবিনে সার্বক্ষণিক চিকিৎসাসেবার ব্যবস্থা করা হয়। বাংলাদেশ স্বাস্থ্য বুলেটিন এবং বিভিন্ন জনস্বাস্থ্য গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, সরকারি স্বাস্থ্য খাতের সিংহভাগ সম্পদ ও সুযোগ-সুবিধা যখন একটি বিশেষ শ্রেণির পেছনে ব্যয় হয়, তখন প্রান্তিক ও সাধারণ রোগীরা বঞ্চিত হন তাদের প্রাপ্য ন্যূনতম চিকিৎসাসেবা থেকে। হাসপাতালগুলোর অভ্যন্তরীণ চিত্র আরও উদ্বেগজনক। সরকারি হাসপাতালে ট্রলি বা হুইলচেয়ার ব্যবহারের জন্য অর্থ দাবি করা, দালাল চক্রের দৌরাত্ম্য, এবং প্রেসক্রিপশনে সুনির্দিষ্ট কোম্পানির উচ্চমূল্যের ওষুধ বা ডায়াগনস্টিক টেস্টের কৃত্রিম সংকট তৈরি-এসব অনিয়ম আজ প্রাতিষ্ঠানিক রূপ ধারণ করেছে। এর পাশাপাশি, অপর্যাপ্ত বাজেট, জনবল সংকট, সীমিত অবকাঠামো এবং হাসপাতালে পর্যাপ্ত নিরাপত্তার অভাবে প্রতিদিন দেশের নিবেদিতপ্রাণ চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরাও চরম পেশাগত চাপের মুখোমুখি হচ্ছেন। ফলে একদিকে সাধারণ রোগীরা যেমন সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন, অন্যদিকে পুরো স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা তলানিতে গিয়ে ঠেকছে। স্বাস্থ্য খাতের এই বৈষম্যের পেছনে রয়েছে নীতি প্রণয়ন ও তার মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়নের বিশাল ব্যবধান। আমাদের দেশে স্বাস্থ্যনীতি এবং বিভিন্ন বিধিমালা থাকলেও মনিটরিং ও জবাবদিহিতার ঘাটতির কারণে তা কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয় না। বিশ্বব্যাংক ও বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (BBS)-এর স্বাস্থ্য অর্থনীতিসংক্রান্ত উপাত্ত ইঙ্গিত দেয় যে, বাংলাদেশে মোট স্বাস্থ্য ব্যয়ের একটি বড় অংশই হলো পকেট থেকে খরচ বা আউট-অফ-পকেট এক্সপেন্ডিচার, যা সাধারণ পরিবারগুলোকে প্রায়শই দারিদ্র্যের মুখে ঠেলে দেয়। প্রভাবশালীকরণের এই সংস্কৃতি বজায় থাকলে স্বাস্থ্য খাতের অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষত আরও গভীর হবে। বর্তমান পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে এর পরিণতি হবে সুদূর প্রসারী ও মারাত্মক। এটি একদিকে যেমন সামাজিক অসন্তোষ বাড়াবে, অন্যদিকে দেশের মানবসম্পদ উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক উৎপাদনশীলতাকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করবে। একটি অসুস্থ জাতি কখনো টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে পারে না। এই কাঠামোগত বৈষম্য থেকে বেরিয়ে আসার সময় এখনই। প্রথমত, চিকিৎসালয়গুলোতে ভিআইপি সংস্কৃতি সম্পূর্ণ পরিহার করে সম্পূর্ণভাবে ক্লিনিক্যাল নিডের ভিত্তিতে জরুরি সেবা নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ‘ইমার্জেন্সি ট্রায়াজ সিস্টেম’ কঠোরভাবে বাধ্যতামূলক করতে হবে, যাতে ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে রোগীর অবস্থা অনুযায়ী সেবা দেওয়া হয়। তৃতীয়ত, হাসপাতালগুলোর অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি, দালাল চক্র এবং অব্যবস্থাপনা রোধে কঠোর প্রশাসনিক মনিটরিং ও জবাবদিহিতা সেল গঠন করতে হবে। চতুর্থত, স্বাস্থ্য খাতে বাজেট বরাদ্দ বাড়িয়ে সাধারণ মানুষের জন্য বিনামূল্যে বা সুলভে ওষুধ এবং ডায়াগনস্টিক সেবা নিশ্চিত করা। সংবিধানের আলোকে স্বাস্থ্যসেবা প্রতিটি নাগরিকের জন্মগত অধিকার। রোগ ধনী ও গরিবের ভেদাভেদ বোঝে না, রাষ্ট্রকেও এই বাস্তব সত্য অনুধাবন করে স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে সব নাগরিকের জন্য সমান ও মানবিক করে তুলতে হবে। কাজী মোহাম্মদ হাসিবুল হকঃ জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশকর্মী |