|
সমস্যার মূলে সরাসরি ক্রয়নীতির প্রভাবঃ ‘নিষেধাজ্ঞার’ এলএনজি কার্গো আমদানির অনুমোদন
নতুন বার্তা, ঢাকা:
|
সরাসরি ক্রয়নীতির আওতায় (ডিপিএম) অনুমোদিত ৬টি এলএনজি কার্গোর একটিও এখনো বাংলাদেশে আসেনি। বরং তদবিরের কার্গো কিনতে গিয়ে সারা দেশে গ্যাসের সংকট আরও দীর্ঘায়িত হয়েছে। রাজনৈতিক তদবিরের কারণে এমনটি হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।জানা যায়, জ্বালানি বিভাগের সুপারিশ অনুযায়ী অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি আন্তর্জাতিক বাজারের চেয়ে প্রতি ইউনিট ১-৮ ডলার কম মূল্য পাওয়া যাবে-এমন প্রস্তাবে ডিপিএম-এ ১৫টি কোম্পানিকে ২৫টি কার্গোর অনুমোদন দেয়। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের হার্ডওয়্যার ব্যবসায়ী, অনভিজ্ঞ ও অখ্যাত কোম্পানি এবং সাধারণ ট্রেডারদেরও কার্গো সরবরাহের জন্য অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে; যা নিয়ে তৈরি হয়েছে প্রশ্ন। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ডিপিএম-এর সুযোগে আন্তর্জাতিকভাবে চলাচলে নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা একটি এলএনজি কার্গো বাংলাদেশকে গছিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। তারপরও ডিপিএম-এর মাধ্যমেই এলএনজি ক্রয় করতে আগ্রহী জ্বালানি বিভাগ। যদিও জ্বালানি বিভাগ কাগজে-কলমে বলছে, রাষ্ট্রীয় জরুরি প্রয়োজন ও জনস্বার্থে সরাসরি ক্রয়নীতিতে এই কার্গোগুলো কেনা হচ্ছে। পেট্রোবাংলার ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আব্দুল মান্নান এ ব্যাপারে যুগান্তরকে বলেন, স্পট মার্কেটে এলএনজির দাম আকাশচুম্বী। এখন ডিপিএম-এ যদি সস্তায় পাওয়া যায়, সেই চেষ্টা করা হচ্ছে। ডিপিএম-এর কার্গো তো আসছে না, এর ফলে গ্যাস সংকট বাড়ছে-এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ডিপিএম-এর কার্গো ছাড়াও আরও কয়েকটি কারণে এবার গ্যাস সংকট বড় আকার ধারণ করেছে। সারা দেশে এক মাসের বেশি ভয়াবহ গ্যাস সংকট চলছে। এতে দেশের শিল্পকারখানায় উৎপাদন চরমভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। কিছু শিল্পকারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। পাশাপশি বাসাবাড়িতেও গ্যাসের সংকট প্রকট। সংশ্লিষ্টরা জানান, গ্যাস সংকট দীর্ঘায়িত হওয়ার অন্যতম কারণ সরাসরি ক্রয়নীতির আওতায় এলএনজি কার্গো ক্রয়ের অনুমোদন। ১৭, ২৩, ২৬ ও ২৯ আগস্ট ডিপিএম-এর কার্গো বাংলাদেশে সরবরাহ করার কথা। কিন্তু সেগুলো আসছে না। এর পরিবর্তে স্পট মার্কেট থেকে টেন্ডার করে চারটি কার্গো আনার চেষ্টা করা হয়। তবে দুটি কার্গো পাওয়া গেলেও ২৯ আগস্টের কার্গো পাওয়া যায়নি। এর ফলে মাসজুড়ে গ্যাস সংকট থাকছেই। অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটিতে অনুমোদিত ১৫টি কোম্পানির মধ্যে ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটিতে অনুমোদিত হয় তিনটি কোম্পানির ৬টি কার্গো। এর মধ্যে হংকংভিত্তিক কোম্পানি জেন হু শিপিংয়ের কার্গো ১৭ আগস্ট আসেনি। ২৩ আগস্টের প্রতিশ্রুত কার্গোও আসছে না। ২৬ ও ২৯ আগস্টের প্রতিশ্রুত কার্গোও আসবে না বলে জানা গেছে। এ কারণে সমস্যায় পড়তে হচ্ছে পেট্রোবাংলাকে। প্রথমত, নির্দিষ্ট তারিখে কার্গো না এলে হঠাৎ স্পটে টেন্ডার ডেকে এলএনজি আমদানি করলে ব্যয় বেড়ে যায়। সরকার গত সপ্তাহে এমন একটি কার্গো প্রতি ইউনিট ২২ ডলারের এলএনজি কিনেছে ২৪ ডলারে। অনেক সময় স্পটে টেন্ডার ডেকেও কোনো কার্গো পাওয়া যায়নি। এতে দেশের দুটি এলএনজি টার্মিনালের (এফএসআরইউ) মধ্যে একটি খালি থাকছে। এতে সারা দেশে গ্যাসের সংকট। জানা যায়, ৬ সেপ্টেম্বর ব্লাক কিউব এবং ১০ সেপ্টেম্বর ম্যাক্সওয়েল নামে দুটি কোম্পানির কাছ থেকে দুটি কার্গো আমদানি করার শিডিউল দিয়েছে পেট্রোবাংলা। এদিকে সবচেয়ে বড় বিপদ হচ্ছে সরাসরি কার্গো কিনতে গিয়ে মার্কিন নিষেধাজ্ঞার জাহাজ বা কার্গো দেশে ঢুকে পড়তে পারে। গত সপ্তাহে এমন একটি ঘটনাও ঘটেছে। হংকংভিত্তিক কোম্পানির জেন হু শিপিং কুংপেং নামে একটি কার্গোতে (নির্মাণ ২০০৩ সালে) এলএনজি পাঠাতে কাগজপত্র সরবরাহ করে। ২৬ আগস্ট এটি আসার কথা ছিল। পরে দেখা যায়, সেই কার্গো (আইএমও নম্বর ৯২৪৭১৯৪) মার্কিন এবং অন্যান্য দেশের নিষেধাজ্ঞাপ্রাপ্ত। কার্গোটি মার্চ থেকে চীনের একটি উপকূলে ভাসছে। মূলত রাশিয়ার এলএনজি পরিবহণের কারণে এই জাহাজকে নিষেধাজ্ঞার তালিকাভুক্ত করা হয়। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতি ইউনিট এলএনজি ২২ ডলারের বেশি হলেও এই কোম্পানি মাত্র ১৪ দশমিক ৯৫ ডলারে এলএনজি বিক্রির প্রস্তাব করে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী নিষেধাজ্ঞার কোনো কার্গোর গ্যাস কিনতে পারবে না বাংলাদেশ। কার্গো সরবরাহে কারা আগ্রহী : সরকারের অনুমোদন পাওয়া যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ডারাব ইন্টারন্যাশনাল অন্যতম একটি কোম্পানি। এই কোম্পানির হার্ডওয়্যার দোকানের ব্যবসার অভিজ্ঞতা আছে। এর ঠিকানা দেখানো আছে ৩৫০১ ৩০ এভিনিউ, এস্টারিয়া, নিউইয়ার্ক। অপর যে তিনটি কোম্পানিকে ৬টি কার্গো এলএনজি আমদানির অনুমোদন দেওয়া হয় তার মধ্যে আরেকটি ব্লাক কিউব ইন্টারন্যাশনাল। এটি খোলা হয়েছে ২০২৫ সালের ৩ এপ্রিল। এ কোম্পানি ১৫ দশমিক ৫০ ডলারে এলএনজি সরবরাহের প্রস্তাব দিয়েছে। ব্রিটিশ নাগরিক মাশরুর হায়দার এই কোম্পানির মালিক। ব্যবসায় এ খাতে তার কোনো পূর্ব-অভিজ্ঞতা নেই। ৯ আগস্ট অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রন্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে ডিপিএম-এ ৭টি কোম্পানির কাছ থেকে ১৪টি এলএনজি কার্গো ক্রয়ের প্রস্তাব অনুমোদন হয়। এ ৭টি কোম্পানির একটি হচ্ছে ওমানের ট্রান্স গাল্ফ এনার্জি এলএলসি। এটি প্রতিষ্ঠিত হয় ২০১৯ সালে। মূলত এটি ট্রেডিং হাউজ। এর স্বত্বাধিকারী শেখ সাইদ আহমেদ আল সারফায়ী। ওমানের অভ্যন্তরে বিভিন্ন পণ্যের ব্যবসা করেন তিনি। অন্যদিকে সিঙ্গাপুরের আইসবার্গ এনার্জিকে দুটি কার্গো আনার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। ২০২২ সালে প্রতিষ্ঠিত এই কোম্পানি মিয়ানমারের সঙ্গে বিভিন্ন পণ্য রপ্তানির রেকর্ড আছে। তবে কোম্পানিটির বিরুদ্ধে ট্যাক্স ফাঁকিসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে সিঙ্গাপুরের আদালতে মামলা চলমান। কার্গো সরবরাহের জন্য চায়না গ্লানকোর মাইনিং ইন্ডাট্রি গ্রুপ লিমিটেড নামে একটি কোম্পানিকেও অনুমোদন দেওয়া হয়। গুগলে সার্চ দিয়ে এই কোম্পানির কোনো অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। মাউন্ডমিনগাল এলএলসি নামে একটি কোম্পানিও দুটি কার্গোর অনুমোদন পেয়েছে। এটি মূলত একটি ট্রেডিং হাউজ। এলএনজি সরবরাহের কোনো অভিজ্ঞতা নেই। চায়নারন নামে একটি প্রতিষ্ঠানের এলএনজি বিক্রির প্রস্তাবও অনুমোদন করা হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত ঘেঁটে এটিরও কোনো অস্তিত্ব খুঁজে পাননি। ট্যাংকার ট্রান্স ওয়েল ট্রেডিং নামে একটি কোম্পানিও আছে ওই ৭ কোম্পানির তালিকায়। এটি একটি ট্রেডিং হাউজ। এলএনজি সরবরাহের কোনো অভিজ্ঞতা এটির নেই। অপরদিকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের কোম্পানি এবং ট্রেডিং হাউজ ব্লক সুয়াম গ্লোবাল এফজেসিও নামে একটি কোম্পানিকেও দুটি কোর্গোর জন্য অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। যদিও তেল গ্যাস অনুসন্ধান সংক্রান্ত ব্যবসা করছে এই কোম্পানি। জ্বালানি বিভাগ এসব প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে বলছে, রাষ্ট্রীয় প্রয়োজন ও জনস্বার্থে জরুরি উদ্যোগ নিতে হয়েছে। এজন্য পাবলিক প্রকিউরমেন্ট আইন ২০০৬-এর ধারা ৬৮(১) এবং পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালা ২০২৫-এর বিধি ৯৭,৯৮(৩), ৯৯(১)-এর (ঠ) (ড), ৯৯ (২) ও ১০৭ অনুযায়ী আন্তর্জাতিক ক্রয়ে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়েছে। পেট্রোবাংলা সে আলোকেই ওই ৭ কোম্পানির ১৪টি কার্গো এলএনজি ক্রয়ের প্রস্তাব মন্ত্রিসভায় উত্থাপন করেছে। দেশে গ্যাসের চাহিদা মেটাতে প্রতিবছর ১১৪ থেকে ১১৫টি কার্গো এলএনজি আমদানি করা হয়। এতদিন দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় কাতার ও ওমান থেকে কার্গো এলএনজি আমদানি করা হলেও গত ফেব্রুয়ারিতে মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের কারণে তারা বাংলাদেশকে এলএনজি দিচ্ছে না। এখন স্পট মার্কেট থেকে আমদানি করে চাহিদা মেটানোর চেষ্টা করছে পেট্রোবাংলা। মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের কারণে প্রতি কার্গো এলএনজির আমদানি ব্যয় প্রায় ৯৭০ কোটি টাকা। অভিযোগ রয়েছে, স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি সরবরাহ দেওয়া কোম্পানির তালিকা সীমিত। একটি সিন্ডিকেট বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের এ ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করছে। তবে সেই সিন্ডিকেটের বাইরে বর্তমান সরকার প্রকৃত সরবরাহকারীকে এখনো এলএনজি আমদানির কাজ দিতে পারেনি। |