|
দুর্নীতি প্রতিরোধে প্রয়োজন সম্মিলিত প্রচেষ্টা
লায়ন মোঃ গনি মিয়া বাবুল:
|
উন্নয়ন, সুশাসন, মানবাধিকার ও শক্তিশালী গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পথে দুর্নীতি সবচেয়ে বড় এবং অন্যতম প্রধান অন্তরায়। দুর্নীতি শুধু ঘুষ, অর্থ আত্মসাৎ কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি, প্রতারণা, জবাবদিহির অভাব, দায়িত্বে অবহেলা এবং ব্যক্তিস্বার্থকে রাষ্ট্রীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে স্থান দেওয়ার প্রবণতাও দুর্নীতির অংশ। একটি দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি যতই দৃশ্যমান হোক না কেন, যদি সেই উন্নয়নের ভেতরে দুর্নীতির বিষবাষ্প ছড়িয়ে পড়ে, তবে সেই অগ্রগতি দীর্ঘস্থায়ী হয় না। তাই দুর্নীতির বিরুদ্ধে সংগ্রাম কেবল একটি প্রশাসনিক দায়িত্ব নয়, এটি একটি জাতীয় অঙ্গীকার এবং নাগরিক দায়িত্ব।বাংলাদেশ আজ উন্নয়নের অগ্রযাত্রায়। পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, এক্সপ্রেসওয়ে, কর্ণফুলী টানেল, বিদ্যুৎ, তথ্যপ্রযুক্তি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে দেশের অগ্রগতি আন্তর্জাতিক মহলেও প্রশংসিত হয়েছে। কিন্তু এই অর্জনের ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে হলে দুর্নীতিকে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। কারণ দুর্নীতি উন্নয়নের গতিকে বাধাগ্রস্ত করে, রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপচয় ঘটায়, বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত করে এবং জনগণের কষ্টার্জিত করের অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত হতে দেয় না। দুর্নীতির সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয় সাধারণ মানুষের। একজন দরিদ্র মানুষ যখন ন্যায্য সরকারি সেবা পেতে ঘুষ দিতে বাধ্য হন, একজন মেধাবী তরুণ যখন যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও স্বচ্ছ নিয়োগের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হন, কিংবা একজন রোগী প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা পেতে অনিয়মের শিকার হন, তখন শুধু ব্যক্তি নয়, রাষ্ট্রও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ধীরে ধীরে মানুষের মনে জন্ম নেয় অবিশ্বাস, হতাশা এবং ক্ষোভ। এই অবস্থা একটি সমাজকে নৈতিকভাবে দুর্বল করে দেয়। দুর্নীতির বিরুদ্ধে আইন রয়েছে, প্রতিষ্ঠান রয়েছে, নজরদারি ব্যবস্থাও রয়েছে। কিন্তু কেবল আইন প্রণয়ন করলেই দুর্নীতি নির্মূল হয় না। প্রয়োজন আইনের নিরপেক্ষ, দ্রুত এবং কার্যকর প্রয়োগ। আইন সবার জন্য সমান, এই বিশ্বাস প্রতিষ্ঠা করতে হবে। অপরাধী যে-ই হোক, তার পরিচয় বা অবস্থান বিবেচনা না করে আইনের আওতায় আনতে হবে। বিচারহীনতার সংস্কৃতি দুর্নীতিকে উৎসাহিত করে, আর নিশ্চিত বিচার দুর্নীতিকে নিরুৎসাহিত করে। দুর্নীতি প্রতিরোধে প্রযুক্তির ব্যবহার আজ সময়ের অন্যতম দাবি। সরকারি সেবার ডিজিটালাইজেশন ইতোমধ্যে অনেক ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা বৃদ্ধি করেছে। অনলাইন আবেদন, ই-ফাইলিং, ই-টেন্ডারিং, ডিজিটাল পেমেন্ট ও সেবা পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে মধ্যস্বত্বভোগী এবং অনিয়মের সুযোগ অনেকাংশে কমেছে। প্রযুক্তিনির্ভর প্রশাসন শুধু সেবার গতি বাড়ায় না, জবাবদিহিও নিশ্চিত করে। তবে প্রযুক্তির পাশাপাশি প্রয়োজন দক্ষ জনবল, তথ্যের নিরাপত্তা এবং ডিজিটাল নৈতিকতা। দুর্নীতি প্রতিরোধের সবচেয়ে শক্তিশালী ভিত্তি হলো নৈতিক শিক্ষা। সততা, দেশপ্রেম, দায়িত্ববোধ এবং মানবিক মূল্যবোধের শিক্ষা পরিবার থেকেই শুরু হয়। একজন শিশু যদি ছোটবেলা থেকেই দেখে যে তার পরিবার সৎ উপার্জনকে সম্মান করে এবং অন্যায়ের সঙ্গে আপস করে না, তাহলে সে ভবিষ্যতে একজন দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে উঠবে। অন্যদিকে অসৎ উপায়ে অর্জিত সম্পদকে যদি সাফল্যের প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, তবে সমাজে দুর্নীতির সংস্কৃতি আরও বিস্তৃত হবে। তাই পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সমাজকে একযোগে মূল্যবোধভিত্তিক শিক্ষা বিস্তারে কাজ করতে হবে। গণমাধ্যম দুর্নীতির বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী সামাজিক শক্তি। অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা বহু অনিয়ম ও দুর্নীতির চিত্র জনগণের সামনে তুলে ধরেছে। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমও সচেতনতা তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তবে তথ্য প্রকাশের ক্ষেত্রে দায়িত্বশীলতা, সত্যতা যাচাই এবং বস্তুনিষ্ঠতা বজায় রাখা অপরিহার্য। কারণ গুজব বা বিভ্রান্তিকর তথ্য যেমন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ক্ষতি করতে পারে, তেমনি প্রকৃত দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলনকেও প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। আমরা প্রায়ই দেখি, অসৎ উপায়ে বিপুল সম্পদের মালিক হওয়া ব্যক্তিকে সমাজে বিশেষ মর্যাদা দেওয়া হয়। এই মানসিকতা পরিবর্তন না হলে দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই কখনোই সফল হবে না। সমাজে সম্মান পাবে সেই ব্যক্তি, যিনি সততা, কর্মনিষ্ঠা ও নৈতিকতার মাধ্যমে নিজের অবস্থান তৈরি করেছেন। সামাজিক মূল্যায়নের এই পরিবর্তনই দুর্নীতি প্রতিরোধে দীর্ঘমেয়াদি ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। তরুণ সমাজকে দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলনের অগ্রভাগে নিয়ে আসতে হবে। কারণ আজকের শিক্ষার্থীরাই আগামী দিনের প্রশাসক, শিক্ষক, চিকিৎসক, কপ্রকৌশলী, বিচারক, সাংবাদিক ও রাজনৈতিক নেতা। তাদের মধ্যে যদি সততা, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহির চেতনা গড়ে ওঠে, তবে ভবিষ্যতের বাংলাদেশ হবে আরও শক্তিশালী। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিতর্ক, রচনা প্রতিযোগিতা, সেমিনার, সাংস্কৃতিক আয়োজন এবং সামাজিক উদ্যোগের মাধ্যমে দুর্নীতিবিরোধী সচেতনতা আরও বিস্তৃত করা যেতে পারে। বেসরকারি খাতেরও দায়িত্ব কম নয়। ব্যবসা-বাণিজ্যে কর ফাঁকি, ভেজাল পণ্য উৎপাদন, বাজার কারসাজি, মিথ্যা হিসাব এবং অনৈতিক প্রতিযোগিতা অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর। করপোরেট সুশাসন, স্বচ্ছ আর্থিক ব্যবস্থাপনা এবং নৈতিক ব্যবসায়িক সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে একটি সুস্থ অর্থনৈতিক পরিবেশ গড়ে তোলা সম্ভব। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। সরকারি দপ্তরে সেবার মান, সময়সীমা এবং দায়িত্ব স্পষ্টভাবে নির্ধারণের পাশাপাশি অভিযোগ নিষ্পত্তির কার্যকর ব্যবস্থা থাকতে হবে। একই সঙ্গে সৎ, দক্ষ ও দায়িত্বশীল কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যথাযথ মূল্যায়ন এবং উৎসাহ প্রদান করতে হবে। সততার স্বীকৃতি যেমন দুর্নীতি নিরুৎসাহিত করে, তেমনি কর্মস্পৃহাও বৃদ্ধি করে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে ধর্মীয়, সামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোকেও আরও সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে। ধর্মীয় মূল্যবোধ মানুষকে ন্যায়, সততা ও দায়িত্ববোধের শিক্ষা দেয়। সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড সমাজে মানবিকতা ও নৈতিক চেতনা জাগ্রত করে। আর সামাজিক সংগঠনগুলো জনসচেতনতা সৃষ্টি ও সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। রাষ্ট্রের পাশাপাশি নাগরিক সমাজ যত শক্তিশালী হবে, দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রতিরোধও তত কার্যকর হবে। দুর্নীতি প্রতিরোধ কোনো একক ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান কিংবা সরকারের পক্ষে সম্ভব নয়। এটি একটি সর্বজনীন আন্দোলন। রাষ্ট্র যদি কঠোর আইন প্রয়োগ করে, কিন্তু নাগরিক সমাজ সচেতন না হয়, তবে কাঙ্ক্ষিত ফল আসবে না। আবার জনগণ সচেতন হলেও যদি প্রশাসনে জবাবদিহির অভাব থাকে, তবুও দুর্নীতি কমবে না। তাই সরকার, প্রশাসন, বিচার বিভাগ, রাজনৈতিক নেতৃত্ব, গণমাধ্যম, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ব্যবসায়ী সমাজ, সামাজিক সংগঠন এবং সাধারণ জনগণকে একই লক্ষ্যে কাজ করতে হবে। আমাদের প্রত্যেকের উচিত নিজের অবস্থান থেকে দুর্নীতিকে না বলা। ছোট অনিয়মকে প্রশ্রয় দিলে সেটিই একসময় বড় দুর্নীতির রূপ নেয়। ব্যক্তিগত জীবন থেকে শুরু করে কর্মক্ষেত্র পর্যন্ত সততা ও নৈতিকতার চর্চা করতে হবে। কারণ একটি দুর্নীতিমুক্ত রাষ্ট্র গড়ে ওঠে কোটি কোটি মানুষের ছোট ছোট সৎ সিদ্ধান্তের ওপর ভিত্তি করে। দুর্নীতি শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতির কারণ নয়, এটি একটি জাতির নৈতিক ভিত্তিকেও দুর্বল করে কদেয়। তাই দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াইকে কেবল আইনি বা প্রশাসনিক কর্মসূচি হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি হতে হবে জাতীয় সংস্কৃতি, সামাজিক দায়িত্ব এবং নাগরিক অঙ্গীকারের অংশ। আমরা যদি প্রত্যেকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে সততা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির চর্চা করি, অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হই এবং ন্যায়কে প্রতিষ্ঠা করার সাহস দেখাই, তবে দুর্নীতিমুক্ত, মানবিক ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তোলা অবশ্যই সম্ভব। সেই লক্ষ্য অর্জনে প্রয়োজন রাষ্ট্রের দৃঢ় রাজনৈতিক সদিচ্ছা, কার্যকর প্রতিষ্ঠান এবং সর্বোপরি জনগণের সম্মিলিত প্রচেষ্টা। কারণ দুর্নীতির বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় শক্তি কোনো আইন নয়, বরং সচেতন, দায়িত্বশীল ও নৈতিক মূল্যবোধসম্পন্ন নাগরিক সমাজ। দুর্নীতি কখনো একা জন্ম নেয় না, আবার একা প্রতিরোধও করা যায় না। রাষ্ট্রীয় সদিচ্ছা, কার্যকর প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যমের দায়িত্বশীল ভূমিকা এবং সর্বোপরি সচেতন নাগরিকের অংশগ্রহণ একসূত্রে গাঁথা হলেই দুর্নীতির বিরুদ্ধে গড়ে উঠবে অপ্রতিরোধ্য প্রতিরোধ। তাই উন্নয়ন, সুশাসন ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার স্বার্থে দুর্নীতি প্রতিরোধে প্রয়োজন সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টা। লায়ন মোঃ গনি মিয়া বাবুল: শিক্ষক, কবি, কলাম লেখক, সমাজসেবক ও সংগঠক |