|
কর্তাদের ভুল পরিকল্পনা: বিজেএমসির ২৫ জুট মিল বন্ধে অনড় সরকার
নতুন বার্তা, ঢাকা:
|
বাংলাদেশ জুট মিলস করপোরেশনের (বিজেএমসি) ২৫ জুট মিলের ভবিষ্যৎ অন্ধকারে। পুরোনো প্রযুক্তি, উৎপাদন ক্ষমতা হারানো, লোকসান ও বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে থাকার শঙ্কায় বন্ধের সিদ্ধান্তে অনড় রয়েছে সরকার। অথচ উন্নতমানের পাটজাত পণ্য উৎপাদন, বিশ্ববাজার নিয়ন্ত্রণ, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন ও পাটের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতের লক্ষ্যে ১৯৭২ সালে যাত্রা শুরু করেছিল বিজেএমসি।সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ-৫৪ বছরে শীর্ষ কর্তাদের অনিয়ম, দুর্নীতি, লুটপাট, অব্যবস্থাপনা, অদক্ষতা, শ্রমিক ও অপরিকল্পিত সিদ্ধান্তের বলি ঐতিহ্যবাহী শিল্প জুট মিলগুলো। অবহেলা আর অযত্নে নষ্ট হয়েছে কোটি কোটি টাকার যন্ত্রপাতি। ফলে পুনরায় চালু করতে সরকারকে গুনতে হবে বিপুল অর্থ। বাধ্য হয়ে বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় মিলগুলো চালুর পক্ষে সরকার। বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব সুব্রত শিকদার বলেন, বন্ধ জুট মিলগুলো সরকারি ব্যবস্থাপনায় আর চালু করার চিন্তাভাবনা সরকারের নেই। কারণ মিলগুলোর মেশিনারিজ পুরোনো। নেই উৎপাদন ক্ষমতা। এছাড়া ৫৪ বছরে মিলগুলো থেকে লাভের মুখ দেখেনি সরকার। তাহলে এসব প্রতিষ্ঠান সরকার কেন চালাবে। তথ্যমতে, বিজেএমসি বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণাধীন স্বায়ত্তশাসিত রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান। বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন ও কৃষকদের পাটের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতে ৭৮টি মিল নিয়ে ১৯৭২ সালে যাত্রা করে প্রতিষ্ঠানটি। ১৯৮১ সালে বিজেএমসির নিয়ন্ত্রিত মিলের সংখ্যা দাঁড়ায় ৮২। ১৯৮২ সালের পর ৩৫টি বিরাষ্ট্রীয়করণ, আটটি মিলের পুঁজি প্রত্যাহার এবং একটি মিল (বনানী) ময়মনসিংহ জুট মিলসের সঙ্গে একীভূত করায় বিজেএমসি নিয়ন্ত্রিত মিলের সংখ্যা দাঁড়ায় ৩৮। নানা কারণে বর্তমান সংখ্যা ২৫। তবে কর্মী অসন্তোষ ও লোকসান দেখিয়ে ২০২০ সালে মিলগুলোর উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধ করে আওয়ামী লীগ সরকার। অন্তর্বর্তী সরকারও মিলগুলো চালুর পদক্ষেপ নেয়নি। সূত্রের দাবি-ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের পর মিলগুলো চালুর বিষয়ে পুনর্বিবেচনা করে নতুন সরকার। কিন্তু আর্থিক ক্ষতি, পুরোনো প্রযুক্তি, উৎপাদন ক্ষমতা হারানো ও বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা বিবেচনায় সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে সরকার। নেওয়া হয় লিজের মাধ্যমে বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় চালু রাখার। ইতোমধ্যে প্রক্রিয়াধীন রয়েছে ৫ মিলের লিজ কার্যক্রম। এছাড়া লিজ দেওয়া হয়েছে ১৪ মিল। এই বিষয়ে ১৫ জুন জাতীয় সংসদে সরকারের বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদীর বলেন, পাটপণ্য রপ্তানিতে সম্ভাবনার পাশাপাশি কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। বিশ্বব্যাপী স্বল্পমূল্যের কৃত্রিম তন্তুর সহজলভ্যতা ও ব্যবহার বৃদ্ধির ফলে পাটজাত পণ্য বিশ্ববাজারে হুমকির মধ্যে পড়েছে। বেশির ভাগ পাটকল পুরোনো প্রযুক্তি ও যন্ত্রপাতির কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকতে পারছে না। ফলে সরকারিভাবে দেশে নতুন পাটকল চালুর পরিকল্পনা নেই। সরকারি নীতি-সহায়তা ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টির মাধ্যমে বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণকে উৎসাহিত করা সরকারের লক্ষ্য। সরকারের এমন সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ বিজেএমসির কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। তাদের দাবি-বিগত সময়ে সরকার ও বিজেএমসির উচ্চপর্যায়ের ভুল সিদ্ধান্ত, সময়োপযোগী মেশিন স্থাপন না করা, দক্ষ জনবল নিয়োগ না দেওয়া, অধিক মূল্যে পাট ক্রয়, শ্রমিকদের উচ্চ বেতন কাঠামো ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অনিয়ম এবং দুর্নীতির কারণে জুটশিল্প ধ্বংস হয়েছে। সর্বশেষ প্রসেস মালামাল, কাঁচাপাট ও মিলের মেশিন স্ক্র্যাপ হিসাবে বিক্রির মাধ্যমে মিলগুলোর বুকে শেষ পেরেক মারা হয়। আওয়ামী সরকারের ছত্রছায়ায় ধ্বংসের এই চূড়ান্ত ধাপ বাস্তবায়ন করে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব মো. আব্দুর রউফ। তার বিরুদ্ধে মিল লিজ দেওয়ায় অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। ব্যক্তিগত সুবিধা আদায়ে লিজ প্রদানের নামে মেশিন স্ক্র্যাপ হিসাবে বিক্রির প্রক্রিয়া শুরু হয় তার হাতে। ব্যবসায়ীরা প্রথমে মিলগুলো লিজ নিয়ে টেক্সটাইল পণ্য উৎপাদনের জন্য জুট মিলের মেশিনারিজ অপসারণের জন্য জানায়। তখন নষ্ট দেখিয়ে সেগুলোকে স্ক্র্যাপ হিসাবে বিক্রির উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। সামনে থেকে এসব কাজ বাস্তবায়ন করেন আব্দুর রউফ। মূলত আওয়ামী সরকারের এজেন্ডা বাস্তবায়নে তিনি দেশের জুটশিল্প ধ্বংস করেছেন। এজেন্ডা বাস্তবায়নে বিজেএমসির চেয়ারম্যান থেকে পুরস্কার হিসাবে পেয়েছেন বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ে সচিব পদ। অভিযোগ-মন্ত্রণালয় থেকে দায়িত্ব ছাড়ার আগ পর্যন্ত তার এসব কাজে সহযোগিতা করেছে বিজেএমসির উপমহাব্যবস্থাপক (বিপণন) কাজী কামরুল করিম, ব্যবস্থাপক (নিরাপত্তা) জসিম উদ্দিন, মহাব্যবস্থাপক (প্রশাসন ও সাধারণ সেবা) নাসিমুল ইসলাম, মহাব্যবস্থাপক (হিসাব) জিয়াউল হক ভূঁইয়া, মহাব্যবস্থাপক (প্রশাসন) মামুন-উর-রশীদ, উপমহাব্যবস্থাপক মতিউর রহমান মন্ডল ও উপমহাব্যবস্থাপক আবুল কাশেম মোহাম্মদ হান্নানসহ কয়েকজন কর্মকর্তা। বিজেএমসির শীর্ষ পর্যায়ের এক কর্মকর্তা বলেন, মিলগুলো চালু না করার বিষয়ে সরকার যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে-তা শ্রদ্ধা জানাই। কিন্তু কি কারণে ঐতিহ্যবাহী জুটশিল্প ধ্বংস হয়েছে? কারা এই ধ্বংসের সঙ্গে জড়িত? সরকারের উচিত সে বিষয় খতিয়ে দেখা। শুধু লোকসানের অজুহাতে বন্ধ করলে দেশীয় পাট শিল্পের ক্ষতি হবে। এদিকে বিষয়গুলো নিয়ে গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছিলেন বিজেএমসির কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। জুটমিল বন্ধ, মালামাল বিক্রি ও কর্তাদের অপকর্মের বিরুদ্ধে মানববন্ধনও করেছিলেন তারা। তবে এ বিষয়ে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি অন্তর্বর্তী সরকার। বরং অনিয়মের বিরুদ্ধে সরব থাকা ওই কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয় তৎকালীন সচিব আব্দুর রউফ। কয়েকজনকে করা হয় শাস্তিমূলক বদলি। খোঁজখবর নিয়ে জানা যায়, বিজেএমসিতে কর্মকর্তার সংখ্যা ৯৪০। কর্মচারী রয়েছে ১২৪৮। এর মধ্যে বড় একটি অংশ সিকিউরিটি গার্ড। তারা মিল ও মিলের সম্পদ পাহারায় ভূমিকা রাখছেন। তবে মিল বন্ধের সিদ্ধান্ত চূড়ান্তভাবে বাস্তবায়ন হলে-এ কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের জন্য বিকল্প কিছু তৈরি করা হবে কিনা তা নিয়ে এখন পর্যন্ত সরকারের পক্ষ থেকে স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হয়নি। আব্দুর রউফ বলেন, মিলগুলো বন্ধ করা সরকারের সিদ্ধান্ত ছিল। কারণ স্বাধীনতার পর থেকে মিলগুলো লাভ করতে পারছিল না। ফলে সরকার বিনিয়োগ না করার সিদ্ধান্ত নেয়। আমি তখন বিজেএমসির চেয়ারম্যান ছিলাম। সরকারের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করেছি। সরকারের সিদ্ধান্ত ছাড়া করপোরেশন প্রধান কি প্রতিষ্ঠান বন্ধ করতে পারে? পারে না। তিনি বলেন, মিলগুলো বন্ধের অনেক কারণ রয়েছে। বিশেষ করে মেশিন ছিল ৬০ দশকের। সময়ের সঙ্গে এগুলো পরিবর্তনের দরকার ছিল। কিন্তু করা হয়নি। সেই মেশিন দিয়ে বর্তমান বাজারে টিকে থাকা সম্ভব নয় বলে বলেন আব্দুর রউফ। |