|
ফুটবল উন্মাদনা কি বিশ্বকাপ নাকি বিশ্বচাপ
রায়হান আহমেদ তপাদার:
|
যুদ্ধ আর উন্মাদনায় যখন পথ হারাচ্ছে পৃথিবী, তখন চোখ ফেরানোর একমাত্র অবলম্বন ফিফা বিশ্বকাপ। কিন্তু আমাদের দেশের চিরচেনা ফুটবল উন্মাদনা কি শেষ পর্যন্ত বিশ্বকাপ নাকি বিশ্বচাপ তৈরি করছে? আর্জেন্টিনা-ব্রাজিল সমর্থন করতে গিয়ে আমরা কি হারিয়ে ফেলছি পারস্পরিক সৌজন্যবোধ।বিশ্বে একতা আর ভালোবাসার বিকল্প নেই। বলা চলে, এখন এর দরকার সব থেকে বেশি। বিগত বছরগুলোতে পৃথিবী যুদ্ধ আর উন্মাদনার শিকার হয়ে পথ হারানোর পথে নেমেছে। এই সংকট আর যুদ্ধের ডামাডোল কখন থামবে কেউ জানে না। কিন্তু একটা কথা সবাই জানে এবং মানে, যুদ্ধ বন্ধ না হলে দুনিয়া বাঁচবে না। আপাতত যুদ্ধ থেকে চোখ ফেরানোর একটা উছিলা বা পথ পাওয়া ছিল জরুরি। সেটাই এনে দিয়েছে বিশ্বকাপ ফুটবল। বিশ্বকাপকে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ক্রীড়া আসর বলা হতো। কিন্তু আজ যখন উত্তর আমেরিকাতে আসরটি বসতে যাচ্ছে , সেদিকে কারও যেন কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। হাজার হাজার টিকিট অবিক্রীত; মূল দামের চেয়ে কম দামে টিকিট পুনঃবিক্রি হয়েছে সপ্তাহখানেক আগেও। যুক্তরাষ্ট্রের শহরে শহরে যে ভিড় থাকার কথা ছিল, সেটাও নেই। হোটেলগুলো যে বাড়তি আয়ের আশা করেছিল, সেটাও আশানুরূপ হয়নি। ফিফাকে তাদের অগ্রিম বুক করা হোটেলরুম বাতিল করতে হয়েছে।এমনকি ট্রাম্পের যুদ্ধনীতির প্রতিবাদস্বরূপ বৈশ্বিক বর্জনের কথাও শোনা যাচ্ছে। কিন্তু কিছুদিন আগে চ্যাম্পিয়নস লিগ ফাইনাল নিয়েও যে উন্মাদনা ছিল, বিশ্বকাপ যেন এর ধারেকাছেও নেই। মনে হচ্ছে, খেলাধুলার বাইরে বর্তমান বৈশ্বিক রাজনীতি ও সংস্কৃতির হালচাল নিয়ে এখানে গভীর কিছুর ইশারা রয়েছে।যুক্তরাষ্ট্রের মানুষের এই উদাসীনতা হয়তো আশ্চর্যজনক নয়। মার্কিন দলের পারফরম্যান্স আহামরি নয়। ফুটবল এখানে কোনো জনপ্রিয় খেলাও নয়। তা ছাড়া আমেরিকানরাও আজকাল স্রেফ দেশপ্রেমের জোয়ারে গা ভাসাতে নারাজ। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে টিকিটের গলাকাটা দাম। তবে বিশ্বের বাদবাকি অংশের স্তিমিত দশা আমাকে বেশি অবাক করেছে। চার বছর পরপর মাসব্যাপী এক বৈশ্বিক উত্তেজনা তৈরি হতো। বর্তমানে বিশ্বকাপের অবস্থানও যেন আর আগের জায়গায় নেই। ক্লাব ফুটবলও এর পাশে আসন নিয়েছে। তবে বিশ্বজুড়ে রাজনৈতিক জাতীয়তাবাদের জোয়ারের কালে এই পরিবর্তন আরও চমকপ্রদ। রাজনৈতিক জাতীয়তাবাদের উন্মাদনার রেশ ফুটবলেও পড়বে বলেও ধারণা করা হচ্ছিল। কিন্তু কাকতালীয়ভাবে এই জনতুষ্টিবাদের জমানা মিশে গেছে বড় ক্লাবগুলোর সঙ্গে। বিদেশি করপোরেটদের পৃষ্ঠপোষকতা ও বিপুল অর্থের বিনিময়ে বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে খেলোয়াড়দের এনে দল সাজানো হয়। দেশের জার্সি, দেশের সন্তানদের নিয়ে গঠিত সেই দলগুলোর কী হবে? ভক্তদের কাছে এর গুরুত্ব আছে, কিন্তু কেবল জাতীয় দলের প্রতি মানুষের আবেগ দিয়ে বিদ্যমান বৈশ্বিক জনতুষ্টিবাদের জমানাকে ব্যাখ্যা করা যাবে না। হয়তোবা এককালে আন্তর্জাতিক ফুটবল জাতীয়তাবাদী উন্মাদনা প্রকাশের মাধ্যম হতো, কিন্তু এখন উগ্র জাতীয়তাবাদের জমানায় আসলে আর এমন কোনো পৃথক মাধ্যমের প্রয়োজন পড়ছে না। অথবা দুই দশক আগে ফ্র্যাঙ্কলিন ফোয়ার যে ইঙ্গিত করেছিলেন, সেটাও হতে পারে। তিনি বলেছিলেন, ক্লাব ফুটবলের এই গোষ্ঠীগত উন্মাদনা আসলে জাতীয়তাবাদের বিরুদ্ধে একটি প্রাকৃতিক প্রতিষেধক এবং বিশ্বায়নবাদের বিরুদ্ধে একধরনের প্রতিবাদ। অথবা এ-ও হতে পারে, ক্লাব ফুটবল তো সারা বছর চলে। একজন ভক্ত আসলে কতক্ষণ ফুটবল হজম করতে পারেন? আবেগ ঢেলে দেওয়ার জন্য আর কত সুযোগ দরকার? তবু এটা ধাঁধার মতো মনে হচ্ছে। এর আংশিক কারণ হচ্ছে, শুরুর দিকে বলা হতো, এই জনতুষ্টিবাদ নিজের দেশের অভিজাতদের দ্বারা পরিত্যক্ত জনগণের বোধ। ফিফার বর্তমান বিতর্কিত প্রেসিডেন্ট সংস্থাটিকে ভুল পথে পরিচালিত করছেন। অথবা সম্প্রতি বিশ্বকাপের আয়োজক দেশগুলোর তালিকাও একটা কারণ-রাশিয়া, কাতার, যুক্তরাষ্ট্র।বিশ্বায়ন কীভাবে ক্লাব ফুটবলকে বদলে দিয়েছে, এটি তারও একটি চমৎকার উদাহরণ। ১৯৯০-এর দশক থেকে শুরু করে পরের দুই দশকে শীর্ষস্থানীয় লিগ এবং বড় বড় ক্লাব বিশ্বের সেরা খেলোয়াড়দের নিজেদের দলে ভেড়াতে শুরু করে। এরপর সেই খেলা পৌঁছে দেওয়া হয় বিশ্বজুড়ে। ফিফা প্রেসিডেন্ট জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর মুখে খেলার বিশুদ্ধতা এবং রাজনীতি থেকে এর দূরত্বের কথা আমরা যতই শুনি না কেন, ফুটবল যে স্রেফ কোনো খেলা নয়, তা স্পষ্ট। এটা এখন আধুনিক রাজনীতির সফট পাওয়ার ও হার্ড পাওয়ার প্রকাশের হাতিয়ারস্বরূপ। এবারের বিশ্বকাপ টুর্নামেন্ট এমন এক ব্যক্তির পরিসরে অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যিনি পুরো পৃথিবীকে দেখেন লেনদেনের চশমায়। তাঁর কাছে সব রাজনৈতিক বা আদর্শিক অবস্থান স্রেফ বাণিজ্যিক চুক্তির অংশ। যেকোনো সময় এগুলো কেনাবেচা যায়। জাতীয়তাবাদের মতো গভীর ও আত্মপরিচয়মূলক ধারণার ক্ষেত্রে সংবাদমাধ্যমগুলো খুব কম সময়ই একসুরে কথা বলতে দ্বিধা করে। কেবল প্রোপাগান্ডা নয়, বরং প্রকৃত সাংস্কৃতিক প্রতিধ্বনিই ফুটিয়ে তোলা হয়। ফলে ব্রিটিশ গণমাধ্যম ইংল্যান্ডের জাতীয় দলকে ঐক্যবদ্ধ ইংল্যান্ডের জীবন্ত প্রতীক হিসেবে বিবেচনা করে। দলগতভাবে, এই খেলোয়াড়দের প্রায়ই ব্রিটিশ রাজনীতিবিদদের চেয়ে সাধারণ মানুষের অনেক বেশি আসল প্রতিনিধি বলে মনে হয়।অবশ্যই গভীর রাজনৈতিক সংকট বা সামাজিক অবক্ষয়ের কোনো আশু সমাধান ফুটবলের কাছে নেই। তবু মাঠের এই সবুজ ঘাসই এখনো একটি দেশের সবচেয়ে স্পষ্ট আয়না।রাজনীতিবিদ ও বিশ্লেষকেরা খেলোয়াড় ও তাঁদের পারফরম্যান্সকে কেবল তাঁদের প্রযুক্তিগত দক্ষতার জন্য খুঁটিয়ে দেখেন না; বরং এর মাধ্যমে তাঁরা সমাজের ভেতরের কলকবজা বোঝার চেষ্টা করেন। ঐতিহাসিক ভাবে বাস্তবতার তোয়াক্কা না করে জাতীয় ঐক্যের এক কাল্পনিক রূপ তৈরি করতে গিয়ে গণমাধ্যম প্রায়ই বড় ধরনের ভুল করেছে। বর্তমান বেলজিয়ামের কথাই ধরা যাক। জাতিগত, রাজনৈতিক ও ভাষাগত দিক থেকে গভীর বিভাজিত একটি দেশে জাতীয় দলটি বিভক্তির বিরুদ্ধে একাকী প্রাচীর হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে।একইভাবে ফ্রান্সে, যেখানে বর্ণবাদী উত্তেজনা প্রতিনিয়ত সামাজিক কাঠামোকে হুমকির মুখে ফেলে,সেখানে উত্তর আফ্রিকান, সাব-সাহারান ও ফরাসি বংশোদ্ভূত খেলোয়াড়দের নিয়ে গঠিত বহুজাতিক দলটিকে গণমাধ্যম ও প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ-উভয়েই এক অপরিহার্য ‘প্রতিষেধক’ হিসেবে দেখেন। কারণ, তাঁদের সামনে এর চেয়ে ভালো আর কোনো আখ্যান নেই। যুক্তরাজ্যের সংবাদমাধ্যমগুলো প্রায়ই ইংল্যান্ড দলকে একটি প্রগতিশীল শক্তির প্রতীক হিসেবে তুলে ধরে, যা ব্রিটেনকে ইউরোপ থেকে বিচ্ছিন্ন করতে চাওয়া জনতুষ্টিবাদীদের গালে একটি বড় চপেটাঘাত। তবে ফুটবলের এই প্রতীকী রাজনৈতিক ব্যবহারের পাশাপাশি লেখক সাইমন কুপার একটি সতর্কবার্তা দিয়ে বলেছেন, ‘টুর্নামেন্টটি উপভোগ করুন, কিন্তু এটাকে খুব গুরুত্বসহকারে নেবেন না। ভাববেন না যে বিশ্বকাপের ম্যাচগুলো বাস্তব জীবনে কোনো প্রভাব ফেলে। এত ঢাকঢোলের পরও একটি সফল টুর্নামেন্ট কোনো প্রেসিডেন্টকে ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখতে পারে না বা বর্ণিল সম্প্রীতিও তৈরি করতে পারে না। বিশ্বকাপ একটি স্বপ্নের মতো উবে যায়। এটি প্রায়ই সামাজিক বাস্তবতার প্রতিফলন দেখাতে পারে, কিন্তু একে নতুন রূপ দিতে পারে না।’ আদতে ফুটবল গভীর রাজনৈতিক শত্রুতা প্রকাশেরও মাধ্যম। এই শত্রুতা কখনো কখনো মারাত্মক সহিংসতায় রূপ নেয়। উদাহরণস্বরূপ ১৯৮৫ সালে ব্রাসেলসের হেইসেল স্টেডিয়ামে লিভারপুল ও জুভেন্টাস সমর্থকদের রক্তক্ষয়ী দাঙ্গার মুখে কোচরা পিছু হটতে বাধ্য হয়েছিলেন এবং তৎকালীন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী মার্গারেট থ্যাচার অপরাধীদের ‘মব’ বলে নিন্দা করেছিলেন। আবার কখনো কখনো এই শত্রুতা গ্যালারিতে ভিনদেশিদের প্রতি উগ্র ও বিদ্বেষপূর্ণ স্লোগান দেওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। ফ্রান্স যখন ২০১৮ সালের বিশ্বকাপ জিতেছিল, তখন কট্টর ডানপন্থীরা এই অশ্বেতাঙ্গ দলকে দেশের জাতীয় প্রতীক হিসেবে মেনে নিতে পারেনি। দলটির বেশির ভাগ খেলোয়াড় আফ্রিকান বংশোদ্ভূত হওয়ায় মার্কিন কমেডিয়ান ট্রেভর নোয়া রসিকতা করে বলেছিলেন, ‘আসলে আফ্রিকাই বিশ্বকাপ জিতেছে।’ এই এক রাজনৈতিক ব্যঙ্গাত্মক কৌতুকই পশ্চিমা বহুসংস্কৃতিবাদের দুর্বলতাকে উন্মুক্ত করে দিয়েছিল।ইউরোপের শীর্ষ ক্লাবগুলো যখন ‘ইউরোপিয়ান সুপার লিগ’ প্রকল্পে যোগ দেওয়ার চুক্তি করেছিল, তখন যে তীব্র ও ক্ষিপ্র রাজনৈতিক বিরোধিতা প্রকল্পকে গুঁড়িয়ে দিয়েছিল, সেটা কিন্তু খেলার বিশুদ্ধতার প্রতি আচমকা কোনো ভালোবাসার কারণে ঘটেনি; বরং এর পেছনে ছিল রাষ্ট্রীয় স্বার্থ সুরক্ষা নীতি। আজ আমরা এমন এক বিশ্বকাপে প্রবেশ করছি, যা পরিচালিত হচ্ছে ডোনাল্ড ট্রাম্পের যুক্তি দিয়ে। ট্রাম্প কিন্তু ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যমের মতো জাতিগত বৈচিত্র্যকে কোনো প্রগতিশীল শক্তির বিজয় হিসেবে দেখেন না কিংবা বিশ্বকাপকে কোনো গণতান্ত্রিক মরূদ্যানও ভাবেন না। তাঁর কাছে ফুটবল হলো স্রেফ একটি সম্পদ- চুক্তি করার, অর্থনৈতিক আধিপত্য বিস্তারের এবং যুক্তরাষ্ট্রের ভূরাজনৈতিক প্রভাবকে নতুন করে সাজানোর চূড়ান্ত একটি প্ল্যাটফর্ম। আমরা ফুটবলপ্রেমীরা মনে মনে যতই চাই না কেন, কোনো রাষ্ট্রপ্রধানেরই আসলে রাজনীতিকে ফুটবল থেকে আলাদা করার ক্ষমতা নেই। তবে এই চরম চুক্তি-ব্যবসায়ী বা ডিলমেকারের কাছে এসে এই সুন্দর খেলাও বর্তমান দুনিয়ারই প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠবে। খেলার নিয়ম অনুযায়ী একদল জিতবে, একদল হারবে। হারলেও মেসি, রোনালদো বা নেইমার সুপারস্টার। তাদের ক্যারিয়ার এবং তাদের জায়গা নিশ্চিত। এখনই যারা অশ্লীল ভাষায় তাদের আক্রমণ শুরু করে দিয়েছেন, ট্রফি পাওয়া না পাওয়া নিয়ে ট্রল করছেন, তাদের সংযত হওয়ার বিকল্প নেই। ফুটবলের দণ্ডমুণ্ডের কর্তা ফিফা সভাপতির কাছে এখন খেলার চেয়েও বড় রাশিয়া-ইউক্রেইনের যুদ্ধ সামলানো। ওই কারণে তিনি খেলার দিনগুলোতে যুদ্ধ বন্ধ রাখার অনুরোধ জানিয়েছেন। আশা করি তেমনটিই হবে এবং ওই বিরতির পর আর যুদ্ধমুখী হবে না তারা এটাই সবার প্রত্যাশা। লেখক: গবেষক ও কলাম লেখক, লন্ডন থেকে |