|
বিশ্ব মডেলেই কি নিয়ন্ত্রণ ‘অনিয়ন্ত্রিত চাকার’?
নতুন বার্তা, ঢাকা:
|
জান্নাতির স্বজনেরা এখনো জানেন না দুর্ঘটনার পর পালিয়ে যাওয়া রিকশাচালককে কীভাবে খুঁজে পাবেন। রহিদুল ইসলাম অনিশ্চিত কবে তার ঋণ শোধ হবে। মূল সড়কে পুলিশ আর এলাকায় সিন্ডিকেট ‘ম্যানেজ’ করে কতদিন টিকে থাকতে পারবেন রফিকুল, সামাদের কাছে তার উত্তর নেই।বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের কাছে চালক-রিকশার নিবন্ধন নিয়ে কোনো তথ্য নেই। রাজনৈতিক দলগুলো শুধু বক্তব্যে চাঁদাবাজি-সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করে, বাস্তবে শাসক বদলালেও শুধু মোড়ক বদলায়। সিটি করপোরেশনও হচ্ছে, হবের মধ্যে আছে আটকে। তাহলে ক্রমে রাজধানী ঢাকা শহরে ‘গলার কাঁটা’ হয়ে ওঠা ব্যাটারিচালিত রিকশাজনিত সংকট নিরসন বা এর নিয়ন্ত্রণ কার হাতে কিংবা কীভাবে? সে সম্পর্কে বিশেষজ্ঞ, গবেষক, সুশীল সমাজ, শ্রমিক নেতা, সাধারণ জনগণ, রিকশাচালক থেকে ট্রাফিক পুলিশের ঊর্ধ্বতনরা কথা বলেছেন। বাতলে দিয়েছেন নানা মত-পথ। তবু একটি প্রশ্নে আটকে থাকতে হয়- এ সংকটের সমাধান করবেন কে, আদৌ কি সম্ভব? এসব প্রশ্ন যখন ঘুরপাক খাচ্ছে তখন সামনে আরও একটি প্রশ্ন হাজির হয়। বিশ্বের অন্য অনেক দেশ কী করছে? তারা কি সংকটে পড়েছিল, পড়লে কীভাবে মোকাবিলা করেছে বা করছে? উত্তর খুঁজতে গিয়ে দেখা যায় বিশ্ব বেছে নিয়েছে নিয়ন্ত্রণের পথ। তাহলে আবারও প্রশ্ন আসে- ঢাকা কোন পথে যাবে? জাপানের অফিসিয়াল ট্রাভেল গাইড ওয়েবসাইট লোকালিতে ওয়াচাকো নামে এক লেখকের প্রকাশিত নিবন্ধে বলা হচ্ছে, ১৮৭০ সালে জাপানের রাজধানী টোকিওতে প্রথম রিকশা চলাচল শুরু হয় পর্যায়ক্রমে তা ছড়িয়ে পড়ে সারা দেশে। যদিও কেউ কেউ ১৮৬৯ সালের কথাও বলেছেন। সেটা ছিল হাতে টানা রিকশা, যা এখনো ভারতের কোলকাতায় টিকে আছে। ২০২১ সালের ব্রিটিশ সংবাদ মাধ্যম বিবিসির একটি প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে: জাপান থেকে রিকশা চীন (১৮৭৩) , হংকং (১৮৭৪), সিঙ্গাপুরে (১৮৮০), ছড়িয়ে পড়ে। ইতিহাসবিদ, গবেষক মুনতাসীর মামুনের গবেষণা প্রবন্ধের বরাতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে এই রিকশা এসেছে ১৯৩০-এর দশকে ভারত থেকে। আর ভারতে প্রথম রিকশার প্রচলন শুরু হয় ১৮৮০ সালের দিকে সিমলা শহরে। বলা হয়, রেভারেন্ট জে ফরডাইস নামের এক স্কটিশ মিশনারি প্রথম এ রিকশা এনেছেন। এর প্রায় ২০ বছর পর ১৯০০ সালে সেই রিকশা কলকাতায় আসে। দেড়শ বছরেরও বেশি সময়ের আগে জাপানের টোকিওতে ‘জিনরিকিশা’ নামে যাত্রা শুরু করা হাতে টানা সেই রিকশা। পরে প্যাডেলচালিত হয়। আর এখন যাতে মোটর ও ব্যাটারি যুক্ত হয়ে নতুন রূপ নিয়েছে। তিন মহাদেশের অভিজ্ঞতা বলছে নিষেধাজ্ঞা নয়, নিয়ন্ত্রিত স্বীকৃতিই কার্যকর পথ। চীন চীনের সাইকেল অ্যাসোসিয়েশন এবং ডাব্লিউএইচওর তথ্য বলছে, ২০১৯ সালে দেশটিতে ই-বাইক ও থ্রি-হুইলারের সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় ৩০ কোটি যা বিশ্বের মোট ই-বাইকের ৯০ শতাংশ। শুরুতে নিয়ন্ত্রণহীন থাকলেও পরে সরকার বাধ্যতামূলক নিবন্ধন, গতিসীমা এবং জোনভিত্তিক চলাচল চালু করে। ২০১৯ সালে নতুন জাতীয় মানদণ্ড কার্যকর করে সর্বোচ্চ গতি ২৫ কিলোমিটার নির্ধারণ করা হয় এবং অনেক শহরে প্রধান সড়কে এসব যান চলাচল সীমিত করা হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী চীনে ই-বাইক চালকদের মৃত্যুর ৭৫ শতাংশ এবং গুরুতর আঘাতের ৮০ শতাংশই মাথায় আঘাতজনিত। ভারত ভারতের অভিজ্ঞতাও গুরুত্বপূর্ণ। নীতি আয়োগ ও ওয়ার্ল্ড রিসোর্সেস ইনস্টিটিউটের (ডব্লিউআরআই) গবেষণায় দেখা যায়, ই-রিকশা একসময় বড় বিশৃঙ্খলা তৈরি করলেও পরে মোটর ভেহিকল আইন সংশোধনের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ কাঠামো গড়ে তোলা হয়। ২০১৫ সালে ই-রিকশাকে আলাদা বিভাগে স্বীকৃতি দিয়ে ড্রাইভিং লাইসেন্স, নিবন্ধন, নির্দিষ্ট রুট ও জোনিং ব্যবস্থা চালু করা হয়। গবেষণা বলছে, নিবন্ধিত ই-রিকশায় দুর্ঘটনার হার অনিবন্ধিতের তুলনায় ৩৮ শতাংশ কম। ভিয়েতনাম ভিয়েতনাম ‘ইন্টিগ্রেশন মডেল’ বেছে নেয়। সরকারি চার্জিং স্টেশন, চালকের প্রশিক্ষণ ও লাইসেন্স কোটা পদ্ধতির মাধ্যমে তারা নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। কেনিয়া ও নাইজেরিয়া আফ্রিকার দেশ কেনিয়া ও নাইজেরিয়ায় ইউনিয়নভিত্তিক নিবন্ধন, ডিজিটাল আইডি ও রুট পারমিটের মাধ্যমে অনানুষ্ঠানিক পরিবহনকে কাঠামোর মধ্যে আনা হয়েছে। নাইরোবিতে এ মডেলে তিন বছরে দুর্ঘটনা ২২ শতাংশ হ্রাস পায় (ওয়ার্ল্ড ব্যাংক ২০২১)। বিশ্ব যখন এভাবে সফল তখন বাংলাদেশ খসড়া নীতিমালায় আটকে আছে। ওপরের তথ্যগুলো একটি স্পষ্ট বার্তা দেয় যে, যেসব দেশ বাস্তবতা স্বীকার করে নিয়ন্ত্রিত কাঠামো গড়েছে তারাই দুর্ঘটনা কমাতে সফল হয়েছে। ঢাকা এখনো সেই রূপান্তরের অপেক্ষায়। তিন মহাদেশের এই অভিজ্ঞতা ঢাকার জন্য একটাই বার্তা রেখে যায় ‘যত দেরি তত মৃত্যু।’ ঢাকা কেন ভিন্ন সংকটে বিশেষজ্ঞদের মতে, ঢাকার সংকট আরও জটিল। কারণ, এখানে কোনো পূর্ণাঙ্গ জাতীয় ডেটাবেজ নেই। গ্যারেজনির্ভর চার্জিং, অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ, সীমিত সড়ক, নীতিগত দ্বৈততা ও অনিয়ন্ত্রিত নগরায়ণ মিলিয়ে পরিস্থিতি কঠিন হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজ (বিলস) ও পরিবহন বিশেষজ্ঞদের পর্যালোচনায় জানা যায়, রাজধানীতে বর্তমানে প্রায় ১৫ থেকে ২০ লাখ ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ই-থ্রি-হুইলার চলছে। স্বল্প দূরত্বের ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ যাত্রা এখন এ যানবাহনের ওপর নির্ভরশীল। ২০২৫ সালে সিপিডির এক আলোচনায় বুয়েটের অধ্যাপক আসিফ-উজ-জামান খান বলেন, এই পর্যায়ে এগুলোকে নিষিদ্ধ করা বাস্তবসম্মত নয়; বরং নগর পরিবহন ব্যবস্থার সঙ্গে একীভূত করতে হবে।’ নগর পরিকল্পনাবিদ স্থপতি ইকবাল হাবিব বলেন, রাজধানী ঢাকায় মাত্র ৭ থেকে ৮ শতাংশ কার্যকর সড়ক রয়েছে। ব্যক্তিগত গাড়ির আধিপত্য, দুর্বল গণপরিবহন ও অনিয়ন্ত্রিত যানবাহন মিলেই বর্তমান সংকট তৈরি হয়েছে।’ আগের পর্বগুলোতে সিপিডির প্রোগ্রাম অ্যাসোসিয়েট মো. খালেদ মাহমুদ, অর্থনীতিবিদ এম এম আকাশ, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. আব্দুস সালাম, বুয়েটের মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. এহসান প্রমুখ এ বিষয়ে বিস্তারিত মতামত দিয়েছেন। ব্র্যাকের রোড সেফটি প্রোগ্রামের ম্যানেজার ইঞ্জিনিয়ার মতিউর রহমানের সঙ্গে কথা হলে তিনি বলেন, ‘ব্যাটারিচালিত রিকশার বড় সমস্যা যান্ত্রিক অস্থিতিশীলতা ও দুর্বল ব্রেকিং ব্যবস্থা।’ তিনি বুয়েটের নকশা করা নিরাপদ মডেল, লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি ও নির্দিষ্ট চার্জিং স্টেশন চালুর সুপারিশ করেন। কিউআর কোডভিত্তিক ডিজিটাল নিবন্ধন, এনআইডির বিপরীতে সীমিত মালিকানা এবং গলিভিত্তিক চলাচল ব্যবস্থা ছাড়া এ খাত নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয় বলে মন্তব্য করেন তিনি। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের (বিলস) নির্বাহী পরিচালক সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘ব্যাটারিচালিত রিকশা খাতকে নিয়ন্ত্রণে আনতে একটি সুনির্দিষ্ট আইনি কাঠামো বা রেগুলেশনের আওতায় আনা জরুরি। এজন্য লাইসেন্স ও নিবন্ধন ব্যবস্থা চালু করতে হবে, যাতে যে কেউ ইচ্ছামতো রিকশা নামাতে না পারে এবং সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়।’ আগের পর্বে সৈয়দ সুলতান আরও মূল্যবান মতামত দিয়েছেন। সরকার প্রস্তাবিত ‘ব্যাটারিচালিত থ্রি-হুইলার ব্যবস্থাপনা নীতিমালা–২০২৫’-এ লাইসেন্স, গতিসীমা, নিরাপত্তা মানদণ্ড ও ওয়ার্ডভিত্তিক চলাচলের কথা রয়েছে। তবে বাস্তবায়ন এখনো সীমিত। এ খাতে জড়িত বিআরটিএ, দুই সিটি করপোরেশন, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়, ডেসকো ও ডিপিডিসিসহ একাধিক সংস্থা। কিন্তু কে নিয়ন্ত্রণ করবে, কে নিবন্ধন দেবে, আর কে বাস্তবায়ন করবে সে প্রশ্ন এখনো স্পষ্ট নয়। এ সমন্বয়হীনতার মধ্যেই প্রতিদিন লাখো মানুষ রাস্তায় নামছেন। কেউ জীবিকার জন্য আবার কেউ বাধ্য হয়ে যাতায়াতের জন্য। ঢাকা এখন দুই বাস্তবতার মাঝখানে দাঁড়িয়ে- একদিকে লাখো মানুষের জীবিকা, অন্যদিকে নগর নিরাপত্তা, ট্রাফিক শৃঙ্খলা। |