|
স্থানীয় সরকার নির্বাচন: সিটিতেও এনসিপির শেষ ভরসা ‘জোট’
নতুন বার্তা, ঢাকা:
|
জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মতো আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও ১১ দলীয় জোটের সঙ্গে ভোট করার পরিকল্পনা করছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। দলটি বর্তমানে এককভাবে প্রার্থী ঘোষণা করে মাঠ গোছালেও, শেষ পর্যন্ত তাদের মূল ভরসা জোটেই। বিশেষ করে সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে জোটের বিকল্প দেখছে না গণঅভ্যুত্থানের পর আত্মপ্রকাশ করা নতুন এই দলটি।মাঠপর্যায়ে সংগঠন তুলনামূলক দুর্বল থাকা এবং এককভাবে নির্বাচনী প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন হওয়ায়, এনসিপি এখন জোটগতভাবে অংশ নেওয়াকেই সবচেয়ে কার্যকর পথ হিসেবে দেখছে বলে দলটির একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে। এনসিপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক ও ঢাকা মহানগর উত্তরের আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীব বলেন, ‘স্থানীয় সরকার নির্বাচন ১১ দলীয় জোট একসঙ্গে করলে, তা নির্বাচনের তফসিল দেওয়ার আগে আলোচনার মাধ্যমে চূড়ান্ত হতে পারে। রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে তখন সেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। তবে, তার আগ পর্যন্ত এনসিপির প্রার্থীরা এককভাবেই প্রচার-প্রচারণা চালিয়ে যাবেন। তফসিল ঘোষণার পরই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসবে।’ তিনি উদাহরণ দিয়ে আরও বলেন, ‘জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে জামায়াতসহ অন্যান্য দলও ৩০০ আসনে প্রার্থী দিয়েছিল। পরে জোটের স্বার্থে অনেক প্রার্থী মনোনয়ন প্রত্যাহার করেন। এখন আমাদের একক প্রার্থী ঘোষণার বিষয়টিও ঠিক সেরকমই ধরতে পারেন।’ দলটির একাধিক নেতা জানিয়েছেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন আর জাতীয় নির্বাচন এক নয়। এখানে প্রভাবশালী প্রার্থী, স্থানীয় শক্তি, অর্থনৈতিক সক্ষমতা এবং এলাকার ভোটব্যাংক বড় ভূমিকা রাখে। এসব জায়গায় এনসিপি এখনও পুরোপুরি প্রস্তুত নয়। ফলে বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে সমমনা রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সমঝোতা বা সিটি কর্পোরেশনভিত্তিক জোটের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখছে তারা। এনসিপির কেন্দ্রীয় এক নেতা বলেন, ‘আমরা মাঠে কাজ করছি, কিন্তু স্থানীয় নির্বাচন হলো শক্তির পরীক্ষা। একা লড়াই করলে অনেক জায়গায় আমাদের প্রার্থী দাঁড়ানোর মতো অবস্থাও থাকবে না। তাই জোটই এখন সবচেয়ে বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত।’ ৫ সিটিতে মেয়র প্রার্থী ঘোষণা জানা গেছে, ঢাকা দক্ষিণ ও উত্তর সিটি কর্পোরেশনসহ দেশের পাঁচটি সিটি কর্পোরেশনের আসন্ন নির্বাচনে মেয়র পদে দলীয় প্রার্থী ঘোষণা করেছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। বাকি সাতটি সিটি কর্পোরেশনেও শিগগিরই প্রার্থী ঘোষণা করা হবে। এছাড়া, উপজেলা পরিষদ ও পৌরসভা নির্বাচনের জন্য ইতোমধ্যে ২০০ প্রার্থীর নাম ঘোষণা করেছে দলটি৷ ঘোষণা অনুযায়ী, ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনে মেয়র পদে লড়বেন এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া। ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক ও মহানগর উত্তরের আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীব। এছাড়া, কুমিল্লা সিটি কর্পোরেশনে জাতীয় যুবশক্তির আহ্বায়ক তারিকুল ইসলাম, রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনে মহানগর এনসিপির আহ্বায়ক মো. মোবাশ্বের আলী এবং সিলেট সিটি কর্পোরেশনে মহানগর এনসিপির আহ্বায়ক আবদুর রহমান আফজাল মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন। তবে, এনসিপির যুগ্ম সদস্য সচিব আলাউদ্দীন মোহাম্মদ বলেন, ‘জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ১১ দল মিলে একটি নির্বাচনী সমঝোতা বা জোট গড়ে তুলেছিল। এই জোটের মূল উদ্দেশ্য ছিল সংস্কারের রাজনীতিকে ত্বরান্বিত করা। তবে, নির্বাচন শেষ হওয়ার পর বিএনপির সংস্কারবিরোধী অবস্থান এবং সংবিধান সংস্কার পরিষদে শপথ গ্রহণ না করার মাধ্যমে বিএনপি মূলত নিজেদের বাইরের সংস্কারপন্থী দলগুলোকে আলাদা অবস্থানে ঠেলে দিয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘১১ দলের এই জোট এখনও বজায় রয়েছে। তবে, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে জোটগতভাবে অংশ নেওয়ার সম্ভাবনা কিছুটা কম। কারণ, স্থানীয় সরকার নির্বাচন দলীয় প্রতীকে হবে না। ফলে জোটভুক্ত দলগুলো বিভিন্ন এলাকায় নিজেদের স্বতন্ত্র প্রার্থী দিতে পারে। যদিও নির্বাচনী জোট বহাল রাখার স্বার্থে স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও সমন্বয় করে কাজ করার সুযোগ রয়েছে।’ জামায়াতের সঙ্গে জোটের সমীকরণ দলীয় সূত্র জানায়, এনসিপি ইতোমধ্যে জাতীয় নির্বাচনের রাজনীতিতেও জোটকে গুরুত্ব দিয়েছে। গত জাতীয় নির্বাচনে দলটি জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোট করে নির্বাচনী মাঠে অংশ নিয়েছিল এবং সংসদের ছয়টি আসনে বিজয় লাভ করেছিল। সেই ধারাবাহিকতা রাখতে স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও জোটভিত্তিক কৌশলকে সামনে আনছে দলটি। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারলে এনসিপি ভবিষ্যতের জাতীয় রাজনীতিতে নিজেদের গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে পারবে। অন্যদিকে, জামায়াতও সংগঠনকে মাঠে আরও সক্রিয় রাখতে এই জোটকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখছে। সবমিলিয়ে, ঢাকা মহানগরের উত্তর ও দক্ষিণ সিটিতে ভাগাভাগি করে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার পরিকল্পনা এনসিপি-জামায়াত জোটের রাজনীতিতে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এ বিষয়ে এনসিপি যুগ্ম সদস্য সচিব আলাউদ্দীন মোহাম্মদ আরও বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন ও জাতীয় নির্বাচনের ধরন আলাদা। জাতীয় নির্বাচনে একটি সামগ্রিক রাজনৈতিক লক্ষ্য থাকে, কিন্তু স্থানীয় সরকার নির্বাচনে স্থানীয় প্রভাব ও নেতাকর্মীদের শক্ত অবস্থান বেশি গুরুত্ব পায়। তাই স্থানীয় সরকার নির্বাচনের সঙ্গে জাতীয় রাজনীতির সম্পর্ক তুলনামূলক কম। তিনি বলেন, যদি ১১ দলের জোট স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও ঐক্য ধরে রাখতে পারে, তাহলে তা জোটের জন্য ইতিবাচক হবে। কিন্তু জোটসমর্থিত প্রার্থীরা যদি একে অপরের বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন, তাহলে ভবিষ্যতে এই জোট দুর্বল হয়ে যেতে পারে, এমনকি ভেঙেও যেতে পারে। সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে শুরু হচ্ছে ভোট এদিকে, স্থানীয় সরকার নির্বাচন কবে আয়োজন করা হবে, তার সুনির্দিষ্ট তারিখ এখনও ঘোষণা করা হয়নি। এর আগেই সিটি কর্পোরেশন, উপজেলা ও পৌরসভার প্রার্থীদের নাম ঘোষণা করছে জাতীয় নাগরিক পার্টি। সিটি কর্পোরেশনগুলোতে প্রশাসক নিয়োগ দেওয়াকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক মহলে একটি নেতিবাচক বার্তা গিয়েছিল যে, হয়তো দ্রুত সময়ের মধ্যে নির্বাচন হবে না। তবে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম জানিয়েছেন, এ বছরের সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মাস থেকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু করবে সরকার। আগামী এক বছরের মধ্যে পাঁচটি স্থানীয় সরকার নির্বাচন শেষ করা হবে। কোন নির্বাচন আগে হবে— এ বিষয়ে তিনি বলেন, বাজেট প্রাপ্তিসাপেক্ষে কোন নির্বাচন আগে হবে তা ঠিক করা হবে। ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন দিয়ে শুরু হবে স্থানীয় সরকার নির্বাচন। এরপর ধাপে ধাপে বেশি বাজেটের নির্বাচনগুলো সম্পন্ন করা হবে। |