|
পদোন্নতিবঞ্চিত ২৫০০: ঈদ আসে-যায়, শেষ হয় না চিকিৎসকদের অপেক্ষা
নতুন বার্তা, ঢাকা:
|
ডা. মীর রাশেদুল হাসান। জাতীয় কিডনি রোগ ও ইউরোলজি ইনস্টিটিউটের আবাসিক চিকিৎসক। সহকারী অধ্যাপক পদে পদোন্নতি পাওয়ার জন্য আবেদন করতে গিয়ে দেখেন সার্ভারে এক্সেস বন্ধ। তার সঙ্গে আরও এমন দুই শতাধিক চিকিৎক আছেন যারা সব যোগ্যতা অর্জন করেও দেখেন আবেদনের সুযোগ নেই। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় এ নিয়ে তারা স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও মন্ত্রণালয়ে ঘুরে সমাধান না পেয়ে আদালতের দ্বারস্থ হয়েছেন। তখন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে বলা হয়েছে, পদোন্নতি যোগ্য সবাইকে বিবেচনা করা হবে। বাস্তবে তা হয়নি।কে এ এম মাহবুব হাসান ও আব্দুল্লাহ আল মামুন। কার্ডিওলজিস্ট। জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের সহকারী অধ্যাপক। ইলেক্টো ফিজিওলজি স্পেশালিটিতে দুটি পদের বিপরীতে তারা দুজনই আছেন সেখানে। পদোন্নতি পাওয়ারও হকদার। কিন্তু তাদের আবেদনে ‘পরবর্তী পদোন্নতির জন্য আগ্রহী’ অপশনে টিক মার্ক না দেওয়ায় বিবেচনা করা হয়নি। তাদের মতো এমন বঞ্চিতের সংখ্যা দুই শতাধিক। কে এ এম মাহবুব হাসান বলেন, “আমরা যে পদে আছি তাতে ৫ বছর না হলে পদোন্নতির জন্য বিবেচিত হয় না। সেজন্য আমরা ‘পরবর্তী পদোন্নতির জন্য আগ্রহী’ অপশনে টিক দেইনি। কিন্তু পরে দেখলাম, আমাদের জুনিয়রদেরও প্রমার্জনা দিয়ে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। তখন আমরা যোগাযোগ করেছি। বলা হয়েছিল, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে প্রক্রিয়া অনুসরণ করে তালিকা মন্ত্রণালয়ে পাঠাতে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে যোগাযোগ করলে তারা বলে, আমরা পাঠিয়েছি। মন্ত্রণালয় বলে আমরা পাইনি। এভাবে করে ইন্টেরিম সরকার সময় পার করেছে।” শুধু মাহবুব হাসান বা রাশেদুল নয়, ‘পরবর্তী পদোন্নতির জন্য আগ্রহী’ টিক মার্ক না দেওয়া, স্পেশালাইজড ডিগ্রি না থাকা এবং প্রকল্প থেকে রাজস্বভুক্তসহ বিভিন্ন কারণে ৭০০ চিকিৎসক পদোন্নতি বঞ্চিত হয়েছেন। পাশাপাশি সব ক্রাইটেরিয়া পূরণের পরও শুধু রাজনৈতিক বিবেচনায় প্রায় এক হাজার ৮০০ চিকিৎসক পদোন্নতিবঞ্চিত। তাদের একজন বলেন, ‘আমরা রোগীদের সেবা দিয়ে থাকি। আদর্শিক সমর্থন থাকতেই পারে। তাই বলে আমাদের অধিকার বঞ্চিত করা হবে? এতে তো রোগীদেরও অধিকার বঞ্চিত করা হয়।’ অন্তর্বর্তী সরকার ১০ হাজার চিকিৎসকের পদোন্নতি দেওয়ার ঘোষণা দিয়ে কাজ শুরু করেছিল। প্রায় সাড়ে সাত হাজার চিকিৎসককে পদোন্নতি দিলেও বঞ্চিত হয়েছেন প্রায় আড়াই হাজার চিকিৎসক। তৎকালীন স্বাস্থ্যসচিব মো. সাইদুর রহমান বলেন, ‘আমরা বলেছিলাম ১০ হাজার চিকিৎসককে পদোন্নতি দেবো। কারণ অধিকার বঞ্চিত করে তাদের থেকে তো আমি ভালো সেবা আশা করতে পারি না। সে লক্ষ্যে কাজও শুরু করেছিলাম। প্রায় সাত হাজার ৫০০ চিকিৎসক পদোন্নতি পেয়েছেন। বাকিদের কাজও চলমান রেখে এসেছি। আশা করি, যারা দায়িত্বে এসেছেন তারা এটা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিবেচনা করবেন।’ গত ৩০ মার্চ রাজধানীতে চক্ষু চিকিৎসকদের এক সম্মেলনে স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ডা. এম এ মুহিত বলেছেন, রাজনৈতিক বিবেচনায় অতীতে চিকিৎসকদের ওপর নানা নিপীড়ন চালানো হয়েছিল। অনেক চিকিৎসককে উচ্চতর শিক্ষাও নিতে দেওয়া হয়নি। বছরের পর বছর পদোন্নতিবঞ্চিত করে রাখা হয়েছিল। আমরা এমন স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তুলবো যেখানে দলীয় বিবেচনায় কেউ বঞ্চিত হবে না। নিপীড়নের শিকার হবে না।’ অবশ্য তার এই বক্তব্যের প্রতিফলন দেখা যায়নি। এখনও পদায়ন, পদোন্নতি ও বদলি দলীয় বিবেচনায় হয়। গত ঈদুল ফিতরের কয়েকদিন আগে পদোন্নতিবঞ্চিতদের একটা অংশ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে দেখা করেন। তাদের বিষয়টি বিবেচনার আশ্বাসও দেন প্রধানমন্ত্রী। ঈদুল ফিতরের আগে পদোন্নতিবঞ্চিতদের নিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘সিদ্ধান্ত ফাইনালে পৌঁছতে পারিনি। এটা নিয়ে আমরা আলাপ করছি। তিনটা ঝামেলা আছে। আমরা ঈদের পর একটা কমপ্রোমাইজিং পরিস্থিতিতে পৌঁছার চেষ্টা করছি।’ তবে ঈদুল ফিতর গিয়ে ঈদুল আজহা চলে এসেছে। এখনো বঞ্চিত রয়ে গেছেন আড়াই হাজার চিকিৎসক। পদোন্নতিবঞ্চিত চিকিৎসক ও রাজধানীর চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের সহকারী পরিচালক ডা. এইচ ই এম রেজওয়ানুর রহমান সোহেল বলেন, ‘ঈদ আসে, ঈদ যায়, মন্ত্রী-সচিবরা বলেন, হবে। কিন্তু কাজ হয় না।’ তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ‘ছাত্রদল করার কারণে ১৯৯৬ সালে ঢাকা মেডিকেল কলেজ ছাত্রাবাসে আওয়ামী লীগের হামলার শিকার হয়ে গুলিবিদ্ধ হই। ১/১১ সরকারের সময় ভর্তি পরীক্ষায় প্রথম স্থান অর্জন করে নেফ্রোলজির এমডি কোর্সে ভর্তি হলেও চূড়ান্ত পরীক্ষায় অংশ নিতে দেওয়া হয়নি। ৩ মাসে ৬ বার বদলি করা হয়েছে, যোগদান নেয়নি। হাইকোর্টে প্রতিকার পেয়ে যোগদান করতে হয়। ২০০৩ সালে কিডনি হাসপাতালের (নিকডু) প্রজেক্টে জয়েন করলেও ২০১৫ সালে ষষ্ঠ গ্রেড দেয়। চাকরির ২৩ বছরেও পদোন্নতি পাইনি। আমার মতো অনেকেই জাতীয়তাবাদী আদর্শের কারণে পদোন্নতি বঞ্চিত।’ |