|
৭১-এর মানবতাবিরোধী অপরাধ: ২৯ মামলায় ১০৫ আসামির কেউই কারাগারে নেই
নতুন বার্তা, ঢাকা:
|
মহান মুক্তিযুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের জন্য ২০১০ সালে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠন করে। সবশেষ ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার জুলাইয়ের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের জন্য পুনর্গঠন করে একই ট্রাইব্যুনাল। আর এরপর থেকেই মূলত একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার অনেকটাই থমকে দাঁড়িয়েছে।ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন মামলা ২৯টি ট্রাইব্যুনাল-সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারাধীন মামলার সংখ্যা ২৯টি। এসব মামলায় মোট আসামির সংখ্যা ১০৫ জন। কিন্তু ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ট্রাইব্যুনালে এসব মামলার বিচারিক কার্যক্রম চলছে না। এসব মামলার কোনো আসামি গ্রেফতার হয়ে কারাগারেও নেই। ২০০৯ সালে একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের উদ্যোগ নেয় তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার। এরপর ২০১০ সালের ২৫ মার্চ পুরাতন হাইকোর্ট ভবনে স্থাপন করা হয় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। মামলার সংখ্যা বাড়ার কারণে ২০১২ সালের ২২ মার্চ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ নামে আরেকটি ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়। পরবর্তীতে মামলা কমে আসায় ২০১৩ সালের ১৩ অক্টোবর দুটি ট্রাইব্যুনাল পুনর্গঠন করা হয়। ২০১০-২০২৪ সাল পর্যন্ত সর্বমোট ৫৯ মামলায় ১৯৭ জনের বিরুদ্ধে রায় ঘোষণা করা হয়। এর মধ্যে আপিল বিভাগে ১০টিরও বেশি মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি করা হয়েছে। এখনো সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে নিষ্পত্তির অপেক্ষায় ৪০টির বেশি মামলা। পুনর্গঠনের আগে ৫৯ মামলার রায়, মৃত্যুদণ্ড কার্যকর ৬ জনের পুনর্গঠনের আগে ১৫ বছরের বেশি সময়ে একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের মোট ৫৯টি মামলার রায় দিয়েছিলেন ট্রাইব্যুনাল। এর মধ্যে সব আইনি প্রক্রিয়া শেষে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছিল ছয়জনের। তাদের মধ্যে পাঁচজন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর শীর্ষস্থানীয় নেতা এবং একজন বিএনপির শীর্ষস্থানীয় নেতা। একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাতটি রায়ের মধ্যে ছয়টিতে জামায়াতে ইসলামীর দুই সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল কাদের মোল্লা ও মুহাম্মদ কামারুজ্জামান, দলটির সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাউদ্দিন কাদের (সাকা) চৌধুরী, জামায়াতের আমির মতিউর রহমান নিজামী ও জামায়াতের নির্বাহী পরিষদের সদস্য মীর কাসেম আলীর ফাঁসি কার্যকর করে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার। এ ছাড়া আমৃত্যু কারাদণ্ড ভোগ করে মৃত্যুবরণ করেন জামায়াত নেতা মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী। অন্যদিকে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ চূড়ান্ত রায় রিভিউতে জামায়াতের সাবেক ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি জেনারেল এটিএম আজহারুল ইসলামকে মৃত্যুদণ্ড থেকে খালাস দিয়েছেন। কখন, কার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছিল প্রথম মৃত্যুদণ্ড: প্রথমে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয় জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আব্দুল কাদের মোল্লাকে। ২০১২ সালের ১২ ডিসেম্বর তার ফাঁসির আদেশ কার্যকর করা হয়। দ্বিতীয় মৃত্যুদণ্ড: দ্বিতীয় অপরাধী হিসেবে ২০১৫ সালের ১১ এপ্রিল রাত ১০টা ১ মিনিটে মানবতাবিরোধী অপরাধে দোষী সাব্যস্ত জামায়াত নেতা মুহাম্মদ কামারুজ্জামানকে ফাঁসির দড়িতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। তৃতীয় ও চতুর্থ মৃত্যুদণ্ড একসঙ্গে কার্যকর: একই অপরাধে জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহ উদ্দিন কাদের (সাকা) চৌধুরীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয় ২০১৫ সালের ২২ নভেম্বর রাত ১২টা ৫৫ মিনিটে। পঞ্চম মৃত্যুদণ্ড: একই অপরাধে জামায়াতের আমির মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীকে ২০১৬ সালের ১১ মে রাত ১২টা ১০ মিনিটে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। ষষ্ঠ মৃত্যুদণ্ড: একই অপরাধে জামায়াতে ইসলামীর নির্বাহী পরিষদের সদস্য মীর কাসেম আলীর ফাঁসি কার্যকর করা হয় ২০১৬ সালের ৩ সেপ্টেম্বর কাশিমপুর কারাগারে রাত ১০টা ৩৫ মিনিটে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মামলায় প্রাধান্য বেশি সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর বিচারক, আইনজীবী ও তদন্ত সংস্থার কর্মকর্তারা পদত্যাগ করে চলে যান। এর পর আবারও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল পুনর্গঠন করেন অন্তর্বর্তী সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়। ২০২৪ সালের ১৪ অক্টোবর রাতে হাইকোর্টের বিচারপতি গোলাম মর্তুজা মজুমদারকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান করে প্রজ্ঞাপন জারি করে আইন মন্ত্রণালয়। এর পর ২০২৫ সালের ৮ মে হাইকোর্ট বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীকে চেয়ারম্যান করে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ গঠন করে সরকার। ২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার আন্দোলন দমনে আওয়ামী লীগের দলীয় ক্যাডার ও সরকারের অনুগত প্রশাসনসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একটি অংশ হত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত করে বলে একের পর এক অভিযোগ জমা পড়ে। পৃথক দুটি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে এসব অপরাধের বিচার কাজ চলছে। যদিও এখন ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে করা ২৯টি মামলা রয়েছে। তবে আগের এসব মামলায় আপাতত বিচার কার্যক্রম চলছে না। চলমান ২৯ মামলার মোট আসামি ১০৫ জন। তারা সবাই জামিনে আছেন। এ বিষয়ে চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, ২০২৪ সালের জুলাই আগস্টে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে করা মামলায় বিচার বেশি প্রায়োরিটি (অগ্রাধিকার) দিয়ে চলছে। তাই আগের মামলাগুলোর বিচার আপাতত হচ্ছে না। আবুল কালাম আযাদের মৃত্যুদণ্ড দিয়ে শুরু হয়েছিল বিচার একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় প্রথম রায় ঘোষণা করা হয় ২০১৩ সালের ২১ জানুয়ারি। সেদিন রায়ে জামায়াতে ইসলামীর রোকন বা সদস্য মাওলানা আবুল কালাম আযাদকে মৃত্যুদণ্ড দেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। এর পর একে একে ৫৯টি মামলায় রায় ঘোষণা করেন ট্রাইব্যুনাল। তবে মৃত্যুদণ্ডের রায়ের বিরুদ্ধে করা আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আবুল কালাম আযাদের সাজা এক বছরের জন্য স্থগিত করেন রাষ্ট্রপতি। পরে ২০২৫ সালের ২২ অক্টোবর ট্রাইব্যুনালে আত্মসমর্পণ করেন তিনি। এ সময় তিনি (আবুল কালাম) ‘যেমন আছেন, তেমন থাকার’ আদেশ দেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। এ বিষয়ে জানতে চাইলে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের ডেপুটি রেজিস্ট্রার মো. মাহমুদুল হাসান বলেন, ২০২৪ সালের আগে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা ২৯টি। এসব মামলায় আসামির সংখ্যা ১০৫ জন। তবে এখন কোনো আসামি কারাগারে নেই। আসামিদের বেশিরভাগই জামিনে আছেন বলেও জানান তিনি। |