|
ঈদে জনশূন্য ঢাকা: বাসাবাড়ি নিরাপদ রাখতে পুলিশের নিরাপত্তা ছক
নতুন বার্তা, ঢাকা:
|
রমজান শেষের পথে। দরজায় কড়া নাড়ছে পবিত্র ঈদুল ফিতর। নাড়ির টানে তপ্ত কংক্রিটের রাজধানী ছাড়ছে লাখো মানুষ। বাস টার্মিনাল, রেলস্টেশন, লঞ্চঘাট-সবখানেই উপচে পড়া ভিড়। কিন্তু রাজধানীর আবাসিক এলাকাগুলোর চিত্র ঠিক উলটো। অভিজাতপাড়া থেকে মধ্যবিত্তের আবাসন-সবই এখন প্রায় জনশূন্য। নির্জন অলিগলি আর খাঁ খাঁ করা ফ্ল্যাটবাড়িগুলো এই ঈদ আনন্দেই বয়ে আনতে পারে চরম বিষাদ। প্রতিবছর ঈদের ছুটিতে এমন ফাঁকা ঢাকাই হয়ে ওঠে চোরচক্রের টার্গেট। মানুষ যখন গ্রামে ঈদ উৎসবের আমেজে ব্যস্ত, তখন তাদের ঢাকার ফ্ল্যাট কতটা নিরাপদ-সেই প্রশ্নই এখন বড় হয়ে উঠছে।গোয়েন্দা তথ্য বলছে, ঈদের ছুটিকে ঘিরে আগে থেকেই ছক কষে প্রস্তুতি নেয় পেশাদার চোরচক্র। তাদের সদস্যরা দিনের বেলায় এলাকা রেকি করে। কখনো হকার সেজে, কখনো ভিক্ষুকের ছদ্মবেশে। তারা খেয়াল করে-কোন ফ্ল্যাটটি অন্ধকার আর কোথায় কদিন ধরে কেউ নেই। নিশ্চিত হওয়ার পরই তালাবদ্ধ ফ্ল্যাটে শুরু হয় রাতের অপারেশন। জানা গেছে, আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়ায় এখনকার চোররাও অনেক স্মার্ট। তাদের সঙ্গে থাকে গ্রিল কাটার পোর্টেবল মেশিন ও উন্নত মানের মাস্টার কি (চাবি)। এমনকি সিসি ক্যামেরা ঝাপসা করার স্প্রে বা সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার কৌশলও এখন তাদের নখদর্পণে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, অপরাধের ধরন এখন অনেক পালটেছে। আগে শুধু গ্রিল কেটে চুরি হতো, এখন চোরচক্রের দলে থাকে লকার বা ডিজিটাল ভল্ট ভাঙার এক্সপার্ট। অনেক সময় তারা ভবনের নিরাপত্তাকর্মীদের সঙ্গে সখ্য গড়ে তোলে তথ্য সংগ্রহ করে। আবার কখনো বাড়ির দারোয়ানকে নেশাজাতীয় কিছু খাইয়ে অচেতন করে অবলীলায় লুটপাট চালায়। ধানমন্ডি, গুলশান, উত্তরা কিংবা বনানীর মতো অভিজাত এলাকায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা বেশি থাকলেও নজরদারির অভাবে সেগুলোই অপরাধীদের প্রথম টার্গেটে পরিণত হয়। অন্যদিকে বাড্ডা বা মোহাম্মদপুরের মতো জনাকীর্ণ এলাকায় ঝুঁকি যেন আরও এক ধাপ বেশি। ঈদে ফাঁকা ঢাকার নিরাপত্তায় নজিরবিহীন প্রস্তুতি নিয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। ডিএমপির ভারপ্রাপ্ত কমিশনার মো. সরওয়ার নগরবাসীকে সতর্ক করে বলেছেন, সীমিত জনবল নিয়ে পুলিশ সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে। তবে নাগরিকদের নিজস্ব সচেতনতা ছাড়া শতভাগ নিরাপত্তা অসম্ভব। সন্দেহজনক কিছু দেখলেই তাৎক্ষণিক ‘৯৯৯’-এ কল করার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। ঈদে ঢাকা ছাড়ার আগে নগদ অর্থ, স্বর্ণালংকার বা গুরুত্বপূর্ণ দলিলাদি ‘অরক্ষিত অবস্থায়’ না রেখে আত্মীয়স্বজনদের বাসায় রেখে যেতে পরামর্শ দেন ডিএমপি কমিশনার। যাদের ঢাকায় আত্মীয়স্বজন নেই, তাদের প্রয়োজনে থানায় রাখার কথাও জানান তিনি। এদিকে র্যাব জানিয়েছে, এবার তিন স্তরের বিশেষ নিরাপত্তা বলয়ে থাকবে রাজধানী। র্যাব-১০-এর অধিনায়ক ও অতিরিক্ত ডিআইজি মোহাম্মদ কামরুজ্জামান জানান, সদরঘাট ও সায়েদাবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে ৩২টি টিম সার্বক্ষণিক কাজ করবে। পাশাপাশি গোয়েন্দা নজরদারিতে থাকবে আরও ৬টি সিভিল টিম। পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) আলী হোসেন ফকির মঙ্গলবার গাবতলী পরিদর্শন করে বলেন, ঈদযাত্রায় কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা বা যাত্রী হয়রানি বরদাশত করা হবে না। মহাসড়কে যানজট কমাতে যেমন বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, তেমনি শহরের ভেতরে অবৈধ বাস কাউন্টার উচ্ছেদেও শুরু হয়েছে অভিযান। চুরির পর মামলা করার চেয়ে ‘প্রতিরোধ’ করাই বুদ্ধিমানের কাজ বলে মনে করেন অপরাধ বিশ্লেষকরা। তারা বলছেন, বাড়ি ছাড়ার আগে কিছু বিষয় খেয়াল রাখা জরুরি। শুধু একটি তালার ওপর ভরসা করা ঝুঁকিপূর্ণ। বাড়ি ছাড়ার আগে কিছু বিষয় অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে। বড় অঙ্কের টাকা বা স্বর্ণালংকার বাসায় না রেখে বিশ্বস্ত কারও কাছে রাখার পক্ষে মত দিয়েছেন তারা। বিশেষজ্ঞদের মতে, দরজায় অতিরিক্ত বাইরের চেইন ব্যবহার না করাই ভালো। এটি ফাঁকা থাকার সংকেত দেয়। স্মার্ট লক বা ইন্টারনাল লক ব্যবহার করা নিরাপদ। বাড়ি যাওয়ার আগে ফ্ল্যাটের সিসি ক্যামেরা সচল আছে কি না দেখে নিতে হবে। গ্যাসের মেইন সুইচ বন্ধ রাখা এবং অপ্রয়োজনীয় বৈদ্যুতিক সংযোগ খুলে রাখা, বারান্দায় কাপড় মেলে না রাখা এবং ফেসবুকে ‘চেক-ইন’ দেওয়া থেকে বিরত থাকা নিরাপদ। অপরাধীরা এখন সোশ্যাল মিডিয়ায়ও নজর রাখে। এছাড়া অ্যাপার্টমেন্টগুলোতে অস্থায়ীভাবে বাড়তি গার্ড রাখা যেতে পারে। রাতে পর্যাপ্ত আলো থাকাও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। |