|
বাজার তদারকি না থাকায় ঈদের আগে সিন্ডিকেট সক্রিয়: ভোজ্য তেলের কৃত্রিম সঙ্কট
নতুন বার্তা, ঢাকা:
|
রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশের বাজারে ভোজ্যতেল সংকটের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। খুচরা বাজারে অনেক জায়গায় সয়াবিন তেল খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না, কোথাও আবার সীমিত পরিমাণে বিক্রি করা হচ্ছে। ফলে বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। এতে ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ মানুষ।ভোজ্যতেলের সংকটের পেছনে আমদানি সংকোচন ও সরবরাহ ঘাটতিকে দায়ী করছেন বাজার সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে আমদানি প্রক্রিয়া সহজ করা, সরবরাহ ব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং নিয়মিত বাজার তদারকি জরুরি। অন্যথায় ভোজ্যতেলের বাজারে অস্থিরতা অব্যাহত থাকতে পারে, যার প্রভাব সরাসরি পড়বে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ওপর। আর ক্যাব বলছে, তেলের সংকট মূলত কৃত্রিমভাবে তৈরি করা হয়েছে। প্রয়োজন সরকারের জোরদার মনিটরিং ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা। অথচ ভোজ্য তেলের বাজার মনিটরিং চোখে পড়ছে না। ব্যবসায়ীদের দাবি, বাজারে সরবরাহ কমে যাওয়ায় তারা পর্যাপ্ত তেল পাচ্ছেন না। আগের মতো কোম্পানিগুলো থেকে তেল পাওয়া যাচ্ছে না। যেটুকু আসে সেটাও খুব সীমিত। তবে টাকা হলে মাল ঠিকই পাওয়া যায়। সেক্ষেত্রে দাম বেশি ধরে মেমোতে কম দেখায়। মূলত মিল মালিকরা সিন্ডিকেট করে একটা কৃত্রিম সংকট তৈরির চেষ্টা করে যাচ্ছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারে ভোজ্যতেলের দাম বাড়ায় আমদানিকারকদের খরচ বেড়েছে। পাশাপাশি ডলার সংকটের কারণে সময়মতো এলসি খোলা যাচ্ছে না। ফলে আমদানি ব্যাহত হচ্ছে এবং বাজারে সরবরাহেও প্রভাব পড়ছে। বাজারে ভোজ্যতেলের কথিত সংকটকে মূলত কৃত্রিম বলে মনে করছে ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)। সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট হুমায়ুন কবীর ভূঁইয়া বলেন, দেশে ভোজ্যতেলের প্রকৃত কোনো ঘাটতি নেই। কিছু অসাধু ব্যবসায়ী সরকারকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করার চেষ্টা করছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে যেভাবে তথ্য দেওয়া হচ্ছে তাতে দেশের চাহিদা অনুযায়ী ভোজ্যতেলের সরবরাহ থাকার কথা। বাজারে পর্যাপ্ত তেল রয়েছে এবং রিফাইনারি কোম্পানিগুলোর কাছেও মজুদ আছে। তাই সরবরাহের ঘাটতি হওয়ার কোনো কারণ নেই। সরকারের পক্ষ থেকে বাজার তদারকি জোরদার করা প্রয়োজন। মৌলভীবাজার ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক বাংলাদেশ মালিক সমিতির সহসভাপতি এবং বাংলাদেশ তেল ব্যবসায়ী সমিতির সাবেক সভাপতি মো. গোলাম মওলা বলেন, আমাদের কাছে গত বছরের তুলনায় আমাদের কাছে প্রায় ৪২ শতাংশ বেশি পণ্য মজুত রয়েছে। আমরা যে হিসাব করেছি তাতে পণ্যের কোনো ঘাটতি কথা না। কেউ যদি কৃত্রিমভাবে সরবরাহ কমিয়ে ভোক্তাদের কষ্ট দেয়, সেটি গ্রহণযোগ্য নয়। গতকাল শনিবার রাজধানীর শনির আখড়া, যাত্রাবাড়ি, সূত্রাপুর, শ্যামবাজার, ধূপখোলামাঠ, রায়সাহেব বাজার, নয়াবাজারসহ বিভিন্ন এলাকার বাজার ঘুরে দেখা গেছে, বাজারের অধিকাংশ দোকানে পাঁচ লিটারের সয়াবিন তেল পাওয়া যাচ্ছে না। কোথাও কোথাও এক লিটার ও দুই লিটারের বোতল মিললেও পাঁচ লিটারের বোতল খুব কম পাওয়া যাচ্ছে। অনেক দোকানে বোতলজাত সয়াবিন তেল নেই। কিছু দোকানে সীমিত পরিমাণে তেল বিক্রি করা হচ্ছে। তবে বাজারে ক্যানোলা তেল পাওয়া যাচ্ছে, যদিও এর দাম তুলনামূলক বেশি। খুচরা দোকানদাররা জানিয়েছেন যে সিটি গ্রুপ, পুষ্টি ও তীর ব্র্যান্ডের তেলের ডিলারদের সঙ্গে যোগাযোগ করা গেলেও অনেক সময় তারা ফোন ধরছেন না। আবার কেউ কেউ বলছেন, তাদের কাছে তেল নেই। ফলে খুচরা ব্যবসায়ীরা বাধ্য হয়ে মৌলভীবাজার থেকে নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে তেল কিনছে সে অভিযোগও পাওয়া গেছে। এক্ষেত্রে আরও একটি অনিয়মের অভিযোগ উঠে এসেছে। কিছু ব্যবসায়ী বেশি দামে তেল বিক্রি করলেও মেমো বা চালানে কম দাম দেখাচ্ছেন। এতে বাজারে স্বচ্ছতা নষ্ট হচ্ছে। শনির আখড়ার ব্যবসায়ী মনির হোসেন জানানলেন, কয়েকদিন থেকে কোম্পানী তেল দিচ্ছে না। তাই বিক্রি করতে পারছেন না। ডিলাররা বলছে, টাকা দিয়ে বসে আছি, মিল থেকে তেল পাচ্ছি না। এজন্য বাজারে সরবরাহ কমেছে। গায়ের রেট থেকে দাম বেশি নেওয়ার সুযোগ নেই। এখন পর্যন্ত পুরাতন মাল বিক্রি করছি। ৫ লিটারের বোতল পাওয়া যাচ্ছে না। আর এটার চাহিদা সবচেয়ে বেশি। আমার কাছে এক লিটার ও দুই লিটারের বোতল আছে। এটাতো এখন থেকে সংকট না। যুদ্ধ শুরুর আগে থেকেই এ অবস্থা। মূলত মিল মালিকরা সিন্ডিকেট করেছে। আমাদের কাছে তথ্য নিয়ে লাভ হবে না। মিলারদের কাছে কি পরিমাণ আছে সেটা যদি সরকার নিতে পারে এবং তাদের প্রেসার দিয়ে বাজারে সরবরাহ বাড়াতে পারে তাহলে এ সমস্যার সমাধান হবে। ধূপখোলা বাজারের আদর ষ্টোরের শহিদুল্লাহ বলেন, আগের মতো কোম্পানিগুলো থেকে তেল পাওয়া যাচ্ছে না। যেটুকু আসে সেটাও খুব সীমিত। ফলে ক্রেতাদের চাহিদা অনুযায়ী দিতে পারছি না। আজকে আমার কাছে ৫ লিটারের কোনো তেলের বোতল নেই। আগামী সপ্তাহ থেকে ঠিক হয়ে যাবে বলে ডিলাররা বলেছে। সে আশায় বসে আছি। যাত্রাবাড়িতে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক দোকানি বলেন, দুই লিটার ও এক লিটারের বোতল পাচ্ছি। ৫ লিটারের বোতল নেই বললেই চলে। ডিলারদের কাছে থাকলেও দেয় না। তারা গায়ের রেটের বেশি টাকা চায়। রূপচাঁদা, তীর, ফ্রেস ডিলারদের কাছে মাল নেই। গত এত সপ্তাহ ধরে এ সমস্যাটা তৈরি হচ্ছে। আমাদের কাছে না এসে পাইকারি ও মিলারদের কাছে যান। খোলা তেল ২০৫ টাকা কেজি। পাম ১৭০ টাকা কেজি। আর দুই লিটার বোতলের সয়াবিন তেল ৩৯০ টাকা, এক লিটার ১৯৫ টাকায় বিক্রি করছি। আরেক দোকানী বলেন, দোকানে কোনো সয়াবিন তেল নেই, ক্যানোলা ফুল থেকে তৈরি যে তেল সেটা আছে। এই তেলের দাম বেশি, চাহিদা কম। এখন বাধ্য হয়ে অনেকেই এই তেল নিচ্ছে। যেহেতু সয়াবিন তেল নাই৷ আমরাতো বেশ কয়েকদিন ধরে সয়াবিন তেল পাচ্ছি না। দেশে ভোজ্যতেলের বাজারে দেখা দেওয়া সংকটের পেছনে আমদানি সংকোচন ও সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতাকে বড় কারণ হিসেবে দেখছেন বাজার সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, দেশের ভোজ্যতেল বাজার আমদানিনির্ভর হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারের ওঠানামার প্রভাব দ্রুত পড়ে। কেবল ভোজ্যতেল নয়, সামগ্রিকভাবে প্রয়োজনীয় আমদানি কমে যাওয়ায় বাজারে সরবরাহের চাপ তৈরি হয়েছে, যার প্রভাব মূল্যস্ফীতিতেও পড়ছে। তাই দীর্ঘমেয়াদে দেশীয় বিকল্প উৎপাদন বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া প্রয়োজন। জানতে চাইলে রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্টের (র্যাপিড) চেয়ারম্যান অর্থনীতিবিদ প্রফেসর ড. মোহাম্মদ আব্দুর রাজ্জাক বলেন, বর্তমানে দেশ এক ধরনের ‘ইমপোর্ট কম্প্রেশন’ বা আমদানি সংকোচনের অবস্থার মধ্যে রয়েছে। ফলে যে পরিমাণ আমদানি হওয়া প্রয়োজন, বাস্তবে তা হচ্ছে না। এটা শুধু ভোজ্যতেলের ক্ষেত্রেই নয়। শিল্পপণ্য বা ক্যাপিটাল গুডস যেগুলো নতুন উৎপাদন সক্ষমতা তৈরি করতে আমদানি করা হয়। সে সবের আমদানিও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। ২০২২ সালে আমরা যতটা আমদানি করেছিলাম, এরপর তিন-চার বছর পেরিয়ে গেলেও সেই পর্যায়ে আর পৌঁছাতে পারিনি। এ বিষয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেছেন, আমদানিকারক ও রিফাইনারি মালিকদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী বাজারে ভোজ্যতেলের পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে। কোনো সংকট নেই, পর্যাপ্ত সরবরাহ রয়েছে। দাম এক ফোঁটাও বাড়বে না। আতঙ্কিত হয়ে বেশি বেশি কেনার কোনো প্রয়োজন নেই। |