|
অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠানে অনুদান
নতুন বার্তা, ঢাকা:
|
‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর’ নিয়ে অনিয়মের অভিযোগের পর এবার অস্তিত্বহীন সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের নামে অনুদান দেয়ার অভিযোগ উঠেছে সদ্য বিদায়ী উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর বিরুদ্ধে। সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ২০২৪-২৫ সালের অনুদানের তালিকা পর্যালোচনা করে এমন তথ্য উঠে এসেছে। গত কয়েকদিন অনুসন্ধান চালিয়ে অভিযোগের সত্যতা মিলেছে।অনুদানের একটি নথি পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, অস্তিত্বহীন নামসর্বস্ব থিয়েটারের নামে বিপুল অর্থ বরাদ্দ দিয়েছেন উপদেষ্টা ফারুকী। ওই নথিতে দেখা গেছে, সংস্কৃতি মঞ্জুরি খাত থেকে চারু শিল্প ও থিয়েটারের জন্য ফারুকী সারা দেশের তিন শতাধিক প্রতিষ্ঠানকে ২ কোটি ২২ লাখ ৪৩ হাজার টাকা অনুদান দেন। এর মধ্যে ১৭টি প্রতিষ্ঠান রাজধানীতে। সেই প্রতিষ্ঠানগুলোর বেশ কয়েকটিতে সরজমিন গিয়ে দেখা গেছে, নথিতে উল্লেখ করা ঠিকানায় কোনো কার্যক্রম বা সাইনবোর্ড নেই। ওই তালিকায় মিরপুরের বড়বাগ এলাকার ‘শিখা নাট্যগোষ্ঠী’ নামে এক প্রতিষ্ঠানও রয়েছে। ওই প্রতিষ্ঠানটিকেও উপদেষ্টা থাকাকালীন অনুমোদন দিয়েছেন মোস্তফা সরয়ার ফারুকী। তবে পুরো এলাকায় তন্নতন্ন করেও শিখা নাট্যগোষ্ঠীর কোনো অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। এলাকাটির স্থানীয় বাসিন্দারা বলেন, পুরো এলাকাতে ‘শিখা নাট্যগোষ্ঠী’ নামে কোনো প্রতিষ্ঠান নেই। শিখা নাট্যগোষ্ঠীর মতোই মিরপুর সেনপাড়ার ‘স্বর্ণধিতি’ নামের আরেক প্রতিষ্ঠানও অনুদান পায়। ওই ঠিকানাতে গিয়ে দেখা যায়, ভবনটি পুরোটাই আবাসিক। ভবন মালিক বলেন, আমার ভবনে কোনো চারু শিল্প বা থিয়েটার নেই। কোনোদিন ছিল না। আমার পুরো ভবনেই মানুষ ভাড়া থাকে। মিরপুরের রূপনগরের আরেকটি স্কুলের ঠিকানায় ‘সঞ্চুরি সাংস্কৃতিক শিক্ষালয়’ নামে একটি প্রতিষ্ঠানের নামে বরাদ্দ দেয়া হয়েছিল। কিন্তু ওই স্কুল কর্তৃপক্ষের ভাষ্য, সঞ্চুরি সাংস্কৃতিক শিক্ষালয় অন্তত ২ থেকে ৩ বছর আগেই তাদের কার্যক্রম গুটিয়ে নিয়ে চলে গেছে। শাহবাগের শেখ কামাল টেনিস কমপ্লেক্সে ‘স্বরকল্পন’ নামের প্রতিষ্ঠানটির নামেও সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় থেকে অনুদান দেয়া হয়। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে সেখানে তালা ঝুলছে। শেষ কবে ‘স্বরকল্পনে’ কার্যক্রম হয়েছে তা কেউই বলতে পারেনি। একই অবস্থা গুলিস্তানের বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ের ঠিকানায় থাকা ‘বাংলাদেশ সংস্কৃতি পরিষদ’-এর। মন্ত্রণালয় থেকে অনুদান পাওয়া এই প্রতিষ্ঠানটিরও কোনো অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। ফারুকীর অনুদান পাওয়া বনশ্রীর ‘সুরতাল শিল্পগোষ্ঠী’ এবং পুরান ঢাকার ওয়ারীর ‘বাংলাদেশ লোক সংস্কৃতি কেন্দ্র’ নামের প্রতিষ্ঠান সম্পর্কেও তথ্য দিতে পারেননি লিস্টে থাকা ঠিকনার বাসিন্দা ও ভবন মালিকরা। এসব অভিযোগের বিষয়ে যোগাযোগ করলে মোস্তফা সরয়ার ফারুকী এ বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি। অনুদানে অনিয়মের এই অভিযোগ ছাড়াও ফারুকীর বিরুদ্ধে ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর’ প্রতিষ্ঠা নিয়েও ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। কয়েক দফা তারিখ ঘোষণার পরও ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর’ উদ্বোধন করে যেতে পারেনি ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। গত ১৭ই ফেব্রুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে বিদায় নিয়েছে প্রফেসর ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। কিন্তু জুলাই স্মৃতি জাদুঘরে এখনো তৎপর বিদায়ী সংস্কৃতি বিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী। উপদেষ্টার দায়িত্ব ছাড়লেও তিনি প্রতিনিয়ত জাদুঘরে যাতায়াত করছেন।নিজের লোক দিয়ে তদারকি করছেন। আর ভেতরে ঠিক কী কাজ চলছে যার খবর নেয়ার অনুমতি খোদ সংবাদকর্মীদেরও নেই। বিষয়টি নিয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে জুলাই জাদুঘরের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, যেখানে সকল উপদেষ্টারা বিদায় নিয়েছেন। সেখানে শুধুমাত্র দুর্নীতির উদ্দেশ্যেই ফারুকী এখনো তার কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছেন। কর্মকর্তা বলেন, জুলাই স্মৃতি জাদুঘর প্রথম জাদুঘর যেখানে দুইটি খাত থেকে অর্থব্যয় করা হয়েছে। একদিকে জুলাই জাদুঘরের জন্য বরাদ্দকৃত অর্থব্যয় করা হয়েছে। অন্যদিকে একই কাজের জন্য আবার বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের বাজেট থেকে অর্থ নেয়া হয়েছে। কারণ আইন প্রণয়নের আগে পর্যন্ত জুলাই জাদুঘর, জাতীয় জাদুঘরের শাখা ছিল। অক্টোবর মাসের শেষের দিকে একটি অধ্যাদেশ প্রণয়ন করে জুলাই জাদুঘরকে পৃথক জাদুকরের মর্যাদা দেয়া হয়েছে। ফলে ওই তারিখ থেকে বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের অনুকূলে বরাদ্দকৃত বাজেট জুলাই জাদুঘরের জন্য ব্যয় করার কোনো আইনগত সুযোগ নেই। কিন্তু এখনো পর্যন্ত বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের অনুকূলে বরাদ্দকৃত বাজেট থেকে জুলাই জাদুঘরের জন্য ব্যয় চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে। একই কাজের জন্য একবার বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের বরাদ্দ থেকে বিল পরিশোধ করা হচ্ছে এবং আবার জুলাই জাদুঘরের অনুকূলে বরাদ্দ বাজেট থেকে দ্বিতীয়বারের মতো বিল পরিশোধ করা হচ্ছে। আর এই দুর্নীতি ও অনিয়মের সূত্রপাত ঘটেছে জাতীয় জাদুঘরের পরিচালক কাজী মনিরুল হকের নোট লেখার মধ্যদিয়ে। দ্বিতীয়ত, জাতীয় জাদুঘরের সেক্রেটারি মো. সাদিকুর রহমান এইসব অনিয়মকে আইনের মোড়কে উত্থাপন করেছেন। তৃতীয়ত, বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের মহাপরিচালক হিসেবে চুক্তিতে নিয়োগপ্রাপ্ত তানজিম ইবনে ওয়াহাব এইগুলো অনুমোদন করেছেন। আর এই সব ফাইলে ফারুকী সাহেবের স্বাক্ষর নেই অথচ সকল অনিয়ম এবং দুর্নীতির প্রধান সুবিধাভোগী তিনি। তিনি বলেন, সবচেয়ে বড় অনিয়ম করা হয়েছে কেনাকাটার ব্যাপারে। মূল জাদুঘরের ব্যাপারে মনোযোগ না দিয়ে বিলম্ব ঘটানোর স্বার্থে গণভবনের বহিরাঙ্গনের ব্যাপারে মনোযোগ দেয়া হয়েছে আগে। ?এই কাজটি করেছে গণপূর্ত বিভাগ। তারা ওপেন টেন্ডার করে কাজটি করেছে বিধায় এখানে পদ্ধতিগত দুর্নীতি নেই। কিন্তু জুলাই জাদুঘরের ইনটেরিয়র বিভিন্ন আসবাবপত্র এবং গ্যাজেট ক্রয় ইত্যাদির ব্যাপারে কখনোই কোনো টেন্ডার আহ্বান করা হয়নি। ফলে এখনো অব্যয়িত অর্থ রয়ে গেছে। মোস্তফা সারোয়ার ফারুকী এখনো এই জাদুঘরের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট রয়েছেন কারণ এই অব্যয়িত অর্থ তার পাওনা। এ ছাড়াও টেন্ডার ছাড়া সুনির্দিষ্ট ভেন্ডারকে দিয়ে কাজ করানো পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুলসের সম্পূর্ণ পরিপন্থি। এরপরও প্রতিটি ক্ষেত্রে চলতি? বাজারদরের পরিবর্তে তিন থেকে চার গুণ টাকার বিল করা হয়েছে। যার বেশির ভাগেরই অর্থ পরিশোধ করা হচ্ছে জুলাই জাদুঘরের বাজেট থেকে। মন্ত্রণালয়ের এই কর্মকর্তা বলেন, সাবেক উপদেষ্টা ফারুকী জুলাই জাদুঘরের দায়িত্ব গ্রহণ করার পর থেকে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা হিসেবে মন্ত্রণালয়ের চেয়ে গণভবনে বেশি সময় কাটিয়েছেন। ?গত ১১ মাসে বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর এর বাজেট থেকে প্রতিদিন ২০ থেকে ৪০ হাজার টাকা দুপুরের খাওয়া, বিকালের নাস্তা এবং রাত্রের খাবারের নামে ব্যয় করেছেন। বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের হিসাব কর্মকর্তার কাছে এর পূর্ণাঙ্গ বিবরণী রয়েছে। জাদুঘরে লোক নিয়োগের নামেও অর্থ কামানোর পরিকল্পনা নেয়া হয়েছিল। নির্বাচনের আগে মাত্র সাত দিনের নোটিশে লিখিত পরীক্ষা ছাড়া মৌখিক পরীক্ষার ভিত্তিতে রিক্রুটমেন্টের (নিয়োগ) আয়োজন করা হয়েছিল। এ বিষয়ে মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল কর্মকর্তা বলেন জাতীয় জাদুঘর ছাড়া যেখানে আহসান মঞ্জিল জাদুঘরের জন্য ২০ জন, চট্টগ্রামের জিয়া জাদুঘরের জন্য ১৮ জন, কুমারখালীতে কাঙ্গাল হরিনাথ জাদুঘরের জন্য ৬ জন, ফরিদপুরে জসিম উদ্দিন জাদুঘরের জন্য ৮ জন এবং সিলেটে ওসমানী জাদুঘরের জন্য বরাদ্দ মাত্র ৫ জন জনবল। সেখানে ফারুকী জুলাই জাদুঘরের জন্য ৩শ’ থেকে ৪শ’ লোক নিয়োগের পরিকল্পনা করেছিলেন।? অর্থ বিভাগ এবং জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় এর আপত্তির মুখে শেষ পর্যন্ত তা ১০৭ জনে নামিয়ে আনতে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় বাধ্য হয়। যদিও এখনো পর্যন্ত এই অবৈধ নিয়োগ প্রক্রিয়া বাতিল করা হয়নি এবং নিয়োগ বিধি মোতাবেক সুষ্ঠু নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু করা হয়নি। নথিপত্র পরীক্ষা করলে দেখা যাবে- গত বছরের জুন মাসে এই জাদুঘরের জন্য ৩৭ জন জনবল বরাদ্দ দেয়া হয়েছিল কিন্তু ফারুকীর নিজের লোক না হওয়ায় সেই নিয়োগের উদ্যোগ নেয়া হয়নি। জনবল নিয়োগ প্রক্রিয়া নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখতে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিতে নিয়োগের পরও তানজিম ইবনে ওয়াহাবকে বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরে মহাপরিচালক করেন ফারুকী। পরে ওই তানজিমকেই আবার জুলাই জাদুঘরের মহাপরিচালকের অতিরিক্ত দায়িত্ব অর্পণ করা হয়। |