|
জ্বালানি সংকটে ঝুঁকিতে উৎপাদন: শিল্প খাতে অগ্রাধিকার প্রয়োজন
নতুন বার্তা, ঢাকা:
|
অন্তর্বর্তী সরকারের শাসনামলে দেশের মেরুদ- খাদের কিনারে। বিনিয়োগ ছিল কার্যত বন্ধ। এখন ব্যবসায়ীরা ঘুরে দ্বাড়ানোর চেষ্টা করছেন। কিন্তু দেশে জ্বালানি সরবরাহে সংকট কিংবা দীর্ঘসূত্রতায় শিল্পে উৎপাদন ব্যাহত হয়। এর সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে।পাশাপাশি পণ্য পরিবহন ও বিপণনেও সমস্যা হয়। এমন পরিস্থিতিতে শিল্প খাতকে অগ্রাধিকার দিয়ে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা খুব জরুরি মনে করছেন অর্থনীতিবিদ, শিল্প উদ্যোক্তা ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে খাদ্যসামগ্রী, ভোজ্যতেল, ওষুধ, সার এবং কৃষি সম্পর্কিত উৎপাদন অব্যাহত রাখতে সরকারকে দ্রুত কার্যকর নীতি গ্রহণ করা আবশ্যক। জ্বালানি সংকটের সময় শিল্পকারখানায় উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেলে সরবরাহ শৃংখলে চাপ তৈরি হয় এবং বাজারে প্রয়োজনীয় পণ্যের ঘাটতি দেখা দিতে পারে। ফলে মূল্যস্ফীতিও বাড়ার ঝুঁকি থাকে। তাই জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় পরিকল্পিত ও অগ্রাধিকারভিত্তিক পদক্ষেপ নেওয়া এখন গুরুত্বপূর্ণ। জানতে চাইলে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সাবেক শিক্ষক, জ্বালানি ও টেকসই উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ প্রফেসর ড. ইজাজ হোসেন বলেন, কারখানা শ্রমিকরা পাঁচ থেকে ছয় দিনের ছুটিতে চলে যাবেন। ১৭ মার্চ থেকে এ সমস্যাটা চলে যাবে। ইন্ডাস্ট্রি যেন তাদের সক্ষমতা অনুযায়ী কাজ করতে পারে সেজন্য অবশ্যই চাহিদা মতো ফুয়েল সাপ্লাই দিতে হবে। কারখানা মালিকরা এমনিতেই ক্ষতিগ্রস্ত। কারখানায় যদি কাজ করতে না পারে তাহলে শ্রমিকদের বেতন দেবে কীভাবে? এজন্য অবশ্যই এখাতে নজর দেওয়া উচিত। বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, দেশের শিল্প খাতে জ্বালানি সরবরাহ অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জ্বালানি সংকটের কারণে যদি শিল্প উৎপাদন ব্যাহত হয়, তাহলে উৎপাদন কমে যাবে, কর্মসংস্থান হুমকির মুখে পড়বে এবং রপ্তানি আয়ও কমে যেতে পারে। ফলে দেশের অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। তাই শিল্প খাতে উৎপাদন স্বাভাবিক রাখতে এবং অর্থনীতির গতি বজায় রাখতে সরকারকে জ্বালানি সরবরাহে শিল্প খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বৈশ্বিকভাবে জ্বালানি তেলের সরবরাহে বিরূপ প্রভাব পড়েছে। দেশেও জ্বালানি সংকটের আশঙ্কায় বেশি পরিমাণে তেল কিনতে ফিলিং স্টেশনগুলোতে জমছে ভিড়। এ অবস্থায় গত ৬ মার্চ ফিলিং স্টেশন থেকে তেল সরবরাহের সীমা বেঁধে দিয়ে নির্দেশনা দিয়েছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। ফলে অনেকে প্রয়োজনীয় জ্বালানি পাচ্ছে না। আবার বেঁধে দেওয়া পরিমাণ পেতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা পাম্পের সামনে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে। এতে চলে যাচ্ছে অনেকটা সময়। যথাসময়ে পণ্য সরবরাহ করতে পারছে না কোম্পানিগুলো। শিল্প উদ্যোক্তারা বলছেন, উৎপাদন অব্যাহত রাখতে জ্বালানি সরবরাহ স্থিতিশীল থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এখন তারা পর্যাপ্ত জ্বালানি পাচ্ছেন না, আর পেট্রোল পাম্প থেকে জ্বালানি আনতেও অনেক সময় লাগছে। শিল্প খাতের জন্য অগ্রাধিকার ভিত্তিতে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে সরকারের দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া অত্যন্ত জরুরি—এমনটাই তারা বলছেন। দেশের অন্যতম বৃহৎ পণ্য সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান সিটি গ্রুপের পরিচালক বিশ্বজিৎ সাহা বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি কেবল দেশের অভ্যন্তরীণ কোনো সমস্যা নয়; এটি মূলত একটি বৈশ্বিক সংকটের অংশ। নিত্যপ্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্য এবং উৎপাদনশীল শিল্পখাতে যাতে কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত না হয়, সেজন্য জ্বালানি তেল ও গ্যাসের সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি। প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের বিপণন পরিচালক কামরুজ্জামান কামাল বলেন, বর্তমানে তেল সংকট আমাদের সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে। এ মুহূর্তে উৎপাদন ব্যয় সরাসরি উল্লেখযোগ্যভাবে না বাড়লেও পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে এর প্রভাব স্পষ্টভাবে দেখা দিতে পারে। বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, জ্বালানি ঘাটতির কারণে শুধু উৎপাদনই নয়, পুরো সরবরাহ ব্যবস্থাও চাপের মুখে পড়েছে। অনেক ক্ষেত্রে শ্রমিকদের নিয়মিতভাবে কাজে নিয়োজিত করা যাচ্ছে না। কারণ উৎপাদন লাইন স্বাভাবিকভাবে চালু রাখা সম্ভব হচ্ছে না। পাশাপাশি পরিবহনের জন্য পর্যাপ্ত তেল না থাকায় প্রস্তুত পণ্য নির্ধারিত সময়ে বাজার বা গন্তব্যে পাঠানোও কঠিন হয়ে পড়ছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, জ্বালানি সংকটের সময় শুধু সরবরাহ বাড়ানো নয়, চাহিদা ব্যবস্থাপনাও গুরুত্বপূর্ণ। তাই শিল্প উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত না হয় সে জন্য অ-জরুরি খাতে জ্বালানি ব্যবহারে সাময়িক সীমা আরোপ করা যেতে পারে। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো প্রফেসর ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, শিল্প উৎপাদন থেমে গেলে অর্থনীতির ওপর বহুমাত্রিক চাপ তৈরি হয়। এতে কর্মসংস্থান কমে, রপ্তানি ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং বাজারে পণ্যের দাম বাড়ে। তাই শিল্প খাতে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়া জ্বালানি আমদানি ও সরবরাহ ব্যবস্থার দক্ষতা বাড়ানোও জরুরি। বন্দর, সংরক্ষণাগার এবং পরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়নের মাধ্যমে জ্বালানি সরবরাহ দ্রুত ও নিরবচ্ছিন্ন করা সম্ভব। |