|
৬ কোটি টাকা আত্মসাৎ: বেরিয়ে এল ইসলামিক ফাউন্ডেশনের রাঘববোয়াল
নতুন বার্তা, ঢাকা:
|
ইসলামিক ফাউন্ডেশনের (ইফা) মসজিদভিত্তিক শিশু ও গণশিক্ষা প্রকল্পে (সপ্তম ফেইজের) ৬ কোটি টাকা আত্মসাতের ঘটনা ঘটেছে। অর্থ আত্মসাতে যে শুধু কর্মচারীরা জড়িত-তা কখনই হতে পারে না। এর পেছনে অনেক বড় রাঘববোয়াল রয়েছে।প্রকল্প পরিচালক, উপপরিচালক, সহকারী পরিচালক, অ্যাকাউন্ট্যান্ট এবং আইটি সহকারী মিলেমিশে এই দুর্নীতি করেছেন। এদিকে প্রকল্প পরিচালকরা সবাই ক্যাডার কর্মকর্তা হওয়ায় ইতোমধ্যে তাদের অনেকই অবসরে গেছেন। কর্মরতদের বিষয়ে কথা বলতে নারাজ তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। তাদের পরিষ্কার বক্তব্য, এ বিষয়ে কথা বলতে গেলে তাদের চাকরি থাকবে না। সূত্র বলছে, ভয়াবহ এ দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় এখন ক্যাডার কর্মকর্তাদের রক্ষা করার অপচেষ্টা চলছে। এমনভাবে তদন্ত রিপোর্ট দেওয়া হয়েছে যাতে কর্মকর্তারা পার পেয়ে যান। তবে অধিকতর তদন্ত শেষে এ বিষয়ে আইনগত ব্যবস্থা নিতে সম্প্রতি ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) চিঠি দেওয়া হয়েছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আগামী দিনের ভবিষ্যৎ শিশুদের নৈতিকতা ও ধর্মীয় মূল্যবোধ শেখাতে ইফা শিশু ও গণশিক্ষা প্রকল্পের কার্যক্রম শুরু করে। এর লক্ষ্য হচ্ছে শিশুরা শৈশব থেকে ধর্মীয় শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে আদর্শ নাগরিক হিসাবে গড়ে উঠবে। দেশের সব বিভাগে ইফার তত্ত্বাবধানে এ কার্যক্রম পরিচালিত হয় এবং এখনো হচ্ছে। দেশের সব বিভাগে ৪৫ হাজারের বেশি শিক্ষক রয়েছে। মাসিক ৬ হাজার টাকা বেতনে তারা শিশুদের কুরআন শিক্ষা দিয়ে থাকেন। অবশ্য পুরাতন শিক্ষকদের বার্ষিক ৫০০ টাকা করে বেতন বৃদ্ধি হয়। এ বিপুলসংখ্যক শিক্ষকের বেতন দিতে গিয়ে পিডির পিও রাশেদুল ইসলাম, ক্যাশিয়ার সুমন শিকদার এবং লেজার কিপার মনিরুল ইসলাম প্রকল্পের কর্তাব্যক্তিদের পরস্পর যোগসাজশে ৬ কোটি ১১ লাখ ১২ হাজার ৫০৯ টাকা আত্মসাৎ করেছেন। জানতে চাইলে ইফার শিশু ও গণশিক্ষা প্রকল্পের বর্তমনি পিডি এসএম তরিকুল ইসলাম বলেন, কর্মচারীরা অর্থ আত্মসাৎ করেছে এটা সত্য। তদন্তে প্রমাণিত হওয়ায় তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে দুদক বিষয়টি তদন্ত করছে। প্রকল্পের অর্থ আত্মসাতের সময় কোন কোন কর্মকর্তা পিডি ছিলেন এমন প্রশ্নে এসএম তরিকুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, একাধিক পিডির সময় এ ঘটনা ঘটেছে। বিশেষ করে সাবেক যুগ্ম সচিব নায়েব আলী মন্ডল এবং সফিউল আলম তালুকদারের সময় ঘটেছে বলে শুনেছি। বিষয়টি নিয়ে ইফা থেকে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক করা হয় সংস্থাটির সহকারী পরিচালক (কার্যক্রম-১) মো. জামাল উদ্দিনকে। তিনি বলেন, এভাবে বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাতের বিষয়টি সত্য। কিন্তু শুধু কর্মচারীরা এত টাকা এককভাবে আত্মসাৎ করবে-তা কখনই হতে পারে না। এর পেছনে অনেক বড় রাঘববোয়াল রয়েছে। আমরা তদন্ত করে প্রভাবশালীদের দোষী সাব্যস্ত করা সম্ভব নয়। সে কারণে বিষয়টি নিয়ে অধিকতর তদন্তের জন্য দায়িত্ব ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়কে দেওয়া হয়েছে। প্রায় একই ধরনের কথা বলেন তদন্তের সঙ্গে সম্পৃক্ত অন্য দুজন কর্মকর্তা। তবে তারা নাম প্রকাশ করতে রাজি হননি। তারা জানান, আসল গডফাদারের কথা কেউ বলছেন না। তারা আরও জানান, শিশু ও গণশিক্ষা প্রকল্পের পিডির পিও মো. রাশেদুল ইসলাম সংস্থাটির সাবেক পরিচালক হালিম হোসেন খানের ভাগনে। বিগত সরকারের সময় তিনি ঢাকা, ময়মনসিংহ ও সিলেট বিভাগের শিশু ও গণশিক্ষা প্রকল্পের শিক্ষকদের মাসিক সম্মানির সফট কপি প্রস্তুত করে ব্যাংকে পাঠাতেন। এ সুযোগে রাশেদুল ইসলাম রূপালী ব্যাংক ইফা উপ-শাখা, সোনালী ব্যাংক পিএসি শাখা, সোনালী ব্যাংক পোস্তগোলা শাখায় তার স্ত্রী, মা, বোন ও বান্ধবীসহ অনেকের নামে শিক্ষকদের মাসিক সম্মানির টাকা পাঠাতেন। কিন্তু তারা কেউ পড়াতেন না। অর্থাৎ তারা শিক্ষকই নন। কিন্তু ভাতা পেয়েছেন বছরের পর বছর। বিষয়টি তদন্তে ধরা পড়েছে। অনেক এলাকার বৈধ শিক্ষদের বেতন আটকে রেখে রাশেদুল ইসলাম ঘুসের বিনিময়ে তা ছাড় করতেন। বিশেষ করে ঢাকার কদমতলী, শ্যামপুর, পোস্তগোলা, বংশাল, ডেমরা ও মাতুয়াইল এলাকার শিক্ষকরা এ বিষয়ে যে অভিযোগ করেছেন তার সত্যতা পাওয়া গেছে। ইফার তদন্ত প্রতিবেদনে পিও রাশেদুল ইসলাম ভুয়া নামে মাসিক সম্মানি পাঠাতে একটি সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন। শেরেবাংলা জোনের অবৈধ ভারপ্রাপ্ত মডেল কেয়ারটেকার ওমর ফারুক, আব্দুল আজিজ, কবির, হেলাল, গোলাম কাদর ও মাদারীপুরের ফিল্ড সুপারভাইজার ইয়াসমিন আক্তারসহ অনেককে তার সিন্ডিকেটের সদস্য হিসাবে যুক্ত করেন। তদন্ত প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, তাদের সবার ৬ মাসের কললিস্ট ও বিকাশ নম্বর পরীক্ষা করলে আসল চিত্র বেরিয়ে আসবে। সেই সঙ্গে শিশু ও গণশিক্ষা প্রকল্পে প্রেষণে নিয়োজিতদের ব্যাংক হিসাব যাছাই করলে অথবা ব্যাংক স্টেটমেন্ট পরীক্ষা করলে প্রকৃত সত্য বেরিয়ে আসবে। এছাড়া রাশেদুল ইসলাম পিডির পিও থাকাকালে অন্যদের সহায়তায় অবৈধ বিল ভাউচারে লাখ লাখ টাকা আত্মসাৎ করেছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। অর্থাৎ তিনি ভ্রমণ না করেও ভ্রমণ বিল নিয়েছেন এবং প্রশিক্ষণ না নিয়ে প্রশিক্ষণ ভাতা তুলেছেন। তদন্ত প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, প্রকল্পের লেজার কিপার মো. মনিরুল ইসলাম মৌখিক জিজ্ঞাসাবাদে অর্থ আত্মসাতের বিষয়টি স্বীকার করেছেন। পরে তার কাছ থেকে তদন্ত কমিটি লিখিত বক্তব্য গ্রহণ করেন। লিখিত বক্তব্যে মনিরুল ইসলাম দাবি করেন ক্যাশিয়ার সুমন শিকদারের প্ররোচনায় তিনি এসব করেছেন এবং কিছু দিন সময় দিলে আত্মসাৎকৃত অর্থ তিনি ফেরত দেবেন। তদন্ত কর্মকর্তারা জানান, তদন্তকালে ক্যাশিয়ার সুমন শিকদারের ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টে ৯৯ লাখ টাকা এবং রাশেদুল ইসলামের ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টে ৩২ লাখ টাকার স্থিতি পাওয়া গেছে। এছাড়া লেজার কিপার মনিরুল ইসলামের অ্যাকাউন্টেও বিপুল পরিমাণ অর্থ লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে। বিষয়টি অধিক তদন্ত করে ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে আরও কেউ জড়িত আছে কিনা তা খতিয়ে দেখতে দুর্নীতি দমন কমিশনে পাঠানো হয়েছে বলে জানা গেছে। জানতে চাইলে এ বিষয়ে ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (বাজেট ও অনুদান) মো. ফজলুর রহমান বলেন, ‘তদন্ত শেষে আমরা যে পেয়েছি তা অধিকতর তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নিতে দুদকে পাঠিয়েছি। এর বেশি কিছু বলতে গেলে আমার চাকরিই থাকবে না।’ |