|
বাংলাদেশের হাসপাতালগুলোর ক্যান্সার এত সহজে নিরাময় করা যাবে না
মীর আব্দুর আলীম:
|
গত সপ্তাহে লন্ডনের কুইন এলিজাবেথ হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য জরুরি প্রয়োজনে যেতে হয়েছিল আমাকে। জরুরি বিভাগে প্রবেশ করার পর মনে হয়েছিল, বিশ্বের অন্যতম উন্নত স্বাস্থ্যব্যবস্থার দেশে এসে নিশ্চয় দ্রুত চিকিৎসা পাব। কিন্তু বাস্তবতা ছিল ভিন্ন। চিকিৎসক হিসেবে সেখানে কর্মরত আমার ছেলে ও পুত্রবধূ থাকা সত্ত্বেও আমাকে অপেক্ষা করতে হয়েছে প্রায় সাড়ে পাঁচ ঘণ্টা। এই অভিজ্ঞতা আমাকে একটি গভীর সত্য উপলব্ধি করিয়েছে; উন্নত অবকাঠামো, দক্ষ চিকিৎসক ও শক্তিশালী ব্যবস্থাপনা থাকা সত্ত্বেও বিশ্বের অন্যতম উন্নত স্বাস্থ্যব্যবস্থাও রোগীর কাছে চিকিৎসককে সঙ্গে সঙ্গে পৌঁছে দিতে পারে না।এই বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের স্বাস্থ্যমন্ত্রীর বক্তব্য “মানুষকে যাতে ডাক্তারের পেছনে ঘুরতে না হয়, ডাক্তারই মানুষের পেছনে ঘুরবে” শুনতে নিঃসন্দেহে মানবিক ও আশাব্যঞ্জক। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এই বক্তব্য বাস্তবায়নের জন্য আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থা কতটা প্রস্তুত? বাংলাদেশের হাসপাতালগুলোর যে ক্যান্সার হয়েছে সে রোগ এত সহজে নিরাময় করা যাবে না। এটি মন্ত্রীর কি একটি বাস্তবসম্ভব নীতি, নাকি জনমানসে আশা জাগানোর একটি রাজনৈতিক উচ্চারণ? লন্ডনের ওই হাসপাতালে আমি আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক প্রত্যক্ষ করেছি, যা বাংলাদেশের জন্য এক গভীর শিক্ষা হতে পারে। যুক্তরাজ্যে কেউ আকস্মিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়লে একটি মোবাইল ফোন কলই যথেষ্ট- ১০ থেকে ১৫ মিনিটের মধ্যে অ্যাম্বুলেন্স রোগীর কাছে পৌঁছে যায়, দ্রুততার সাথে চিকিৎসা শুরু হয় ঘটনাস্থলেই, এবং দ্রুত তাকে হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে জরুরি চিকিৎসা নিশ্চিত করা হয়। এই ব্যবস্থাটি কেবল একটি সেবা নয়, বরং রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে নাগরিকের জীবনের প্রতি সর্বোচ্চ দায়িত্ববোধের বাস্তব প্রতিফলন। সেখানে রোগী চিকিৎসকের পেছনে ছুটে বেড়ায় না; বরং রাষ্ট্রের স্বাস্থ্যব্যবস্থা নিজেই রোগীর কাছে পৌঁছে যায় অতি দ্রুত, সুশৃঙ্খল এবং নিশ্চিতভাবে।আমাদের দেশেও জরুরী মুমূর্ষ রোগীদের ক্ষেত্রে এই ব্যবস্থা থাকা উচিত। আমাদের স্বাস্থ্যমন্ত্রী মহোদয় এই ব্যবস্থাটা গ্রহণ করতে পারেন সবার আগে। বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো একটি কার্যকর জরুরি চিকিৎসা ব্যবস্থার অভাব। দুর্ঘটনা, হৃদরোগ বা হঠাৎ অসুস্থতার ক্ষেত্রে চিকিৎসার প্রথম এক ঘণ্টাকে “গোল্ডেন আওয়ার” বলা হয়। এই সময়ের মধ্যে চিকিৎসা নিশ্চিত করা গেলে মৃত্যুহার উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব। কিন্তু বাংলাদেশে জরুরি অ্যাম্বুলেন্স সেবা এখনো বিচ্ছিন্ন, অপরিকল্পিত এবং অনেক ক্ষেত্রে বাণিজ্যিকভাবে পরিচালিত। ফলে রোগীকে হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই অমূল্য সময় নষ্ট হয়ে যায়। এই পরিস্থিতিতে ডাক্তারকে রোগীর কাছে পৌঁছে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের জন্য প্রথমে জরুরি চিকিৎসা ব্যবস্থার মৌলিক সংস্কার অপরিহার্য। বাংলাদেশে জনসংখ্যার তুলনায় চিকিৎসকের সংখ্যা এখনো অপর্যাপ্ত। একজন চিকিৎসককে প্রতিদিন অতিরিক্ত সংখ্যক রোগী দেখতে হয়। এই চাপের মধ্যে চিকিৎসকের পক্ষে হাসপাতালে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি রোগীর বাড়িতে গিয়ে চিকিৎসা দেওয়া বাস্তবসম্মত নয়। চিকিৎসকের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং সুষম বণ্টন নিশ্চিত না করে এই লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব নয়। বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার একটি বড় বৈষম্য হলো শহর ও গ্রামের মধ্যে চিকিৎসা সেবার অসম বণ্টন। রাজধানী ঢাকা, চট্টগ্রাম কিংবা বিভাগীয় শহরগুলোতে উন্নত হাসপাতাল, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক এবং আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জামের প্রাচুর্য থাকলেও দেশের বৃহত্তর গ্রামীণ জনগোষ্ঠী এখনো মৌলিক চিকিৎসা সুবিধা থেকে বঞ্চিত। অনেক উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে চিকিৎসকের পদ থাকলেও সেগুলো দীর্ঘদিন খালি থাকে অথবা চিকিৎসকরা নিয়মিত উপস্থিত থাকেন না। ফলে গ্রামীণ জনগণ বাধ্য হয়ে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে শহরে আসেন, যা সময়, অর্থ এবং শারীরিক কষ্ট সব দিক থেকেই একটি বড় বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। এই বাস্তবতায় “ডাক্তার মানুষের পেছনে যাবে” এই লক্ষ্য অর্জন করতে হলে প্রথমেই গ্রামীণ স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে শক্তিশালী, কার্যকর এবং আকর্ষণীয় করে তুলতে হবে, যাতে চিকিৎসকরা সেখানে কাজ করতে আগ্রহী হন এবং জনগণ স্থানীয় পর্যায়েই চিকিৎসা পান। বাংলাদেশ গত কয়েক দশকে স্বাস্থ্যখাতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করলেও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এখনো একটি বড় প্রতিবন্ধকতা। অনেক সরকারি হাসপাতালে পর্যাপ্ত শয্যা নেই, জরুরি বিভাগে রোগীর চাপ সামাল দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত জায়গা নেই, এবং আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জামের অভাব স্পষ্ট। অনেক ক্ষেত্রে একটি বেডে একাধিক রোগী চিকিৎসা নিতে বাধ্য হন যা একটি আধুনিক স্বাস্থ্যব্যবস্থার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ। এই বাস্তবতায় চিকিৎসক যদি রোগীর বাড়িতে পৌঁছাতেও চান, তখনও প্রয়োজন হবে একটি শক্তিশালী হাসপাতাল কাঠামো, যেখানে রোগীকে দ্রুত স্থানান্তর করে উন্নত চিকিৎসা নিশ্চিত করা যাবে। তাই অবকাঠামো উন্নয়ন ছাড়া স্বাস্থ্যব্যবস্থার গুণগত পরিবর্তন সম্ভব নয়। একটি কার্যকর অ্যাম্বুলেন্স নেটওয়ার্ক আধুনিক স্বাস্থ্যব্যবস্থার মেরুদণ্ড। উন্নত দেশগুলোতে একটি কেন্দ্রীয় জরুরি নম্বরে ফোন করলেই কয়েক মিনিটের মধ্যে প্রশিক্ষিত প্যারামেডিক দলসহ অ্যাম্বুলেন্স পৌঁছে যায়। কিন্তু বাংলাদেশে এখনো অ্যাম্বুলেন্স সেবা বিচ্ছিন্ন এবং অনেক ক্ষেত্রে বেসরকারি ও বাণিজ্যিকভাবে পরিচালিত। ফলে জরুরি মুহূর্তে একটি অ্যাম্বুলেন্স পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে, কিংবা পাওয়া গেলেও সেটি সময়মতো পৌঁছায় না। একটি রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত, প্রযুক্তিনির্ভর এবং সময়নিষ্ঠ অ্যাম্বুলেন্স নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা হলে হাজার হাজার মানুষের জীবন রক্ষা করা সম্ভব হবে এবং তখনই স্বাস্থ্যমন্ত্রীর বক্তব্য বাস্তবতার ভিত্তি পাবে। এ জন্য প্রযুক্তিনির্ভর স্বাস্থ্যসেবা খুব জরুরী হয়ে পড়েছে। বর্তমান বিশ্বে প্রযুক্তি স্বাস্থ্যসেবাকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে। টেলিমেডিসিন, অনলাইন পরামর্শ, দূরবর্তী রোগ নির্ণয় এসব প্রযুক্তি ব্যবহার করে চিকিৎসা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া সম্ভব। বাংলাদেশেও ডিজিটাল অগ্রগতির ফলে এই সুযোগ তৈরি হয়েছে। একটি জাতীয় টেলিমেডিসিন নেটওয়ার্ক গড়ে তুললে গ্রামীণ জনগণ সহজেই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ পেতে পারেন, যা চিকিৎসার মান উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। একটি দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার মান অনেকাংশে নির্ভর করে সেই দেশের স্বাস্থ্যখাতে বিনিয়োগের উপর। বাংলাদেশে স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দ এখনো তুলনামূলকভাবে সীমিত। একটি শক্তিশালী স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তুলতে হলে স্বাস্থ্যখাতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে এবং এটিকে জাতীয় অগ্রাধিকারের কেন্দ্রে আনতে হবে। কারণ স্বাস্থ্যবান জনগোষ্ঠীই একটি দেশের উন্নয়নের প্রধান চালিকাশক্তি। চিকিৎসকদের কর্মপরিবেশ মানবিক ও নিরাপদ হওয়া জরুরি। চিকিৎসকরা একটি রাষ্ট্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানবসম্পদের অংশ। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে তারা নিরাপত্তাহীনতা, অতিরিক্ত কর্মচাপ এবং সীমিত সুযোগ-সুবিধার মধ্যে কাজ করতে বাধ্য হন। একটি নিরাপদ, সম্মানজনক এবং সহায়ক কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে চিকিৎসকরা আরও দক্ষতার সঙ্গে জনগণকে সেবা দিতে পারবেন। প্রশাসনিক দক্ষতা ও জবাবদিহিতা সুশাসনের অপরিহার্য উপাদান বটে। স্বাস্থ্যব্যবস্থার উন্নতির জন্য শুধু অবকাঠামো নয়, প্রয়োজন দক্ষ প্রশাসন এবং সুশাসন। পরিকল্পনা, বাস্তবায়ন এবং তদারকির প্রতিটি স্তরে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা এবং অনিয়ম দূর না করলে স্বাস্থ্যখাতে কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন সম্ভব নয়। চিকিৎসা শিক্ষার সম্প্রসারণ এবং ভবিষ্যতের বিনিয়োগ জরুরি। চিকিৎসকের সংখ্যা বাড়ানোর জন্য নতুন মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠা এবং চিকিৎসা শিক্ষার মান উন্নয়ন অপরিহার্য। দক্ষ এবং প্রশিক্ষিত চিকিৎসক তৈরি করা একটি দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ, যা একটি দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার ভিত্তিকে শক্তিশালী করে। প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবার দীর্ঘমেয়াদি সমাধান চাই আমরা। রোগ প্রতিরোধের উপর গুরুত্ব দিলে স্বাস্থ্যব্যবস্থার উপর চাপ কমানো সম্ভব। জনসচেতনতা বৃদ্ধি, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাত্রা নিশ্চিত করা গেলে অনেক রোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব। গ্রামীণ স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোকে আধুনিক সরঞ্জাম, পর্যাপ্ত চিকিৎসক এবং দক্ষ জনবল দিয়ে শক্তিশালী করতে হবে। এতে জনগণ স্থানীয় পর্যায়েই চিকিৎসা পাবে এবং শহরের উপর চাপ কমবে। এ জন্য রাজনৈতিক সদিচ্ছার বাস্তব রূপ চাই। মাননীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঘোষণা বাস্তবায়ন হলে এদেশের চিকিৎসা ব্যবস্থা হবে প্রশংসনীয়। এ জাতীয় রাজনৈতিক ঘোষণা জনগণের মধ্যে আশা সৃষ্টি করে। কিন্তু সেই ঘোষণা বাস্তবে রূপ নিতে হলে কার্যকর পরিকল্পনা, পর্যাপ্ত বাজেট এবং ধারাবাহিক তদারকি প্রয়োজন। বাস্তবায়নই একটি নীতির প্রকৃত সাফল্যের মাপকাঠি। টেকসই অগ্রগতির পথ একটি শক্তিশালী স্বাস্থ্যব্যবস্থা রাতারাতি গড়ে ওঠে না। এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি এবং ধাপে ধাপে বাস্তবায়িত প্রক্রিয়া। সঠিক পরিকল্পনা, বিনিয়োগ এবং প্রশাসনিক দক্ষতার মাধ্যমে বাংলাদেশও একটি উন্নত স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারে। সর্বশেষ বলতে চাই কেবল প্রতিশ্রুতি নয়, কার্যকর রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রমাণ চাই আমরা। স্বাস্থ্যমন্ত্রীর বক্তব্য নিঃসন্দেহে একটি মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন। কিন্তু এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য প্রয়োজন বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা, শক্তিশালী অবকাঠামো এবং কার্যকর প্রশাসনিক সংস্কার। একটি আধুনিক রাষ্ট্রের প্রকৃত শক্তি তার নাগরিকের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সক্ষমতার উপর নির্ভর করে। বাংলাদেশ যদি সত্যিই একটি মানবিক, উন্নত এবং দায়িত্বশীল রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে চায়, তবে স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে এমন একটি পর্যায়ে নিয়ে যেতে হবে, যেখানে একজন নাগরিক অসুস্থ হলে তাকে চিকিৎসার জন্য অসহায়ভাবে অপেক্ষা করতে হবে না। বরং রাষ্ট্রের স্বাস্থ্যব্যবস্থা নিজেই তার পাশে পৌঁছে যাবে। মীর আব্দুল আলীম: সাংবাদিক, সমাজ গবেষক। |