|
নতুন সরকারের কাছে প্রত্যাশা
রাষ্ট্র পুনর্গঠনে মানবাধিকার যেন অগ্রাধিকার পায়
হাসান হামিদ :
|
বাংলাদেশের রাজনীতিতে এক অস্থির সময় অতিক্রম করে দেশ এখন নতুন সরকার পেয়েছে। অন্তর্বর্তী ব্যবস্থার প্রায় দেড় বছর; সেপ্টেম্বর ২০২৪ থেকে জানুয়ারি ২০২৬ পেরিয়ে যে চিত্র সামনে এসেছে, তা নিঃসন্দেহে গভীর উদ্বেগের। বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনের পরিসংখ্যান ও মাঠপর্যায়ের পর্যবেক্ষণে দেখা যাচ্ছে, রাজনৈতিক সহিংসতা, মব হামলা, সাংবাদিক নির্যাতন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ, সীমান্তে প্রাণহানি এবং হেফাজতে মৃত্যুর মতো ঘটনা উদ্বেগজনক মাত্রায় ঘটেছে। এই বাস্তবতার মধ্যেই নতুন সরকার গঠন হল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এর নেতৃত্বে। ফলে মানবাধিকার প্রশ্নটি এখন আর কেবল নৈতিকতার বিষয় নয়; এটি রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা, গণতন্ত্রের বিশ্বাসযোগ্যতা এবং আন্তর্জাতিক মর্যাদার সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত।আমরা দেখেছি, গত ১৭ মাসে রাজনৈতিক সহিংসতার যে পরিসংখ্যান সামনে এসেছে, তা শঙ্কাজনক। একাধিক সংগঠনের হিসাবে, এক হাজারের বেশি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় প্রায় দুই শতাধিক মানুষের প্রাণ গেছে এবং আহত হয়েছেন কয়েক হাজার। আধিপত্য বিস্তার, প্রতিশোধমূলক আক্রমণ, নির্বাচনকেন্দ্রিক সংঘাত, চাঁদাবাজি ও দখলদারিত্ব এসব ছিল সহিংসতার প্রধান কারণ। নির্বাচন ঘিরে সহিংসতার পৃথক চিত্রও কম ভয়াবহ নয়। প্রাক্-নির্বাচনী তিন মাসে বহু সংঘর্ষে প্রাণহানি ও ব্যাপক আহতের ঘটনা ঘটেছে। এই পরিস্থিতি ইঙ্গিত দেয় যে রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে সহনশীলতার ঘাটতি এবং আইন প্রয়োগে নিরপেক্ষতার অভাব দীর্ঘদিনের সমস্যা হিসেবে রয়ে গেছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিকগুলোর একটি ছিল মব সহিংসতার বিস্তার। গণপিটুনি, গুজব-নির্ভর হামলা কিংবা সংগঠিত ভিড়ের আক্রমণে বহু মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। রাষ্ট্রীয় বাহিনীর উপস্থিতি থাকা সত্ত্বেও অনেক ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক ও কার্যকর প্রতিরোধ দেখা যায়নি এমন অভিযোগ উঠে এসেছে। এতে নাগরিকদের মধ্যে এক ধরনের নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়েছে, যেখানে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা সামাজিকভাবে স্বীকৃতি পেতে শুরু করে। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে এটি অত্যন্ত বিপজ্জনক প্রবণতা, কারণ এতে বিচারব্যবস্থার ওপর আস্থা ক্ষয়ে যায়। সাংবাদিকদের ওপর হামলা ও হয়রানির ঘটনাও আশঙ্কাজনক মাত্রায় ঘটেছে। শত শত হামলা, একাধিক প্রাণহানি, অসংখ্য মামলা ও অভিযুক্তকরণ সব মিলিয়ে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা বড় ধরনের চাপে পড়েছে। প্রভাবশালী দুটি জাতীয় দৈনিকের কার্যালয়ে হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা শুধু বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়; এটি মতপ্রকাশের পরিসর সংকুচিত হওয়ার প্রতীক। গণমাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণ বা ভীত করার সংস্কৃতি দীর্ঘমেয়াদে গণতন্ত্রকে দুর্বল করে। একটি জবাবদিহিমূলক সরকার চাইলে প্রথমেই সংবাদমাধ্যমের নিরাপত্তা ও স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি ডিজিটাল পরিসরেও উদ্বেগের কারণ রয়েছে। সাইবার নিরাপত্তা ও সুরক্ষা সংক্রান্ত আইনের আওতায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কনটেন্টকে কেন্দ্র করে বহু মামলা ও গ্রেপ্তার হয়েছে। আইন প্রয়োগের প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করা যায় না; কিন্তু যখন আইনের ব্যবহার মতপ্রকাশ নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার হয়ে ওঠে, তখন তা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের পরিপন্থী হয়ে দাঁড়ায়। নতুন সরকারের উচিত হবে এসব আইনের ভাষা ও প্রয়োগপদ্ধতি পর্যালোচনা করা, যাতে তা নাগরিক অধিকার রক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়। হেফাজতে মৃত্যু, সংঘর্ষে প্রাণহানি এবং কারাগারে অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনাগুলো রাষ্ট্রের জন্য বড় ধরনের সতর্কবার্তা। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে নির্যাতন বা অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের অভিযোগ নতুন নয়, কিন্তু অন্তর্বর্তী সময়েও তা অব্যাহত থাকলে সংস্কারের প্রতিশ্রুতি প্রশ্নবিদ্ধ হয়। বিচারবহির্ভূত হত্যার অভিযোগ বা নির্যাতনে মৃত্যুর ঘটনা স্বচ্ছ তদন্ত ও জবাবদিহির মাধ্যমে সমাধান না হলে নাগরিক আস্থা ফিরবে না। স্বাধীন তদন্ত কমিশন, নিরপেক্ষ প্রসিকিউশন ও দ্রুত বিচার এসব নিশ্চিত করাই হবে নতুন সরকারের অন্যতম চ্যালেঞ্জ। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা, ধর্মীয় স্থাপনায় ভাঙচুর এবং মাজারে আক্রমণ সামাজিক সম্প্রীতির ভিত্তিকে নড়বড়ে করে। সংখ্যায় হয়তো ঘটনাগুলো সীমিত মনে হতে পারে, কিন্তু প্রতিটি হামলা রাষ্ট্রের বহুত্ববাদী চরিত্রের ওপর আঘাত। একই সঙ্গে নারী ও শিশু নির্যাতনের উচ্চ হার প্রমাণ করে যে সামাজিক নিরাপত্তা কেবল রাজনৈতিক পরিসরেই নয়, পারিবারিক ও সামাজিক ক্ষেত্রেও ভঙ্গুর। ধর্ষণ, শিশুহত্যা ও লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিরোধ ও দ্রুত বিচার না হলে উন্নয়ন-অগ্রগতির সব দাবিই প্রশ্নের মুখে পড়বে। সীমান্তে প্রাণহানির ঘটনাও দীর্ঘদিনের ইস্যু। প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে কূটনৈতিক ও সীমান্ত-ব্যবস্থাপনা আলোচনায় মানবাধিকারের বিষয়টি অগ্রাধিকার না পেলে এ সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। সীমান্তরক্ষায় আইন প্রয়োগের পাশাপাশি মানবিক নীতিমালার প্রতিও জোর দিতে হবে। এই সামগ্রিক প্রেক্ষাপটে নতুন সরকারের সামনে একটি ঐতিহাসিক সুযোগ তৈরি হয়েছে। রাজনৈতিক প্রতিহিংসা বা প্রতিশোধপরায়ণতার চক্র থেকে বেরিয়ে এসে একটি অধিকারভিত্তিক শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা গেলে তা দেশের রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তন আনতে পারে। এজন্য প্রথমত প্রয়োজন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পেশাদারিত্ব ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা। নিয়োগ, পদোন্নতি ও দায়িত্ব বণ্টনে রাজনৈতিক প্রভাব কমিয়ে একটি জবাবদিহিমূলক কাঠামো গড়ে তুলতে হবে। দ্বিতীয়ত, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও সংবাদমাধ্যমের নিরাপত্তা রক্ষায় স্পষ্ট নীতি ঘোষণা জরুরি। সাংবাদিক নির্যাতনের প্রতিটি ঘটনায় দ্রুত তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করা গেলে একটি শক্ত বার্তা যাবে যে সরকার সমালোচনাকে ভয় পায় না। একইভাবে ডিজিটাল আইনের সংস্কার করে নাগরিকের গোপনীয়তা ও বাকস্বাধীনতার সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। তৃতীয়ত, মব সহিংসতা প্রতিরোধে বিশেষ কৌশল প্রণয়ন প্রয়োজন। গুজব শনাক্তকরণে প্রযুক্তির ব্যবহার, স্থানীয় প্রশাসনের দ্রুত প্রতিক্রিয়া, কমিউনিটি পুলিশিং এবং সচেতনতা কার্যক্রম একসঙ্গে চালু করতে হবে। ভিড়-সন্ত্রাসের ঘটনায় দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হলে এ প্রবণতা থামবে না। চতুর্থত, সংখ্যালঘু ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিশেষ সেল বা মনিটরিং ব্যবস্থার প্রয়োজন। ধর্মীয় ও জাতিগত সম্প্রীতি রক্ষায় রাজনৈতিক নেতৃত্বের সুস্পষ্ট অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল শক্তিশালী করা, ভুক্তভোগী সহায়তা তহবিল বৃদ্ধি এবং সামাজিক সচেতনতা বাড়ানো জরুরি। পঞ্চমত, মানবাধিকার কমিশনসহ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতা বৃদ্ধি করতে হবে। তাদের সুপারিশ বাস্তবায়নে সরকার যদি আন্তরিক হয়, তবে জবাবদিহির সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা পাবে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ড অনুসরণে প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত এবং জাতিসংঘের সংশ্লিষ্ট প্রক্রিয়ার সঙ্গে সক্রিয় সম্পৃক্ততাও ইতিবাচক বার্তা দেবে। সবশেষে মনে রাখতে হবে, মানবাধিকার রক্ষা কেবল আইন প্রয়োগের বিষয় নয়; এটি রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও নৈতিক নেতৃত্বের প্রশ্ন। সহিংসতার রাজনীতি থেকে সরে এসে অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সহনশীল রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তুলতে না পারলে উন্নয়নের যে স্বপ্ন দেখানো হয়, তা টেকসই হবে না। নতুন সরকার যদি সত্যিই একটি নতুন অধ্যায় সূচনা করতে চায়, তবে মানবাধিকারের প্রশ্নে আপস না করার অঙ্গীকারই হতে পারে সেই যাত্রার প্রথম পদক্ষেপ। হাসান হামিদ: ন্যাশনাল এসোসিয়েট এন্ড কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ (বাংলাদেশ), আইএসএইচআর |