|
চাঁদাবাজি বন্ধ না হলে ব্যবসা বন্ধের হুমকি: চাঁদাবাজদের তথ্য দেওয়ার আহ্বান পুলিশের
নতুন বার্তা, ঢাকা:
|
সারা দেশে চাঁদাবাজি এখন ‘বার্নিং ইস্যু’। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে চাঁদাবাজদের যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ ছিলেন ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ। জুলাই আন্দোলনে আওয়ামী লীগের পতনের পর অনেকটা হাঁপ ছেড়ে বাঁচে মানুষ। কিন্তু পরে দেখা যায় একই চিত্র। চাঁদাবাজির থাবা থেকে মুক্তি মেলার প্রত্যাশা আর পূরণ হয়নি। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলেও অব্যাহত থাকে চাঁদাবাজি। ব্যবসায়ী নেতারা বলছেন, নানা নামে, নানা কায়দায় চাঁদা আদায় করা হয়। অতিরিক্ত ট্রাক ভাড়ার মাধ্যমে মালিক সমিতি এবং শ্রমিক ইউনিয়নসহ নানা সমিতির ব্যানারে চাঁদা আদায় করা হচ্ছে। এসব চাঁদার কারণে সদরঘাটের পাইকারি বাজারের ১৬০ টাকা কেজির ফল গুলিস্তানে দ্বিগুণ দামে বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া ক্ষমতাসীন দলের লোকজন, পুলিশ, রাজস্ব কর্মকর্তাসহ অনেকেই চাঁদাবাজি করছেন। চাঁদাবাজি বন্ধ না হলে ব্যবসা বন্ধ করে চলে যাওয়ার হুমকিও দিচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। চাঁদাবাজি ও দুর্নীতি বন্ধে নতুন সরকারের কাছ থেকে কড়া বার্তা প্রত্যাশা করছেন তারা। এমন প্রেক্ষাপটে ব্যবসায়ীদের উদ্দেশে পুলিশের আহ্বান, তারা যেন চাঁদাবাজদের তথ্য পুলিশকে দিয়ে সহায়তা করেন।আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, চাঁদাবাজ চাঁদাবাজই, তাদের কোনো দল নেই। চাঁদাবাজি যে করবে তার বিরুদ্ধে মামলা করে সোজা ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এমনকি পুলিশ যদি চাঁদাবাজি করে তাহলে পুলিশের ওইসব সদস্যকে চাকরিচ্যুত করা হবে। ব্যবসায়ীদের উদ্দেশে পুলিশের আহ্বান তারা যেন চাঁদাবাজদের তথ্য পুলিশকে দিয়ে সহায়তা করেন। এক্ষেত্রে ভুক্তভোগীর পরিচয় গোপন রাখা হবে। এছাড়া বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার পাশাপাশি পুলিশের শীর্ষ কর্মকর্তাদের কাছেও ভুক্তভোগীদের প্রতিকার চাওয়ার পথ খোলা রয়েছে। সোমবার রাজধানীর মতিঝিলে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) নিজস্ব কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনটির সভাপতি তাসকীন আহমেদ বলেছেন, অসহনীয় চাঁদাবাজি ব্যবসা-বাণিজ্যে আস্থাহীনতা তৈরি করছে। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের আগে যে হারে চাঁদা দিতে হতো, ২০২৪ সালের ৬ আগস্ট থেকে ব্যবসায়ীদের একই হারে চাঁদা দিতে হচ্ছে। ক্ষেত্রবিশেষে ২০ থেকে ৫০ শতাংশ বেশি চাঁদা দিতে হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকার চাঁদাবাজি বন্ধ করতে পারেনি, এমনকি সরকারি দপ্তরে একদিনের জন্যও দুর্নীতি কমেনি। তিনি আরও বলেন, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, চাঁদাবাজি ও তীব্র জ্বালানি সংকটের কারণে শিল্পকারখানার উৎপাদন প্রতিনিয়ত ব্যাহত হচ্ছে। এখন কারখানায় চাঁদা দেওয়া আবশ্যক হয়ে পড়েছে এবং আওয়ামী দুঃশাসন পার হলেও তা বন্ধ হয়নি। স্থানীয় শিল্পকারখানাগুলো সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সবার আগে উন্নতি করতে হবে। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ক্ষমতাসীন দলের লোকজন, পুলিশ, রাজস্ব কর্মকর্তাসহ অনেকেই চাঁদাবাজি করেন। কারা চাঁদাবাজি করছে, সেটা সরকারকে বের করতে হবে। চাঁদাবাজরা এসে বলে, তারা সরকারি দলের লোক। যখনই যে সরকার আসে, তখনই বলে আমরা সরকারি দলের লোক; আমাদের চাঁদা দিতে হবে। আমাদের এই অনুষ্ঠান আছে, পাড়ার এই চাঁদা দিতে হবে। চাঁদাবাজি বন্ধ না হলে আমরা ব্যবসা বন্ধ করে চলে যাব। তিনি আরও বলেন, কারখানায় ঢুকতেও চাঁদা দিতে হয়। অফিস ও রাস্তায় চাঁদা দিতে হয়। জনগণ ও ব্যবসায়ী মহল চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে। চাঁদাবাজি ও দুর্নীতি বন্ধে আমরা নতুন সরকারের কাছ থেকে কড়া বার্তা প্রত্যাশা করছি। এমন পরিস্থিতিতে পুলিশের অবস্থান জানতে চাইলে অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক (অপরাধ ও অপস) খন্দকার রফিকুল ইসলাম বলেন, নতুন গণতান্ত্রিক সরকার চাঁদাবাজির বিষয়ে প্রচণ্ড সেনসেটিভ এবং কঠোর অবস্থানে আছে। চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে আমাদের লোকজনকেও বলে দেওয়া হয়েছে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমাদের কাছে নেতাকর্মী বলে কিছু নেই, চাঁদাবাজ চাঁদাবাজই। কোনো দল যেহেতু তাদের (চাঁদাবাজদের) প্রশ্রয় দিচ্ছে না, স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী বলেছেন চাঁদাবাজ চাঁদাবাজই। সুতরাং পুলিশের কাছে কোনো নেতাকর্মী গোনার সময় নেই। চাঁদাবাজি যে করবে তার বিরুদ্ধে মামলা করে সোজা ব্যবস্থা নেওয়া হবে-এটাই হলো আমাদের অবস্থান। চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করার জন্য ভুক্তভোগীদের আহ্বান জানাবেন কিনা জানতে চাইলে খন্দকার রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘এটা উনার (ভুক্তভোগীর) আইনগত অধিকার। অনেক সময় ভয় পান বলে তারা অভিযোগ করেন না। এক্ষেত্রে ভুক্তভোগীরা গোপনেও তথ্য দিয়ে আমাদের সহায়তা করতে পারেন। তাতে উনারা একটু সেফ সাইডে থাকলেন। কারণ যে লোকটা চাঁদাবাজির শিকার হন তিনি সব সময় যে বুক ফুলিয়ে অভিযোগ করতে পারবেন-সে অবস্থা তো নাও থাকতে পারে। চাঁদাবাজি ঠেকাতে পুলিশের পক্ষ থেকে কোনো গোপন অ্যাপস করার চিন্তাভাবনা আছে কিনা জানতে চাইলে পুলিশের এ কর্মকর্তা বলেন, ‘না এমন কোনো চিন্তা আমাদের নেই। চাঁদাবাজদের ইনফরমেশন দেওয়ার মতো আমাদের বহু উইন্ডো খোলা আছে। ভুক্তভোগীরা অভিযোগ দিতে পারেন। আমাদেরকেও ফোনে জানাতে পারেন তারা। গোপনে নাম প্রকাশ না করেও তথ্য দিতে পারেন। এছাড়া আমাদের গোপন এজেন্সিও আছে।’ পুলিশের চাঁদাবাজির বিষয়ে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি তাসকীন আহমেদের দেওয়া বক্তব্যের সূত্রে খন্দকার রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘উনি একজন দায়িত্বশীল ব্যক্তি। কোনো ইন্ডাস্ট্রিতে পুলিশ গিয়ে চাঁদাবাজি করে-এসব বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য যদি দেন আমরা ব্যবস্থা নেব। পাঁচটা হলে অন্তত তিনটার তথ্য দিতে বলেন-যেসব ইন্ডাস্ট্রিতে পুলিশ নিজে গিয়ে চাঁদাবাজি করছে। যারা এই কাজ করছে তাদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নিয়ে দেখাচ্ছি।’ তবে তিনি এও বলেন, ‘ঢালাওভাবে কথা তো অনেকেই বলে। ওইটার ভিত্তিতে আমাদের কোনো মন্তব্য নেই। কোনো অ্যাকশনও নিতে পারি না। সরাসরি না বললে উনি (তাসকীন আহমেদ) আমাদের কাছে তথ্য দিন যে এই ইন্ডাস্ট্রিতে পুলিশ গিয়ে চাঁদা নিয়েছে। তাহলে ওই পুলিশ অফিসারের চাকরি থাকবে বলে আমার মনে হয় না।’ বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশনের (বিইএফ) সভাপতি ফজলে শামীম এহসান বলেন, অন্য ব্যবসার মতো রপ্তানি ব্যবসায় জড়িতরা রাস্তাঘাটে চাঁদার সম্মুখীন কম হন। তবে চাঁদার আরেক ভার্সন, যেটা ঘুস নামে পরিচিত, সেটা অন্তর্র্বর্তী সরকারের সময় বহুলাংশে বৃদ্ধি পেয়েছিল। ৫ আগস্টের পর আমরা আশা করেছিলাম, এতবড় আন্দোলনের পর গঠিত সরকার ঘুস-চাঁদা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে। কিন্তু তারা এক্ষেত্রে ব্যর্থ হয়েছে। নতুন সরকার সুশাসনের মাধ্যমে ঘুস-চাঁদার মূলোৎপাটন করতে সক্ষম হবে বলে আশা করছি। মৌলভীবাজার ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক গোলাম মাওলা বলেন, নানা নামে, নানা কায়দায় চাঁদা আদায় করা হয়। যেমন পাইকারি ব্যবসায়ীরা যদি একটা ট্রাক ২০ হাজার টাকায় ভাড়া করেন, তাহলে দেখা যায় ওই ট্রাকের আসল ভাড়া ১৫ হাজার টাকা। বাকি ৫ হাজার টাকা দালালি। এই দালালির টাকা মালিক সমিতি, শ্রমিক ইউনিয়ন, এই সমিতি-ওই সমিতির নামে আদায় করা হয়। এরকম বিভিন্ন নামে চাঁদার টাকা ব্যবসায়ীদের দিতে হয়। যার চাপ ভোক্তাদের ওপর বর্তায়। আর জিনিসপত্রের দাম বাড়ে। এ কারণে দেখা যায় সদরঘাটে পাইকারি বাজারে যে ফল ১৬০ টাকা কেজিতে বিক্রি হয়, সে ফল গুলিস্তানে ৩০০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে। এই দাম বাড়ে মূলত চাঁদার কারণে। কারণ চাঁদা না দিলে হয়তো ওই ফল বিক্রেতা সেখানে বসতে পারতেন না। তিনি আরও বলেন, পুরান ঢাকার অলিগলিতে ভ্যানে ব্যবসা করতে ৪০০-৫০০ টাকা চাঁদা দিতে হয়। এ চাঁদাকে একেবারে চিরতরে নির্মূল করা প্রয়োজন। যাতে ব্যবসায়ীরা স্বস্তিতে ব্যবসা করতে পারেন। |