|
শিক্ষকসংকট ও কোচিং-নির্ভরতা: কোথায় যাচ্ছে আমাদের মাধ্যমিক শিক্ষা?
হাসান হামিদ:
|
বাংলাদেশের মাধ্যমিক শিক্ষা আজ এক গভীর সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। সর্বশেষ বাংলাদেশ শিক্ষা পরিসংখ্যান-২০২৩ অনুযায়ী মাধ্যমিকে ঝরে পড়ার হার ৩৩ শতাংশ। এই একটিমাত্র পরিসংখ্যানই আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার ভঙ্গুর চিত্র স্পষ্ট করে দেয়। ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত যে পর্যায়টিকে আমরা মাধ্যমিক শিক্ষা হিসেবে বিবেচনা করি, সেটিই একজন শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ গঠনের ভিত্তি। অথচ এই ভিত্তিই এখন নড়বড়ে। বিদ্যালয়ে নিয়মিত ও মানসম্মত পাঠদান না হওয়ায় শিক্ষার্থীদের বড় অংশ নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে কোচিং ও গৃহশিক্ষকের ওপর। ফলে শিক্ষা একটি মৌলিক অধিকার থেকে ক্রমশ ব্যয়বহুল পণ্য হয়ে উঠছে, যা কিনতে পারছে কেবল সামর্থ্যবান পরিবারগুলো।জানতে পেরেছি, মাধ্যমিক পর্যায়ে বর্তমানে দেশে ১৮ হাজার ৯৬৮টি সাধারণ বিদ্যালয় রয়েছে, যার মধ্যে ৬২৮টি সরকারি। এই বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থী সংখ্যা প্রায় ৮১ লাখ ৬৬ হাজার এবং শিক্ষক প্রায় ২ লাখ ৪৭ হাজার। পাশাপাশি ১ হাজার ৪৮০টি স্কুল অ্যান্ড কলেজে আরও প্রায় ১৬ লাখ শিক্ষার্থী পড়ছে। সংখ্যার বিচারে এটি একটি বিশাল কাঠামো। কিন্তু এই কাঠামোর ভেতরেই রয়েছে গুরুতর অসামঞ্জস্য। সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে প্রায় সাড়ে তিন হাজার শিক্ষকের পদ শূন্য, যা মোট পদের প্রায় ২০ শতাংশ। শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত এখনো গড়ে ১:৩৭, যেখানে ২০১০ সালের জাতীয় শিক্ষানীতিতে ২০১৮ সালের মধ্যে এই অনুপাত ১:৩০-এ নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। লক্ষ্য রয়ে গেছে কাগজে, বাস্তবে শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের ভিড় আর শিক্ষকের সীমিত সক্ষমতা মিলিয়ে পাঠদান হয়ে উঠছে দায়সারা। শিক্ষকসংকটের কারণে অনেক বিদ্যালয়ে নিয়মিত ক্লাস হয় না। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘদিন প্রধান শিক্ষক নেই। সহকারী প্রধান শিক্ষক চলতি দায়িত্বে প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করছেন। এতে প্রশাসনিক শৃঙ্খলা যেমন দুর্বল হয়, তেমনি শিক্ষকদের মধ্যে নেতৃত্বের ঘাটতি তৈরি হয়। পাঠ পরিকল্পনা, মূল্যায়ন ও একাডেমিক তদারকি যথাযথভাবে হয় না। ফলাফল হিসেবে শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয়ে প্রয়োজনীয় মনোযোগ পায় না এবং পরিবারগুলো বাধ্য হয়ে কোচিং ও গৃহশিক্ষকের শরণাপন্ন হয়। এই কোচিং-নির্ভর সংস্কৃতি এখন কেবল রাজধানী নয়, সারা দেশের বাস্তবতা। একদিকে সচ্ছল পরিবার সন্তানদের জন্য একাধিক কোচিং ও গৃহশিক্ষক রাখছে; অন্যদিকে মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো চাপে পড়ে যাচ্ছে বাড়তি খরচে। নিম্নবিত্ত ও দরিদ্র পরিবারের সন্তানদের পক্ষে এই অতিরিক্ত ব্যয় বহন করা প্রায় অসম্ভব। ফলে তারা পিছিয়ে পড়ছে। ২০২৩ সালের প্রথম ছয় মাসে শিক্ষার্থীপ্রতি পারিবারিক শিক্ষা ব্যয় প্রাথমিক স্তরে ২৫ শতাংশ এবং মাধ্যমিকে ৫১ শতাংশ বেড়েছে। ইউনেসকোর তথ্য অনুযায়ী, দেশের শিক্ষা খাতে মোট ব্যয়ের ৭১ শতাংশই বহন করছে পরিবারগুলো। অর্থাৎ রাষ্ট্রের দায়ভার ক্রমশ পরিবারে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। এটি শিক্ষা ব্যবস্থার সামাজিক ন্যায়বিচারকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। বিদ্যালয়ে যথাযথ পাঠদান না হওয়ায় কোচিং-প্রাইভেট একটি বিকল্প কাঠামো তৈরি করেছে। ২০১২ সালের নীতিমালায় শিক্ষকরা নিজ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীকে পড়াতে পারবেন না বলা হলেও বাস্তবে সেই বিধিনিষেধ মানা হয় না। অনেক শিক্ষক প্রতিষ্ঠানের আশপাশে বাসা ভাড়া নিয়ে কোচিং পরিচালনা করছেন। অভিভাবকদের অভিযোগ, ক্লাসে পূর্ণ মনোযোগ না দিয়ে প্রাইভেট পড়ানোর দিকে ঝোঁক বেশি। এমনকি প্রাইভেটে না পড়লে পরীক্ষায় নম্বর কম দেওয়া হয়- এমন অভিযোগও শোনা যায়। এসব অভিযোগ সত্য হোক বা অতিরঞ্জিত, শিক্ষকদের পেশাগত নৈতিকতা নিয়ে যে আস্থাহীনতা তৈরি হয়েছে, সেটিই সবচেয়ে উদ্বেগজনক। শিক্ষার মান অবনতির প্রমাণ মিলছে শিক্ষার্থীদের দক্ষতা মূল্যায়নেও। মাধ্যমিক পর্যায়ে ইংরেজি ও গণিতে দক্ষতা আরও কমেছে। বাংলাতেও শিক্ষার্থীরা আগের তুলনায় দুর্বল। বিশ্বায়নের যুগে ইংরেজি ও গণিতে পিছিয়ে থাকা মানে ভবিষ্যতের প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়া। অথচ এই দুই বিষয়ে বিশেষজ্ঞ শিক্ষক সংকট প্রকট। পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণও নেই। শিক্ষকদের দীর্ঘদিন একই পদে থেকে অবসর নেওয়ার প্রবণতা পেশাটিকে আকর্ষণহীন করে তুলছে। ২০১৮ সালে ‘সিনিয়র শিক্ষক’ পদ সৃষ্টি হলেও নিয়মিত পদোন্নতি না হওয়ায় কাঙ্ক্ষিত প্রণোদনা তৈরি হয়নি। তরুণ মেধাবীরা শিক্ষকতায় আসতে আগ্রহ হারাচ্ছেন। তাছাড়া শিক্ষা পদ্ধতির ঘন ঘন পরিবর্তন পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। ২০০৮ সালে সৃজনশীল প্রশ্ন পদ্ধতি, ২০১২ সালে নতুন কারিকুলাম, ২০২২ সালে আরেকটি শিক্ষাক্রম, পরে তা বাতিল করে আবার পুরোনো কারিকুলামে ফেরা- এই ধারাবাহিক পরিবর্তনে শিক্ষার্থী ও শিক্ষক উভয়েই বিভ্রান্ত। যথাযথ প্রশিক্ষণ ছাড়া নতুন পদ্ধতি চালু করা হলে তার সুফল মেলে না। বরং শিক্ষার্থীরা পরীক্ষামূলক প্রয়োগের গিনিপিগে পরিণত হয়। এখন আবার ২০২৭ সাল থেকে নতুন শিক্ষাক্রম চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। প্রশ্ন হলো, দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা ও প্রস্তুতি ছাড়া বারবার পরিবর্তন কি শিক্ষার স্থিতিশীলতা নষ্ট করছে না? মাধ্যমিক শিক্ষা কেবল একাডেমিক ফলাফলের বিষয় নয়; এটি সামাজিক গতিশীলতার সোপান। একজন দরিদ্র পরিবারের শিক্ষার্থী যদি মানসম্মত মাধ্যমিক শিক্ষা না পায়, তবে তার উচ্চশিক্ষায় যাওয়ার সম্ভাবনা কমে যায়। ফলে দারিদ্র্যের চক্র ভাঙা কঠিন হয়। অপরদিকে সচ্ছল পরিবারের শিক্ষার্থীরা বাড়তি সহায়তা নিয়ে এগিয়ে যায়। শিক্ষা ব্যবস্থার এই বৈষম্য দীর্ঘমেয়াদে সমাজে আয়ের ও সুযোগের বৈষম্য বাড়ায়। অন্তর্বর্তী সরকার বিভিন্ন খাতে কমিশন গঠন করলেও শিক্ষাকে অগ্রাধিকার তালিকায় না রাখা হতাশাজনক। প্রাথমিক ও উপানুষ্ঠানিক শিক্ষার মানোন্নয়নে কমিটি গঠন হলেও সুপারিশ বাস্তবায়নে অগ্রগতি সামান্য। মাধ্যমিক শিক্ষা নিয়ে একটি সামগ্রিক, সময়োপযোগী ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত সংস্কার প্রয়োজন। শিক্ষক নিয়োগে স্বচ্ছতা ও দ্রুততা নিশ্চিত করতে হবে। শূন্য পদ দ্রুত পূরণ, পদোন্নতির স্পষ্ট কাঠামো এবং আকর্ষণীয় বেতন-ভাতা নিশ্চিত না করলে সংকট কাটবে না। বিদ্যালয়ে কার্যকর পাঠদান নিশ্চিত করতে শিক্ষকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও একাডেমিক তদারকি জরুরি। কোচিং নির্ভরতা কমাতে বিদ্যালয়ভিত্তিক অতিরিক্ত সহায়ক ক্লাস চালু করা যেতে পারে, যেখানে দরিদ্র শিক্ষার্থীরা বিনা খরচে সহায়তা পাবে। পাঠ্যপুস্তকভিত্তিক শিক্ষা ও সৃজনশীল চিন্তার বিকাশে জোর দিতে হবে। একই সঙ্গে শিক্ষাবর্ষে কার্যদিবস নিশ্চিত করা জরুরি। গবেষণা অনুযায়ী ১৪ মাসে ৪২৭ দিনের মধ্যে ২৭৯ দিন বিদ্যালয় বন্ধ থাকা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। সবচেয়ে বড় কথা, শিক্ষা খাতে রাষ্ট্রের বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। পরিবার-নির্ভর ব্যয়ের বোঝা কমিয়ে আনতে না পারলে সমতা আসবে না। শিক্ষা কেবল পরীক্ষায় ভালো ফলের জন্য নয়; এটি নাগরিক গড়ে তোলার প্রক্রিয়া। আনন্দমুখর পরিবেশে শিক্ষার্থীরা শিখবে- এই স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে হলে রাজনৈতিক সদিচ্ছা, নীতিগত স্থিতিশীলতা ও প্রশাসনিক দক্ষতা একসঙ্গে প্রয়োজন। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে আজকের মাধ্যমিক শিক্ষার্থীদের ওপর। তারা যদি ভরসা হারায় বিদ্যালয়ের ওপর এবং শিক্ষা হয়ে ওঠে কেবল কোচিং-নির্ভর ব্যয়বহুল প্রতিযোগিতা, তবে আমরা একটি বৈষম্যমূলক সমাজের দিকে এগোব। এখনই সময় নতুন করে ভাবার- মাধ্যমিক শিক্ষা কীভাবে সবার জন্য মানসম্মত, সমতাভিত্তিক ও টেকসই করা যায়। এই ভাবনাই হোক নীতিনির্ধারকদের অগ্রাধিকার। হাসান হামিদ: ন্যাশনাল এসোসিয়েট এন্ড কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ (বাংলাদেশ), আইএসএইচআর |