|
কড়াইল বস্তির অপরাধীদের ভাড়া করে জিএম কাদেরের বাসায় হামলা, মূল নায়ক অধরা
বিশেষ সংবাদদাতা:
|
পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী রাজধানীর কড়াইল বস্তি থেকে অপরাধীদের ভাড়া করে এনে জাতীয় পার্টির (জাপা) চেয়ারম্যান জিএম কাদেরের উত্তরার বাসায় হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটানো হয়েছে। অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে চমকপ্রদ ও চাঞ্চল্যকর সব তথ্য—পুরো হামলার ঘটনাটি বাস্তবায়নে সরাসরি ঘটনাস্থলে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছে পেশাদার অবৈধ অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী ও বনানীর চিহ্নিত মাদক কারবারি আব্দুর রহমান মাসুম ওরফে ‘মোল্লা মাসুম’।হামলার ঘটনার সময় ধারণ করা একাধিক ভিডিও চিত্রে মোল্লা মাসুমের চেহারা স্পষ্টভাবে দেখা গেলেও রহস্যজনক কারণে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী তাকে এখনও গ্রেপ্তার করতে পারেনি। সচেতন মহলের মতে, তাকে গ্রেপ্তার করে জিজ্ঞাসাবাদ করলেই বেরিয়ে আসবে হামলার মূল কারণ, অর্থ জোগানদাতা ও নেপথ্যের নির্দেশদাতাদের পরিচয়। নাম প্রকাশ না করার শর্তে কড়াইল বস্তির একাধিক বাসিন্দা জানান, জিএম কাদেরের বাসায় হামলার আগের দিন রাতভর বস্তির বিভিন্ন স্থানে ছোট-বড় অপরাধীদের নিয়ে গোপন বৈঠক করে মোল্লা মাসুম। সেখানে পুরো হামলার নকশা তৈরি করা হয় এবং রাতভর চলে তাদের ইয়াবা সেবন। ভাড়াটে অপরাধীদের একটি বড় অংশই কড়াইল বস্তিনির্ভর অপরাধ চক্রের সদস্য। অনুসন্ধানে জানা যায়, রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় থাকা মাসুমের বিরুদ্ধে অবৈধ অস্ত্র বহন, মাদক ব্যবসা, চাঁদাবাজি ও অপহরণসহ রাজধানীর বিভিন্ন থানায় একাধিক মামলা রয়েছে। বিটিসিএলের অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী বাবার সূত্রে অতীতে মহাখালী ওয়্যারলেস গেটের বিটিসিএল পূর্ব কলোনিতে বসবাস করলেও বর্তমানে সে টঙ্গীতে থাকে। তবে টঙ্গীতে থাকলেও কড়াইল বস্তিকে কেন্দ্র করেই তার ভয়ংকর অপরাধ ও মাদকের নেটওয়ার্ক পরিচালিত হয়। কিশোর বয়স থেকেই সে একাধিক অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। গত বছরের ১৫ অক্টোবর দিবাগত মধ্যরাতে মহাখালী ওয়্যারলেস গেটে বৈশাখী টেলিভিশনের পাশের গলিতে হেলমেট পরা অবস্থায় ফাঁকা গুলিবর্ষণ করে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছিল এই মাসুম। পরবর্তীতে সিসিটিভি ফুটেজে তার পরিচয় শনাক্ত হয়। বৈশাখী টিভির টেন্ডার পাওয়া এক প্রতিষ্ঠানের কাছে দাবি করা চাঁদা না পেয়ে ভয় পেতেই সেই গুলিবর্ষণ করা হয়েছিল। কিন্তু অজ্ঞাত কারণে তখনও পুলিশ তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি, উদ্ধার হয়নি ব্যবহৃত অবৈধ অস্ত্রও। এর আগেও ২০১৬ সালের ১৯ এপ্রিল মহাখালী থেকে আলমগীর নামের এক ব্যবসায়ীকে অপহরণ করে নির্মাণাধীন ভবনে আটকে রেখে মোটা অঙ্কের মুক্তিপণ দাবি করে মাসুম ও তার গ্যাং। পরে র্যাব-১ অভিযান চালিয়ে দুটি অবৈধ পিস্তলসহ তাকে গ্রেপ্তার করে তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানায় সোপর্দ করে। সর্বশেষ চলতি বছরের ৭ মে গাজীপুরের পুবাইল থানা এলাকা থেকে বিপুল পরিমাণ ইয়াবাসহ পুলিশের হাতে ধরা পড়ে মাসুম। কিন্তু উদ্বেগের বিষয় হলো, এত গুরুতোর মামলার পরও মাত্র এক মাসেরও কম সময়ে সে আদালত থেকে জামিনে বেরিয়ে আসে। জামিনে মুক্তি পেয়েই ফের টাকার চুক্তিতে একের পর এক বড় ধরনের অপরাধ সংঘটিত করে চলেছে সে। এভাবে চিহ্নিত অপরাধীদের দ্রুত জামিন পাওয়ার ঘটনা বিচার ব্যবস্থাকেও প্রশ্নের মুখে ফেলছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। উল্লেখ্য, গত সোমবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে উত্তরার বাসভবনের সামনে ‘স্বৈরাচারবিরোধী সাধারণ জনগণ’ ব্যানারে একদল লোক জড়ো হয়ে বিক্ষোভ মিছিল করে। ব্যানারে লেখা ছিল—‘জুলাইয়ের শহীদদের রক্তের সঙ্গে বেইমানি করে ফ্যাসিবাদের সঙ্গে যোগাযোগ; জিএম কাদেরের গ্রেপ্তার চাই’। বিষয়টি নিয়ে জাতীয় পার্টির দপ্তর সম্পাদক মাহমুদ আলম বলেন, “একটি ব্যানার নিয়ে একদল দুষ্কৃতকারী জাপা চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে স্লোগান দিয়ে বাড়ির ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করে। ভেতরে ঢুকতে না পেরে তারা দরজা-জানালায় ইট-পাথর নিক্ষেপ করে ভাঙচুর চালায়। এ ঘটনায় আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে।” উত্তরা পশ্চিম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) খালিদ মনসুর জানান, মিছিলের খবর পেয়েই ঘটনাস্থলে পুলিশ পাঠানো হয়। তবে পুলিশ পৌঁছানোর আগেই তারা সটকে পড়ে। বর্তমানে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে এবং সেখানে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, অবিলম্বে ভিডিও ফুটেজ দেখে চিহ্নিত সন্ত্রাসী মোল্লা মাসুম ও ভাড়াটে হামলাকারীদের গ্রেপ্তার করা হলে এই হামলার নেপথ্যের পুরো ষড়যন্ত্র উন্মোচিত হবে। |