|
বোদা আউলিয়ার ঘাটে ভয়াবহ নৌ-ট্র্যাজেডির ৪ বছর পূর্ণ হলো, কাঁদছে করতোয়ার পাড়
কুয়েল ইসলাম সিহাত, বোদা (পঞ্চগড়) প্রনিধিতিঃ
|
গত ২০২২ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর (শুক্রবার) সেই ভয়াবহ নৌকাডুবির চার বছর পূর্ণ হলো। চার বছর পেরিয়ে গেলেও স্বজন হারানোর সেই ক্ষত শুকায়নি। নিখোঁজ স্বজনের অপেক্ষা, পরিবারের উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারানোর কষ্ট সব মিলিয়ে দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর অনেকেই এখনো দুর্বিষহ জীবন কাটাচ্ছেন। চার বছর পেরিয়ে গেলেও সেই দুর্ঘটনার শোক কাটিয়ে উঠতে পারেননি স্বজনরা।২০২২ সালে দিনটি ছিলো শুক্রবার ২৫ সেপ্টেম্বর দুপুর তখন প্রায় একটা। পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলার আউলিয়ার ঘাট দিয়ে করতোয়া নদী পার হচ্ছিল যাত্রীবোঝাই একটি নৌকা। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মহালয়া উপলক্ষ্যে অনেকে যাচ্ছিলেন বদেশ্বরী মন্দিরে। নদীর মাঝখানে যাওয়ার পর হঠাৎ স্রোতের টানে নৌকাটি দুলতে শুরু করে। তীরে থাকা স্বেচ্ছাসেবকেরা মাইকে মাঝিকে সতর্ক করেন। নৌকা ঘুরিয়ে তীরে ফিরতে গিয়ে ঘটে ভয়াবহ দুর্ঘটনা। মুহূর্তের মধ্যে নৌকাটি ডুবে যায়। নদীতে থাকা অন্য নৌকার মাঝি ও স্থানীয় লোকজন উদ্ধারকাজে ছুটে যান। কিছু মানুষকে বাঁচানো গেলেও ভয়াল ওই দুর্ঘটনায় নারী-পুরুষ ও শিশুসহ ৭১ জনের প্রাণহানি ঘটে। তাদের মধ্যে ৭১ জনের মরদেহ উদ্ধার করা সম্ভব হলেও গত চার বছর পর এখনো একজন নিখোঁজ রয়েছেন। তিনি হলেন সরেন্দ্র নাথ বর্মণ (৬৫) বোদা উপজেলার সাকোয়া ইউনিয়নের কলেজপাড়া এলাকার বাসিন্দা। নৌকাডুবিতে বোদা উপজেলার চন্দনবাড়ী ইউনিয়নের দক্ষিণ শিকারপুর প্রধানপাড়ার আদুরী রানী। তিনি স্বামীকে হারিয়ে দুই সন্তান ও শাশুড়ীকে নিয়ে সংগ্রামের জীবন তার। তিনি অন্যের জমিতে কাজ করে কোনোরকমে সংসার চালাচ্ছে। আদুরী রানী বলেন, সন্তানরা যখন বাবাকে খোঁজে, তখন কী বলব বুঝে উঠতে পারি না। সংসারে একজন পুরুষ মানুষ না থাকার কষ্ট প্রতিদিন অনুভব করি। শুরুতে কিছু সহযোগিতা পেয়েছিলাম, কিন্তু এখন কেউ খোঁজ নেয় না। একই দুর্ঘটনায় বাবা, বোন ও দুলাভাইসহ পরিবারের ৬জন সদস্যকে হারিয়েছেন সাকোয়া ইউনিয়নের কলেজপাড়ার দর্জি স্বপন কুমার রায়। তিনি বলেন, সবচেয়ে বড় কষ্ট হলো বাবা সরেন্দ্র নাথ বর্মণের মরদেহটাও পাইনি। চার বছর পরও তার কোনো খোঁজ নেই। নাতি-নাতনিরা এখনো দাদুকে খোঁজে। পঞ্চগড় জেলার ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ এই নৌ-ট্র্যাজেডির পর করতোয়া নদীর ওপর স্থায়ী সেতু নির্মাণের দাবি জোরালো হয়ে ওঠে। ২০২৪ সালে পৃথক দুটি সেতুর নির্মাণকাজ শুরু হয়। বর্তমানে কাজ দৃশ্যমান হলেও স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রত্যাশার তুলনায় অগ্রগতি ধীর। ফলে দুর্ভোগ কমার বদলে দীর্ঘায়িত হচ্ছে। নদী পারাপারকারী আরিফ হোসেন বলেন, এত বড় দুর্ঘটনার পরও মানুষকে এখনো নৌকায় চলাচল করতে হচ্ছে। দ্রুত সেতুর কাজ শেষ হলে আমাদের দুর্ভোগ কমবে। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) সূত্রে জানা গেছে, প্রায় ১১৬ কোটি টাকা ব্যয়ে আউলিয়ারঘাট-কালিয়াগঞ্জ রুটে ৩৪৫ মিটার এবং মাড়েয়া-বড়শশী রুটে ৫৪৫ মিটার দীর্ঘ দুইটি সেতু নির্মাণ করা হচ্ছে। প্রকল্পের প্রায় ৭৭ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। তবে সংযোগ সড়কের জন্য জমি অধিগ্রহণসংক্রান্ত জটিলতার কারণে কিছু অংশের কাজ ধীরগতিতে এগোচ্ছে। পঞ্চগড় এলজিইডির সিনিয়র সহকারী প্রকৌশলী মনোজ কুমার আচার্য্য বলেন, জমি সংক্রান্ত কিছু জটিলতা রয়েছে। তবে সেগুলো সমাধানের চেষ্টা চলছে। মাড়েয়া-কালিয়াগঞ্জ সেতুর কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। আমরা দ্রুত দুটি সেতুই যান চলাচলের উপযোগী করার চেষ্টা করছি। সম্প্রতি নির্মাণাধীন সেতুর কাজ পরিদর্শন করেন পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ। তিনি প্রকল্প বাস্তবায়নে কোনো ধরনের অনিয়ম বরদাশত করা হবে না বলে সংশ্লিষ্টদের সতর্ক করেন। এলজিইডির পরিকল্পনা অনুযায়ী সবকিছু ঠিক থাকলে ২০২৭ সালের ৩০ জুনের মধ্যে সেতু দুটি যান চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করা হবে। তবে চার বছর আগে করতোয়া নদীর বুকে ঘটে যাওয়া সেই মর্মান্তিক ট্র্যাজেডির স্মৃতি আজও তাড়া করে ফেরে পঞ্চগড়বাসীকে। স্বজন হারানোর বেদনার পাশাপাশি এখন তাদের একটাই প্রত্যাশা- দ্রুত শেষ হোক সেতুর কাজ, নিরাপদ হোক করতোয়া নদী পারাপার। |