|
সংগ্রাম, ত্যাগ ও নেতৃত্বের দীর্ঘ পথ পেরিয়ে রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর
মোঃ সাহাবুর রহমান:
|
দীর্ঘ ৩৫ বছর পর প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ভোটের মাধ্যমে বাংলাদেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার একদিন পরই রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নিলেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। ২০ আগস্ট ২০২৬ জাতীয় সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে তিনি ২৫৫ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী ১১-দলীয় ঐক্যের প্রার্থী অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল অলি আহমদ পেয়েছেন ৮৮ ভোট। মোট ৩৪৯ জন ভোটারের মধ্যে ৩৪৩ জন সংসদ সদস্য ভোট দেন। পরদিন ২১ আগস্ট সন্ধ্যা ৭টা ৪০ মিনিটে বঙ্গভবনের দরবার হলে জাতীয় সংসদের ভারপ্রাপ্ত স্পিকারের দায়িত্বে থাকা ব্যারিস্টার কায়সার কামালের কাছে রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন পরিচ্ছন্ন, সৎ ও সজ্জন রাজনীতিবিদ মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। শপথ অনুষ্ঠানে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্বে থাকা হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম উপস্থিত ছিলেন। মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গণির সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই শপথগ্রহণের মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিনের সম্মুখসারির বিএনপি নেতা মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। শপথ অনুষ্ঠানের শুরুতেই বঙ্গভবনের দরবার হলে রাষ্ট্রপতির প্রবেশের সময় উচ্চস্বরে আগমন বার্তা দেওয়া হয়। একই সঙ্গে অর্কেস্ট্রার ঝংকারে বেজে ওঠে জাতীয় সংগীতের সুর। প্রধানমন্ত্রীসহ শপথ অনুষ্ঠানে উপস্থিত অতিথিরা জাতীয় সংগীত শেষ না হওয়া পর্যন্ত দাঁড়িয়ে সম্মান জানান। এরপর মন্ত্রিপরিষদ সচিব রাষ্ট্রপতির কাছে অনুষ্ঠান পরিচালনার অনুমতি চাইলে তাঁর অনুমতি নিয়ে পবিত্র কোরআন থেকে তিলাওয়াত করা হয়। শপথবাক্য পাঠ শেষে রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর তাঁর হাতে থাকা ফোল্ডারে সংরক্ষিত দুটি কাগজে স্বাক্ষর করেন। এর একটি মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ সংরক্ষণ করবে এবং অন্যটি থাকবে রাষ্ট্রপতির ব্যক্তিগত সংগ্রহে। রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়া এবং পরদিন শপথ গ্রহণের মধ্য দিয়ে তাঁর কয়েক দশকের রাজনৈতিক সংগ্রাম, ত্যাগ, অভিজ্ঞতা ও নেতৃত্বের এক নতুন পরিণতি ঘটেছে। বাংলাদেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ায় মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে অভিনন্দন জানিয়েছে ভারত, পাকিস্তান, চীন, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, সুইজারল্যান্ডসহ আরও অনেক দেশ। এছাড়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাস মারফত অভিনন্দন জানিয়েছে। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের যে রাজনৈতিক পথচলা শুরু হয়েছিল ছাত্ররাজনীতি দিয়ে, পরে শিক্ষকতা ও সরকারি চাকরি পেরিয়ে তৃণমূলের রাজনীতি, সংসদ, মন্ত্রিসভা এবং বিএনপির মহাসচিবের দায়িত্বে এসে পৌঁছেছিল, সেই দীর্ঘ পথ এবার তাঁকে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে নিয়ে এসেছে। তবে এই জায়গায় পৌঁছানো সহজ কোনো যাত্রা ছিল না। এর পেছনে রয়েছে কয়েক দশকের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, আন্দোলন-সংগ্রাম, মামলা, কারাবরণ, ব্যক্তিগত ত্যাগ এবং দলের প্রতি অবিচল আনুগত্য। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে জয় এবং শপথ গ্রহণ তাঁর রাজনৈতিক জীবনের শুধু একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা নয়; এটি তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলার একটি গুরুত্বপূর্ণ স্বীকৃতিও বটে। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ১৯৪৮ সালের ২৬ জানুয়ারি ঠাকুরগাঁওয়ে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা মির্জা রুহুল আমিন ছিলেন একজন বিশিষ্ট আইনজীবী ও রাজনীতিক এবং একাধিকবার তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। পরিবারের অন্য সদস্যদেরও জাতীয় রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। তাঁর চাচা মির্জা গোলাম হাফিজ বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত থেকে ভূমিমন্ত্রী, আইনমন্ত্রী এবং দ্বিতীয় জাতীয় সংসদের স্পিকার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। আরেক চাচা উইং কমান্ডার এস.আর. মির্জা মুক্তিযুদ্ধের সময় মুজিবনগর সরকারের অধীনে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ফলে রাজনীতি ও জনসেবার পরিবেশ তাঁর পারিবারিক পরিমণ্ডলে অপরিচিত ছিল না। ঢাকা কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক সম্পন্ন করে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি বিষয়ে অধ্যয়ন করেন এবং স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়ই তিনি ছাত্ররাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে ওঠেন। তৎকালীন পূর্বপাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের সলিমুল্লাহ মুসলিম হল শাখার সাধারণ সম্পাদক এবং পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের উত্তাল সময়ে তাঁর ছাত্ররাজনৈতিক ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য। রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কারণে সে সময় তাঁকে গ্রেপ্তার এবং কারাবরণও করতে হয়েছিল। শিক্ষাজীবন শেষে তিনি শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে বেছে নেন। ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসের শিক্ষা ক্যাডারে যোগ দিয়ে ঢাকা কলেজে অর্থনীতির প্রভাষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। পরে বিভিন্ন সরকারি কলেজে শিক্ষকতা করেন এবং সরকারি দায়িত্বের অংশ হিসেবে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন। শিক্ষকতা ও সরকারি চাকরির অভিজ্ঞতা তাঁর চিন্তা, প্রশাসনিক বাস্তবতা বোঝার ক্ষমতা এবং পরবর্তী রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডকে সমৃদ্ধ করে। কিন্তু মানুষের জন্য আরও বৃহত্তর পরিসরে কাজ করার আকাঙ্ক্ষা তাঁকে শেষ পর্যন্ত সক্রিয় রাজনীতিতে ফিরিয়ে আনে। ১৯৮৬ সালে সরকারি চাকরি ছেড়ে তিনি সরাসরি রাজনীতিতে যোগ দেন। ১৯৮৮ সালে ঠাকুরগাঁও পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়ে তৃণমূলের মানুষের সঙ্গে তাঁর রাজনৈতিক সম্পর্ক আরও গভীর হয়। এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় তিনি বিএনপিতে যোগ দেন এবং ১৯৯২ সালে ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সভাপতি নির্বাচিত হন। তৃণমূল থেকে কেন্দ্র—তাঁর এই রাজনৈতিক উত্থান ছিল ধীর, ধারাবাহিক ও সাংগঠনিক অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ। ২০০১ সালে তিনি ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকারের সময়ে কৃষি এবং বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এর মাধ্যমে তাঁর রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার সঙ্গে যুক্ত হয় রাষ্ট্র পরিচালনা ও প্রশাসনিক কাজের বাস্তব অভিজ্ঞতা। এরপর আসে তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়গুলোর একটি। ২০১১ সালে তিনি বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব নেন এবং ২০১৬ সালে মহাসচিব নির্বাচিত হন। দীর্ঘ সময় ধরে তিনি দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের অন্যতম প্রধান মুখ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এই সময় বিএনপিকে অত্যন্ত কঠিন রাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার কারাবাস এবং দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের দীর্ঘ প্রবাসজীবনের সময়ে মির্জা ফখরুলকে দলের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা, নেতাকর্মীদের সঙ্গে সমন্বয় এবং দলের রাজনৈতিক অবস্থান তুলে ধরার বড় দায়িত্ব পালন করতে হয়েছে। প্রতিকূলতার মধ্যেও তিনি দলকে ঐক্যবদ্ধ রাখার চেষ্টা করেছেন। বিএনপির মহাসচিব হিসেবে তাঁর রাজনৈতিক জীবনের বড় একটি অংশ কেটেছে আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে। সংবাদ সম্মেলন, সভা-সমাবেশ, রাজপথ, আদালত কিংবা কারাগার—বিভিন্ন পরিস্থিতিতে তিনি দলের রাজনৈতিক অবস্থান তুলে ধরেছেন। রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কারণে তাঁকে বহুবার মামলা ও গ্রেফতারের মুখোমুখি হতে হয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে ১১১টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। তিনি ১১ বার কারাগারে গেছেন এবং জীবনের প্রায় সাড়ে তিন বছর কারাগারে কাটিয়েছেন। এসব প্রতিকূলতার মধ্যেও তাঁর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে ধৈর্য ও সংযম বজায় রাখার বিষয়টি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সাফল্যের পেছনে তাই শুধু পদ-পদবি নয়; রয়েছে দীর্ঘ সময়ের ত্যাগ ও কঠিন পরীক্ষার মধ্য দিয়ে নিজেকে প্রমাণ করার ইতিহাস। একজন রাজনৈতিক নেতার সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হয় কঠিন সময়ে। বিএনপির জন্য দীর্ঘ প্রতিকূল সময়েও মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দলের দায়িত্ব থেকে সরে যাননি। বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার কারাবাস এবং দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের প্রবাসজীবনের সময়ে তিনি দলের সাংগঠনিক কার্যক্রম সচল রাখা এবং নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ রাখার চেষ্টা করেছেন। এখানেই তাঁর রাজনৈতিক চরিত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ফুটে ওঠে—দলের প্রতি দায়িত্ববোধ এবং নেতৃত্বের প্রতি আস্থা। দীর্ঘ রাজনৈতিক পরীক্ষার মধ্যেও তিনি বিএনপির নেতৃত্ব ও আদর্শের সঙ্গে নিজেকে সম্পৃক্ত রেখেছেন। এই দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম ও কঠিন সময়ে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের ভূমিকার একটি মূল্যায়ন পাওয়া যায় ১৯ আগস্ট বিএনপির সংসদীয় দলের বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বক্তব্যে। বিএনপি মনোনীত রাষ্ট্রপতি প্রার্থী হিসেবে ওই বৈঠকে অংশ নিয়ে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বক্তব্য দেওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী বৈঠকটিকে একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, “আজ একটি ঐতিহাসিক দিন। অনেক ত্যাগ ও কঠিন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে আমরা আজকের এই অবস্থানে এসে পৌঁছেছি।” মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের কথা স্মরণ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তাঁকে গভীর রাতে তুলে নেওয়া হয়েছে, কারাগারে পাঠানো হয়েছে এবং নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে। এত প্রতিকূলতা ও কষ্টের মধ্যেও তিনি দলের কঠিন সময়ে সাহস ও নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং দলকে ঐক্যবদ্ধ রেখেছেন।” মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের রাজনৈতিক জীবনের একটি কঠিন সময়ের কথা স্মরণ করে প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, “একটি সংকটময় সময়ে, যখন আমাকে দেশের বাইরে থাকতে বাধ্য করা হয়েছিল, তখন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সাহসের সঙ্গে দলের হাল ধরেছিলেন। তিনি কখনো হাল ছেড়ে দেননি। নানা প্রতিকূলতা, মামলা-হামলা, কারাবরণ ও ব্যক্তিগত কষ্টের মধ্যেও তিনি দলের প্রতি তাঁর দায়িত্ব ও অঙ্গীকার থেকে সরে যাননি।” মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের দীর্ঘ ত্যাগ ও অবদানের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, “দলের সবচেয়ে কঠিন সময়ে তাঁর সাহসী ভূমিকা, ত্যাগ, নিষ্ঠা ও অবদানের জন্য বিএনপি তাঁর প্রতি গভীরভাবে কৃতজ্ঞ। প্রতিকূলতার মধ্যেও তিনি যেভাবে দলের পাশে থেকেছেন এবং দলকে ঐক্যবদ্ধ রাখার চেষ্টা করেছেন, তা আমাদের রাজনৈতিক পথচলার একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।” দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম ও কঠিন সময়ে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের ভূমিকা সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রীর এই মূল্যায়ন তাঁর প্রতি দলের নেতৃত্বের গভীর আস্থা এবং তাঁর রাজনৈতিক ত্যাগ ও অবদানের স্বীকৃতিকে স্পষ্ট করে। একই সঙ্গে রাষ্ট্রপতি পদে তাঁকে মনোনয়ন দেওয়ার মধ্য দিয়ে তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা, প্রজ্ঞা ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনের সক্ষমতার ওপর নেতৃত্বের আস্থারও প্রতিফলন ঘটেছে। একজন অভিজ্ঞ ও পরীক্ষিত রাজনৈতিক নেতাকে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে মনোনয়ন দেওয়ার সিদ্ধান্তে তাঁর দীর্ঘ পথচলা ও অবদানের যথাযথ মূল্যায়নই প্রতিফলিত হয়েছে। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের ব্যক্তিত্বের আরেকটি আকর্ষণীয় দিক তাঁর সাহিত্যপ্রেম। অর্থনীতির সাবেক শিক্ষক এই রাজনীতিক বাংলা ও বিশ্বসাহিত্যের একজন আগ্রহী পাঠক। রাজনৈতিক বক্তব্যেও বিভিন্ন সময়ে কবিতা, সাহিত্য ও দর্শনের প্রসঙ্গ উঠে এসেছে। কারাগারের নিঃসঙ্গ সময়েও বই ও কবিতা তাঁর মানসিক শক্তির উৎস ছিল। রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, জীবনানন্দ কিংবা সুকান্তের কবিতা তাঁর রাজনৈতিক বক্তব্যকে অনেক সময় ভিন্ন মাত্রা দিয়েছে। ফলে তাঁর রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের মধ্যে যেমন কঠোর সংগ্রামের অভিজ্ঞতা রয়েছে, তেমনি রয়েছে সাহিত্য ও সংস্কৃতির প্রতি গভীর অনুরাগ। এই সমন্বয় তাঁকে অন্য অনেক রাজনীতিকের তুলনায় স্বতন্ত্র করে তুলেছে। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের রাজনৈতিক চিন্তায় শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের প্রভাব এবং তাঁর রাজনৈতিক দর্শনের প্রতি গভীর শ্রদ্ধার বিষয়টিও স্পষ্ট। তিনি জিয়াউর রহমানকে বহুদলীয় গণতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ এবং বাংলাদেশের রাষ্ট্রচিন্তার গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব হিসেবে মূল্যায়ন করেন। শহীদ জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক দর্শনের প্রতি এই শ্রদ্ধা বিএনপির রাজনৈতিক ঐতিহ্যের সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত। একই ধারাবাহিকতায় বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্ব এবং তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপির দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলার সঙ্গেও মির্জা ফখরুলের রাজনৈতিক জীবন ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। ২০২৬ সালে দীর্ঘ বিরোধী রাজনীতির পর মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এবং স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এর কিছুদিন পর বিএনপি তাঁকে রাষ্ট্রপতি পদে মনোনীত করে। রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়ন পাওয়ার পর তিনি দলীয় পদ থেকে পদত্যাগ করেন। দীর্ঘদিন বিএনপির মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করার পর রাষ্ট্রপতি পদে যাওয়ার অর্থ হলো—তাঁকে এখন দলীয় রাজনীতির পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে পুরো রাষ্ট্রের প্রতিনিধিত্ব করতে হবে। এরপর আসে ২০ আগস্টের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন। বেলা ২টায় কোরআন তেলাওয়াতের মধ্য দিয়ে ভোটগ্রহণের কার্যক্রম শুরু হয় এবং বিকেল ৫টায় ভোটগ্রহণ শেষ হয়। ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম প্রথম ভোট দেন। এরপর ভারপ্রাপ্ত স্পিকার কায়সার কামাল, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ অন্যান্য সংসদ সদস্য ভোট দেন। মোট ৩৪৯ জন ভোটারের মধ্যে ৩৪৩টি ব্যালট ব্যবহৃত হয়। মির্জা ফখরুল পান ২৫৫ ভোট, আর অলি আহমদ পান ৮৮ ভোট। চারটি ব্যালট ত্রুটির কারণে বিধি অনুযায়ী পরিবর্তন করা হলেও কোনো ভোট বাতিল হয়নি। ফলাফল ঘোষণার পরপরই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান গোলাপ ফুল দিয়ে নবনির্বাচিত রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে অভিনন্দন জানান। বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমানও তাঁর আসন থেকে উঠে এসে তাঁকে অভিনন্দন জানান। নবনির্বাচিত রাষ্ট্রপতিও নিজের আসন থেকে উঠে গিয়ে বিরোধীদলীয় নেতাসহ অন্যদের সঙ্গে কোলাকুলি করেন। পরে বিএনপির অন্যান্য সংসদ সদস্যরাও তাঁর সঙ্গে কোলাকুলি ও করমর্দন করেন। রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে ঘিরে সংসদে এই সৌহার্দ্যপূর্ণ দৃশ্য নতুন দায়িত্বের জন্য একটি ইতিবাচক প্রতীক হিসেবেও বিবেচিত হবে। ১৯৯১ সালের পর এবারই প্রথম প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলো। পরবর্তী ১৯৯৬, ২০০১, ২০০২, ২০০৯, ২০১৩, ২০১৮ ও ২০২৩ সালের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে একক প্রার্থী থাকায় ভোটগ্রহণের প্রয়োজন হয়নি। ফলে ৩৫ বছর পর সংসদে অনুষ্ঠিত এই প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার ঘটনাকে রাজনৈতিকভাবে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে। রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার একদিন পর, ২১ আগস্ট, বঙ্গভবনের দরবার হলে অনুষ্ঠিত হয় তাঁর শপথগ্রহণ অনুষ্ঠান। সন্ধ্যা ৭টা ৪০ মিনিটে জাতীয় সংসদের ভারপ্রাপ্ত স্পিকারের দায়িত্বে থাকা ব্যারিস্টার কায়সার কামালের কাছে রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। রাষ্ট্রপতির আগমনের সঙ্গে সঙ্গে দরবার হলে দেওয়া হয় উচ্চস্বরে আগমন বার্তা। একই সময়ে অর্কেস্ট্রার ঝংকারে বেজে ওঠে জাতীয় সংগীতের সুর। প্রধানমন্ত্রীসহ আমন্ত্রিত অতিথিরা জাতীয় সংগীত শেষ না হওয়া পর্যন্ত দাঁড়িয়ে সম্মান জানান। শপথ গ্রহণের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রপতি হিসেবে তাঁর সাংবিধানিক দায়িত্বের আনুষ্ঠানিক সূচনা হয়। দীর্ঘদিনের দলীয় রাজনীতি, আন্দোলন-সংগ্রাম ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের অভিজ্ঞতার পর এখন তাঁর সামনে দায়িত্বের পরিধি আরও বিস্তৃত। মানুষের সঙ্গে যোগাযোগের অভিজ্ঞতা, সংসদ ও সরকার পরিচালনার অভিজ্ঞতা, প্রতিকূল পরিস্থিতিতে ধৈর্য ধরে থাকার ক্ষমতা এবং রাজনৈতিক বাস্তবতা বোঝার দক্ষতা তাঁর নতুন দায়িত্বে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হতে পারে। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের রাজনৈতিক জীবনকে এক কথায় বলা যায়—এটি সংগ্রাম, ধৈর্য, ত্যাগ ও দায়িত্ববোধের দীর্ঘ ইতিহাস। ছাত্রনেতা থেকে শিক্ষক, শিক্ষক থেকে সরকারি কর্মকর্তা, সরকারি চাকরি ছেড়ে তৃণমূলের রাজনীতিক, পৌরসভার চেয়ারম্যান থেকে জেলা বিএনপির সভাপতি, সংসদ সদস্য থেকে প্রতিমন্ত্রী, দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব থেকে দীর্ঘদিনের মহাসচিব—প্রতিটি ধাপ তিনি অতিক্রম করেছেন ধীরে ধীরে। তাঁর এই দীর্ঘ যাত্রায় বিএনপি ছিল তাঁর রাজনৈতিক জীবনের প্রধান প্ল্যাটফর্ম। বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে দলের বিভিন্ন কঠিন সময়ে দায়িত্ব পালন এবং তারেক রহমানের নেতৃত্বে দীর্ঘ প্রতিকূল সময়ে দলকে সাংগঠনিকভাবে সক্রিয় রাখার অভিজ্ঞতা তাঁর রাজনৈতিক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সেই দীর্ঘ পথচলারই এক বড় স্বীকৃতি এসেছে রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়ন, নির্বাচনে বিজয় এবং শপথ গ্রহণের মধ্য দিয়ে। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের রাষ্ট্রপতি হিসেবে নির্বাচিত হওয়া শুধু তাঁর ব্যক্তিগত রাজনৈতিক জীবনের নতুন অধ্যায় নয়; এটি তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক ত্যাগ, অভিজ্ঞতা ও নেতৃত্বেরও এক গুরুত্বপূর্ণ পরিণতি। যে মানুষটি দীর্ঘদিন রাজপথে থেকেছেন, কারাবরণ করেছেন, দলের কঠিন সময়ে দায়িত্ব পালন করেছেন, নেতৃত্বের প্রতি আস্থা রেখেছেন এবং প্রতিকূলতার মধ্যেও দলকে সাংগঠনিকভাবে সক্রিয় রাখার চেষ্টা করেছেন—আজ তিনি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক দায়িত্বে। তবে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব দলীয় রাজনীতির ঊর্ধ্বে। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক পরিচয় পেছনে রেখে এখন তাঁকে সংবিধান, রাষ্ট্র ও জনগণের স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দায়িত্ব পালন করতে হবে। তাঁর সামনে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হবে রাজনৈতিক জীবনের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা ও প্রজ্ঞাকে রাষ্ট্রীয় দায়িত্বের নিরপেক্ষতা, সংযম ও সাংবিধানিক মর্যাদার সঙ্গে সমন্বয় করা। ঠাকুরগাঁওয়ের মাটি থেকে শুরু হওয়া যে দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিযাত্রা ছাত্ররাজনীতি, শিক্ষকতা, তৃণমূলের নেতৃত্ব, সংসদ, মন্ত্রিসভা, রাজপথের আন্দোলন, মামলা ও কারাবরণ পেরিয়ে বিএনপির মহাসচিবের দায়িত্বে পৌঁছেছিল—সেই পথচলার পরিণতিতেই আজ মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি। দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম, প্রজ্ঞা ও আস্থার এই পথচলা তাঁকে নিয়ে এসেছে এক সম্পূর্ণ নতুন অধ্যায়ে—যেখানে তাঁর পরিচয় শুধু একজন প্রবীণ রাজনীতিকের নয়, তিনি এখন সমগ্র রাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে অর্জিত অভিজ্ঞতা ও প্রজ্ঞাকে কাজে লাগিয়ে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর কীভাবে সংবিধান, রাষ্ট্র ও জনগণের স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দায়িত্ব পালন করেন, সেটিই হবে তাঁর রাষ্ট্রপতি জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় এবং ভবিষ্যৎ মূল্যায়নের প্রধান ভিত্তি। |