|
আরব বিশ্বের নতুন চমক ত্রিদেশীয় চুক্তি
রায়হান আহমেদ তপাদার:
|
তুরস্ক, সৌদি আরব ও পাকিস্তানের মধ্যে মক্কা চুক্তি মধ্যপ্রাচ্যে নতুন বাস্তবতা হাজির করেছে।বহু বছর ধরে সৌদি আরবের কৌশলগত ধৈর্যকে অনেকেই ভুলভাবে নির্ভরশীলতা হিসেবে দেখেছে। রিয়াদ উসকানি সহ্য করেছে, অপ্রয়োজনীয় যুদ্ধে যায়নি, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখেছে এবং অভ্যন্তরীণ উন্নয়নে মনোযোগ দিয়েছে। তবে এই সংযম কখনোই এমন বিশ্বাস ছিল না যে যুক্তরাষ্ট্রনির্ভর নিরাপত্তাব্যবস্থা স্থায়ী থাকবে। মক্কায় সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের মধ্যে স্বাক্ষরিত পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি দেখিয়ে দিয়েছে যে পুরোনো কাঠামো বদলাচ্ছে। সুন্নি মুসলিম বিশ্বের তিনটি প্রভাবশালী দেশ এখন একসঙ্গে দাঁড়িয়েছে। এদের একটির ওপর হামলা মানে তিনটির ওপর হামলা হিসেবে ধরা হবে। এটি নতুন আঞ্চলিক নিরাপত্তাব্যবস্থার সূচনা। যদিও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো চমক একদম পছন্দ করে না, তবু ৭ আগস্ট স্বাক্ষরিত মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি ছিল আরব আমিরাত (ইউএই) ও ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর জন্য এক বিরাট চমক। গাজায় ইসরায়েলের গণহত্যার জবাবে একটি মুসলিম জোট গড়ে তোলার ইচ্ছার কথা বেশ স্পষ্ট করেই জানিয়েছিলেন তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান। তবে আড়ালে থেকে চতুর চাল চেলেছেন সৌদি আরবের ডি ফ্যাক্টো শাসক-ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান (এমবিএস)। ইরান যুদ্ধের দুপক্ষই যাতে তাঁর পদক্ষেপে সমন্বয় খুঁজে পায়, তিনি সেভাবেই এগোচ্ছিলেন। গত মাসে ওয়াশিংটনে সৌদি জ্বালানিমন্ত্রী প্রিন্স আব্দুল আজিজ বিন সালমান একটি শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষর করেন। কিন্তু এর পরপরই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাতে বাদ সাধেন। তিনি পেছনের শর্ত হিসেবে সৌদিকে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার তাগিদ দেন। দক্ষিণ ইরাকে ইরান-সমর্থিত পপুলার মোবিলাইজেশন ফোর্স বা মিলিশিয়াগুলোকে লক্ষ্য করে হামলা চালায় সৌদি ও মার্কিন যুদ্ধবিমান। এই মিলিশিয়াগুলোর নেতৃত্বে ছিলেন ইরানের আইআরজিসির উপদেষ্টারা। সৌদি গোয়েন্দারা খবর পেয়েছিল, মিলিশিয়াগুলো কুয়েতে সীমান্ত পার হয়ে হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। একই সময়ে ইয়েমেনের সানাতেও হামলা চালায় সৌদি যুদ্ধবিমান। কারণ, হুতিদের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি ভেঙে পড়েছিল। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ ইরানবিরোধী হামলায় যারা যোগ দিয়েছিল, সেই জোটের কাছে মনে হচ্ছিল, সৌদির শাসক অবশেষে তাদের পক্ষ নিচ্ছেন। তবে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানে যোগ দেওয়া তাঁর ভাবনায় ছিল না।এই পুরো অঞ্চলে এখন ঘটে চলেছে মৌলিক কিছু পরিবর্তন। ইরান, গাজা ও লেবাননে ইরানের সাম্প্রতিক তিন যুদ্ধ সৌদি মানসিকতায় বড় পরিবর্তন এনেছে।পশ্চিমে শিক্ষিত সৌদি বিশ্লেষকেরা দেখছেন, কীভাবে দুজন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ইসরায়েলের গণহত্যাকে অস্ত্র দিয়ে সহায়তা করেছেন। ফলে তাঁরা আর নিজেদের পশ্চিমা শিবিরের লোক ভাবতে পারছেন না। একই সঙ্গে তাঁরা দেখছেন, যুক্তরাষ্ট্র এ অঞ্চলে নিজের বিমানঘাঁটিগুলোই রক্ষা করতে পারছে না। এতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি তৈরি হয়েছে চরম অবজ্ঞা।সৌদি শুরা কাউন্সিলের সাবেক সদস্য ড. আহমেদ আলতুওয়াইজরি সেসব সৌদি বুদ্ধিজীবীর অন্যতম, যাঁদের কথা এখানে বলা হচ্ছে। তিনি বললেন, মক্কা চুক্তি এক চরম সংকটকালে আলোর মুখ দেখেছে। ট্রাম্পের ওপর থেকে সবাই আস্থা হারিয়েছে। এই চুক্তি শুধু এই তিন দেশের নয়, পুরো অঞ্চলের স্বার্থ রক্ষা করবে। এটি পুরো অঞ্চলের রাজনৈতিক হিসাব পাল্টে দিচ্ছে। ভবিষ্যতে আরব ও মুসলিম বিশ্বের আরও দেশ এই চুক্তিতে যোগ দেবে। এ সংঘাতে ট্রাম্পের দুর্বলতা উন্মোচিত হয়ে পড়েছে। তিনি যুদ্ধে জিততে পারছেন না, আবার কোনো সমাধানও বের করতে পারছেন না। ইরানি মধ্যস্থতাকারীরা বিষয়টি ধরে ফেলেছেন। তাঁরা হরমুজ প্রণালির বর্তমান অচলাবস্থা ট্রাম্পের মধ্যবর্তী নির্বাচন পর্যন্ত টেনে নিতে চান। কারণ, তাঁরা হিসাব করছেন, ট্রাম্প কংগ্রেসে তাঁর নিয়ন্ত্রণ হারাতে পারেন। আর তাতে দুর্বল অবস্থায় তাঁকে আলোচনার টেবিলে আনা সহজ হবে। ইসরায়েলি কূটনৈতিক ও সামরিক পরিকল্পনাকারীরা দীর্ঘদিন ধরে বলছিলেন, তাঁরা ‘সুন্নি’ মুসলিম জোটের বিরুদ্ধে একটি জোট তৈরি করতে চায়। সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে তাদের সামরিক সহযোগিতা ছিল এ পরিকল্পনার মূল কেন্দ্র। ইরানে মার্কিন-ইসরায়েলি যৌথ আক্রমণ সেই জোটকে আড়াল থেকে সামনে নিয়ে আসে। যেটা আগে গোপনে চলত, সেটা এখন একেবারে প্রকাশ্যে চলে এসেছে। আমিরাতের প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ বিন জায়েদ (এমবিজে) আব্রাহাম আকোর্ডে বেশ উৎসাহের সঙ্গেই সই করেছিলেন। যুদ্ধের আগুনে সেই চুক্তির পরীক্ষাও হয়ে গেছে।ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের মুখে যখন আবুধাবি কোণঠাসা, তখন ইসরায়েল সেখানে তাদের সবচেয়ে সংবেদনশীল এবং উচ্চ প্রযুক্তির প্রতিরক্ষাব্যবস্থা মোতায়েন করে। একটি আরব দেশে সরাসরি ইসরায়েলি নিয়ন্ত্রণে তাদের সবচেয়ে আধুনিক প্রতিরক্ষাব্যবস্থা মোতায়েন করাকে তখন নজিরবিহীন হিসেবে দেখা হয়েছিল।ইসরায়েলের স্বপ্ন ছিল, শত্রুদের একবার পিষে ফেলতে পারলে ভারত থেকে ভূমধ্যসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত একটি বিশাল জোট তৈরি হবে। আর ইসরায়েল বসবে তেল, গ্যাস, অর্থ ও প্রযুক্তির সেই সংযোগস্থলের কেন্দ্রে। এই অঞ্চলের সামরিক চাবিকাঠি থাকবে তেল আবিবের হাতে।সৌদিরা এখন পুরোপুরি নিশ্চিত যে আমিরাতের প্রেসিডেন্ট ইয়েমেন ও সুদানে তাঁদের জীবন কঠিন করে তুলবেন। আমিরাত ইচ্ছা করেই ইয়েমেন ও সুদানে বিশৃঙ্খলা তৈরি করবে। তারা মিসরকে সৌদির বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে অবস্থান নিতে উসকানি দেবে। পরিস্থিতি যদি চরম পর্যায়ে পৌঁছায়, তবে রিয়াদ আবুধাবিতে ক্ষমতার পরিবর্তনের পথও ভাবতে পারে। স্থানীয় দ্বন্দ্ব থামানোর এটিই হবে সহজতম উপায়।এ পরিকল্পনায় মিসর ও সিরিয়ার মতো প্রথাগত আরব শক্তির পতন ছিল নিশ্চিত। তারা হয় নিঃস্ব হয়ে দেউলিয়া হবে, না হয় ধর্মীয় ও জাতিগত উপদলে খণ্ডবিখণ্ড হয়ে যাবে। আহমদ আল-শারার সিরিয়া নিয়ে ইসরায়েলের এখনো একই পরিকল্পনা। আমিরাত ও ইসরায়েল-উভয়ের স্বার্থই ছিল অভিন্ন। তারা ইয়েমেন, সুদান ও লিবিয়ায় গৃহযুদ্ধ উসকে দিতে চেয়েছিল। এমনকি সোমালিল্যান্ডের মতো বিচ্ছিন্নতাবাদী অঞ্চলকে ব্যবহার করে সামরিক ঘাঁটির জাল বিছিয়ে নিজেদের জলপথের সাম্রাজ্য গড়ে তুলতে চেয়েছিল। মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি ঠিক এ প্রকল্পেরই এক মারাত্মক প্রতিপক্ষ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর প্রথম প্রভাব পড়বে রিয়াদ ও আবুধাবির মধ্যকার কৌশলগত বিরোধকে আরও গভীর ও তীব্র করার মাধ্যমে। গত ডিসেম্বরে ইয়েমেন থেকে আমিরাতিরা বহিষ্কৃত হওয়ার পর রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. আবদুল খালেক আবদুল্লাহ লিখেছিলেন, ‘ইয়েমেন নিয়ে আমাদের মতপার্থক্য আছে। সংঘাতের কারণে তা এখন শীর্ষ পর্যায়ে। সহযোগীদের মধ্যে ঝামেলা হতেই পারে, কিন্তু তারা আবার এক হয়।’কিন্তু জানুয়ারি আসতে না আসতেই আবদুল খালেক আবদুল্লাহর সুর বদলে গেল। তিনি লিখলেন, ‘সৌদি আরব আর আমিরাতের মধ্যকার দূরত্ব কেবল ইয়েমেন সংঘাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এটি আরও গভীর।’ সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফয়সাল বিন ফারহান আল সৌদ তখন বলেছিলেন, সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় নিরাপত্তার পারস্পরিক শ্রদ্ধার ওপর। এরপর আরব আমিরাত তাদের দেশে আল অ্যারাবিয়ার এক্স অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে দেয় এবং ওপেক ত্যাগ করে।পরিস্থিতি যদি চরম পর্যায়ে পৌঁছায়, তবে রিয়াদ আবুধাবিতে ক্ষমতার পরিবর্তনের পথও ভাবতে পারে। স্থানীয় দ্বন্দ্ব থামানোর এটিই হবে সহজতম উপায়। সৌদিরা তাঁদের কৌশলগত সিদ্ধান্তের ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ ফিরিয়ে আনতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। সে কারণেই তাঁরা মক্কা চুক্তিতে মিসরকে অন্তর্ভুক্ত করার বিরোধিতা করেছিলেন। গত সপ্তাহে তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান মিসর সফরকালে আশা প্রকাশ করেন, কায়রোও এই চুক্তিতে যোগ দেবে এবং চার দেশ মিলে কাজ করবে। ওয়াশিংটনে এই দুটি প্রতিদ্বন্দ্বী সামরিক জোটকে মূল্যায়ন করা হচ্ছে দুভাবে-একটি হলো গভীর কৌশলগত জোট, আর অন্যটি ক্ষিপ্র কিন্তু লেনদেনসর্বস্ব জোট।সাবেক মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তা থিওডর সিঙ্গার বলেন, ‘প্রথম দর্শনে আমিরাত-ইসরায়েল জোট দুপক্ষকেই তাৎক্ষণিক সুবিধা দেয়। কিন্তু দীর্ঘ মেয়াদে মক্কা চুক্তি আরও ব্যাপক ও সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলবে।’ যুক্তরাষ্ট্রের কল্যাণে হয়তো ইসরায়েলের কাছে অত্যাধুনিক অস্ত্র রয়েছে, কিন্তু সেই অস্ত্র ব্যবহারের কোনো আঞ্চলিক বৈধতা তাদের নেই। তারপরও এ যুদ্ধগুলো তাদের সামরিক উদ্দেশ্য পূরণে ব্যর্থ হচ্ছে। নেতানিয়াহু আর ট্রাম্প পুরো উপসাগরকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে এসেছেন। যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল বন্ধের উপক্রম।গাজা ও দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েল দীর্ঘ মেয়াদে নিজেদের অবস্থান পোক্ত করতে বড় ধরনের অবকাঠামো তৈরি করছে। কোনো ফ্রন্ট থেকেই পিছু হটার লক্ষণ নেই। হামাস আর হিজবুল্লাহকে নিশ্চিহ্ন করার সামরিক লক্ষ্য পূরণ না হওয়ায় ও ট্রাম্পের চাপ সামলাতে গিয়ে ইসরায়েল কেবল নিজের অবস্থান কাঁটাতারে ঘিরেই শক্ত করছে। এমন পরিস্থিতিতে আরব বিশ্ব সুরক্ষার জন্য এবং সমাধানের জন্য মক্কা জোটের দিকেই তাকিয়ে থাকবে। এই জোটগুলোর সম্মিলিত শক্তি এখন ছয় লাখ ৫০ হাজারের বেশি। এটি একক বাহিনী নয়, বরং সমন্বিত আঞ্চলিক শক্তি। এই পরিবর্তন ইসরায়েলের জন্যও বার্তা। সামরিক শক্তি মানেই সীমাহীন ক্ষমতা নয়। কাতারে হামলা দেখিয়েছে এর পরিণতি কী হতে পারে। উপসাগরীয় দেশের ওপর আঘাত কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। নতুন কাঠামো ইরান ও ইসরায়েল উভয়ের জন্য সীমা নির্ধারণ করবে। ফলে একটি ভারসাম্য তৈরি হবে। অনেকে এই চুক্তিকে প্রতীকী ভাবতে পারে। কিন্তু বাস্তবে সহযোগিতা শুরু হয়েছে। সামুদ্রিক জোট আছে, ইয়েমেনে অভিযান চলছে, উপসাগরে সংহতির আলোচনা হচ্ছে। এই চুক্তি সেই প্রক্রিয়াকে আনুষ্ঠানিক করেছে। এটাই আমেরিকা-পরবর্তী মধ্যপ্রাচ্যের শুরু। এখানে যুক্তরাষ্ট্র থাকবে, কিন্তু একমাত্র নিরাপত্তানির্ভরতা থাকবে না। দেশগুলো নিজেরাই নিজেদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে। এবং এই নতুন ব্যবস্থার কেন্দ্র হয়ে উঠছে সৌদি আরব। লেখক: গবেষক ও কলাম লেখক, লন্ডন থেকে |