|
রাষ্ট্র ও নাগরিকের যৌথ উদ্যোগেই দেশ এগিয়ে যায়
রায়হান আহমেদ তপাদার:
|
নাগরিক সমাজের প্রবণতাই হচ্ছে মাঝে মাঝে বিদ্যমান অবস্থাকে চ্যালেঞ্জ করা,যা আরও উদার ও অংশীদারত্ব- মূলক সমাজের দিকে ধাবিত হতে পারে। যার জন্য সমাজে শুধু ভিন্নমত ও দৃষ্টিভঙ্গির প্রতি সহনশীলতাই নয়; অর্থবহ, ইতিবাচক সংলাপ ও বিতর্কের জন্য উদারতারও প্রয়োজন। চিন্তার উদারতার অভাবে সামাজিক বিচ্ছিন্নতার আশঙ্কা থাকে, যার প্রকাশ ঘটতে পারে সহিংসভাবে, যা অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও অগ্রযাত্রার পরিবেশকে অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে। নাগরিক সমাজের জন্য সহায়ক পরিস্থিতির ক্ষেত্রে আদর্শিক কোনো মানদণ্ড নেই। যদিও এ ক্ষেত্রে একটি অপরিহার্য উপাদান হচ্ছে, নাগরিক সমাজ সেখানেই গড়ে উঠবে, যখন রাষ্ট্র কোনো নিয়ন্ত্রণমূলক আইন চাপিয়ে দেবে না বরং এর পরিবর্তে নাগরিকদের অংশগ্রহণকে উৎসাহিত করবে। শক্তিশালী নাগরিক সমাজ যুগপৎভাবে একটি কার্যকর ও স্থিতিশীল গণতন্ত্রের পূর্বশর্ত এবং এর পরিণতি। জাতিসংঘ মনে করে, নাগরিক সমাজকে কোনো রকম বাধা-বিঘ্ন ছাড়া বিকশিত হতে দিলেই উন্নয়ন ও গণতন্ত্র সবচেয়ে ভালোভাবে কার্যকর হয়। তবে দেশের উন্নয়নের দায় শুধু সরকারের নয়, নাগরিকেরও বটে। বাংলাদেশে উন্নয়ন নিয়ে কথা উঠলেই আমরা প্রায় স্বভাবগতভাবে সরকারের দিকে তাকাই। রাস্তা ভাঙা, সরকারের ব্যর্থতা। শহর নোংরা, সিটি করপোরেশনের ব্যর্থতা। ট্রাফিক বিশৃঙ্খলা, পুলিশের ব্যর্থতা। হাসপাতাল অগোছালো, প্রশাসনের ব্যর্থতা। নিশ্চয়ই সরকারের দায়িত্ব আছে এবং সে দায়িত্ব এড়ানোর কোনো সুযোগ নেই। রাষ্ট্রের সম্পদ, নীতি, আইন, অবকাঠামো, সেবা ও জবাবদিহির প্রধান দায়িত্ব সরকারেরই। কিন্তু একটি দেশ কি শুধু সরকার দিয়ে উন্নত হয়? নাকি এখানে নাগরিকেরও দায়িত্ব আছে সেটাও মাথায় রাখতে হবে। একটি সমাজ কি শুধু পুলিশের বাঁশি শুনে শৃঙ্খলাবদ্ধ হয়? উন্নয়ন যদি কেবল সেতু, রাস্তা, মেট্রোরেল, বিদ্যুৎকেন্দ্র, রপ্তানি আয় বা মাথাপিছু আয়ের হিসাব হতো, তাহলে নাগরিকের চরিত্র নিয়ে কথা বলার দরকার ছিল না। কিন্তু উন্নয়ন শেষ পর্যন্ত মানুষের আচরণে, সামাজিক অভ্যাসে, দায়িত্ববোধে এবং প্রতিদিনের নৈতিকতায় পরিমাপ হয়। উন্নত দেশগুলো শুধু ভালো সরকার দিয়ে উন্নত হয়নি; তারা উন্নত হয়েছে কারণ নাগরিকেরা নিজেদেরও রাষ্ট্রের অংশ হিসেবে দেখেছে। জাপানে স্কুলের শিশুরা নিজেদের শ্রেণিকক্ষ নিজেরাই পরিষ্কার করে। অনেক স্থানে খেলার মাঠ, উৎসব, স্টেডিয়াম, ট্রেন স্টেশন বা জনসমাগমের জায়গায় মানুষ নিজের ব্যবহৃত জায়গা নিজেই পরিষ্কার রাখে।পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা শুধু পরিচ্ছন্নতা কর্মীর কাজ নয়, নাগরিক চরিত্রের অংশ। এই জায়গাটিই আমাদের শেখার। বাংলাদেশের শহর, বাজার, বাসস্ট্যান্ড, লঞ্চঘাট, রেলস্টেশন, হাসপাতাল, স্কুল, সরকারি অফিস-সব জায়গায় আমরা নাগরিক আচরণের পরীক্ষা দিই। দুর্ভাগ্য হলো, পরীক্ষার ফল খুব ভালো নয়। বাসস্ট্যান্ডে আমরা লাইনে দাঁড়াতে চাই না। বাসে উঠে নারী, শিশু, বৃদ্ধ বা প্রতিবন্ধী মানুষের জন্য আসন ছাড়তে অনীহা দেখাই।ট্রেনে টিকিট কেটে ভ্রমণ করা এখনো অনেকের কাছে বোকামি মনে হয়। প্ল্যাটফর্মে ময়লা ফেলি, টয়লেট নোংরা করি, জানালা দিয়ে প্লাস্টিক ছুড়ে দিই, পাবলিক সম্পদকে ব্যক্তিগত অবহেলার জায়গা বানাই। অথচ আমরা যদি নিজেরা একটু শৃঙ্খলা মেনে চলি, তবে সরকারের জন্য অনেক সহজ হয়। সুশাসন চাইলে নাগরিককেও সুশৃঙ্খল হতে হয়। আমরা প্রায়ই বলি, দেশে আইন নেই। আসলে আইন অনেক আছে; আইন মানার সংস্কৃতি দুর্বল। ট্রাফিক সিগন্যাল লাল হলেও রাস্তা ফাঁকা দেখলে আমরা পার হয়ে যাই। পদচারী-সেতু থাকলেও নিচ দিয়ে দৌড়ে রাস্তা পার হই। হাসপাতালের নিয়ম মানি না, স্কুলের নিয়ম মানি না, অফিসের সময় মানি না, পরীক্ষার হলে নকলকে অপরাধের বদলে সুযোগ ভাবি। আবার রাষ্ট্রের কাছে চাই-দক্ষতা, শৃঙ্খলা, নিরাপত্তা, ন্যায়বিচার। প্রশ্ন হলো নাগরিক যদি নিয়মকে সম্মান না করে, তাহলে রাষ্ট্রের নিয়ম কীভাবে শক্তিশালী হবে? আইন শুধু ভয়ের বিষয় নয়; আইন হলো সামাজিক আস্থার ভিত্তি।আমি নিয়ম মানব,কারণ অন্যরাও মানবে-এই বিশ্বাসের ওপর সভ্যতা দাঁড়িয়ে থাকে। আমাদের দেশের উন্নয়নের আরেকটি শর্ত হলো সামাজিক সম্মানবোধ। আমরা যেন দ্রুত একধরনের রূঢ় সমাজে পরিণত হচ্ছি। বাসে, রাস্তায়, দোকানে, সরকারি অফিসে, অনলাইনে-ভাষার ভদ্রতা কমছে। ছোটকে অপমান, বড়কে অবজ্ঞা, নারীকে তুচ্ছ করা, ভিন্নমতকে গালি দেওয়া, শ্রমজীবী মানুষকে অসম্মান করা-এসব আমাদের সামাজিক পুঁজিকে নষ্ট করছে। একটি সমাজে অর্থনৈতিক পুঁজি যেমন দরকার, তেমনি দরকার সামাজিক পুঁজি-বিশ্বাস, শালীনতা, পারস্পরিক সম্মান, সহনশীলতা ও সহযোগিতা।উন্নয়নকে নাগরিক দায়িত্বের সঙ্গে যুক্ত করতে হলে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় পরিবর্তন দরকার। শুধু নম্বর, চাকরি, বিদেশযাত্রা বা পেশাগত সাফল্য দিয়ে শিক্ষা সম্পূর্ণ হয় না। স্কুলে শিশুদের শেখাতে হবে, নিজের ডেস্ক নিজে পরিষ্কার করা, পানির অপচয় না করা, ময়লা ডাস্টবিনে ফেলা, লাইনে দাঁড়ানো, গণপরিবহনে শালীন আচরণ করা, বয়স্কদের সাহায্য করা, মিথ্যা না বলা, সরকারি সম্পদ নষ্ট না করা। বিশ্ববিদ্যালয়েও নাগরিক শিক্ষা থাকা দরকার। আমরা ডিগ্রিধারী মানুষ তৈরি করছি, কিন্তু নাগরিক তৈরি করছি কি? একজন উচ্চশিক্ষিত মানুষ যদি রাস্তার মাঝখানে গাড়ি পার্ক করেন, দুর্বলকে অপমান করেন, ঘুষ দিয়ে কাজ করাকে বুদ্ধিমত্তা ভাবেন, তাহলে তাঁর শিক্ষা সমাজকে উন্নত করে না; বরং উন্নয়নের মুখোশ তৈরি করে। সরকারি কাজ সম্পন্ন করতে নাগরিক সহযোগিতা অপরিহার্য। রাস্তা মেরামত, ড্রেন পরিষ্কার, টিকাদান কর্মসূচি, বৃক্ষরোপণ, বন্যা মোকাবিলা, স্কুল উন্নয়ন, বাজার ব্যবস্থাপনা, ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ, পাড়া-মহল্লার নিরাপত্তা- এসব কাজে জনগণ সহযোগিতা না করলে প্রশাসনের কাজ বহুগুণ কঠিন হয়। আমরা অনেক সময় সরকারি প্রকল্পকে নিজের চোখের সামনে ব্যর্থ হতে দেখেছি। কারণ, ভাবি, এটা আমার কাজ নয়। রাষ্ট্রের সম্পদ আসলে জনগণের সম্পদ-এই সহজ কথাটি আমরা যত দিন হৃদয়ে নেব না, তত দিন উন্নয়ন ভঙ্গুর থাকবে। নাগরিক দায়িত্ব মানে শুধু বড় কাজ নয়; ছোট কাজের ধারাবাহিকতা। যেমন রাস্তায় থুতু না ফেলা, যেখানে-সেখানে প্রস্রাব না করা, প্লাস্টিক ব্যবহার কমানো, শব্দদূষণ না করা, মসজিদ-মন্দির-স্কুল-হাসপাতালের আশপাশে শৃঙ্খলা রাখা, যানবাহনে ভাড়া নিয়ে অযথা ঝগড়া না করা, অনলাইনে মিথ্যা তথ্য না ছড়ানো, ভোটের সময় অর্থ বা পরিচয়ের ভিত্তিতে নয়, বিবেকের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া। উন্নত নাগরিকত্বের শুরু এখানেই। যে মানুষ নিজের আশপাশের দশ হাত জায়গা পরিষ্কার রাখে না, সে দেশের উন্নয়ন নিয়ে দীর্ঘ বক্তৃতা দিলে তা কেমন শোনায় তা আপনারাই বলুন। এখানে অবশ্য সতর্কতা দরকার। নাগরিক দায়িত্বের কথা বলার অর্থ সরকারের ব্যর্থতা ঢেকে দেওয়া নয়। সরকারকে অবশ্যই জবাবদিহি করতে হবে, দুর্নীতি কমাতে হবে, সেবা দিতে হবে, ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হবে, শিক্ষার মান বাড়াতে হবে,স্বাস্থ্যসেবা উন্নত করতে হবে।কিন্তু নাগরিকেরা যদি নিজেদের দায়িত্ব পুরোপুরি অস্বীকার করে শুধু সরকারকে দোষ দেয়, তাহলে উন্নয়ন অসম্পূর্ণ থাকবে। উন্নয়ন হলো রাষ্ট্র ও নাগরিকের যৌথ চুক্তি। সরকার অবকাঠামো দেবে, নাগরিক সেটি রক্ষা করবে। সরকার আইন করবে, নাগরিক তা মানবে। সরকার সেবা দেবে, নাগরিক সেবা নেওয়ার শৃঙ্খলা বজায় রাখবে। সরকার পরিকল্পনা করবে, নাগরিক সহযোগিতা করবে। এই পারস্পরিক দায়িত্ব ছাড়া উন্নয়ন টেকসই হয় না। আমাদের দেশের সামনে বড় সম্ভাবনা আছে। আমাদের তরুণ জনসংখ্যা আছে, প্রবাসী শক্তি আছে, উদ্যোক্তা আছে, কৃষকের শ্রম আছে, নারীর অগ্রযাত্রা আছে, প্রযুক্তির বিস্তার আছে, সাংস্কৃতিক শক্তি আছে। কিন্তু সম্ভাবনা বাস্তবে রূপ নিতে হলে আমাদের নাগরিক চরিত্রও উন্নত হতে হবে।একবিংশ শতাব্দীর প্রথম কোয়ার্টারে বৈশ্বিকভাবে গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার সংকট ও কর্তৃত্ববাদী সমাজ বিকাশের এ সময়ে বাংলাদেশে শিক্ষার্থী-জনতার যে রক্তাক্ত বিপ্লব হয়েছে, তার পরিপ্রেক্ষিতে যে রাষ্ট্র নির্মাণের কথা বলা হচ্ছে সে রাষ্ট্রে নাগরিক চুক্তি হবে অত্যাধুনিক। এ চুক্তিতে নাগরিক ও শাসনকারী কর্তৃপক্ষের মধ্যে রাষ্ট্র গঠন ও এর জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সার্বভৌমত্ব রক্ষা, নাগরিক অধিকার ও মানবাধিকার, নৃতাত্ত্বিক ও জেন্ডার বৈষম্যমুক্ত বাংলাদেশ হবে। আজকে শিক্ষার্থী-জনতার বিপ্লবের সুবিধা হলো বৈষম্যবিরোধী সমাজ নির্মাণের প্রয়োজনীয় পাঠ তারা আগের বিপ্লবগুলো তথা রুশ, ফ্রেঞ্চ, আমেরিকান বিপ্লবগুলো থেকে নিতে পারবে। বিশেষ করে ফ্রেঞ্চ বিপ্লব থেকে তারা নিজেদের পরিবেশের উপযোগী মানবাধিকার ও মৌলিক অধিকার সমুন্নত রাখার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে পারবে। শত শত মানুষের শহীদী রক্ত এবং হাজার হাজার ক্ষত-বিক্ষত আহত মানুষের আহাজারির ওপর যে রক্তাক্ত রাজপথ থেকে একটা নতুন বাংলাদেশ নির্মাণের জন্য সব বাংলাদেশী নাগরিকের মধ্যে বোঝাপড়ার প্রমাণস্বরূপ একটা নাগরিক চুক্তি দরকার। এ চুক্তির স্বরূপ নির্ধারিত হবে নাগরিকদের মনন থেকে, কিন্তু স্থানীয় ও বৈশ্বিক পূর্ববর্তী নাগরিক চুক্তিগুলোর সাফল্য ও ব্যর্থতার শিক্ষা ও অভিজ্ঞতা থেকে এ চুক্তিকে সমৃদ্ধ করতে হবে। যেহেতু রাষ্ট্র ধারাবাহিকভাবে পরিচালিত করে রাজনৈতিক দল,সেহেতু রাজনৈতিক দল হলো এর অন্যতম ক্যাটালিস্ট। তবে শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে যেহেতু বিপ্লব ২০২৪ হয়েছে সেহেতু এ বোঝাপড়ায় শিক্ষার্থীরা অন্যতম নির্ধারক। তাছাড়া অন্যান্য সামাজিক ও রাজনৈতিক কুশীলব এ বোঝাপড়ার খসড়া উপস্থাপন করবে। সরকার এ তিন পক্ষকে নিয়ে ধারাবাহিকভাবে আলোচনা করে ব্যাপক ও বৃহত্তর বোঝাপড়া তৈরি করবে এবং এ বৃহত্তর বোঝাপড়ার চূড়ান্ত অবস্থায় তৈরি হবে নাগরিক চুক্তি। মনে রাখতে হবে ফ্যাসিবাদ মনস্তত্ত্বে রয়ে যায়। ন্যূনতম স্তরে নাগরিক চুক্তি না হলে ফ্যাসিবাদ ফিরে আসে (মিসর ও তিউনিসিয়া) অথবা মারাত্মক রাজনৈতিক ও সামাজিক নৈরাজ্য দেখা দেয়। যেমন, লিবিয়া, ইরাক, সিরিয়া ও ভেনিজুয়েলায় দেখা গেছে। ভিয়েতনাম ও কিউবায় এক ধরনের ন্যূনতম নাগরিক চুক্তি হওয়ায় জাতি ও রাষ্ট্র নিরাপদ হয়েছে এবং আমেরিকা, ফ্রান্স বা ব্রিটেনের মতো উঁচু মাত্রার নাগরিক চুক্তি হলে রাষ্ট্র টেকসই হয়। তাই এখন বাংলাদেশের শাসকদের সাধারণ নাগরিকদের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে হবে। অন্যথায় ফ্যাসিবাদ আবার ফিরে আসতে পারে। লেখক: গবেষক ও কলাম লেখক, লন্ডন থেকে |