|
আবাসিক মাদ্রাসায় শিশু সুরক্ষা ও নিরাপদ শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরী
জুবাইর আহমেদ:
|
সাম্প্রতিক সময়ে আবাসিক মাদ্রাসাগুলোতে কিছু শিক্ষক কর্তৃক কোমলমতী শিক্ষার্থীদের ওপর শারীরিক নির্যাতন ও যৌন নিপীড়নের খবর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও সংবাদপত্রে উঠে আসছে। যদিও এসব ঘটনার কিছু ক্ষেত্রে তথ্যের সত্য-মিথ্যার সংমিশ্রণ বা অতিরঞ্জন থাকে, তবুও দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বাস্তবিকই এমন অপকর্ম ঘটছে, তা অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। যে শিক্ষকেরা শিক্ষার্থীদের ধর্মীয় মূল্যবোধ, নীতি-নৈতিকতা ও আখেরাতের শিক্ষা দেন, তাদের হাতেই শিশু নির্যাতনের ঘটনা অত্যন্ত হৃদয়বিদারক ও অপ্রত্যাশিত। শাসন করার নামে নির্বিচারে মারধর কিংবা যৌন বলৎকার কোনো অবস্থাতেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না; কারণ শাসন আর নির্যাতন কখনোই এক বিষয় নয়।এই ধরনের অপরাধ ও নির্যাতনের সিংহভাগই ঘটে থাকে মূলত আবাসিক ও কওমী মাদ্রাসাগুলোতে। অন্যদিকে, সরকারি আলিয়া মাদ্রাসাগুলোতে দিনের নির্দিষ্ট সময়ের পর পাঠদান শেষ হয়ে যাওয়ায় এবং সেখানে সার্বক্ষণিক নজরদারি থাকায় এ জাতীয় ঘটনার সুযোগ বেশ কম। কিন্তু কওমী ও হেফজ বিভাগের আবাসিক কাঠামোর সুযোগ নিয়ে কিছু বিকৃত মানসিকতার ব্যক্তি কোমলমতী শিশুদের জীবন বিষাদময় করে তুলছে। এর পরিণতি অত্যন্ত ভয়াবহ। এভাবে চলতে থাকলে সাধারণ মুসলিম সমাজ তাদের সন্তানদের দ্বীনি শিক্ষা অর্জনের জন্য মাদ্রাসায় পাঠাতে আস্থা হারিয়ে ফেলবে, যা সামগ্রিক ইসলামী শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য একটি বড় হুমকি। মূলত সরকারি সুস্পষ্ট নিয়ন্ত্রণ ও নজরদারির অভাবেই এই ক্ষেত্রটিতে শৃঙ্খলা ফেরানো কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই অনতিবিলম্বে দেশের সকল কওমী ও আবাসিক মাদ্রাসাকে নিবন্ধনের আওতায় আনা জরুরি। কোনো প্রতিষ্ঠানকে পরিচালনা করতে হলে সেখানে শিক্ষার্থীদের সুরক্ষা সংক্রান্ত নির্ধারিত মানদণ্ড পূরণ বাধ্যতামূলক করতে হবে। একই সাথে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিশু নির্যাতন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করে এবং এর কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে একটি সুনির্দিষ্ট 'শিশু সুরক্ষা আইন' প্রণয়ন করা এখন সময়ের দাবি। যেখানে সেখানে মাদ্রাসা গড়ে তোলা রোধ করতে হবে। মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠার জন্য সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রনয়ন করতে হবে। উক্ত নীতিমালা মানতে না পারলে নিবন্ধন দেয়া যাবে না। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে নির্যাতন বন্ধে শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়াতেও বড় ধরনের পরিবর্তন আনা প্রয়োজন। শুধু ধর্মীয় যোগ্যতাই নয়, শিক্ষক নিয়োগের সময় তাদের মনস্তাত্ত্বিক সুস্থতা এবং অতীত চালচলন পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই করা উচিত। শিশুদের ভয় দেখিয়ে নয়, বরং ভালোবাসার মাধ্যমে কীভাবে পরিচালনা করতে হয়, সে বিষয়ে শিক্ষকদের আধুনিক ও ইতিবাচক শৃঙ্খলা বিষয়ক প্রশিক্ষণ দেওয়া আবশ্যক। পাশাপাশি আবাসিক মাদ্রাসাগুলোর প্রতিটি সিসিটিভি ক্যামেরার আওতায় আনা এবং স্থানীয় প্রশাসন ও মাদ্রাসা বোর্ডের যৌথ উদ্যোগে আকস্মিক পরিদর্শনের ব্যবস্থা গঠন করতে হবে। যেকোনো অভিযোগ পাওয়ার পর তা আড়াল করার অপচেষ্টা বন্ধ করে অপরাধীদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে। কোনো শিক্ষকের বিরুদ্ধে শিশু নির্যাতন বা বলৎকারের সত্যতা পাওয়া গেলে তাকে অবিলম্বে বহিষ্কারসহ দেশের প্রচলিত আইনে কঠোর ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে। বিচারে এই দৃষ্টান্ত স্থাপন করা গেলে ভবিষ্যতে অন্য কেউ এমন অপকর্ম করার সাহস পাবে না। এছাড়া শিক্ষার্থীদের স্বাধীনভাবে অভিযোগ জানানোর জন্য একটি গোপন ও নিরপেক্ষ অভিযোগ বক্স এবং অভিভাবক ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে মনিটরিং সেল গঠন করা যেতে পারে। মুসলিম হিসেবে সন্তানদের ধর্মীয় শিক্ষা দান করা অভিভাবকের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। নিজ ঘরে রেখে দ্বীনি শিক্ষা দেওয়ার কথা বলা হলেও ঘরে এক শিক্ষকের মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ শিক্ষা প্রদান সম্ভব নয়, কারন শিক্ষা গ্রহণ দীর্ঘমেয়াদী প্রক্রিয়া, তাই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তথা ধমীয় শিক্ষার জন্য মাদ্রাসা শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা অতাবশ্যকীয়। তাই কওমী শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে এবং শিশুদের ভবিষ্যৎ সুরক্ষায় সরকার, মাদ্রাসা বোর্ড এবং সাধারণ সমাজকে একযোগে কাজ করতে হবে। অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করে এবং আইনি নজরদারি বাড়িয়ে মাদ্রাসাগুলোকে শিশুদের জন্য একটি নিরাপদ, ভীতিহীন ও সুন্দর শিক্ষার নীড় হিসেবে গড়ে তোলাই হোক আমাদের অঙ্গীকার। লেখকঃ সাবেক শিক্ষার্থী, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব জার্নালিজম অ্যান্ড ইলেকট্রনিক মিডিয়া (বিজেম)। |