|
মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক ঘাঁটির বৈধতা আছে কী, এসব সরিয়ে নিলে কী হতে পারে
নতুন বার্তা, ঢাকা:
|
মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বিস্তৃত সামরিক ঘাঁটির নেটওয়ার্ক অনেক বছর ধরে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে বিতর্কিত বিষয়। সাম্প্রতিক ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সংঘাতের মধ্যে এই প্রশ্নটি আবার সামনে এসেছে- মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের এত বিপুল সামরিক ঘাঁটির আইনি বৈধতা কতটা, এবং এই নেটওয়ার্ক কাদের জন্য নিরাপত্তার আবরণ আর কাদের জন্য হুমকি?বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে যুক্তরাষ্ট্রের ২০টির বেশি বড় সামরিক ঘাঁটি এবং শতাধিক ছোট সামরিক স্থাপনা রয়েছে বলে প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের ধারণা। এসব ঘাঁটি ছড়িয়ে রয়েছে কাতার, বাহরাইন, কুয়েত, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, জর্ডান, ইরাক, সিরিয়া, তুরস্ক এবং ওমানসহ বিভিন্ন দেশে। এর মধ্যে কাতারের আল উদেইদ বিমানঘাঁটি মধ্যপ্রাচ্যে সবচেয়ে বড় মার্কিন সামরিক ঘাঁটি। বাহরাইনে রয়েছে মার্কিন নৌবাহিনীর পঞ্চম নৌবহরের সদরদপ্তর, আর কুয়েত ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ বিমান ও লজিস্টিক ঘাঁটি। এই নেটওয়ার্ক থেকে যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্য, পারস্য উপসাগর এবং আশপাশের অঞ্চলে সামরিক অভিযান পরিচালনা করতে সক্ষম। আন্তর্জাতিক আইনের দৃষ্টিতে এসব ঘাঁটির অধিকাংশই দ্বিপাক্ষিক প্রতিরক্ষা চুক্তি বা সামরিক সহযোগিতা চুক্তির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত। অর্থাৎ সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রকে তাদের ভূখণ্ডে সামরিক উপস্থিতির অনুমতি দিয়েছে। এই কারণে আন্তর্জাতিক আইনের আনুষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্যে এগুলোকে সাধারণত বৈধ বলে ধরা হয়। তবে সমালোচকরা বলেন, এই চুক্তিগুলো প্রায়ই শক্তির ভারসাম্যহীন অবস্থায় স্বাক্ষরিত হয় এবং অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয় জনগণের মতামত প্রতিফলিত হয় না। ফলে বাস্তবে এগুলো কতটা সার্বভৌম সিদ্ধান্ত-তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি গত আট দশকে ধীরে ধীরে গড়ে উঠেছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর তেল ও বাণিজ্যিক স্বার্থ রক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্র এই অঞ্চলে প্রভাববলয় বাড়াতে শুরু করে। স্নায়ুযুদ্ধের সময় সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রভাব ঠেকাতে এই উপস্থিতি আরও বাড়ানো হয়। ১৯৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধের পর মার্কিন ঘাঁটির সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। ২০০১ সালের পর আফগানিস্তান ও ইরাক যুদ্ধের সময় মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি আরও বিস্তৃত হয়। ইরানের দৃষ্টিতে হুমকি: ইরান দীর্ঘদিন ধরে এই ঘাঁটিগুলোকে নিজের নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হিসেবে দেখে আসছে। কারণ ভৌগোলিকভাবে ইরান প্রায় চারদিক থেকেই মার্কিন সামরিক ঘাঁটি দিয়ে পরিবেষ্টিত। সাম্প্রতিক উত্তেজনার মধ্যে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বলেছেন, ‘যেসব ঘাঁটি থেকে ইরানের বিরুদ্ধে হামলা চালানো হবে, সেগুলো তেহরানের কাছে বৈধ লক্ষ্যবস্তু হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।’ এই অবস্থান ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতকে আরও জটিল করে তুলেছে। অন্য শক্তিধর দেশগুলোর উপস্থিতি: মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক ঘাঁটির ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্য সবচেয়ে বেশি হলেও অন্য শক্তিধর দেশগুলোরও সীমিত উপস্থিতি রয়েছে। সিরিয়ায় রাশিয়ার তরতুস নৌঘাঁটি এবং খমেইমিম বিমানঘাঁটি রয়েছে। যুক্তরাজ্য বাহরাইনে এইচএমএস জুফেয়ার ঘাঁটি পরিচালনা করে এবং ফ্রান্স সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবিতে একটি স্থায়ী সামরিক ঘাঁটি পরিচালনা করছে। তবে সংখ্যার দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক নেটওয়ার্ক অন্য সব দেশের তুলনায় অনেক শক্তিশালী ও বিস্তৃত। ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব দ্রুত বেড়ে যায়। অনেক বিশ্লেষক এই সময়কে ‘ইউনিপোলার মোমেন্ট’ বা একমেরু বিশ্বব্যবস্থা হিসেবে বর্ণনা করেন। এই বাস্তবতায় যুক্তরাষ্ট্র বৈশ্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার প্রধান শক্তি হয়ে ওঠে এবং মধ্যপ্রাচ্যে তার সামরিক উপস্থিতিও বিস্তৃত হয়। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক স্টিফেন ওয়াল্ট মনে করেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি মূলত শক্তির ভারসাম্য বজায় রাখা এবং মিত্রদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কৌশল। তবে অতিরিক্ত সামরিক উপস্থিতি অনেক সময় উল্টো প্রতিক্রিয়াও তৈরি করতে পারে।’ অন্যদিকে বিশ্লেষক জন মিয়ারশাইমার বলেন, ‘বিদেশি সামরিক ঘাঁটি অনেক সময় স্থানীয় জনগণের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি করে এবং দীর্ঘমেয়াদে তা নিরাপত্তা সমস্যাকে আরও জটিল করে তোলে।’ যদি ঘাঁটিগুলো সরিয়ে নেয়া হয় তাহলে মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বব্যবস্থা কী হতে পারে তা ধারণা করা যাক। কিছু বিশ্লেষক মনে করেন, যদি যুক্তরাষ্ট্র তার ঘাঁটিগুলো মধ্যপ্রাচ্য থেকে সরিয়ে নেয়, তাহলে আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্যে বড় পরিবর্তন ঘটতে পারে। ইরান, তুরস্ক বা সৌদি আরবের মতো আঞ্চলিক শক্তির প্রভাব বাড়তে পারে। একই সঙ্গে রাশিয়া বা চীনও নতুন প্রভাব বিস্তারের সুযোগ লুফে নিতে পারে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটিগুলো একদিকে নিরাপত্তা জোটের অংশ হলেও অন্যদিকে তা আঞ্চলিক উত্তেজনার একটি বড় উৎস হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে। |