|
কক্সবাজার বদলালে বদলাবে দেশের পর্যটন অর্থনীতি
মীর আব্দুল আলীম:
|
একটি দেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা সব সময় শিল্পকারখানার চিমনি কিংবা বড় বড় অবকাঠামোর মধ্যে লুকিয়ে থাকে না। কখনো কখনো প্রকৃতিই একটি দেশকে এমন সম্পদ দিয়ে দেয়, যা সঠিক পরিকল্পনা, ব্যবস্থাপনা ও বিনিয়োগের মাধ্যমে জাতীয় অর্থনীতির বড় শক্তিতে পরিণত হতে পারে। বাংলাদেশের জন্য কক্সবাজার তেমনই এক সম্পদ। দিগন্তজোড়া সমুদ্র, দীর্ঘ বালুকাবেলা, পাহাড়, নীল জলরাশি আর সূর্যাস্তের অপূর্ব দৃশ্য নিয়ে কক্সবাজার প্রকৃতির এক অনন্য উপহার। বিশ্বের বহু দেশ তাদের সমুদ্রসৈকতকে পরিকল্পিত পর্যটন নগরীতে পরিণত করে বিপুল কর্মসংস্থান ও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করছে। অথচ এত বড় প্রাকৃতিক সম্পদ হাতে নিয়েও আমরা এখনো কক্সবাজারের সম্ভাবনার সামান্য অংশই কাজে লাগাতে পেরেছি।কক্সবাজারকে আরও সুন্দর, পরিচ্ছন্ন, নিরাপদ ও আন্তর্জাতিক মানের পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার বিষয়ে আমি সম্প্রতি কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (কউক) প্রকল্প পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. তৌহিদ পারভেজের সঙ্গে কথা বলেছি। কক্সবাজারকে সাজিয়ে-গুছিয়ে একটি পরিকল্পিত আন্তর্জাতিক পর্যটন গন্তব্যে পরিণত করার বিষয়ে তাঁদের মধ্যে সদিচ্ছার প্রকাশ পেয়েছে। আমার বিশ্বাস, এই সদিচ্ছার সঙ্গে রাষ্ট্রের কার্যকর সহযোগিতা, স্থানীয় জনগণ, ব্যবসায়ী, পর্যটনসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান, পরিবেশবিদ এবং বেসরকারি খাত একসঙ্গে কাজ করলে কক্সবাজারকে আন্তর্জাতিক মানের পর্যটন স্পটে পরিণত করা অসম্ভব নয়। প্রয়োজন শুধু বিচ্ছিন্ন উদ্যোগ নয়, একটি সমন্বিত জাতীয় পরিকল্পনা এবং তার দৃশ্যমান বাস্তবায়ন। আমি নিজেও বিভিন্ন দেশের সমুদ্রসৈকত দেখার সুযোগ পেয়েছি। অনেক জায়গায় কক্সবাজারের মতো প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য নেই, অথচ পরিচ্ছন্নতা, নিরাপত্তা, পরিকল্পিত অবকাঠামো, পরিবহন, বিনোদন ও পর্যটন ব্যবস্থাপনার কারণে সেসব স্থান আন্তর্জাতিক পর্যটকের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে। তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে, প্রকৃতি যখন আমাদের এত কিছু দিয়েছে, আমরা কেন তার পূর্ণ অর্থনৈতিক মূল্য সৃষ্টি করতে পারছি না? কক্সবাজারকে তাই শুধু বেড়ানোর জায়গা হিসেবে দেখলে হবে না। এটিকে দেখতে হবে বাংলাদেশের পর্যটন অর্থনীতির অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হিসেবে। বাংলাদেশ পর্যটনের দেশ হতে পারে। শুধু কক্সবাজার নয়, বান্দরবানের পাহাড়, সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ বন, সেন্ট মার্টিনের নীল জল, পতেঙ্গা, কুয়াকাটা, রাতারগুল, হাওর অঞ্চল, প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন, নদী ও গ্রামীণ প্রকৃতি মিলিয়ে আমাদের পর্যটন সম্পদের বৈচিত্র্য অসাধারণ। বিশ্বব্যাংকের বিভিন্ন নথিতেও বাংলাদেশের দীর্ঘ উপকূলীয় অঞ্চল, কক্সবাজার ও দক্ষিণ-পূর্ব উপকূলকে নীল অর্থনীতি, ইকো-ট্যুরিজম ও পরিবেশবান্ধব নগর উন্নয়নের সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র হিসেবে দেখা হয়েছে। কিন্তু সম্ভাবনা আর অর্থনৈতিক সাফল্য এক বিষয় নয়। সম্ভাবনাকে বাস্তব শিল্পে পরিণত করতে হয়। পর্যটনও তার ব্যতিক্রম নয়। কক্সবাজারকে তাই শুধু একটি সমুদ্রসৈকত হিসেবে দেখলে চলবে না। এটিকে দেখতে হবে একটি পূর্ণাঙ্গ আন্তর্জাতিক পর্যটন অর্থনৈতিক অঞ্চল হিসেবে। কক্সবাজার বিমানবন্দর আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হিসেবে কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ পেয়েছে। সেখানে কাস্টমস, ইমিগ্রেশন, স্বাস্থ্য ও কোয়ারেন্টিন সুবিধার বিষয়ও সামনে এসেছে। কিন্তু একটি বিমানবন্দরকে আন্তর্জাতিক ঘোষণা করলেই আন্তর্জাতিক পর্যটক আসবেন না। প্রয়োজন নিয়মিত আন্তর্জাতিক ফ্লাইট, প্রতিযোগিতামূলক বিমানভাড়া, সহজ ভিসা ও ইমিগ্রেশন ব্যবস্থা, আন্তর্জাতিক মানের টার্মিনাল, নিরাপত্তা, বহুভাষিক সেবা, মানসম্মত পরিবহন এবং বিদেশি পর্যটকের জন্য একটি নির্ভরযোগ্য ভ্রমণব্যবস্থা। বিমানবন্দরকে হতে হবে কক্সবাজার তথা বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক পর্যটনের প্রবেশদ্বার। এখানে একটি বিশেষ আন্তর্জাতিক পর্যটন জোনের কথা গুরুত্ব দিয়ে ভাবা যেতে পারে। পুরো সমুদ্রসৈকত সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত থাকবে। বাংলাদেশের মানুষ বিনা মূল্যে সমুদ্র উপভোগ করবে, পরিবার নিয়ে যাবে, শিশুরা খেলবে, তরুণরা আনন্দ করবে। সমুদ্রের সৌন্দর্য উপভোগ করা এ দেশের মানুষের অধিকার। কিন্তু এর পাশাপাশি নির্দিষ্ট একটি এলাকায় আন্তর্জাতিক মানের একটি নিয়ন্ত্রিত বিচ জোন গড়ে তোলা যেতে পারে। সেখানে নির্ধারিত টিকিট বা ডে-পাসের মাধ্যমে উন্নত সেবা গ্রহণের সুযোগ থাকবে। দেশি পর্যটকের জন্য এক ধরনের ফি এবং বিদেশি পর্যটকের জন্য আলাদা পর্যটন প্যাকেজ থাকতে পারে। প্রবেশমূল্য কত হবে, তা গবেষণা ও বাজার বিশ্লেষণের ভিত্তিতে নির্ধারণ করা যেতে পারে। এখানে মূল বিষয় অর্থ আদায় নয়, বরং একটি নির্দিষ্ট এলাকায় বিশ্বমানের সেবা নিশ্চিত করা। সেই বিশেষ জোনে থাকতে পারে পরিচ্ছন্ন সৈকত, নিরাপদ সাঁতার এলাকা, প্রশিক্ষিত লাইফগার্ড, আধুনিক ওয়াশরুম, লকার, পরিবর্তনকক্ষ, মানসম্মত খাবারের ব্যবস্থা, শিশুদের বিনোদন, ওয়াটার স্পোর্টস, বিচ চেয়ার, সানশেড, চিকিৎসা ও জরুরি উদ্ধারব্যবস্থা। বিদেশি পর্যটক সেখানে যে অর্থ ব্যয় করবেন, তার একটি বড় অংশ সরাসরি দেশের অর্থনীতিতে প্রবাহিত হবে। দেশি পর্যটকের ব্যয়ও স্থানীয় অর্থনীতিতে কর্মসংস্থান ও ব্যবসার সুযোগ তৈরি করবে। এমন একটি জোনকে ‘ফরেন ট্যুরিস্ট জোন’ বলা যেতে পারে। তবে নামের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হবে এর মান ও ব্যবস্থাপনা। এটি কোনোভাবেই সাধারণ মানুষের জন্য বৈষম্যের দেয়াল তৈরি করবে না। একই সৈকতের একদিকে থাকবে সবার জন্য উন্মুক্ত জনবান্ধব সৈকত, অন্যদিকে থাকবে অর্থের বিনিময়ে উন্নত সেবা গ্রহণের সুযোগ। পৃথিবীর বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্রে নানা ধরনের পেইড বিচ বা প্রিমিয়াম পর্যটনসেবা রয়েছে। বাংলাদেশেও জনমত, পরিবেশগত সমীক্ষা, অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ এবং স্বচ্ছ নীতিমালার ভিত্তিতে এমন একটি মডেল তৈরি করা যেতে পারে। তবে শুধু সৈকত সাজালেই হবে না। সৈকতকে ঘিরে একটি পূর্ণাঙ্গ পর্যটন অর্থনীতি তৈরি করতে হবে। আন্তর্জাতিক মানের হোটেল, বুটিক হোটেল, রেস্টুরেন্ট, সি-ফুড মার্কেট, স্থানীয় হস্তশিল্পের বাজার, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, নিরাপদ বিনোদন, ওয়াকওয়ে, সাইকেল ট্র্যাক, মেরিন ড্রাইভের নির্দিষ্ট পর্যটন স্টপেজ, পর্যটন তথ্যকেন্দ্র, ডিজিটাল গাইড, বহুভাষিক সাইনবোর্ড এবং প্রশিক্ষিত পর্যটনকর্মী প্রয়োজন। বিদেশি পর্যটক যেন বিমানবন্দর থেকে হোটেল, হোটেল থেকে সৈকত এবং সৈকত থেকে অন্যান্য পর্যটন স্পটে যাওয়ার পুরো প্রক্রিয়ায় একটি নিরাপদ, পরিচ্ছন্ন ও সংগঠিত পরিবেশ পান। একজন বিদেশি পর্যটক বাংলাদেশে এসে যেন মনে না করেন তিনি একটি অসংগঠিত জায়গায় এসেছেন। বরং তাঁর অভিজ্ঞতা এমন হওয়া দরকার, যাতে তিনি মনে করেন তিনি একটি পরিকল্পিত আন্তর্জাতিক পর্যটন গন্তব্যে এসেছেন। পর্যটনের ক্ষেত্রে প্রথম অভিজ্ঞতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিমানবন্দরে নামার পর থেকে হোটেলে পৌঁছানো, তথ্য পাওয়া, পরিবহন ব্যবহার, খাবার গ্রহণ, সৈকতে যাওয়া, নিরাপত্তা পাওয়া এবং কেনাকাটা করা পর্যন্ত প্রতিটি ধাপ পর্যটন অভিজ্ঞতার অংশ। এর সঙ্গে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিরাপত্তা। পর্যটন শিল্পের প্রাণ হচ্ছে নিরাপত্তা। পর্যটকের মনে নিরাপত্তাহীনতা থাকলে বিশ্বের সবচেয়ে সুন্দর সৈকতও পর্যটক টানতে পারবে না। সৈকতে পর্যটন পুলিশ, প্রশিক্ষিত লাইফগার্ড, সিসিটিভি, জরুরি চিকিৎসাকেন্দ্র, উদ্ধারকারী দল, নির্দিষ্ট সাঁতার এলাকা, সমুদ্রের বিপদসংকেত, নারী ও শিশু সহায়তা কেন্দ্র এবং ২৪ ঘণ্টার জরুরি যোগাযোগব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। নিরাপত্তা শুধু পর্যটকের জন্য নয়, স্থানীয় ব্যবসায়ী ও বাসিন্দাদের জন্যও নিশ্চিত করতে হবে। উন্নয়ন করতে গিয়ে পরিবেশের কথা ভুলে গেলে চলবে না। কক্সবাজারের সৌন্দর্যের মূল ভিত্তিই প্রকৃতি। তাই বালিয়াড়ি, জলাভূমি, গাছপালা, জীববৈচিত্র্য ও সমুদ্রের স্বাভাবিক পরিবেশ রক্ষা করেই পর্যটন অবকাঠামো গড়ে তুলতে হবে। কোনো প্রকল্পের পরিবেশগত ঝুঁকি থাকলে তার সমাধান খুঁজতে হবে। প্রয়োজন হলে নকশা পরিবর্তন করতে হবে, নির্মাণের ধরন বদলাতে হবে, পর্যটকের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে, নির্দিষ্ট সময়ের জন্য প্রবেশ সীমিত করতে হবে কিংবা পরিবেশের ধারণক্ষমতা অনুযায়ী পর্যটন পরিচালনা করতে হবে। পরিবেশ রক্ষা এবং পর্যটন উন্নয়নকে পরস্পরের প্রতিপক্ষ বানানোর প্রয়োজন নেই। বরং পরিবেশবান্ধব পর্যটনই হতে পারে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ পথ। একটি গাছ কাটার প্রয়োজন হলে তার পরিবেশগত মূল্যায়ন যেমন জরুরি, তেমনি বিকল্প বৃক্ষরোপণ ও পরিবেশ পুনরুদ্ধারের পরিকল্পনাও জরুরি। কোথাও বালিয়াড়ি রক্ষা করতে হবে, কোথাও জলাভূমি রক্ষা করতে হবে, আবার কোথাও পর্যটকের জন্য নিরাপদ হাঁটার পথ তৈরি করতে হবে। সব সিদ্ধান্তই হওয়া উচিত বৈজ্ঞানিক সমীক্ষা ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ভিত্তিতে। পর্যটন উন্নয়নের সবচেয়ে বড় শক্তি হতে পারে স্থানীয় মানুষ। কক্সবাজারের মানুষ শুধু পর্যটকের কাছে দোকানদার বা পরিবহনকর্মী হয়ে থাকবে কেন? তাঁদের প্রশিক্ষণ দিয়ে ট্যুর গাইড, লাইফগার্ড, শেফ, হোটেলকর্মী, ট্রাভেল অপারেটর, নৌযান পরিচালনাকারী, হস্তশিল্প উদ্যোক্তা এবং পর্যটন ব্যবস্থাপনার অংশীদার করা সম্ভব। এতে পর্যটনের আয় স্থানীয় অর্থনীতিতে আরও বেশি ছড়িয়ে পড়বে। একজন বিদেশি পর্যটক একটি হোটেলে টাকা খরচ করবেন, রেস্টুরেন্টে খাবেন, স্থানীয় পণ্য কিনবেন, পরিবহন ব্যবহার করবেন, গাইড নেবেন। অর্থাৎ একজন পর্যটক কেবল একজন দর্শনার্থী নন, তিনি একটি অর্থনৈতিক চেইন তৈরি করেন। তাঁর ব্যয়ের সঙ্গে যুক্ত হয় হোটেল, রেস্টুরেন্ট, পরিবহন, ক্ষুদ্র ব্যবসা, কৃষি, মৎস্য, হস্তশিল্প এবং অসংখ্য মানুষের কর্মসংস্থান। আরেকটি বিষয় আমাদের গুরুত্ব দিয়ে ভাবতে হবে। কক্সবাজারে শুধু পর্যটক আনলেই হবে না, তাঁকে কয়েক দিন ধরে রাখতে হবে। তিন দিনের প্যাকেজ, পাঁচ দিনের প্যাকেজ, পরিবারভিত্তিক প্যাকেজ, অ্যাডভেঞ্চার প্যাকেজ, ইকো-ট্যুরিজম প্যাকেজ, কনভেনশন ও কনফারেন্স ট্যুরিজম, ওয়েলনেস ট্যুরিজম, সামুদ্রিক খাবার ও স্থানীয় সংস্কৃতিভিত্তিক প্যাকেজ তৈরি করা যেতে পারে। কক্সবাজারের সঙ্গে বান্দরবান, চট্টগ্রাম ও দেশের অন্যান্য পর্যটনকেন্দ্রকে যুক্ত করে সমন্বিত ট্যুর প্যাকেজ তৈরি করা হলে একজন বিদেশি পর্যটক শুধু কক্সবাজারে এসে ফিরে যাবেন না। তিনি বাংলাদেশে আরও কয়েক দিন অবস্থান করবেন। বাড়বে তাঁর ব্যয়, বাড়বে দেশের পর্যটন আয়। রাষ্ট্রকেও কক্সবাজারকে শুধু পর্যটন মন্ত্রণালয়ের একটি প্রকল্প হিসেবে দেখলে চলবে না। এটিকে অর্থনীতি, বেসামরিক বিমান চলাচল, স্বরাষ্ট্র, পরিবেশ, স্থানীয় সরকার, সড়ক ও যোগাযোগ, সংস্কৃতি এবং বেসরকারি খাতের সমন্বিত জাতীয় উদ্যোগ হিসেবে দেখতে হবে। সরকারি বিনিয়োগের পাশাপাশি স্বচ্ছ পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপের সুযোগ তৈরি করা যেতে পারে। বেসরকারি বিনিয়োগ আসবে, কিন্তু সৈকত, বালিয়াড়ি, পরিবেশ ও জনস্বার্থের সুরক্ষা নিশ্চিত করার দায়িত্ব রাষ্ট্রেরই থাকবে। পর্যটন উন্নয়নের নামে যেন অপরিকল্পিত দখলদারিত্ব বা অবকাঠামোগত বিশৃঙ্খলা তৈরি না হয়, সে জন্য শক্তিশালী মাস্টারপ্ল্যান এবং কার্যকর তদারকি প্রয়োজন। কক্সবাজার নিয়ে আমাদের মানসিকতাও বদলাতে হবে। শুধু ঈদের ছুটিতে লাখো মানুষের ভিড় আর হোটেল ব্যবসা দিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যটন শিল্প তৈরি হয় না। আন্তর্জাতিক পর্যটন শিল্প মানে সারা বছর পর্যটক, সারা বছর কর্মসংস্থান এবং সারা বছর বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের সুযোগ। এ শিল্পে বিমানবন্দর থেকে সৈকত, হোটেল থেকে রেস্টুরেন্ট, নিরাপত্তা থেকে পরিবেশ, বিনোদন থেকে সংস্কৃতি, সবকিছুকে একটি সুতোয় বাঁধতে হয়। বাংলাদেশের পর্যটন শিল্পের সম্ভাবনা বিশাল। সরকারি নথিতে টেকসই পর্যটন উন্নয়ন, আন্তর্জাতিক প্রচার, পর্যটন অবকাঠামো আধুনিকীকরণ এবং কক্সবাজারে পর্যটনসংশ্লিষ্ট সুবিধা উন্নয়নের প্রয়োজনীয়তার কথা রয়েছে। এখন প্রয়োজন পরিকল্পনাগুলোকে কাগজ থেকে বাস্তবে নিয়ে আসা। দীর্ঘদিনের পরিকল্পনা যদি বাস্তবায়নের পথে এগোয়, তাহলে কক্সবাজার শুধু দেশের মানুষের বিনোদনের জায়গা থাকবে না, এটি হয়ে উঠতে পারে একটি বড় অর্থনৈতিক কর্মকেন্দ্র। কক্সবাজারের সমুদ্র বাংলাদেশের মানুষের। এই সমুদ্রের সৌন্দর্য উপভোগ করার অধিকারও এ দেশের মানুষের। তাই সাধারণ মানুষের জন্য সৈকত উন্মুক্ত থাকুক। পাশাপাশি এক বা একাধিক আন্তর্জাতিক মানের বিশেষ পর্যটন জোন তৈরি হোক, যেখানে দেশি-বিদেশি পর্যটক অর্থের বিনিময়ে উন্নত সেবা গ্রহণ করবেন। সেই আয় থেকে সৈকতের পরিচ্ছন্নতা, নিরাপত্তা, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং স্থানীয় মানুষের উন্নয়নে অর্থ ব্যয় করা যেতে পারে। বিদেশি পর্যটক ডলার খরচ করবেন, বাংলাদেশি পর্যটক টাকা খরচ করবেন, কিন্তু উভয়ের ব্যয়ই বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রবাহিত হবে। কক্সবাজারকে যদি আমরা শুধু বেড়ানোর জায়গা হিসেবে দেখি, তাহলে আমরা এর সৌন্দর্য দেখব। কিন্তু যদি একে জাতীয় অর্থনীতির সম্পদ হিসেবে দেখি, তাহলে এর সম্ভাবনাও দেখতে পাব। বিশ্বের অনেক দেশ তাদের প্রাকৃতিক সম্পদকে পর্যটন অর্থনীতিতে রূপান্তর করে এগিয়ে গেছে। বাংলাদেশও সেই পথে এগোতে পারে। তবে তার জন্য দরকার সাহসী সিদ্ধান্ত, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, পরিবেশের প্রতি দায়িত্বশীলতা, আন্তর্জাতিক মানের ব্যবস্থাপনা এবং পর্যটনকে জাতীয় অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ খাত হিসেবে দেখার মানসিকতা। কক্সবাজারকে বদলানোর সময় এখনই। আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের পরবর্তী ধাপ হতে হবে আন্তর্জাতিক পর্যটন সংযোগ। সমুদ্রসৈকতের পরবর্তী ধাপ হতে হবে বিশ্বমানের ব্যবস্থাপনা। পরিবেশ রক্ষার পরবর্তী ধাপ হতে হবে পরিবেশবান্ধব পর্যটন। আর পর্যটনের পরবর্তী ধাপ হতে হবে বৈদেশিক মুদ্রা আয় ও কর্মসংস্থানের নতুন দুয়ার। কক্সবাজারের ঢেউ প্রতিদিন আমাদের ডাকছে। প্রকৃতি আমাদের যে সম্পদ দিয়েছে, তাকে অবহেলায় ফেলে রাখার সময় শেষ। এখন প্রয়োজন জ্ঞান, পরিকল্পনা, বিনিয়োগ ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে সেই সম্পদকে দেশের অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত করা। কক্সবাজার শুধু বাংলাদেশের সবচেয়ে পরিচিত সমুদ্রসৈকত নয়। সঠিক পরিকল্পনা, রাষ্ট্রীয় সহযোগিতা এবং সম্মিলিত উদ্যোগে এটি হতে পারে বাংলাদেশের বিশ্ব পর্যটনের প্রবেশদ্বার, স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থানের বড় ক্ষেত্র এবং বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের অন্যতম নতুন দুয়ার। মীর আব্দুল আলীমঃ মহাসচিব, কলামিস্ট ফোরাম অব বাংলাদেশ। |