|
পাঁচটি বিধান বাতিল ও নতুন করে জনমত যাচাইয়ের দাবি
সাইবার নিরাপত্তা আইনের খসড়া সংবিধানের মৌলিক অধিকারের পরিপন্থী: কনস্টিটিউশন ওয়াচডগ
নতুন বার্তা, ঢাকা:
|
সাইবার নিরাপত্তা (সংশোধন) আইন, ২০২৬-এর খসড়াটি বর্তমান অবস্থায় প্রত্যাহার করে নেওয়ার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে সাংবিধানিক অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন কনস্টিটিউশন ওয়াচডগ। সংগঠনটি বলেছে, খসড়ার পাঁচটি বিধান সংবিধানের তৃতীয় ভাগে নিশ্চিত করা মৌলিক অধিকারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।গতকাল দেওয়া এক বিবৃতিতে সংগঠনটি বলেছে, মন্ত্রিসভা কমিটিতে চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষায় থাকা খসড়াটি সংসদে তোলার আগে সংশোধন করতে হবে। বিবৃতিতে প্রস্তাবিত ধারা ২৬ক নিয়ে আপত্তি জানানো হয়। এই ধারায় "গুজব ও অপতথ্য" ছড়ানোকে নতুন অপরাধ হিসেবে যুক্ত করা হয়েছে, যার সর্বোচ্চ শাস্তি ১০ বছরের কারাদণ্ড বা ৪০ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ড। খসড়ায় গুজব বলতে এমন যেকোনো অসমর্থিত বা অযাচাইকৃত তথ্য, সংবাদ বা দাবিকে বোঝানো হয়েছে, যা জনমনে বিভ্রান্তি, আতঙ্ক, উত্তেজনা বা সামাজিক অস্থিরতা সৃষ্টি করে বা করার সম্ভাবনা রাখে। বিবৃতিতে বলা হয়, এই ধারায় অপরাধ প্রমাণের জন্য অভিপ্রায় বা প্রকৃত ক্ষতির প্রমাণ লাগবে না। সৎ উদ্দেশ্যে প্রকাশিত কোনো সংবাদ পরে অসম্পূর্ণ প্রমাণিত হলেও তা এই সংজ্ঞার আওতায় পড়বে। সংগঠনটি বলেছে, সংবিধানের ৩৯(২) অনুচ্ছেদে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর নির্দিষ্ট কয়েকটি ক্ষেত্রেই যুক্তিসঙ্গত বাধানিষেধ আরোপের সুযোগ রাখা হয়েছে, কিন্তু প্রস্তাবিত অপরাধটি সেসবের কোনোটির মধ্যে পড়ে না। ধারা ৮-এ প্রস্তাবিত পরিবর্তন নিয়েও আপত্তি জানিয়েছে সংগঠনটি। খসড়ায় কনটেন্ট অপসারণের ক্ষমতা আইন প্রয়োগকারী সংস্থার বাইরে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় এবং সরকারের কাছ থেকে ক্ষমতাপ্রাপ্ত অন্যান্য সংস্থাকেও দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ব্যবস্থা নেওয়ার শর্ত প্রকৃত ক্ষতির বদলে ক্ষতির আশঙ্কা পর্যন্ত নামিয়ে আনা হয়েছে। এ ছাড়া কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের জন্য মানহানিকর বা রাষ্ট্রের জন্য অবমাননাকর কনটেন্ট অপসারণের নতুন একটি কারণ যুক্ত করা হয়েছে। কনস্টিটিউশন ওয়াচডগ বলেছে, বিদ্যমান আইনে কোনো কনটেন্ট ব্লক করার তিন দিনের মধ্যে ট্রাইব্যুনালের অনুমতি নেওয়ার বাধ্যবাধকতা আছে এবং অনুমতি না পেলে কনটেন্টটি পুনরায় অবমুক্ত করতে হয়। খসড়ায় এই বিধান বাদ দেওয়া হয়েছে। বিবৃতিতে বলা হয়, "এটি বিচারিক তদারকিতে বিলম্ব নয়, বরং কার্যকর তদারকি ব্যবস্থাটিকেই তুলে দেওয়া।" সংগঠনটি জানায়, বিদ্যমান আইনের ধারা ৮(৩)-ও খসড়ায় বিলোপ করা হয়েছে। ওই ধারা অনুযায়ী স্বচ্ছতার স্বার্থে ব্লক করা সব কনটেন্টের তথ্য সরকারকে জনসমক্ষে প্রকাশ করতে হয়। এই বিধান না থাকলে কোনো নাগরিক জানতেই পারবেন না তার কনটেন্ট ব্লক করা হয়েছে কি না, ফলে প্রতিকার চাওয়ার সুযোগও থাকবে না। প্রস্তাবিত ধারা ৫২-কে সংবিধানের ২৭ ও ৩১ অনুচ্ছেদের পরিপন্থী বলে উল্লেখ করেছে সংগঠনটি। ওই ধারায় জাতীয় সাইবার সুরক্ষা কাউন্সিলের সদস্য ও আইনের অধীনে সরল বিশ্বাসে কাজ করা কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দেওয়ানি বা ফৌজদারি মামলা করা যাবে না বলে বলা হয়েছে। বিবৃতিতে ধারা ৪১(৩)-এর বিরোধিতা করা হয়, যেখানে এই আইনের অপরাধ মোবাইল কোর্টে বিচারের সুযোগ রাখা হয়েছে। সংগঠনটি বলেছে, মোবাইল কোর্ট পরিচালনাকারী নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা প্রশাসনের অংশ, বিচার বিভাগের নয়। ২০১৭ সালে হাইকোর্ট মোবাইল কোর্ট আইন, ২০০৯-এর ১১টি ধারা অসাংবিধানিক ঘোষণা করেছিলেন। ২০১৮ সালের জানুয়ারিতে আপিল বিভাগ ওই রায় স্থগিত করেন এবং আপিলটি এখনো নিষ্পত্তি হয়নি। সংগঠনটি বলেছে, নারী ও শিশুদের অনলাইন নিপীড়ন থেকে রক্ষা করা এবং ডিপফেক ও সমন্বিত অপতথ্য মোকাবিলার যে উদ্দেশ্যের কথা খসড়ায় বলা হয়েছে, তারা তা স্বীকার করে। তবে এসব উদ্দেশ্য পূরণের জন্য আপত্তিকর পাঁচটি বিধানের প্রয়োজন নেই। বিবৃতিতে ধারা ২৬ক ও ৫২ পূর্ণাঙ্গভাবে বাতিল, কনটেন্ট অপসারণের ক্ষমতা কেবল আইন প্রয়োগকারী সংস্থার মধ্যে সীমিত রাখা ও আগাম বিচারিক অনুমোদন বাধ্যতামূলক করা, মোবাইল কোর্টের এখতিয়ার প্রত্যাহার, ধারা ৮(৩) বহাল রাখা এবং পূর্ণাঙ্গ খসড়া প্রকাশ করে অন্তত ৩০ দিনের জন্য নতুন করে জনমত যাচাইয়ের দাবি জানানো হয়। |