|
পলাতক ও কারাগারে নেতাকর্মীরা, তবু ত্রিশাল আওয়ামী লীগে কমিটি নিয়ে বিতর্ক
ত্রিশাল (ময়মনসিংহ) প্রতিনিধি:
|
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ময়মনসিংহের ত্রিশালে দলটির স্থানীয় নেতাকর্মীদের বড় একটি অংশ মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে কিংবা আত্মগোপনে রয়েছেন। এই পরিস্থিতির মধ্যেই উপজেলা আওয়ামী লীগের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড নিয়ে দলের অভ্যন্তরে শুরু হয়েছে প্রকাশ্য বিরোধ। বিশেষ করে ইউনিয়ন পর্যায়ের কমিটি ভেঙে দেওয়া, নতুন কমিটি গঠন এবং শীর্ষ নেতাদের ভূমিকা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চলছে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য।তৃণমূলের কয়েকজন নেতাকর্মীর অভিযোগ, দলের অনেক নেতা-কর্মী যখন মামলা, গ্রেপ্তার ও হামলার ভয়ে এলাকায় থাকতে পারছেন না, তখন উপজেলা আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের কেউ কেউ নিজেদের কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছেন। এর মধ্যে ইউনিয়ন কমিটি গঠন ও অনুমোদনের ক্ষেত্রে আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে ‘কমিটি বাণিজ্য’ করার অভিযোগও উঠেছে। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে স্বাধীনভাবে কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। সম্প্রতি উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মো. ইকবাল হোসেনের ব্যক্তিগত ফেসবুক অ্যাকাউন্ট নিয়েও আলোচনা তৈরি হয়েছে। দীর্ঘদিন নিষ্ক্রিয় থাকার পর অ্যাকাউন্টটি সক্রিয় হলে সেখানে ৫ আগস্টের কয়েক দিন পর অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের একটি বক্তব্য শেয়ার করা হয়। বিষয়টি নিয়ে দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে আলোচনা ও সমালোচনা শুরু হয়। এ বিষয়ে ইকবাল হোসেনের দাবি, তাঁর ফেসবুক অ্যাকাউন্ট সাময়িকভাবে হ্যাক বা অন্য কেউ ব্যবহার করেছিলেন। বিষয়টি তাঁর নজরে আসার পর তিনি অ্যাকাউন্টটি নিয়ন্ত্রণে নেন। ওই পোস্টকে তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান হিসেবে দেখার সুযোগ নেই বলেও দাবি করেন তিনি। অন্যদিকে গত ৩১ মে ত্রিশাল পৌর শহরের নজরুল অডিটোরিয়ামে উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আবুল কালামের দুই মেয়ের বিয়ের আয়োজন নিয়েও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা হয়। দলটির অনেক নেতাকর্মী যখন মামলা ও গ্রেপ্তার আতঙ্কে এলাকায় অনুপস্থিত, তখন বিপুলসংখ্যক অতিথির উপস্থিতিতে জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠান আয়োজন নিয়ে কেউ কেউ প্রশ্ন তোলেন। তবে আবুল কালাম বলেন, এটি তাঁদের পরিবারের পূর্বনির্ধারিত একটি অনুষ্ঠান। এর সঙ্গে রাজনৈতিক পরিস্থিতি কিংবা দলীয় কর্মকাণ্ডের কোনো সম্পর্ক নেই। তৃণমূলের ক্ষোভের অন্যতম কারণ হিসেবে উঠে এসেছে বিভিন্ন ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের কমিটি ভেঙে দেওয়ার বিষয়টি। স্থানীয় নেতাকর্মীদের অভিযোগ, কয়েকটি ইউনিয়নের গুরুত্বপূর্ণ নেতারা কারাগারে থাকা বা আত্মগোপনে থাকা অবস্থায় কমিটি ভেঙে নতুন কমিটি করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। স্থানীয় সূত্র ও দলীয় নেতাকর্মীদের ভাষ্য অনুযায়ী, বালিপাড়া ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি ও ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান গোলাম মোহাম্মদ বাদল দীর্ঘ সময় কারাগারে ছিলেন। ৫ আগস্টের পর তাঁর ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও বাড়িঘরে হামলা ও ভাঙচুরের অভিযোগও রয়েছে। তাঁর ছেলে আদনানও একাধিক মামলায় কারাগারে রয়েছেন বলে পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। এর মধ্যেই ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের কমিটি ভেঙে দেওয়া হয়েছে বলে তিনি জানতে পেরেছেন। হরিরামপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের ক্ষেত্রেও একই ধরনের ঘটনা ঘটেছে বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয় নেতাকর্মীরা। তাঁদের ভাষ্য, ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগ নেতা আবু সাঈদ রাজনৈতিক মামলায় কারাগারে থাকা অবস্থায় ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের কমিটি ভেঙে দেওয়া হয়। নেতারা অনুপস্থিত থাকা অবস্থায় এমন সিদ্ধান্ত দলীয় গঠনতন্ত্র অনুযায়ী হয়েছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তাঁরা। এসব বিষয় নিয়ে আওয়ামী লীগের পলাতক ও আত্মগোপনে থাকা নেতাকর্মীদের বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও মেসেজিং গ্রুপে আলোচনা-সমালোচনা চলছে। উপজেলা শ্রমিক লীগের সভাপতি ও আওয়ামী লীগ নেতা সুহেল মাহমুদ সুমন তাঁর ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেওয়া এক পোস্টে দাবি করেন, দীর্ঘদিন ধরে তাঁরা আত্মগোপনে রয়েছেন এবং তাঁদের বাড়িঘরে হামলা হয়েছে। তৃণমূলের বহু নেতাকর্মী কারাগারে থাকলেও উপজেলা আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা তাঁদের খোঁজখবর না নিয়ে নিজেদের স্বার্থে বিভিন্ন কর্মকাণ্ড চালাচ্ছেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি। একই সঙ্গে ইউনিয়ন কমিটি গঠনে অনিয়মের অভিযোগ তুলে দলীয় হাইকমান্ডের হস্তক্ষেপ কামনা করেন তিনি। বালিপাড়া ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সদ্য সাবেক সভাপতি গোলাম মোহাম্মদ বাদল মুঠোফোনে বলেন, ‘৫ আগস্টের পর আমার সব ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলা ও ভাঙচুর করা হয়েছে। পাঁচটি মামলায় প্রায় ছয় মাস কারাগারে ছিলাম। কিছুদিন আগে জামিন পেয়েছি। আমার ছেলে তিনটি মামলায় এখনো কারাগারে। গত সপ্তাহে শুনেছি, আমার ইউনিয়ন কমিটি ভেঙে দেওয়া হয়েছে। এতে আমার কোনো আপত্তি নেই। দল যাকে যোগ্য মনে করবে, তাকে দায়িত্ব দেবে। তবে আমার জেলজীবন ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ক্ষতির বিষয়টি বিবেচনা করে আমাকে অব্যাহতি দিলে কষ্টটা কিছুটা কম হতো।’ ত্রিশাল উপজেলা, পৌরসভা ও বইলর ইউনিয়নসহ বিভিন্ন কমিটি গঠনে আর্থিক লেনদেনের অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট নেতাদের বক্তব্য জানতে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁরা এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। ত্রিশাল উপজেলা আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ বিরোধ নিয়ে দলের কেন্দ্রীয় পর্যায়ের কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ্য পাল্টাপাল্টি বক্তব্য ও অভিযোগের কারণে স্থানীয় আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দল নতুন করে সামনে এসেছে। |