|
জুলাইয়ের চেতনা হোক গণতন্ত্রের মূলমন্ত্র
রায়হান আহমেদ তপাদার:
|
বাংলাদেশে সরকারি চাকরিক্ষেত্রে বৈষম্যের বিরোধিতা, বিশেষত কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া একটি ছাত্র আন্দোলন অল্প সময়েই এক গণবিপ্লবে পরিণত হয় অনেক কারণে। তার মধ্যে যেমন ছিল আন্দোলনকারীদের প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ, তেমনিভাবে ছিল আন্দোলন দমনে শক্তি প্রয়োগ ও ভুল পদক্ষেপের প্রতিক্রিয়ায় ব্যাপক আকারে ক্ষোভের প্রকাশ। আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক শক্তিগুলো জুলাই চব্বিশের ঘটনাপ্রবাহে নীরব ও নিষ্ক্রিয় ছিল, এমনটা হলফ করে বলা যাবে না। সবকিছুর সম্মিলিত ফলাফল হলো এই, দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী একনায়কতন্ত্রের পতন ঘটে চরম নাটকীয়তায় ভরা টানটান উত্তেজনাকর ঘটনাবলির মাধ্যমে। দুই বছর পরে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক গবেষণা, বই ও বিশ্লেষণে উঠে আসছে-এ আন্দোলন কীভাবে সফল হলো এবং কেন এটি ব্যতিক্রমী ছিল। বিশ্লেষণ বলছে, এ ছাত্র আন্দোলন শুধু রাজনৈতিক ঘটনা নয়; এটি একটি নতুন ধারা, যা তরুণদের নেতৃত্ব, ডিজিটাল প্রতিরোধ এবং গণতান্ত্রিক সংগ্রামের নতুন রূপরেখা তৈরি করেছে। গবেষক ও বিশ্লেষকরা এখন এটিকে একুশ শতকের রাজনৈতিক প্রতিরোধের এক মডেল হিসাবে দেখছেন। দেখছেন, রাজনৈতিক সংগ্রামের পথে অতীত থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যতের জন্য কৌশল নির্ধারণের পন্থা হিসাবে। বিশ্লেষকদের মতে এ আন্দোলনের সাফল্যের মূল চাবিকাঠি ছিল স্মার্ট কৌশল, স্পষ্ট ভাষা, এবং সামাজিক মাধ্যমে সুসংগঠিত প্রচার। যখন এক মন্ত্রী ছাত্রদের ‘রাজাকার’ বলে আখ্যা দেন, তখন তা আন্দোলনের জন্য পরিণত হয় একটি নৈতিক যুদ্ধ ঘোষণায়। ছাত্ররা ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবোধকে হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করে সরকারকে নৈতিকভাবে চ্যালেঞ্জ করে। জুলাইয়ের ঘটনাগুলো ডিজিটাল যুগের প্রতিরোধ আন্দোলনের এক স্থিরচিত্রস্বরূপ। চব্বিশের জুলাই মাসের ছাত্র আন্দোলন আরও একটি ব্যতিক্রমী বিষয় সামনে আনে ‘ডিজিটাল প্রতিরোধ' শীর্ষক একটি গবেষণায় দেখা যায়, কীভাবে ফেসবুক, মেসেঞ্জার ও অন্যান্য ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ছাত্রদের আন্দোলনকে সংগঠিত করতে এবং সরকারকে ঘায়েল করতে ব্যবহৃত হয়। সরাসরি কোনো একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দল বা নেতৃত্ব ছাড়াই আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে দেশের শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত। গভীরভাবে যে বিষয়ের প্রতি মনোযোগ দেওয়া দরকার তা হলো, জুলাই অভ্যুত্থান শুধু একটি আন্দোলন নয়, একটি যুগান্তকারী রূপান্তর, রাজনৈতিক পালাবদল এবং বিপ্লবাত্মক প্রচেষ্টা। চব্বিশের এ ছাত্র অভ্যুত্থান প্রমাণ করে, তরুণদের নেতৃত্বে রাজনৈতিক পরিবর্তন সম্ভব। কোনো রাজনৈতিক দলের ডাকে নয়, বরং এটি ছিল বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া তরুণ-তরুণীদের সংগঠিত সচেতন প্রয়াস। হাতে ব্যানার-প্ল্যাকার্ড, কাঁধে ইতিহাসের ভার এবং হাতে থাকা স্মার্টফোনই ছিল তাদের প্রধান অস্ত্র।গবেষকরা বলছেন, এ আন্দোলন হংকংয়ের ‘আম্ব্রেলা মুভমেন্ট’, ‘আরব বসন্ত’ কিংবা বিশ্বজুড়ে জলবায়ু আন্দোলনের মতোই এক বৈশ্বিক ধারার অংশ। কিন্তু এর কৌশল, ভাষা ও নেতৃত্ব ছিল পুরোপুরি দেশীয় ও স্বকীয়, যা দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশেই নানা রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে।আসল কথা হলো, জুলাইয়ের অভিজ্ঞতা থেকে ভবিষ্যতের জন্য শিক্ষা গ্রহণ। এ আন্দোলনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো-নতুন প্রজন্ম শুধু রাজনৈতিকভাবে সচেতন নয়, তারা রাজনৈতিকভাবে সক্ষম এবং তারা আর ভয় পায় না। রাষ্ট্র যতই শক্তিশালী হোক, ইতিহাস ও হ্যাশট্যাগের শক্তি একসঙ্গে থাকলে প্রতিরোধ করা যায় না। তবে তাদের সামনের দিনগুলো নিয়ে রয়েছে দ্বিধা। মূলস্রোতের গতানুগতিক রাজনীতির সঙ্গে তাদের বোঝাপড়া কেমন হবে, সেটাও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ফলে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতি নিয়ে আমরা এখনো অনেক প্রশ্নের মুখোমুখি-কীভাবে তরুণদের রাজনীতিতে সম্পৃক্ত করা হবে? ডিজিটাল আন্দোলন কীভাবে টেকসই সংস্কারে রূপান্তরিত হবে? এ আন্দোলনের ফলে বাংলাদেশে নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত আসতে কতটুকু সফল হবে কিংবা সামনের দিনগুলোতে বিচ্যুতি এড়িয়ে কতটুকু শুদ্ধতার সঙ্গে চলমান থাকতে পারবে? এসব প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন বিবেচনায় রেখেও দুই বছরের স্মৃতি নিয়ে একটি বিষয় নিশ্চিতই বলা যায়-২০২৪ সালের বর্ষার ছাত্র অভ্যুত্থান আমাদের দেখিয়ে দিয়েছে, পরিবর্তন আসতে পারে হঠাৎ করেই-বিশেষত যখন ইতিহাস, প্রযুক্তি এবং নৈতিক সাহস এক বিন্দুতে মিলিত হয়; তখন পরিস্থিতি নিজেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিজের পথে চলতে থাকে; ক্ষমতা বা শক্তির দাপট সেটাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। এ ধরনের আন্দোলন থেকেই জন্ম নেয় রাজনৈতিক প্রতিরোধের এক মডেল। যদিও সামগ্রিক সাফল্য আন্দোলনের চূড়ান্ত পরিণতি ও অর্জনের নিরিখে ভবিষ্যতের ইতিহাস নির্ধারণ করবে। কিছু পরিবর্তন একটি জাতির আত্মপরিচয় ও পুনর্জাগরণের স্মারক হয়ে থাকে। একাত্তরের রক্তাক্ত অধ্যায় পেরিয়ে অর্জিত জুলাই গণ-অভ্যুত্থান তেমন এক অবিস্মরণীয় দিন। চব্বিশের জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার অদম্য প্রতিরোধ ও আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ার যে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়েছিল। রক্তাক্ত জুলাই- আগস্টের সেই আন্দোলনের স্মৃতি, শহীদদের আত্মত্যাগ, আহত ব্যক্তিদের বেদনা, রাজপথের প্রতিরোধ, দেয়ালজুড়ে লেখা স্লোগান, গ্রাফিতি ও শিল্পকর্ম-সব কিছু এক ছাদের নিচে ধারণ করতেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বর্তমান এই জাদুঘর। জানা গেছে, জাদুঘরের বিভিন্ন গ্যালারিতে স্থান পেয়েছে জুলাই আন্দোলনের সময় ব্যবহৃত পোস্টার, ব্যানার, প্ল্যাকার্ড, দেয়াললেখা ও গ্রাফিতি। সংরক্ষণ করা হয়েছে আলোকচিত্র, ভিডিও, সংবাদপত্রের কাটিং, আন্দোলনের বিভিন্ন পর্যায়ের দলিল এবং ব্যক্তিগত ব্যবহার্য সামগ্রী। রয়েছে শহীদদের কিছু চিঠি, যেগুলো তাঁরা পরিবারের উদ্দেশে লিখে গিয়েছিলেন।আন্দোলনের বিরল আলোকচিত্র ও বিভিন্ন স্মারকও প্রদর্শনের জন্য রাখা হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, আগামী প্রজন্মের কাছে জুলাইয়ের চেতনা পাঠের জন্য জাদুঘরটির বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে। আজ দুই বছর পরও এই সময়ে দাঁড়িয়ে দেখা যায়, কর্তৃৃত্ববাদী আওয়ামী লীগ সরকারের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে দেশবাসী কতটা ক্ষুব্ধ ছিল। গণতন্ত্রহীনতা, একের পর এক বিতর্কিত নির্বাচন। দমনমূলক নীতির কারণে জনগণের নাভিশ্বাস উঠেছিল। সাড়ে পনের বছর ধরে বাংলাদেশ ধীরে ধীরে একটি ভয়, নীরবতা ও নিয়ন্ত্রিত রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছিল। দুর্নীতি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছিল, রাষ্ট্রযন্ত্রের বিভিন্ন স্তরে রাজনৈতিক আনুগত্যই হয়ে উঠেছিল প্রধান যোগ্যতা। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ক্রমে সংকুচিত হয়েছে, বিরোধী মতকে দমন করা হয়েছে গ্রেপ্তার, গুম, মামলা ও ভয়ভীতির মাধ্যমে। আন্তর্জাতিক সূচকগুলোও সেই বাস্তবতার প্রতিফলন ঘটিয়েছে। রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্সের ২০২৪ সালের বিশ্ব প্রেস স্বাধীনতা সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১৮০টি দেশের মধ্যে ১৬৫তম, আর ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের গণতন্ত্র সূচকে ১৬৭টি দেশের মধ্যে ৭৫তম।’ এমন দমবন্ধ পরিস্থিতির কারণেই শুরু হয়েছিল জুলাইয়ের জাগরণ। আমাদের মনে রাখা দরকার, জুলাই অভ্যুত্থান একটি যাত্রার সূচনামাত্র; কিন্তু চূড়ান্ত গন্তব্য নয়। জুলাই গণ-অভ্যুত্থান তখনই সার্থক হবে যখন এর পেছনের মূল চেতনা- বৈষম্যহীনতা, বাকস্বাধীনতা ও সর্বস্তরে ন্যায়পরায়ণতা প্রতিষ্ঠিত হবে। শত শহীদের রক্ত এবং হাজারো আহত মানুষের পঙ্গুত্ববরণের মূল্য আমাদের দিতে হবে রাষ্ট্রীয় সংস্কার ও সুশাসনের মধ্য দিয়ে। দুই বছর পরও জুলাই আন্দোলনের ক্ষত বয়ে বেড়াচ্ছে প্রায় দুই হাজার শিশু। বহু পরিবার চিকিৎসা ব্যয়ে নিঃস্ব হয়েছে। বর্তমান সরকারকে তাদের কথা ভাবতে হবে। আহতদের পুনর্বাসনের বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। শিশু-কিশোর-তরুণ-তরুণী তথা সর্বস্তরের মানুষের আত্মত্যাগের বিনিময়ে এই অভ্যুত্থানের অর্জন যেন কোনো স্বার্থান্বেষী মহলের বিশৃঙ্খলায় ম্লান না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থান আমাদের শুধু অতীতে ফিরে তাকানোর সুযোগ দেয় না, ভবিষ্যতের প্রেরণাও জোগায়। তাই বৈষম্যহীন দেশ গড়ার পথে জুলাইয়ের চেতনা হোক মূলমন্ত্র। তবে দুই বছরের মূল্যায়নে জুলাই-পরবর্তী চিত্র আশার বিস্তার ঘটিয়েছে। মাত্র এক বছর যদিও কোনো রাজনৈতিক অর্জনের জন্য যথেষ্ট সময় নয়, তথাপি একটি ভঙ্গুর ও বিধ্বস্ত পরিস্থিতিতে যাত্রা শুরু করে জুলাইয়ের চেতনায় যে অর্জন সাধিত হয়েছে, তা উল্লেখযোগ্য। কারণ, প্রচণ্ড টালমাটাল পরিস্থিতিতে দায়িত্ব নিয়েছিল জুলাই-পরবর্তী অন্তর্বর্তী সরকার। তাদের সামনে ছিল সমস্যার পাহাড় আর মাথার ওপর ছিল সীমাহীন প্রত্যাশার চাপ। এমন এটি চ্যালেঞ্জিং পরিস্থিতি মোকাবিলা করে সামনের দিকে সাফল্যের সঙ্গে এগিয়ে চলাও কম কৃতিত্ব নয়।চব্বিশের জুলাইয়ে রাজপথে রক্তের আলপনায় রচিত হয়েছিল ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ফ্যাসিবাদী সরকার উৎখাতের ইতিবৃত্ত। জুলাই অভ্যুত্থানের গতি-প্রকৃতি, রাজনৈতিক প্রতিরোধের শক্তি, অর্জন ও ভবিষ্যতের শিক্ষা নিয়ে নৈর্ব্যক্তিক আলাপ-আলোচনা ও বিশ্লেষণই জরুরি। জরুরি জুলাই অভ্যুত্থানের সমান্তরালে বাংলাদেশের সংস্কার প্রচেষ্টা এবং গণতান্ত্রিক উত্তরণের তুলনামূলক আলোচনা। চাটুকারিতা ও মিথ্যা প্রশংসা না করে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় জুলাই অভ্যুত্থানের সাফল্য ও ব্যর্থতার বিষয়গুলো সামনে এনে ভবিষ্যতের জন্য শিক্ষা গ্রহণ করাই বরং গুরুত্বপূর্ণ। পক্ষান্তরে, এমন সব স্বস্তির খবর ঢাকা পড়েছে প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় চরম বিশৃঙ্খলা ও নজিরবিহীন মবের ঘটনা। এসব ঘটনা নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। চব্বিশের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। এসব বিষয়ে সরকারকে সামনের দিনগুলোতে আরও সতর্ক থাকতে হবে এবং জুলাই অভ্যুত্থানের ইতিবাচক শক্তি ও রাজনৈতিক প্রতিরোধের স্পৃহাকে কাজে লাগিয়ে দেশের আপামর মানুষের বর্তমানকে নিরাপদ এবং ভবিষ্যৎকে সুন্দর করার উদ্যোগ নিতে হবে। লেখক: গবেষক ও কলাম লেখক, লন্ডন থেকে |