|
আবাসন খাতে ‘কালো টাকা’ বৈধ করার সুযোগ, বৈষম্য বাড়ার শঙ্কা
নতুন বার্তা, ঢাকা:
|
দেশে দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং নগরায়ণের ফলে আবাসন খাতে চাহিদা কয়েক গুণ বেড়েছে। এই বাস্তবতাকে সামনে রেখে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে জমি, ভবন ও অ্যাপার্টমেন্ট কেনাবেচার ক্ষেত্রে অপ্রদর্শিত আয় বা কথিত ‘কালো টাকা’ বৈধ করার সুযোগ রাখা হয়েছে। যদিও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সরাসরি ‘কালো টাকা সাদা করার ব্যবস্থা’ থাকার বিষয়টি অস্বীকার করছে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, নতুন বিধান কার্যত অপ্রদর্শিত অর্থ বৈধ করার পথই উন্মুক্ত করেছে।সরকারের দাবি, এই উদ্যোগ আবাসন খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি, রাজস্ব আহরণ এবং অর্থনীতিতে অর্থের প্রবাহ বাড়াতে সহায়ক হবে। তবে সমালোচকদের মতে, কর ফাঁকি ও দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত অর্থ বৈধ করার সুযোগ তৈরি হলে তা সুশাসন, কর নৈতিকতা এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের জন্য দীর্ঘমেয়াদে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে প্রস্তাবিত এই বিধান নিয়ে আগামী দিনগুলোতে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনে বিতর্ক আরও জোরালো হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কী আছে নতুন ব্যবস্থায় প্রস্তাবিত বাজেটের অর্থ বিলে আয়কর আইন, ২০২৩-এর প্রথম তফসিলে সংশোধন এনে বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি স্বপ্রণোদিতভাবে জমি, বিল্ডিং বা অ্যাপার্টমেন্টে বিনিয়োগ কিংবা ক্রয়ের সময় অপ্রদর্শিত আয় ঘোষণা করে নির্ধারিত কর পরিশোধ করলে সেই অর্থের উৎস সম্পর্কে কোনো কর্তৃপক্ষ প্রশ্ন তুলতে পারবে না। এছাড়া জমি বা আবাসন কেনার সময় দলিলে প্রকৃত মূল্যের তুলনায় কম মূল্য দেখানো হলেও পরবর্তীতে অতিরিক্ত অর্থ স্বপ্রণোদিতভাবে ঘোষণা করে নিয়মিত কর ও অতিরিক্ত নির্ধারিত কর পরিশোধের মাধ্যমে তা বৈধ করার সুযোগ রাখা হয়েছে। অর্থবিলের ভাষ্য অনুযায়ী, ‘এ আইন বা বাংলাদেশে প্রচলিত অন্য কোনো আইনে যা কিছুই থাকুক না কেন, কোনো ব্যক্তি কর্তৃক স্বপ্রণোদিতভাবে প্রদর্শিত বিনিয়োগ বা ক্রয়ের উৎস এবং এর বিপরীতে পরিশোধিত করের বিষয়ে কোনো প্রশ্ন উত্থাপন বা কার্যক্রম গ্রহণ করা যাবে না।’ এনবিআরের ব্যাখ্যা জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কর্মকর্তারা বলছেন, এটি প্রচলিত অর্থে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ নয়। তাদের মতে, অপ্রদর্শিত আয়ের ক্ষেত্রে নিয়মিত আয়করের পাশাপাশি অতিরিক্ত ১৫ শতাংশ কর (গেইন ট্যাক্স) পরিশোধ করতে হবে। ফলে এটি কর প্রদানের মাধ্যমে আয়কে নিয়মিত করার একটি প্রক্রিয়া মাত্র। এনবিআর চেয়ারম্যান মো. আব্দুর রহমান খান জানান, বিষয়টিকে অনেকেই ভুলভাবে ‘কালো টাকা সাদা করার সুযোগ’ হিসেবে দেখছেন। তিনি জানান, গত বছর জমি বিক্রেতাদের জন্য একটি বিধান করা হয়েছিল, যেখানে দলিলে কম মূল্য দেখিয়ে জমি বিক্রি করা হলেও ব্যাংক লেনদেন ও বায়নানামার মাধ্যমে প্রকৃত মূল্য প্রমাণ করতে পারলে নিয়মিত কর ও অতিরিক্ত ১৫ শতাংশ কর পরিশোধ করে সেই অর্থ বৈধভাবে প্রদর্শনের সুযোগ ছিল। এবার একই ধরনের সুবিধা ক্রেতাদের জন্যও প্রস্তাব করা হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে ফ্ল্যাট বা জমির প্রকৃত ক্রয়মূল্য দলিলে কম দেখানো হয়। এমন পরিস্থিতিতে ক্রেতারা স্বপ্রণোদিত হয়ে প্রকৃত মূল্য ঘোষণা করলে নিয়মিত করের পাশাপাশি অতিরিক্ত কর পরিশোধ করে অর্থের হিসাব বৈধভাবে দেখাতে পারবেন। তবে যাদের অর্থ আগে থেকেই বৈধ ও কর পরিশোধ করা, তাদের কোনো অতিরিক্ত কর দিতে হবে না। এটি মূলত করদাতাদের হয়রানি কমানোর জন্য প্রস্তাব করা হয়েছে। এ নিয়ে আপত্তি থাকলে সরকার বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করতে পারে। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীও দাবি করেছেন, জমির প্রকৃত মূল্য নির্ধারণের ব্যবস্থা কার্যকর হলে অপ্রদর্শিত অর্থ বৈধ করার সুযোগ সীমিত হয়ে যাবে। গত ১২ জুন বাজেটোত্তর সংবাদ সম্মেলনে এক প্রশ্নের জবাবে বিষয়ে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, জমির মৌজা রেট প্রকৃত বাজারমূল্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা গেলে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ থাকবে না। তিনি জানান, বর্তমানে অনেক ক্ষেত্রে জমির প্রকৃত মূল্য দলিলে কম দেখানো হয়। এ সমস্যা সমাধানে সরকার মৌজা রেট পুনর্মূল্যায়নের উদ্যোগ নিয়েছে এবং এ বিষয়ে একটি কমিটি কাজ করছে। স্থানভেদে জমির প্রকৃত মূল্য নির্ধারণ করে মৌজা রেট বাস্তবসম্মত করা হলে অপ্রদর্শিত অর্থ বৈধ করার সুযোগও বন্ধ হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। আবাসন ব্যবসায়ীরা যা বলছেন আবাসন ব্যবসায়ীদের সংগঠন রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশনের (রিহ্যাব) সভাপতি ড. আলী আফজাল প্রস্তাবিত বাজেটে নির্ধারিত কর পরিশোধের মাধ্যমে অপ্রদর্শিত অর্থ আবাসনসহ উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগের সুযোগ দেওয়ার সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন। তিনি বলেন, দীর্ঘদিন অর্থনীতির মূলধারার বাইরে থাকা অর্থ বিনিয়োগের সুযোগ পেলে তা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধি করবে। রিহ্যাব সভাপতির মতে, আবাসন খাতের সঙ্গে প্রায় ২৬৯টি শিল্পখাত যুক্ত থাকায় এ খাতে বিনিয়োগ বাড়লে সামগ্রিক অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। তবে তিনি নির্মাণসামগ্রী, বিশেষ করে রডের ওপর আরোপিত অতিরিক্ত করের সমালোচনা করে বলেন, এতে নির্মাণ ব্যয় বাড়বে এবং শেষ পর্যন্ত ফ্ল্যাট ক্রেতাদের ওপর বাড়তি চাপ পড়বে। তাই এ বিষয়ে সরকারের পুনর্বিবেচনা করা উচিত। তবে এর আগে অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। কিন্তু ব্যাপক সমালোচনার মুখে শেষ পর্যন্ত সেই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে সরকার। দুই দশক পর বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতায় এসে নতুন অর্থবিলে আবারও এমন একটি বিধান অন্তর্ভুক্ত করেছে, যা আবাসন খাতে বিনিয়োগের মাধ্যমে অপ্রদর্শিত আয় বৈধ করার সুযোগ সৃষ্টি করেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। অর্থনীতিবিদদের উদ্বেগ অর্থনীতিবিদ ও নীতি বিশ্লেষকদের একটি বড় অংশ এ ব্যবস্থাকে ভিন্নভাবে দেখছেন। তাদের মতে, আবাসন খাতে বিনিয়োগের মাধ্যমে অপ্রদর্শিত অর্থ বৈধ করার সুযোগ কর-সচেতন ও নিয়মিত করদাতাদের প্রতি এক ধরনের বৈষম্য সৃষ্টি করবে। তারা বলছেন, সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন গোষ্ঠী, প্রভাবশালী ব্যবসায়ী কিংবা দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত অর্থের মালিকরা সহজেই এই সুবিধা গ্রহণ করে বিপুল পরিমাণ জমি ও ফ্ল্যাটের মালিক হতে পারবেন। ফলে সম্পদের কেন্দ্রীকরণ আরও বাড়বে এবং সমাজে ধনী-গরিবের ব্যবধান বিস্তৃত হবে। এক শ্রেণির মানুষ শত শত বিঘা জমি ও হাজার হাজার ফ্ল্যাটের মালিক হবেন, আর অন্য শ্রেণির মানুষ বছরের পর বছর সেই ফ্ল্যাটেই ভাড়াটিয়া হিসেবে বসবাস করবেন। এতে সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্য আরও তীব্র হবে। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেছেন, প্রস্তাবিত বাজেটে জমি ও ফ্ল্যাট কেনাবেচার মাধ্যমে অপ্রদর্শিত আয় বৈধ করার যে সুযোগ রাখা হয়েছে, তা অর্থনৈতিক, নৈতিক ও রাজনৈতিক কোনো দিক থেকেই গ্রহণযোগ্য নয়। তার মতে, অতীতে এমন সুযোগ দেওয়া হলেও রাজস্ব আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়েনি; বরং এটি নিয়মিত করদাতাদের জন্য নৈতিক ঝুঁকি তৈরি করে। মোস্তাফিজুর রহমান আরও বলেন, বাজেট বক্তৃতায় সরাসরি উল্লেখ না থাকলেও জমি ও অ্যাপার্টমেন্ট লেনদেনের ক্ষেত্রে ভিন্নভাবে এ সুযোগ রাখা হয়েছে। জমির মৌজা রেট ও প্রকৃত বাজারমূল্যের মধ্যে বড় ব্যবধান থাকায় অনেক অর্থ অপ্রদর্শিত থেকে যায়। সরকার মৌজা রেট হালনাগাদের উদ্যোগ নিয়েছে এবং এই পরিবর্তনের আগে এটিকে এক ধরনের ‘শেষ সুযোগ’ হিসেবে উপস্থাপন করা হতে পারে। কালো টাকা সাদা করা নিয়ে উদ্বেগের কথা জানিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান এ প্রসঙ্গে বলেন, আবাসন খাত বা অর্থনীতিতে বিনিয়োগ বাড়ানোর যুক্তিতে অপ্রদর্শিত অর্থ বৈধ করার সুযোগ দেওয়া রাষ্ট্রের জন্য আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত। ইফতেখারুজ্জামানের মতে, এটি দুর্নীতি ও অনিয়মকে রাষ্ট্রীয়ভাবে উৎসাহিত করার শামিল এবং সৎ করদাতাদের নিরুৎসাহিত করে। তিনি বলেন, স্বাধীনতার পর বিভিন্ন সরকার কালো টাকা বৈধ করার সুযোগ দিলেও এতে করফাঁকি কমেনি, বরং বেড়েছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এ ধরনের সুযোগ বন্ধের উদ্যোগ নিলেও বর্তমান সরকারের তা পুনর্বহালের চেষ্টা দুর্নীতির বিরুদ্ধে ঘোষিত অবস্থানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তাই জনস্বার্থ ও দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক শৃঙ্খলার স্বার্থে কালো টাকা বৈধ করার সুযোগ স্থায়ীভাবে বন্ধ করা উচিত। |