|
শিশু সুরক্ষায় আইনের ফাঁকেই থাকছে লাখো শিশু
নতুন বার্তা, ঢাকা:
|
দেশে এখনো ১০ লাখের বেশি শিশু ঝুঁকিপূর্ণ শ্রমে নিয়োজিত। লাখো শিশু রাস্তায় দিন কাটাচ্ছে। যৌন নিপীড়ন ও অনলাইন শোষণের শিকার হচ্ছে অসংখ্য শিশু। অথচ এসব শিশুকে সুরক্ষা দেওয়ার মতো কোনো পূর্ণাঙ্গ আইনি কাঠামো বাংলাদেশে নেই। এমন উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে গবেষণা সংস্থা কনস্টিটিউশন ওয়াচডগের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে।গত ৭ জুন প্রকাশিত প্রতিবেদনটির শিরোনাম — 'বাংলাদেশে শিশু সুরক্ষা আইনের সংস্কার: একটি পূর্ণাঙ্গ শিশু সুরক্ষা আইনের প্রয়োজনীয়তা'। প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, ২০১৩ সালের শিশু আইনসহ বিদ্যমান বেশ কিছু আইন থাকলেও সেগুলো খণ্ডিত ও পরস্পর সমন্বয়হীন। ফলে শিশুরা কার্যত আইনি সুরক্ষার বাইরেই থেকে যাচ্ছে। পরিস্থিতি কতটা খারাপ বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর জাতীয় শিশুশ্রম জরিপ ২০২২ অনুযায়ী, দেশে ৫ থেকে ১৭ বছর বয়সী প্রায় ৪ কোটি শিশুর মধ্যে ১৭ লাখ ৭৬ হাজার শিশু শিশুশ্রমে নিয়োজিত। এর মধ্যে ১০ লাখ ৬৮ হাজার শিশু সরাসরি ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করছে। ইউনিসেফ ও বিবিএসের সাম্প্রতিক এমআইসিএস ২০২৫ জরিপের প্রাথমিক তথ্য বলছে, শিশুশ্রমের হার ২০১৯ সালের ৬ দশমিক ৮ শতাংশ থেকে বেড়ে ৯ দশমিক ২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ পরিস্থিতি ভালো হওয়ার বদলে আরও খারাপ হচ্ছে। পথশিশুদের বিষয়ে ইউনিসেফের ২০২৪ সালের বিশ্লেষণ বলছে, দেশে পথশিশুর সংখ্যা কয়েক লাখ, কিন্তু সরকারি কোনো জরিপ না থাকায় আসল চিত্র আরও ভয়াবহ হতে পারে। ফলে তারা রাষ্ট্রীয় সুরক্ষার বাইরেই থেকে যাচ্ছে। জন্মনিবন্ধনের হালও সন্তোষজনক নয়। প্রাথমিক এমআইসিএস ২০২৫ তথ্য অনুযায়ী, পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে মাত্র ৫৯ শতাংশের জন্মনিবন্ধন হয়েছে। জন্মনিবন্ধন না থাকায় বাল্যবিবাহ ও শিশুশ্রম ঠেকানো আরও কঠিন হয়ে পড়ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। কোথায় ফাঁক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমান আইনি কাঠামোয় নয়টি বড় দুর্বলতা রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো — পথশিশুদের জন্য আলাদা কোনো আইনি স্বীকৃতি নেই, শিশু নির্যাতনের ঘটনা বাধ্যতামূলকভাবে জানানোর কোনো বিধান নেই, যৌন নিপীড়নের মামলায় শিশুবান্ধব কোনো বিচারিক পদ্ধতি নেই এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাস্তুচ্যুত শিশুদের সুরক্ষার কোনো ব্যবস্থা নেই। এ ছাড়া একাধিক মন্ত্রণালয়ে শিশু সুরক্ষার দায়িত্ব ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকলেও কেন্দ্রীয়ভাবে সমন্বয়কারী কোনো কর্তৃপক্ষ নেই। ১১টি সুপারিশ এই পরিস্থিতি মোকাবেলায় কনস্টিটিউশন ওয়াচডগ ১১টি সুনির্দিষ্ট সুপারিশ দিয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো একটি পূর্ণাঙ্গ 'শিশু সুরক্ষা আইন' প্রণয়ন করা। এ ছাড়া একটি স্বাধীন জাতীয় শিশু সুরক্ষা কর্তৃপক্ষ গঠন, প্রতিটি জেলায় শিশু সুরক্ষা কমিটি স্থাপন, শিশু সুরক্ষা আদালত প্রতিষ্ঠা এবং শিক্ষক, চিকিৎসক ও সমাজকর্মীদের জন্য শিশু নির্যাতনের ঘটনা বাধ্যতামূলকভাবে জানানোর বিধান রাখার সুপারিশও করা হয়েছে। সংস্থাটি জানিয়েছে, ভারতের পকসো আইন ও শ্রীলঙ্কার জাতীয় শিশু সুরক্ষা কর্তৃপক্ষের মডেল থেকে শিক্ষা নিয়ে বাংলাদেশের নিজস্ব বাস্তবতা অনুযায়ী এই আইন তৈরি করা সম্ভব। কনস্টিটিউশন ওয়াচডগের সভাপতি মো. ইব্রাহীম খলিলুল্লাহ্ বলেন, "বাংলাদেশের সংবিধান ও আন্তর্জাতিক চুক্তি অনুযায়ী শিশুদের সুরক্ষা দেওয়া রাষ্ট্রের দায়িত্ব। কিন্তু সেই দায়িত্ব পালনের কাঠামো এখনো তৈরি হয়নি। আইন এখন শুধু কাগজের মধ্যে সীমাবদ্ধ — এটাকে বাস্তবে রূপ দিতে হবে।" |