|
মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার : একদিকে আশার আলো, অন্যদিকে সিন্ডিকেটের ‘পুরোনো’ ভয়
নতুন বার্তা, ঢাকা:
|
রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে প্রায় দুই বছর বন্ধ থাকার পর শ্রমবাজার খোলার প্রক্রিয়া শুরু করতে একমত হয়েছে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়া। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকার গঠনের পর দ্রুত সময়ের মধ্যে শ্রমবাজার খোলার উদ্যোগ নতুন পথ দেখাচ্ছে। তবে একইসঙ্গে নিয়োগ প্রক্রিয়া আবারও সীমিত কিছু এজেন্সির নিয়ন্ত্রণে যাওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে।সম্প্রতি মালয়েশিয়ার রাজধানী কুয়ালালামপুরে শ্রমবাজার নিয়ে দুই দেশের প্রতিনিধি দলের বৈঠকে ‘বিশ্বাসযোগ্য’ এজেন্সির মাধ্যমে কর্মী পাঠানোর কথা বলা হয়েছে। যেটি আবারও নির্দিষ্ট সংখ্যক এজেন্সির মাধ্যমেই এই শ্রমবাজার নিয়ন্ত্রণের বার্তা দেয়। পাশাপাশি শূন্য অভিবাসন ব্যয়ে কর্মী প্রেরণের কথা এসেছে, যা বাস্তবায়ন দুরূহ ব্যাপার বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। সরকারের কর্মকর্তারা বলছেন, এবার আর আগের মতো নয়, নিয়োগ প্রক্রিয়ায় আসছে আমূল পরিবর্তন। মালয়েশিয়া সব দেশের কর্মীদের জন্য একটি প্রযুক্তি-নির্ভর ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ভিত্তিক নিয়োগ পদ্ধতি চালু করার উদ্যোগ নিয়েছে। এই ব্যবস্থার মূল লক্ষ্য, মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমানো, অভিবাসন ব্যয় হ্রাস করা এবং নিয়োগের যাবতীয় খরচ যাতে নিয়োগকর্তারাই বহন করেন তা নিশ্চিত করা। অভিবাসন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আগের সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী কর্মী পাঠানোর প্রক্রিয়া চললে আবারও পুরোনো সিন্ডিকেট সক্রিয় হতে পারে। কারণ ওই চুক্তিতে যোগ্য এজেন্সি বেছে নেওয়ার ক্ষমতা মালয়েশিয়াকে দেওয়া হয়েছিল। এটি হলে অতীতের সেই বিতর্কিত সিন্ডিকেট ব্যবস্থারই পুনরাবৃত্তি হবে। ২০২৪ সাল থেকে মালয়েশিয়ায় জনশক্তির বাজার বন্ধ বাংলাদেশের। ওই বছর মালয়েশিয়ার সরকার ঘোষণা করেছিল, আগে থেকে অনুমোদন পাওয়া বাংলাদেশের কর্মীদের ৩১ মে-এর মধ্যে দেশটিতে যেতে হবে। এরপর কর্মী ভিসায় আর কেউ সেখানে ঢুকতে পারবেন না। ওই তারিখের পর থেকে আর কোনো কর্মী যেতে পারেননি দেশটিতে। এরপর বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে দফায়-দফায় চেষ্টা করেও এই শ্রমবাজার উন্মুক্ত করা সম্ভব হয়নি। বিএনপি সরকার গঠনের পর গুরুত্বপূর্ণ এই জনশক্তি বাজার আবার উন্মুক্ত করার উদ্যোগ নেয়। বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করতে মালয়েশিয়া যান প্রবাসীকল্যাণমন্ত্রী আরিফুল হক ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন। গত বৃহস্পতিবার (৯ এপ্রিল) মালয়েশিয়ার পুত্রজায়ায় বাংলাদেশ সরকার ও মালয়েশিয়া সরকারের মধ্যে শ্রম অভিবাসনের বিষয়ে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এ বৈঠকে শ্রমবাজার খোলা ও ব্যয় কমানো নিয়ে আলোচনা হয়। শ্রম অভিবাসন বিষয়ে বৈঠক প্রসঙ্গে দুই দেশ যৌথ বিবৃতি দিয়েছে। বিবৃতিতে বলা হয়েছে, মধ্যস্থতাকারী কমিয়ে অভিবাসনের ব্যয় হ্রাস, বিশ্বাসযোগ্য নিয়োগকারী সংস্থা ব্যবহার এবং আটকে থাকা শ্রমিকদের নিয়োগ দ্রুত সম্পন্ন করার বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়া হবে। এতে আরও বলা হয়, মালয়েশিয়া সব উৎসদেশের জন্য এআই-ভিত্তিক প্রযুক্তিনির্ভর নিয়োগ ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নিয়েছে। এতে মধ্যস্বত্বভোগী কমবে, অভিবাসন খরচ কমবে এবং আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) নির্দেশনা অনুযায়ী ‘নিয়োগকর্তাই অর্থ প্রদান করবেন’ নীতির সঙ্গে সংগতি রেখে শ্রমিকদের জন্য খরচ ‘শূন্য’ হবে। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে অন্যান্য সব প্রেরণকারী দেশকে সম্পৃক্ত করে একটি বৈশ্বিক উদ্যোগ হিসেবে এ ধরনের ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম বাস্তবায়নে পূর্ণ সমর্থন ও সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করা হয়। এ ছাড়া মানব পাচার সংক্রান্ত চলমান আইনি মামলা সম্পর্কিত উদ্বেগ নিয়ে দুই পক্ষই আলোচনা করেছে। বাংলাদেশ আইনের শাসন, যথাযথ প্রক্রিয়া, জবাবদিহিতা এবং সময়োপযোগী বিচার নিশ্চিত করার প্রতি তাদের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছে। পরে শুক্রবার কুয়ালালামপুরে বাংলাদেশ হাইকমিশনে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, প্রবাসীদের সমস্যা সমাধান ও বিদ্যমান সংকট দূর করতে মালয়েশিয়া কর্তৃপক্ষের কাছে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে সব দাবি ও প্রস্তাব অত্যন্ত স্বচ্ছতার সঙ্গে তুলে ধরা হয়েছে। আলোচনার ভিত্তিতে গৃহীত সিদ্ধান্তগুলো মাঠ পর্যায়ে সঠিকভাবে বাস্তবায়নের মাধ্যমে কাজের প্রতিফলন ঘটানো এখন সরকারের মূল লক্ষ্য। নিয়মিত তদারকির মাধ্যমে এবারের নিয়োগ প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণ দুর্নীতিমুক্ত রাখা হবে। প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন বলেন, বিগত সময়ের অব্যবস্থাপনার ফলে সৃষ্ট সংকট রাতারাতি সমাধান করা সম্ভব না হলেও সরকার সর্বোচ্চ আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করছে। বিশেষ করে মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি শ্রমিকদের মানবাধিকার সুরক্ষা, উন্নত কর্মপরিবেশ এবং সামাজিক মর্যাদা নিশ্চিত করাকে বর্তমান সরকার সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে। শ্রমবাজার খোলায় দুই দেশের এসব পরিষ্কার উদ্যোগ সত্ত্বেও মালয়েশিয়ায় শ্রমশক্তি প্রেরণ নির্ঝঞ্জাট হবে বলে মনে করেন না এই খাতের সংশ্লিষ্ট অনেকে। তারা বলছেন সিন্ডিকেটের পুরোনো ভূত আবারও চেপে বসতে পারে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সির (বায়রা) সাবেক যুগ্ম মহাসচিব মোহাম্মদ ফখরুল ইসলাম বলেন, আবারও সিন্ডিকেটের কবলেই পড়তে যাচ্ছে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার। দুই দেশের মন্ত্রীর বৈঠকের পর যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়েছে- ‘বিশ্বাসযোগ্য’ রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে কর্মী প্রেরণ, সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে চলমান মামলা প্রত্যাহার, শূন্য অভিবাসন ব্যয় প্রভৃতি। আসলে এসব নাটকের মাধ্যমে আগের মতো এজেন্সি সিন্ডিকেটের দিকেই যাচ্ছে বর্তমান সরকার। ফখরুল ইসলাম বলেন, ২০২২ সালে মালয়েশিয়ার তৎকালীন মানবসম্পদ মন্ত্রী সারাভানান ঢাকায় এসে শূন্য অভিবাসন খরচে কর্মী নেওয়ার কথা বলেছিলেন। কিন্তু আমরা কী দেখলাম? আসলে সরকারকে ব্ল্যাক মেইল করে সিন্ডিকেট করাই ছিল তাদের উদ্দেশ্য। এবারও তার ব্যতিক্রম নয়। এর আগে ২০১৬ সালেও বলা হয়েছিল বিনা খরচে যাবে কর্মী। কিন্তু বাস্তবতা ছিল ভিন্ন। মালয়েশিয়া যাওয়ার আগে মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী বলেছিলেন, আমরা কোনো সিন্ডিকেট বুঝি না, আমরা সবসময় সবার জন্য উন্মুক্ত রাখার চেষ্টা করি। বাংলাদেশ জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য বলছে, ১৯৭৮ সালে প্রথম ২৩ জন শ্রমিক মালয়েশিয়ায় যান। বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে আনুষ্ঠানিক জনশক্তি নিয়োগ চুক্তি সই হয় ১৯৯২ সালে। ১৯৯০ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত সে দেশে বাংলাদেশি শ্রমিক রপ্তানি বৃদ্ধি পায়। এর মধ্যে ২০২৩ সালে বাংলাদেশ থেকে সর্বোচ্চ ৩ লাখ ৫১ হাজার ৬৮৩ জন মালয়েশিয়ায় গেছেন। ২০২৪ সালের ৩১ মে শ্রমবাজারটি বন্ধ হয়ে যায়। অভিবাসন ও শরণার্থী বিষয়ক বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনীর মনে করেন, আমাদের একটা মানসিকতা হয়ে গেছে, বেশি লোক পাঠাতে হবে; যত বেশি লোক পাঠানো যায়। এই মানসিকতা থেকে গেলে সমস্যাও থেকেই যাবে। মালয়েশিয়ার কি আমাদের কর্মী দরকার নেই? আছে। তা না হলে কিন্তু তারা পার্মানেন্টলি শ্রমবাজারটা বন্ধ করে দিত। ওরা কখনো চাপ দেয়, কখনো রিলাক্স করে। বৈঠকের পর যেসব সিদ্ধান্তের কথা শোনা যাচ্ছে, এখানে নতুন কিছু নেই। এই শ্রমবাজার নিয়ে যে দুর্নীতি, এটা সবাই অনেকদিন ধরে জানে যে এটা মালয়েশিয়া থেকে হচ্ছে। পুরো ব্যাপারটা নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষেত্রে প্রবাসী বাংলাদেশি এবং ওখানকার উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা জড়িত। সেই জায়গায় যদি আমরা চাপ দিতে না পারি তাহলে যেটা হবে, একইরকমভাবে সবকিছু চলবে। খুব বেশি পরিবর্তন হবে না। আবার কিছুদিন পরে দেখা যাবে সংকট হচ্ছে। আসিফ মুনীর বলেন, এখন একটা যুক্তি থাকতে পারত, যাদেরকে অনুমতি দেওয়া হয় তারা হয়তো ভালো করে, কিন্তু সেটাও তো না। সিন্ডিকেটের মাধ্যমে গিয়ে অনেক কর্মীকে ভুক্তভোগী হতে হয়েছে। অনেক খরচ করতে হয়েছে, কিন্তু সেখানে গিয়ে যে সবাই কাজ পেয়েছে তাও কিন্তু না। ঘুরেফিরে একই জিনিস হয়েছে। আমরা অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েও একই জিনিস দেখেছি, এখনও তাই দেখছি। এখানে তাড়াহুড়ো করার আসলে কোনো প্রয়োজন ছিল না। এটা দেখানোর কোনো বিষয় না। সরকার দায়িত্ব নেওয়ার কয়েক মাসের মধ্যে বাজার উন্মুক্ত করলাম বা চালু করলাম। এ চালু যদি আবার বন্ধ হয়ে যায় এর দায় কিন্তু এই সরকারকেই নিতে হবে। সরকারের কী করা উচিত সে প্রসঙ্গে এই অভিবাসন বিশেষজ্ঞ বলেন, সরকারের উচিত ছিল নতুন করে যাচাই-বাছাই করা। আগের যে সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) ছিল সেগুলোর মধ্যে কোন কোন জায়গায় গ্যাপ ছিল, কোন জিনিসগুলো মালয়েশিয়া পালন করেনি বা কোন জিনিসগুলো আমাদের পূর্ববর্তী সরকার পালন করেনি, যাচাই-বাছাই করে নতুন করে চুক্তিগুলোকে সাজানো। পূর্ব প্রস্তুতি নিয়ে তারপর এগোলে ভালো হতো। দেখা যায়, যথাযথ প্রস্তুতি নেওয়া হয় না। আমরা বসে থাকি কবে ওদের সঙ্গে মিটিং করে বলব বাজারটা খুলে দেন। বাজার খোলার জন্য যে পূর্বশর্তগুলো থাকা উচিত, সেগুলো পালন না করলে একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হবে। আর এটা খুবই হতাশাজনক। বায়রার সাবেক মহাসচিব শামীম আহমেদ চৌধুরী নোমান বলেন, আমি মনে করি, মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার সবার জন্য উন্মুক্ত হওয়া উচিত। যদি সব এজেন্সিকে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য কাজ করার সুযোগ দেওয়া হয়, তবে পরে তাদের দক্ষতার ভিত্তিতে গ্রেডিং করা যেতে পারে। কিন্তু শুরু থেকেই যদি সুযোগ সীমিত করে দেওয়া হয়, তবে অনেক এজেন্সি তাদের সক্ষমতা প্রমাণের সুযোগই পাবে না। |