|
বাজেট ঘাটতি পূরণে এবারও সরকারের ভরসা ব্যাংক ঋণ
নতুন বার্তা, ঢাকা:
|
বাজেট ঘাটতি মেটাতে প্রতি বছরের মতো এবারও ব্যাংক ঋণের ওপরই সবচেয়ে বেশি ভরসা রাখছে সরকার। আসন্ন ২০২৬–২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেটে ঘাটতি ধরা হয়েছে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের, যার বড় অংশই আসবে ব্যাংকিং খাত থেকে। ঘাটতি অর্থায়নে বৈদেশিক ঋণের ওপর জোর দেওয়া হলেও অতীত অভিজ্ঞতা বলছে, শেষ পর্যন্ত সরকারের প্রধান নির্ভরতা হয়ে ওঠে দেশীয় ব্যাংকগুলোই। ‘অর্থনৈতিক গণতন্ত্রায়ন ও বিনিয়ন্ত্রণকরণ : ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতির অভিযাত্রায় বাংলাদেশ’— এমন সম্ভাব্য প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে আগামী ১১ জুন জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট উপস্থাপন করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উপস্থিতিতে উপস্থাপিত হতে যাওয়া এটি বর্তমান বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রথম পূর্ণাঙ্গ বাজেট। অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, আগামী অর্থবছরের বাজেটের মোট আকার ধরা হয়েছে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। এর বিপরীতে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। ফলে আয় ও ব্যয়ের মধ্যে ব্যবধান দাঁড়াচ্ছে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা। এই ঘাটতি পূরণে সরকার অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক-দুই উৎস থেকেই অর্থ সংগ্রহের পরিকল্পনা করেছে। অভ্যন্তরীণ উৎসের মধ্যে সরকারের সবচেয়ে বড় ভরসা হিসেবে থাকছে ব্যাংক ঋণ। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রাজস্ব আদায়ে কাঙ্ক্ষিত প্রবৃদ্ধি না হওয়া এবং ব্যয় ক্রমাগত বাড়তে থাকায় সরকারকে বারবার ব্যাংকিং খাতের দিকে ঝুঁকতে হয়েছে। প্রস্তাবিত বাজেট অনুযায়ী, বৈদেশিক ঋণ ও অনুদান থেকে ১ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা এবং অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহ করা হবে। এর মধ্যে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে নেওয়া হবে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা এবং সঞ্চয়পত্র ও অন্যান্য উৎস থেকে ১৫ হাজার কোটি টাকার অর্থ সংগ্রহ করা হবে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে অভ্যন্তরীণ ঋণ সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু রাজস্ব আদায়ের ধীরগতি এবং ব্যয় নির্বাহের চাপ সামাল দিতে গিয়ে সংশোধিত বাজেটে সেই লক্ষ্যমাত্রা বাড়িয়ে ১ লাখ ৩৭ হাজার কোটি টাকা করা হয়। আগামী অর্থবছরে অভ্যন্তরীণ ঋণের লক্ষ্যমাত্রা কিছুটা কমিয়ে ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা নির্ধারণ করা হলেও অর্থনীতিবিদদের মতে, রাজস্ব আদায়ের পরিস্থিতির উন্নতি না হলে সরকারকে শেষ পর্যন্ত আরও বেশি ব্যাংক ঋণ নিতে হতে পারে। অন্যদিকে ব্যাংক খাতের ওপর চাপ কমাতে সরকার বৈদেশিক ঋণ ও অনুদান আহরণের ওপরও জোর দিচ্ছে। নতুন বাজেটে এ খাত থেকে ১ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে এই লক্ষ্য অর্জন নিয়ে সংশয় রয়েছে। কারণ চলতি অর্থবছরে বৈদেশিক উৎস থেকে ১ লাখ ১ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহের মূল লক্ষ্য নির্ধারণ করা হলেও বাস্তবে তা অর্জন করা সম্ভব হয়নি। পরে সংশোধিত বাজেটে লক্ষ্যমাত্রা কমিয়ে ৬৩ হাজার কোটি টাকায় নামিয়ে আনা হয়। সে হিসাবে আগামী অর্থবছরে বৈদেশিক উৎস থেকে অর্থ সংগ্রহের লক্ষ্য সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে অতিরিক্ত প্রায় ৫৩ হাজার কোটি টাকা বৈদেশিক ঋণ ও অনুদান সংগ্রহ করতে হবে সরকারকে। অর্থ বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, বহুপক্ষীয় উন্নয়ন সংস্থা, উন্নয়ন সহযোগী দেশ এবং বিভিন্ন প্রকল্পভিত্তিক অর্থায়নের মাধ্যমে এই লক্ষ্য অর্জনের চেষ্টা করা হবে। তবে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, প্রকল্প বাস্তবায়নের ধীরগতি এবং ঋণ ছাড়ের জটিলতা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে থাকতে পারে। এদিকে চলতি অর্থবছরের বাজেট ঘাটতি মেটাতে ব্যাংক থেকে এক লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করেছিল সরকার। কিন্তু অর্থবছরের জুলাই থেকে ১০ মে পর্যন্ত সরকার ব্যাংক খাত থেকে নিট ১ লাখ ৯ হাজার ৫৬৮ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে। অর্থাৎ অর্থবছর শেষ হওয়ার আগেই লক্ষ্য ছাড়িয়ে গেছে সরকারি ঋণ। এ বিষয় ব্যাংক নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) সাবেক চেয়ারম্যান ও বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ নূরুল আমিন বলেন, রাজস্ব আহরণে বড় ধরনের ঘাটতি এবং প্রত্যাশিত বিদেশি বাজেট সহায়তা না পাওয়ায় সরকারকে ব্যাংকঋণের ওপর বেশি নির্ভর করতে হচ্ছে। তবে এ ধরনের নির্ভরতা দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। তিনি বলেন, সরকার যদি কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ঋণ নেয়, তাহলে নতুন টাকা সৃষ্টি করতে হয়, যা মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়াতে পারে। আবার বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে বেশি ঋণ নিলে ব্যাংকগুলোর তারল্য কমে যায় এবং বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। বর্তমানে বিনিয়োগ ও ঋণ প্রবৃদ্ধি তুলনামূলক কম থাকায় এর প্রভাব তেমন দৃশ্যমান নয়। তবে ভবিষ্যতে অর্থনীতির স্বার্থে ব্যাংক ঋণ নির্ভরতা কমানোর বিকল্প পথ খোঁজার পরামর্শ দেন ব্যাংকারদের এই সাবেক শীর্ষ নেতা। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত মে মাসে পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট ভিত্তিতে মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ৪২ শতাংশ। ফলে প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং রাজস্ব আহরণ বাড়ানোই আগামী অর্থবছরে সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের (২০২৫-২৬) প্রথম ১০ মাসে (এপ্রিল পর্যন্ত) সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে রাজস্ব ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৪ হাজার ৫৩৩ কোটি টাকা। এই সময়ে এনবিআরের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪ লাখ ৩১ হাজার ৪৬১ কোটি ২৭ লাখ টাকা, যার বিপরীতে আদায় হয়েছে মাত্র ৩ লাখ ২৬ হাজার ৯২৮ কোটি ১৬ লাখ টাকা। এই ১০ মাসে প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে ১০.৬০ শতাংশ। অথচ অর্থবছর শেষ হতে বাকি থাকা সময়ে লক্ষ্যমাত্রা ছুঁতে হলে আরও ১ লাখ ৭৬ হাজার কোটি টাকা আদায় করতে হবে, যা প্রায় অসম্ভব। |