|
পার্ল হারবারের পর যে ২ দেশ প্রকাশ্যে মার্কিন ঘাঁটিতে হামলা চালিয়েছে
নতুন বার্তা, ঢাকা:
|
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ইতিহাসে সবচেয়ে আলোচিত সামরিক হামলাগুলোর একটি হলো পার্ল হারবার হামলা। ১৯৪১ সালের ৭ ডিসেম্বর মিত্রশক্তি যুক্তরাষ্ট্রের নৌঘাঁটি পার্ল হারবারে আকস্মিক বিমান হামলা চালায় অক্ষশক্তি জাপান। এই হামলায় মার্কিন নৌবাহিনীর ব্যাপকমাত্রায় ক্ষতি হয় এবং এর পরপরই যুক্তরাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। সেই সময় থেকে দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তি ও বৈশ্বিক প্রভাব এতটাই শক্তিশালী হয়ে ওঠে যে কোনো রাষ্ট্র সরাসরি মার্কিন ঘাঁটিতে হামলা চালানোর সাহস খুব কমই দেখিয়েছে।বিশেষ করে স্নায়ুযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র প্রায় একক সুপারপাওয়ার (পরাশক্তি) হিসেবে আবির্ভূত হয়। ১৯৯১ সালে সোভিযেত ইউনিয়ন ভেঙে পড়ার পর আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবকে অনেক বিশ্লেষক ‘একমেরু বিশ্বব্যবস্থা’ বলে অভিহিত করেন। এই প্রেক্ষাপটে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে সরাসরি হামলা চালানো যে কোনো রাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত বলে বিবেচিত হয়। তবু ইতিহাসে এমন দুটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ রয়েছে, যেখানে রাষ্ট্রীয়ভাবে মার্কিন বাহিনীর অবস্থান লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে। প্রথমটি ঘটে ১৯৯১ সালে উপসাগরীয় যুদ্ধ চলাকালে। সে সময় ইরাকের প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসাইন স্কাড ব্যালিস্টিক মিসাইল নিক্ষেপের নির্দেশ দেন। এসব ক্ষেপণাস্ত্রের লক্ষ্য ছিল মূলত সৌদি আরবে অবস্থানরত যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন জোটবাহিনীর ঘাঁটি এবং ইসরায়েল। বিশ্লেষকদের মতে, এর উদ্দেশ্য ছিল ইসরায়েলকে যুদ্ধে টেনে এনে আরব দেশগুলোর মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি করা। দ্বিতীয় বড় হামলার উদাহরণটি আসে প্রায় তিন দশক পরে। ২০২০ সালের জানুয়ারিতে ইরাকে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটি আল আসাদ বিমানঘাঁটি ও ইরবিল বিমান ঘাঁটি লক্ষ্য করে ব্যালিস্টিক মিসাইল নিক্ষেপ করে ইরান। এই হামলা ছিল ইরানি জেনারেল কাশেম সোলাইমানি নিহত হওয়ার প্রতিক্রিয়া। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ইরান প্রকাশ্যে এই হামলার দায় স্বীকার করে, যা আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে একটি বিরল ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হয়। সম্প্রতি মধ্যপ্রাচ্যের বেশ কয়েকটি দেশে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি লক্ষ্য করে অনেক গুলো হামলা চালিয়েছে ইরান। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ব্যবহার করে সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, কাতার, কুয়েত, বাহরাইনে অবস্থানরত মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলোকে শক্তিশালী ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে তেহরান। নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক আধিপত্যের কারণে রাষ্ট্রগুলো সাধারণত সরাসরি হামলার পথ এড়িয়ে চলে। মার্কিন প্রতিক্রিয়া যে কতটা কঠোর হতে পারে, তা অনেক দেশই ভালোভাবে উপলব্ধি করে। মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক গবেষক ফাওয়াজ জর্জ বলেন, ‘মার্কিন ঘাঁটিতে সরাসরি হামলা করা কেবল সামরিক পদক্ষেপ নয়, এটি একটি বড় রাজনৈতিক বার্তাও। সাধারণত রাষ্ট্রগুলো এমন ঝুঁকি নিতে চায় না, কারণ এতে দ্রুত বৃহত্তর যুদ্ধ শুরু হওয়ার আশঙ্কা থাকে।’ একই মত প্রকাশ করেছেন সামরিক ইতিহাসবিদ ম্যাক্স বুট। তিনি বলেন, ‘দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতা এমন এক স্তরে পৌঁছেছে যে অধিকাংশ রাষ্ট্র সরাসরি সংঘর্ষ এড়িয়ে চলে। তাই রাষ্ট্রীয়ভাবে মার্কিন ঘাঁটিতে হামলার ঘটনা খুবই বিরল।’ ভিয়েতনাম, আফগানিস্তান যুদ্ধের সময় মার্কিন ঘাঁটিসহ বিভিন্ন স্থাপনায় সশস্ত্র গোষ্ঠীর হামলা হলেও রাষ্ট্রীয় ভাবে দায় স্বীকার করা হয়নি। ভিয়েতনাম যুদ্ধ চলাকালে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি ও স্থাপনাগুলো নিয়মিত হামলার মুখে পড়ে, তবে এসব হামলার পেছনে কোনো রাষ্ট্র সরাসরি দায়ী ছিল না। মূলত উত্তর ভিয়েতনামের সমর্থিত গেরিলা সংগঠন ভিয়েট কং দক্ষিণ ভিয়েতনামের বিভিন্ন এলাকায় অবস্থান করা মার্কিন ঘাঁটি, বিমানঘাঁটি ও সরবরাহ কেন্দ্র লক্ষ্য করে হামলা চালাত। ১৯৬০ ও ১৯৭০-এর দশকে গেরিলা কৌশল, অতর্কিত আক্রমণ এবং মাইন বিস্ফোরণের মাধ্যমে মার্কিন বাহিনীকে বড় ধরনের চাপে ফেলা হয়। ২০০১ সালে শুরু হওয়া আফগানিস্তান যুদ্ধ চলাকালে আফগানিস্তানে স্থাপিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটি, কনভয় ও বিমানঘাঁটি বারবার সশস্ত্র গোষ্ঠীর হামলার শিকার হয়। বিশেষ করে তালিবান এবং তাদের মিত্র সংগঠনগুলো অতর্কিত হামলা, রকেট নিক্ষেপ ও আত্মঘাতী আক্রমণের মাধ্যমে মার্কিন স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করে। আফগানিস্তানের বিভিন্ন প্রদেশে মার্কিন ঘাঁটি ও টহলদল প্রায়ই এ ধরনের হামলার মুখে পড়ে। তবে এসব হামলার ক্ষেত্রেও সরাসরি কোনো রাষ্ট্র মার্কিন ঘাঁটিতে আক্রমণ চালায়নি; বরং এটি ছিল বিদ্রোহী ও সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর পরিচালিত যুদ্ধ। সব মিলিয়ে দেখা যায়, পার্ল হারবার হামলার পর থেকে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের শক্ত অবস্থানের কারণে সরাসরি মার্কিন ঘাঁটিতে হামলা করার ঘটনা অত্যন্ত সীমিত। ইতিহাসে ইরাক ও ইরানের পদক্ষেপগুলো তাই শুধু সামরিক দৃষ্টিকোণ থেকেই নয়, বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্যের আলোচনাতেও বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। |