|
জিম্মি পথচারীরা, নেপথ্যে কতিপয় স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা
মহাখালী ওয়্যারলেস গেটে ফুটপাত দখল ও বেপরোয়া চাঁদাবাজি
নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা:
|
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও উচ্চপর্যায়ের কড়া নির্দেশনা সত্ত্বেও রাজধানী বনানী থানাধীন মহাখালী ওয়্যারলেস গেট এলাকায় থামছে না বেপরোয়া চাঁদাবাজি। ফুটপাত ও সড়ক দখল করে অবৈধ দোকানপাট বসানোকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে এই শক্তিশালী চাঁদাবাজি বলয়। ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের (ডিএনসিসি) বারবার উচ্ছেদ অভিযানের পরও দখলমুক্ত করা যাচ্ছে না হাঁটার পথ। সকালে সিটি কর্পোরেশন উচ্ছেদ চালালে বিকেলেই প্রভাবশালী চক্রের মদদে আবার বসে যায় সারি সারি দোকান। স্থানীয়দের প্রশ্ন—আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কঠোর অবস্থানের মধ্যেও এতো সাহস কোথায় পায় এই চাঁদাবাজরা?সরেজমিনে মহাখালী ওয়্যারলেস গেট মোড় থেকে টিএন্ডটি স্কুল রোড এবং বেলতলা এলাকা ঘুরে দেখা যায় চরম ঘিঞ্জি ও বিশৃঙ্খল পরিবেশ। ফুটপাত ছাপিয়ে মূল সড়কের ওপর গড়ে উঠেছে অস্থায়ী দোকান ও ফলের পসরা। স্কুল রোডে সারি সারি সবজি বিক্রেতাদের ভ্যানগাডির কারণে সাধারণ মানুষের হাঁটাচলাই দায় হয়ে পড়েছে। ফুটপাত না থাকায় বাধ্য হয়ে পথচারীদের মূল সড়ক দিয়ে পথ চলতে হয়, যেখানে প্রতিনিয়ত তাদের মুখোমুখি হতে হচ্ছে বেপরোয়া গতির অটোরিকশার। সম্প্রতি মহাখালী টিএন্ডটি মাঠের পাশে সিটি কর্পোরেশনের একটি ময়লার ট্রাকের ধাক্কায় এক নারী পথচারী নিহত হন। স্থানীয়দের মতে, ফুটপাতে হাঁটার বিন্দুমাত্র জায়গা না থাকায় বাধ্য হয়ে তিনি মূল সড়কে নামতেই এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনার শিকার হন। কেবল দুর্ঘটনাই নয়, ফুটপাত দখলকে কেন্দ্র করে প্রতিনিয়ত ঘটছে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি। কিছু দিন আগে ওয়্যারলেস গেট মোড়ে একটি চা দোকানে চেয়ারে বসা নিয়ে সরকারি তিতুমীর কলেজের এক শিক্ষার্থীর সঙ্গে স্থানীয় এক যুবকের বাকবিতণ্ডা থেকে সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়। ওই ঘটনার পর সাধারণ শিক্ষার্থী ও পথচারীদের সুবিধার্থে ওয়্যারলেস গেট মোড়ে সিটি কর্পোরেশন নির্মিত বিশ্রামারাগারে বাড়তি চেয়ারের ব্যবস্থা করে দেয় বনানী থানা বিএনপি। তবে উদ্বেগের বিষয় হলো, পথচারীদের বিশ্রামের পুরো জায়গাটি এখন দখল করে নিয়েছে চা ও সিগারেটের অবৈধ দোকান। অনুসন্ধানে স্থানীয় ব্যবসায়ী ও অধিবাসীদের সাথে কথা বলে মহাখালী ওয়্যারলেস গেট এলাকার ফুটপাত ও সড়ক দখলের নেপথ্যে শক্তিশালী একটি সিন্ডিকেটের নাম উঠে এসেছে। অভিযোগ রয়েছে, এই চাঁদাবাজির মূল নিয়ন্ত্রক ২০ নং ওয়ার্ড বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক ওলি উল্লাহ মিয়া সায়েম, 'জ' ইউনিট বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আনিসুর রহমান আনিস এবং ওয়ার্ড বিএনপির সাবেক নেতা নাসির। ব্যবসায়ীদের দাবি, স্থানভেদে একেকটি দোকান থেকে দৈনিক ২০০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করা হয়। কেবল স্থায়ী বা মৌসুমী দোকানই নয়, রাজপথের মোড়ে বসা ফুটপাতের মুচি কিংবা ভিক্ষুকরাও রেহাই পাচ্ছে না এই সিন্ডিকেটের হাত থেকে। ওয়্যারলেস গেট এলাকার স্থায়ী বাসিন্দা কামাল হোসেন বলেন, "স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের নিয়ে প্রতিদিন আতঙ্কের মধ্যে রাস্তা পার হতে হয়। হাঁটার ফুটপাতটা পর্যন্ত চা-দোকানিরা গিলে খেয়েছে। মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়ে আমাদের মূল রাস্তায় হাঁটতে হচ্ছে।" অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে অভিযুক্তদের একজন, ২০ নং ওয়ার্ড বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক ওলি উল্লাহ মিয়া সায়েম অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, "একটি মহল রাজনৈতিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন করতে আমার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছে। চাঁদাবাজির সাথে আমার কোনো সম্পৃক্ততা নেই।" তবে বনানী থানা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মিজানুর রহমান বাচ্চু বলেন, "দলীয় পরিচয়ে কেউ চাঁদাবাজি বা অবৈধ দখলের সাথে জড়িত থাকলে কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া হবে না। সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ পেলে তাৎক্ষণিক সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।" উচ্ছেদ অভিযান প্রসঙ্গে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের নির্বাহী কর্মকর্তা জিয়াউর রহমান জানান, "আমরা নিয়মিত ফুটপাত দখলমুক্ত করতে অভিযান পরিচালনা করছি। তবে উচ্ছেদের পর স্থানীয় প্রভাবশালীরা পুনরায় দোকান বসিয়ে দিলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর সহযোগিতা প্রয়োজন। অচিরেই ওই এলাকায় স্থায়ী যৌথ অভিযান চালানো হবে।" বনানী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সালাউদ্দিন বলেন, "ফুটপাত দখল বা চাঁদাবাজির বিষয়ে পুলিশের জিরো টলারেন্স নীতি রয়েছে। অপরাধী যেই হোক না কেন, রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনা না করে আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।" সাধারণ মানুষের দাবি, শুধু সাময়িক উচ্ছেদ অভিযান চালিয়ে এই সমস্যার সমাধান হবে না। ফুটপাত স্থায়ীভাবে পথচারীদের চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করতে এবং এর নেপথ্যে থাকা প্রভাবশালী চাঁদাবাজ চক্রকে আইনের আওতায় আনতে স্থায়ী তদারকি দল গঠন করা জরুরি। |