|
মসজিদ নয়: ভাঙতে হবে বিদ্বেষের দেয়াল
মীর আব্দুল আলীম:
|
মসজিদ ভাঙার ঘটনা কোনোভাবেই শুধু একটি স্থাপনা ভেঙে ফেলার ঘটনা নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে মানুষের বিশ্বাস, প্রার্থনা, স্মৃতি, আবেগ এবং ধর্মীয় পরিচয়। ভারতে সাম্প্রতিক সময়ে বহু পুরোনো মসজিদ ও মুসলিম ধর্মীয় স্থাপনা নিয়ে মামলা, জরিপ, অপসারণের উদ্যোগ এবং কোথাও কোথাও ভাঙার ঘটনাকে কেন্দ্র করে যে উত্তেজনা ও প্রতিবাদ দেখা যাচ্ছে, তা তাই গভীরভাবে ভাবার বিষয়। একই সঙ্গে কোনো মন্দির, গির্জা, বৌদ্ধবিহার, সিনাগগ কিংবা অন্য কোনো ধর্মের উপাসনালয় ভাঙার ঘটনাও একইভাবে উদ্বেগের। কারণ উপাসনালয়ের দেয়াল ভাঙা যতটা সহজ, মানুষের হৃদয়ে তৈরি হওয়া ক্ষত সারানো ততটা সহজ নয়।আদালতের দোহাই দিয়ে কোনো পুরোনো ধর্মীয় স্থাপনা ভাঙার প্রশ্ন উঠলে রাষ্ট্রকে শুধু আইনের একটি ধারা দেখলেই চলবে না; তাকে ভাবতে হবে এর ধর্মীয়, সামাজিক ও মানবিক অভিঘাত নিয়েও। কোনো স্থাপনা নিয়ে ঐতিহাসিক বা মালিকানাগত বিরোধ থাকতেই পারে। তার নিষ্পত্তির জন্য আদালত আছে, আইন আছে, প্রমাণ যাচাইয়ের ব্যবস্থা আছে। কিন্তু একটি বিরোধের সমাধান যেন এমন কোনো পথে না যায়, যাতে একটি সম্প্রদায়ের মনে রাষ্ট্র সম্পর্কে অবিশ্বাস তৈরি হয় এবং ধর্মে ধর্মে সংঘাতের বীজ আরও গভীরে প্রোথিত হয়। ভারতের সরকারের কাছে তাই এই মুহূর্তে বিষয়টি নতুন করে ভাবার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। আইনের শাসন অবশ্যই বজায় রাখতে হবে, আদালতের সিদ্ধান্ত অবশ্যই সম্মান করতে হবে। কিন্তু রাষ্ট্রের সিদ্ধান্তের সঙ্গে মানবিক বিবেচনাও থাকতে হবে। বিশেষ করে শত বছরের পুরোনো কোনো উপাসনালয় যখন একটি সম্প্রদায়ের ধর্মীয় স্মৃতি ও অনুভূতির অংশ হয়ে গেছে, তখন সেটিকে অপসারণের আগে সম্ভব সব বিকল্প পথ বিবেচনা করা জরুরি। কারণ আইনগতভাবে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব হলেই প্রতিটি পরিস্থিতিতে সেই পদক্ষেপ নেওয়া সামাজিকভাবে বিচক্ষণ বা শান্তিপূর্ণ হবে এমন নয়। একটি মসজিদ মুসলমানের কাছে শুধু ইট-পাথরের ভবন নয়। একটি মন্দিরও হিন্দুর কাছে শুধু স্থাপত্য নয়। গির্জা খ্রিস্টানের কাছে, বৌদ্ধবিহার বৌদ্ধের কাছে, সিনাগগ ইহুদির কাছে কেবল একটি নির্মাণকাজ নয়। এসব স্থানের সঙ্গে প্রজন্মের স্মৃতি, প্রার্থনা, সংস্কৃতি ও আত্মপরিচয় জড়িয়ে থাকে। তাই ধর্মীয় স্থাপনা নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় রাষ্ট্রকে স্থাপনার পাশাপাশি মানুষের অনুভূতিকেও বিবেচনায় নিতে হবে। ভারতের ১৯৯১ সালের Places of Worship Act স্বাধীনতার সময়কার ধর্মীয় স্থানের চরিত্র বজায় রাখার একটি নীতি নির্ধারণ করেছিল। এই আইনের সাংবিধানিক বৈধতা নিয়ে সুপ্রিম কোর্টে মামলা বিচারাধীন। ফলে ধর্মীয় স্থানের চরিত্র পরিবর্তন নিয়ে বর্তমান বিতর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি কাঠামো ইতিমধ্যেই রয়েছে। এই কাঠামোর মধ্যেই বিরোধের সমাধান খোঁজা উচিত, জনতার আবেগ বা রাজনৈতিক মেরুকরণের মাধ্যমে নয়। রাষ্ট্রের জন্য এখানেই সবচেয়ে বড় পরীক্ষাটি। রাষ্ট্র কোনো ধর্মের পক্ষ নেবে না, আবার কোনো ধর্মের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েও রাজনীতি করবে না। রাষ্ট্রের পক্ষ হবে সংবিধান, আইনের শাসন এবং নাগরিকের অধিকার। কোনো মন্দির অন্যায়ভাবে ভাঙা হলে রাষ্ট্রের অবস্থান যেমন স্পষ্ট হতে হবে, কোনো মসজিদ অন্যায়ভাবে ভাঙা হলেও সেই অবস্থান একই রকম দৃঢ় হতে হবে। কোনো গির্জা, বৌদ্ধবিহার, সিনাগগ বা অন্য কোনো উপাসনালয়ের ক্ষেত্রেও একই নীতি প্রযোজ্য। ন্যায়বিচারের সৌন্দর্য এখানেই যে তার দাঁড়িপাল্লা পরিচয় দেখে ওজন বদলায় না। রাজনীতির একটি বড় প্রলোভন হলো মানুষকে তার নাগরিক পরিচয়ের বদলে ধর্মীয় পরিচয়ে ভাগ করা। কারণ বিভক্ত মানুষকে উত্তেজিত করা সহজ, ভয় দেখানো সহজ, ভোটের অঙ্কে ব্যবহার করাও সহজ। কিন্তু রাষ্ট্র যদি এই বিভাজনের রাজনীতিকে প্রশ্রয় দেয়, তার ক্ষতি কোনো একটি সম্প্রদায়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। আজ যে পরিচয় সংখ্যাগরিষ্ঠ, কাল সে সংখ্যালঘু হতে পারে; আজ যে নিরাপদ, কাল তার নিরাপত্তা অন্যের হাতে নির্ভরশীল হয়ে যেতে পারে। তাই ধর্মীয় স্বাধীনতা রক্ষার সবচেয়ে নিরাপদ পথ হলো সবার জন্য একই নিয়ম। ভারতের মতো বহুধর্মীয় ও বহুত্ববাদী সমাজে রাষ্ট্রের উচিত বিশেষভাবে একটি নীতিতে অটল থাকা: যার যার ধর্ম, তার তার অধিকার; কিন্তু রাষ্ট্র সবার। মসজিদের আজান কারও বিরুদ্ধে যুদ্ধের ঘোষণা নয়, মন্দিরের ঘণ্টাধ্বনিও কারও বিরুদ্ধে নয়, গির্জার ঘণ্টা বা বৌদ্ধবিহারের প্রার্থনাও নয়। এগুলো মানুষের বিশ্বাসের ভাষা। এই ভাষাগুলোকে পরস্পরের বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়ে দিলে ধর্ম জয়ী হয় না, পরাজিত হয় মানবতা। আদালত ইতিহাসের নথি বিচার করবে, রাষ্ট্র আইন প্রয়োগ করবে, গবেষক ইতিহাস অনুসন্ধান করবেন। কিন্তু জনতা যেন বিচারকের আসনে বসে না যায়। কারণ জনতার হাতে বিচার চলে গেলে প্রথমে অভিযুক্তের পরিচয় হারিয়ে যায়, তারপর প্রমাণের মূল্য হারায়, শেষ পর্যন্ত আইনের অস্তিত্বই প্রশ্নের মুখে পড়ে। ধর্মীয় স্থাপনা রক্ষার প্রশ্নটি তাই কেবল ধর্মের প্রশ্ন নয়; এটি আইনের শাসন রক্ষার প্রশ্ন। অতীতের ইতিহাস অবশ্যই জানা দরকার। কোনো সময় কোনো শাসক কোনো ধর্মীয় স্থাপনার ওপর অন্যায় করে থাকলে ইতিহাসবিদরা তা গবেষণা করবেন, নথি পরীক্ষা করবেন, আদালত প্রাসঙ্গিক হলে আইনি প্রশ্নের বিচার করবেন। কিন্তু কয়েকশ বছর আগের কোনো ঘটনার জন্য আজকের সাধারণ মানুষকে দায়ী করা যায় না। আজকের একজন মুসলমান অতীতের কোনো শাসকের কাজের জন্য দায়ী নন; আজকের একজন হিন্দুও অতীতের কোনো শাসকের সিদ্ধান্তের জন্য দায়ী নন। অতীতের অপরাধের বোঝা বর্তমানের নিরপরাধ মানুষের কাঁধে চাপিয়ে দিলে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হয় না, বরং নতুন অন্যায়ের জন্ম হয়। সবচেয়ে বড় আশঙ্কার জায়গাটি এখানেই। যখন ধর্মীয় স্থাপনা নিয়ে বিরোধ রাজনৈতিক পরিচয়ের সঙ্গে মিশে যায়, তখন একটি আইনি বিষয় ধীরে ধীরে সাম্প্রদায়িক আবেগের বিষয়ে পরিণত হতে পারে। মানুষ তখন নাগরিক হিসেবে নয়, ধর্মীয় পরিচয়ে একে অপরকে দেখতে শুরু করে। আর এই বিভাজন যদি গভীর হয়, তাহলে তার পরিণতি শুধু একটি স্থাপনা বা একটি শহরের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। ধর্মে ধর্মে সংঘাত কোনো সমাজের জন্যই কল্যাণকর নয়। একটি মসজিদ ভাঙার প্রতিক্রিয়া অন্য কোথাও একটি মন্দিরের ওপর আক্রমণের অজুহাত হতে পারে; একটি মন্দির নিয়ে সংঘাত অন্য কোনো ধর্মীয় স্থাপনার নিরাপত্তাকে ঝুঁকিতে ফেলতে পারে। এভাবে প্রতিশোধের একটি চক্র তৈরি হলে তার শেষ কোথায়, কেউ জানে না। তাই একটি ধর্মীয় স্থাপনা রক্ষার প্রশ্নকে অন্য ধর্মের বিরুদ্ধে দাঁড় করানো নয়, বরং সব ধর্মীয় উপাসনালয়ের নিরাপত্তার প্রশ্ন হিসেবে দেখতে হবে। এখানেই রাষ্ট্রের নিরপেক্ষতার পরীক্ষা। কোনো মসজিদ অন্যায়ভাবে ভাঙা হলে রাষ্ট্রকে যেমন প্রতিবাদ ও আইনি সুরক্ষার অবস্থান নিতে হবে, কোনো মন্দির অন্যায়ভাবে ভাঙা হলেও একই অবস্থান নিতে হবে। গির্জা, বৌদ্ধবিহার, সিনাগগ বা অন্য কোনো উপাসনালয়ের ক্ষেত্রেও একই নীতি প্রযোজ্য। রাষ্ট্রের দাঁড়িপাল্লা ধর্ম দেখে বদলাতে পারে না। মানুষকে শুধু মানুষ হিসেবে দেখার শিক্ষা এখান থেকেই শুরু করতে হবে। মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, ইহুদি এসব মানুষের ধর্মীয় পরিচয়। কিন্তু রাষ্ট্রের কাছে তার প্রথম পরিচয় নাগরিক। আর মানুষের কাছে তার প্রথম পরিচয় মানুষ। নিজের ধর্ম পালন করার অধিকার যেমন থাকবে, তেমনি অন্যের ধর্ম পালন করার অধিকারকেও সম্মান করতে হবে। ভারত সরকারের কাছে তাই সময়ের দাবি হলো, ধর্মীয় স্থাপনা নিয়ে যেকোনো বিরোধে সর্বোচ্চ সংযম ও সতর্কতার নীতি গ্রহণ করা। যেখানে আইনগতভাবে সম্ভব, ভাঙার পরিবর্তে সংরক্ষণ ও বিকল্প সমাধানকে অগ্রাধিকার দেওয়া; যেখানে বিরোধ রয়েছে, আদালতের প্রক্রিয়াকে চলতে দেওয়া; আর যেখানে মানুষের ধর্মীয় অনুভূতি জড়িত, সেখানে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে তার সামাজিক অভিঘাত বিবেচনা করা। কারণ একটি উপাসনালয় ভেঙে ফেলা হয়তো একটি সমস্যার তাৎক্ষণিক সমাপ্তি বলে মনে হতে পারে, কিন্তু তার সঙ্গে যদি হাজার মানুষের মনে ক্ষোভ, অপমান ও নিরাপত্তাহীনতা জন্ম নেয়, তাহলে সমস্যার প্রকৃত সমাধান হয় না। বরং নতুন সমস্যার জন্ম হয়। রাষ্ট্রের শক্তি তার ভাঙার ক্ষমতায় নয়, তার রক্ষা করার সক্ষমতায়। একটি রাষ্ট্র তখনই শক্তিশালী হয়, যখন সংখ্যাগরিষ্ঠের আবেগের পাশাপাশি সংখ্যালঘুর নিরাপত্তাকেও সমান গুরুত্ব দিতে পারে; যখন জনপ্রিয় দাবির পাশাপাশি আইনের শাসনকে অগ্রাধিকার দিতে পারে; যখন অতীতের ক্ষতকে বর্তমানের মানুষের বিরুদ্ধে ব্যবহার না করে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য শান্তির পথ তৈরি করতে পারে। মসজিদ ভাঙা বন্ধ করতে হবে। মন্দির ভাঙাও বন্ধ করতে হবে। কোনো গির্জা, বৌদ্ধবিহার, সিনাগগ কিংবা অন্য কোনো উপাসনালয় ভাঙার সংস্কৃতিও বন্ধ করতে হবে। কারণ এটি শেষ পর্যন্ত কোনো একটি ধর্মের বিজয় বা পরাজয়ের প্রশ্ন নয়; এটি মানুষের সহাবস্থানের প্রশ্ন। ধর্ম থাকবে, ধর্মীয় বিশ্বাস থাকবে, উপাসনালয় থাকবে। কিন্তু ধর্মের নামে মানুষে মানুষে দেয়াল তৈরি করা যাবে না। ইতিহাসের বিচার হবে প্রমাণে, বিরোধের নিষ্পত্তি হবে আইনে, আর সমাজের ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হবে সহনশীলতা ও সম্প্রীতিতে। ভারত সরকারের এখনই ভাবা উচিত একটি মসজিদ ভাঙার পর যে ক্ষত তৈরি হয়, তা শুধু মুসলমানের ক্ষত নয়; একটি মন্দির ভাঙার ক্ষতও শুধু হিন্দুর ক্ষত নয়। উপাসনালয়ে আঘাত শেষ পর্যন্ত মানুষের বিশ্বাসে আঘাত। তাই ভাঙার পথ থেকে সরে এসে রক্ষার পথ বেছে নেওয়াই রাষ্ট্রের সবচেয়ে মানবিক সিদ্ধান্ত হতে পারে। উপাসনালয় নয়, ভাঙতে হবে বিদ্বেষের দেয়াল। ধর্মে ধর্মে যুদ্ধ নয়, মানুষে মানুষে সম্প্রীতিই হোক রাষ্ট্রের পথ। মীর আব্দুল আলীমঃ সাংবাদিক, কলামিস্ট। |