|
গুজবের আগুনে পুড়ছে সমাজ
মুহাম্মদ শামসুল ইসলাম সাদিক:
|
একটি মিথ্যা কথা কখনো কখনো একটি মানুষের জীবন, একটি পরিবারের সম্মান এবং একটি সমাজের শান্তি কেড়ে নিতে গুজবের মতো শব্দই সক্ষম। একটি কথা—হয়তো সত্য নয়। একটি বার্তা—হয়তো ভিত্তিহীন। একটি ছবি—হয়তো সম্পূর্ণ ভিন্ন ঘটনার। অথচ সেটিই যখন মানুষের হাতে হাতে, মুঠোফোন থেকে মুঠোফোনে ছড়িয়ে পড়ে, তখন মুহূর্তেই তৈরি হয় আতঙ্ক, সন্দেহ ও উত্তেজনা। কেউ যাচাই করে না, কেউ উৎস জানতে চায় না; বরং ‘শুনেছেন?’—এই একটি প্রশ্নের সঙ্গে সঙ্গে মিথ্যা তথ্য পেয়ে যায় নতুন জীবন। এভাবেই জন্ম নেয় গুজব। আর গুজব যখন সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়ে পড়ে, তখন তা আর নিছক একটি মিথ্যা কথা থাকে না—তা পরিণত হয় ভয়ংকর সামাজিক ব্যাধিতে।গুজবের কোনো পা নেই, অথচ তার গতি বিদ্যুতের চেয়েও দ্রুত। এর কোনো মুখ নেই, অথচ হাজারো মুখে তা উচ্চারিত হয়। এর কোনো সত্যতা নেই, অথচ একসময় মানুষ সেটিকেই সত্য বলে বিশ্বাস করতে শুরু করে। সবচেয়ে বিপজ্জনক বিষয় হলো, গুজব মানুষের যুক্তিবোধকে অতিক্রম করে আবেগকে উসকে দেয়। আর আবেগ যখন বিবেককে পরাজিত করে, তখন একটি সমাজ খুব সহজেই অস্থির হয়ে উঠতে পারে। আমাদের সমাজে গুজব নতুন নয়। প্রাচীনকাল থেকেই মানুষের মধ্যে মুখে মুখে নানা কল্পকাহিনি, অতিরঞ্জিত তথ্য ও মিথ্যা সংবাদ ছড়িয়েছে। কিন্তু প্রযুক্তির বিস্ময়কর বিকাশ গুজবকে দিয়েছে ভয়ংকর শক্তি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে একটি মিথ্যা তথ্য ছড়িয়ে দিতে এখন আর কোনো সভা, মিছিল কিংবা জনসমাগমের প্রয়োজন হয় না। একটি ফেসবুক পোস্ট, একটি ভিডিও, একটি ভয়েস মেসেজ কিংবা একটি বিভ্রান্তিকর ছবি যথেষ্ট। কয়েক মিনিটের মধ্যেই তা হাজার, লাখ মানুষের কাছে পৌঁছে যেতে পারে। সমস্যা এখানেই শেষ নয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদমও অনেক সময় উত্তেজনাপূর্ণ, চাঞ্চল্যকর ও আবেগনির্ভর কনটেন্টকে বেশি মানুষের সামনে নিয়ে আসে। ফলে সত্য ও মিথ্যার প্রতিযোগিতায় অনেক সময় মিথ্যাই এগিয়ে যায়। কারণ সত্য সাধারণত ধীর, কিন্তু গুজব দ্রুত; সত্য প্রমাণ চায়, গুজব শুধু বিশ্বাস চায়। গুজবের সবচেয়ে ভয়াবহ শিকার হতে পারে একজন নিরপরাধ মানুষ। কারও বিরুদ্ধে একটি মিথ্যা অভিযোগ ছড়িয়ে পড়লেই তার সামাজিক মর্যাদা নষ্ট হতে পারে। একটি পরিবারকে নিয়ে অপপ্রচার তাদের দীর্ঘদিনের সম্পর্ক ও সম্মানকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে। কোনো প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ভিত্তিহীন তথ্য ছড়িয়ে পড়লে তার ওপর মানুষের আস্থা নষ্ট হতে পারে। এমনকি কোনো সম্প্রদায়কে কেন্দ্র করে গুজব ছড়িয়ে পড়লে তা সামাজিক সম্প্রীতির জন্য ভয়াবহ হুমকি হয়ে উঠতে পারে। আরও ভয়াবহ হলো, গুজব কখনো কখনো সহিংসতার আগুন জ্বালায়। একটি মিথ্যা তথ্যকে কেন্দ্র করে মানুষ উত্তেজিত হয়, একে অন্যকে সন্দেহ করতে শুরু করে। যুক্তির জায়গা দখল করে নেয় প্রতিশোধের মানসিকতা। তখন সামান্য একটি গুজবও বড় ধরনের সংঘাতের কারণ হতে পারে। অর্থাৎ গুজব শুধু তথ্যের বিকৃতি নয়; এটি সামাজিক নিরাপত্তার জন্যও একটি গুরুতর হুমকি। প্রশ্ন হলো—মানুষ গুজব বিশ্বাস করে কেন? এর উত্তর লুকিয়ে আছে মানুষের মনস্তত্ত্বে। মানুষ সাধারণত চমকপ্রদ ও অস্বাভাবিক খবরের প্রতি বেশি আকৃষ্ট হয়। একটি স্বাভাবিক ঘটনা যতটা না আলোড়ন সৃষ্টি করে, তার চেয়ে অনেক বেশি উত্তেজনা তৈরি করে কোনো অস্বাভাবিক বা ভয়ংকর সংবাদ। সেই সুযোগটিই কাজে লাগায় গুজব সৃষ্টিকারীরা। কখনো রাজনৈতিক স্বার্থে, কখনো ব্যক্তিগত প্রতিহিংসায়, কখনো ব্যবসায়িক প্রতিযোগিতায়, আবার কখনো নিছক কৌতূহল বা দুষ্টুমির বশে গুজব ছড়ানো হয়। তবে গুজবের সবচেয়ে বড় বাহক অনেক সময় গুজব সৃষ্টিকারী ব্যক্তি নন; বরং আমরা নিজেরাই। কেউ একটি মিথ্যা তথ্য তৈরি করল, কিন্তু আমরা যাচাই না করে সেটি শেয়ার করলাম—তাহলে সেই মিথ্যার বিস্তারে আমাদেরও দায় রয়েছে। ‘আমি তো শুধু শেয়ার করেছি’—এই অজুহাত কোনোভাবেই দায়িত্ব এড়ানোর পথ হতে পারে না। কারণ একটি তথ্য শেয়ার করার আগে সেটি সত্য কি না যাচাই করার নৈতিক দায়িত্ব প্রত্যেক নাগরিকের রয়েছে। এখানে গণমাধ্যমের দায়িত্বও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সংবাদমাধ্যমকে হতে হবে গুজবের বিপরীতে সত্যের নির্ভরযোগ্য আশ্রয়। কোনো তথ্য প্রকাশের আগে একাধিক নির্ভরযোগ্য উৎস থেকে তা যাচাই করতে হবে। একই সঙ্গে গণমাধ্যমকে মানুষের মধ্যে তথ্য যাচাইয়ের সংস্কৃতি গড়ে তুলতে ভূমিকা রাখতে হবে। পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও ডিজিটাল সচেতনতার শিক্ষা জরুরি। শিশু-কিশোরদের শুধু প্রযুক্তি ব্যবহারের দক্ষতা শেখালেই হবে না; শেখাতে হবে প্রযুক্তি ব্যবহারের নৈতিকতা। কোন তথ্য বিশ্বাস করতে হবে, কোনটি যাচাই করতে হবে, কোনটি শেয়ার করা উচিত নয়—এসব বিষয়ে বাস্তবভিত্তিক শিক্ষা প্রয়োজন। রাষ্ট্রেরও দায়িত্ব রয়েছে। গুজবের মাধ্যমে যারা পরিকল্পিতভাবে সামাজিক অস্থিরতা সৃষ্টি করে, তাদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। তবে শুধু আইন দিয়ে গুজব বন্ধ করা সম্ভব নয়। প্রয়োজন দ্রুত ও নির্ভরযোগ্য সরকারি তথ্যপ্রবাহ। কোনো ঘটনার সত্য তথ্য মানুষ দ্রুত জানতে না পারলে গুজব সেই শূন্যস্থান দখল করে নেয়। আমাদের মনে রাখতে হবে, গুজবের সবচেয়ে কার্যকর প্রতিষেধক হলো সচেতনতা ও সত্য। কোনো খবর শুনেই বিশ্বাস করার আগে কয়েকটি প্রশ্ন করা দরকার—উৎস কী? তথ্যটি কে দিয়েছে? নির্ভরযোগ্য কোনো সংবাদমাধ্যমে কি খবরটি প্রকাশিত হয়েছে? সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কি বিষয়টি নিশ্চিত করেছে? ছবি বা ভিডিওটি আসলেই ওই ঘটনার কি না? এই সামান্য সতর্কতাই অনেক বড় বিপর্যয় ঠেকাতে পারে। একটি সমাজের শক্তি শুধু তার অর্থনীতি, প্রযুক্তি কিংবা অবকাঠামোর ওপর নির্ভর করে না; তার সবচেয়ে বড় শক্তি হলো মানুষের পারস্পরিক বিশ্বাস। গুজব সেই বিশ্বাসে ফাটল ধরায়। তাই গুজবের বিরুদ্ধে লড়াই মানে শুধু মিথ্যা তথ্যের বিরুদ্ধে লড়াই নয়—এটি সামাজিক সম্প্রীতি, মানবিক মর্যাদা ও নাগরিক নিরাপত্তা রক্ষার লড়াই। আজ আমাদের প্রত্যেকের হাতে একটি করে শক্তিশালী মাধ্যম—মুঠোফোন। এই মাধ্যম দিয়ে আমরা যেমন সত্য ছড়িয়ে দিতে পারি, তেমনি মুহূর্তেই ছড়িয়ে দিতে পারি মিথ্যা ও বিভ্রান্তি। সিদ্ধান্তটি আমাদেরই নিতে হবে—আমরা কি গুজবের বাহক হব, নাকি সত্যের প্রহরী? একটি শেয়ার করার আগে একবার থামুন। একটি বার্তা পাঠানোর আগে একবার ভাবুন। কারণ আপনার আঙুলের একটি স্পর্শ হয়তো কারও জীবনে আলো আনতে পারে, আবার অন্ধকারও নামিয়ে দিতে পারে। গুজব ছড়ানো সহজ, কিন্তু তার ক্ষত সারানো কঠিন। তাই আসুন—গুজব নয়, সত্যকে ছড়িয়ে দিই; বিভ্রান্তি নয়, সচেতনতা তৈরি করি; অবিশ্বাস নয়, মানুষের মধ্যে আস্থা ও সম্প্রীতির সেতু গড়ে তুলি। লেখকঃ- প্রাবন্ধিক ও মুদ্রণ ব্যবস্থাপক, দৈনিক সিলেটের ডাক |